![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৫ |
প্রতীক্ষা
ডাক্তার সেন বলেছিলেন, “ব্যালকনিতে গিয়ে মাঝে মাঝে বসবেন। কারও সাহায্য নিয়ে নয়, বরং নিজে নিজে হাঁটার চেষ্টা করে দেখুন। নিশ্চয়ই পারবেন”।
কিন্তু এই প্রবীণ বয়সে পায়ের চোট কি আর সহজে সারতে চায়? চেষ্টা রোজই করেন সদানন্দ। আজও একা একা ব্যালকনিতে এসে বসেছেন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে।
ঘটনাটা আকস্মিকভাবেই ঘটেছিল। অন্যমনস্ক হয়েই পা রেখেছিলেন সিঁড়িতে। পা হড়কে গড়িয়ে পড়তে পড়তে রেলিং জাপটে ধরেছিলেন বলে মাথার চোটটা এড়ানো গিয়েছিল। কিন্তু পায়ের হাড়ে মারাত্মক ফ্র্যাকচার ধরা পড়েছিল এক্স-রেতে। মেয়ে দোলন কর্মসূত্রে চেন্নাইতে থাকে। সদানন্দ চাননি তক্ষুনি ওকে খবরটা দিতে। বলেছিলেন, “এই তো সামনের মার্চেই ও আসছে। শুধু শুধু কেন জানাতে যাবে এখন? চট্ করে এখনই চলে এলে পরে যদি আসতে না পারে? যদি ছুটি না পায়? তাছাড়া এমন কিছু মেজর ব্যাপার না। বুড়ো হাড়ে চোট লাগলে সামলাতে সময় লাগবেই।“
স্ত্রী নন্দিতা শুনেছিলেন সেই কথা। কিছুই জানাননি মেয়েকে।
আজ দোলন ফিরছে। ফ্লাইটে ওঠার আগে মেয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বলেছিলেন নন্দিতা। তখনই সব ঘটনা জানিয়েছিলেন।
দোলন যতক্ষণ ফ্লাইটে থাকে, ততক্ষণ নিদারুণ উৎকণ্ঠায় থাকেন সদানন্দ। ব্যালকনিতে বসে থাকতে থাকতে চা কখন ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, খেয়ালই করেননি তিনি। বারে বারে চোখ চলে যাচ্ছিল মোবাইলের ঘড়ির দিকে। দমদমে দোলনের ফ্লাইট না নামা পর্যন্ত এই অস্থিরতা তাঁর চলবেই।
“চা যে তোমার জল হয়ে গেল।” নন্দিতার কথায় পেছনে তাকালেন সদানন্দ। “কী এত ভাবছ বল তো?”
মৃদু হাসলেন সদানন্দ। কাছের নারকেল গাছের ফাঁক দিয়ে গোল থালার মতো উজ্জ্বল চাঁদ দেখা যাচ্ছে। সদানন্দ বললেন, “তোমার মনে আছে, নন্দিতা দোলের দিনই আমরা পুজো দিয়ে এই বাড়িতে প্রবেশ করেছিলাম! তখন আশেপাশে জায়গা ফাঁকা ফাঁকা। তারপর কত পরিবর্তন হয়ে গেল, তাই না!”
নন্দিতা বললেন, “তা তো হবেই। মাঝের সময়টা কি কম? তিরিশ বছরেরও বেশি। আর তার ঠিক পরের বছরই দোলের আগের দিন দোলন এল। তুমি বললে দোলের আগের দিন জন্ম। তাই নাম রাখব দোলন”।
দূরে গোল চাঁদের দিকে চেয়ে সদানন্দ বললেন, “কালই তো দোলপূর্ণিমা তাই না? আচ্ছা, দোলনের ফ্লাইট পৌঁছেছে দমদমে? একবার ফোন করে দেখো না!”
নন্দিতা বললেন, “অত ভেবো না তো! ও নিজে ফোন করবে ঠিক। তুমি চা-টা শেষ কর”।
ঠাণ্ডা চা-টা এক চুমুকে শেষ করে উঠলেন সদানন্দ। এবার ঘরে যাবেন। নন্দিতা হাত বাড়িয়ে বললেন, “ধর। নাকি পারবে একা একা?”
ডাক্তার সেনের কথা মনে করিয়ে দিলেন সদানন্দ। গাছের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ব্যালকনিতে এসে পড়েছে। বসন্তের মৃদু বাতাস বইছে।
ঠিক
তখনই ঘরের ভেতর টেবিলের উপর রাখা নন্দিতার মোবাইলটা বেজে উঠল।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন