মৃণাল বণিক, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মৃণাল বণিক
উপলব্ধির আড়ালে
উপলব্ধি আর মূল্যবোধের আলোকে দাঁড়িয়ে ঠিক যেখানে একটা নির্ণায়ক অধ্যায় নিজেকে তুলে ধরছে, সেখানে বিগত পঞ্চাশ বছর আগের প্রোভোকিং ফ্যাক্টর থেকে উঠে আসা গদ্যময় আর্তি, নবীন লেখকের রচনাক্ষেত্রে শতসহস্র প্রশ্ন রেখে যায়। প্রোভোকিং ফ্যাক্টরের কি কোনো অ্যান্টি প্রোভোকিং ফ্যাক্টর থাকতে পারে? যেখানে এসে একটা মোড় নেবে জীবন থেকে উঠে আসা সাহিত্ধারা। বা একটা মোড় কি দ্বিতীয়বার ঘুরে দেখে আসবে, কোথায় রয়ে গেছে তার হাত থেকে ছেড়ে যাওয়া অশ্লীল জীবনের প্রতিরূপ। অশ্লীল বলছি কেননা শ্লীলতার আড়াল থেকে উঠে এসেই সে একদিন সঙ্গমের অন্যতর রূপ দেখতে চেয়েছিল। সেখানে সে জীবনের নীচে বিভিন্ন রকেমের ক্যাপশন ব্যবহার করেছিল। বা তাকে ব্যাখ্যাতীত ভাবে সরিয়ে রেখেছিল সিস্টেমেটিক চিন্তা প্রবাহের বিরুদ্ধে। যা থেকে জন্ম নিয়েছিল এক পরাবাস্তব অধ্যায়। সেখানে হাপরের মতো কারখানার আগুন মানুষকে তার বাস্তবতা থেকে সরিয়ে রুজি রুটির কাছে নিয়ে গেছিল। অথচ সে সব ছিল রক্তক্ষয়ী।
এখন প্রশ্ন হল কেন এই আর্তি? কোথা থেকে উঠে আসছে এই সব আমাদের কাছে। একটু পিছনের দিকে যদি চোখ নিয়ে যাই দেখতে পাব ইউরোপ ছিল এক সময় বারুদ ভর্তি বাক্স। যখন তখন ব্লাস্ট হতে পারে। সেখান থেকে উঠে আসছিল মিলেটারিজম, ইমপিরিয়ালিজম, ন্যাশানালিজম, ইন্ডাসট্রিয়ালিজম। অর্থাৎ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পাওয়ার, মিলেটারি পাওয়ার, সাম্রাজ্যবাদ, আর দেশাত্মবোধ। প্রতিটি দেশ হু হু করে বাড়িয়ে নিচ্ছিল নিজেদের আর্মি। ক্ষমতা বৃদ্ধির লড়াইয়ে প্রতিটি শক্তি একে অন্যের প্রতিপক্ষ। যতদূর ঘোড়া দৌড়তে পারবে ততদূর সাম্রাজ্য। আর এই উপনিবেশিকতার মুলে জল সিঞ্চনের জন্য দরকার অফুরন্ত কাঁচা মালের যোগান। কারখানার জন্য কাঁচামাল চাই, চাই সস্তায় লেবার। এখন এই উপমহাদেশ আর কৃষ্ণ-মহাদেশের মতো কাঁচা মালের যোগান আর কে দিতে পারে বা সস্তায় শ্রমিক! না শেষ হওয়া এই চাহিদার জন্য, এই সব হতদরিদ্র দেশগুলো হয়ে উঠল শোষণের এক নতুন পৃথিবী। এবং তার প্রবাহ চলতে থাকল এক মালিক থেকে অন্য মালিকের হাত হয়ে। আমাদের এখানেও তারই প্রতিরূপ ফুটে উঠল। আমরা তার হাতে নিজেদের তুলে দিতে রাজি। আমাদের বাস্তবে রুজি চাই। কিন্তু কীভাবে?
সেই উত্তর উপনিবেশিক সময়ে দাঁড়িয়ে জোতদার আর সরকারের মাঝ থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া কিছু মানুষ তেভাগা থেকে নকশালবারি হয়ে ঠিক যখন সত্তরের দশক, মানে যাকে মুক্তির দশক বলা হয়, একটা আন্দোলন রেখে যাচ্ছে, তখনই এই রক্তক্ষয়ী শব্দটা মাথায় হ্যামারিং করে খুব। কিছুই করতে না পারার থেকে যা কিছু একটা করে যাওয়ার তাগিদ মানুষকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় তার সীমারেখা পর্যন্ত। অথচ তার বাইরেটা অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না। আর সেখানেই নিম লেখকেরা না দেখতে পাওয়া সেই বাস্তবতার জন্য রাখে তাদের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। উঠে আসে টেকনো শব্দ, টেকনো উপমা, টেকনো সিনট্যাক্স আর টেকনো চিন্তাধারা।
কিন্তু এই টেকনো শব্দটাই বা এল কোথা থেকে? রুজি রুটির সন্ধানে মানুষ কি কোনো একটা বাস্তবতার থেকে দূরে এসে নিজেকে দেখেছিল মেশিনচালিত? নাকি তা বাস্তবে ছিল একটা সীমাবদ্ধ যাপন থেকে উঠে এসে আরেকটা সীমাবদ্ধ যাপনের দিকে যাওয়া! কেননা তার আগে তারা বিশেষ যে কিছু একটা করে উঠে ছিল তা কিন্তু নয়। ক্লার্ক থেকে টেকনিশিয়ান এটুকুই ছিল তাদের পরিবর্তনের ধারা। সেখানে তাদের কোনো রকম আপ-গ্রেডেশন কিন্তু হয়নি। বরং এই পোস্ট ইনডাস্ট্রিয়ালিজম তাদের চোখের সামনের সিনারিওটা পালটে দিয়েছিল। যা মেনে নেওয়াই ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু তাও কৃষিভিত্তিক জীবনের সাথে ক্লারিকাল জীবনের বিশেষ কিছু তফাৎ নেই। তারা যখন তাদের অফিস থেকে ঘরের দিকে যেত তখন সব মালিন্য অফিসের ধুলো মলিন ফাইলের মাঝেই রেখে যেত। তার কোনো ক্ষত ঘরে নিয়ে যেতে হত না। এখন এই পোস্ট ইনডাস্ট্রিয়ালিজমের পর একজন শ্রমিক যখন ঘরের দিকে যায়, তখন সবুজ গাছ গাছালির বদলে একশ আশি ডিগ্রি বিপরীত যন্ত্রচালিত কারখানার ধুলো ধোঁয়া শব্দ আগুন আর প্রাণহীন লোহা লক্কড়ের না শেষ হওয়া লড়াই, এক চিরস্থায়ী মার্ক রেখে যায় মস্তিষ্কের কোষের মাঝে। তার কেমিক্যাল ব্যাল্যান্স পালটে যায়। এবং কিছুদিন পেটের তাগিদে এই সব সহ্য করেও শেষমেশ তার ভিতর ‘কেন’ প্রশ্নটা জেগে ওঠে তার অজান্তেই। আর এই প্রশ্নগুলোই তাকে তার জীবনের না গল্পের কাছে নিয়ে যায়।
এখন এই না-গল্প আর গল্পের মাঝের তফাৎ কোথায়। যখনই একজন লেখক তার কল্পনা জগতে রোমান্টিসিজমের সব ঘেরাটোপ থেকে সরে গিয়ে, তার জায়গায় উচ্চারণের চরমতম স্বাধীনতার দিকে যাবে। বা তার মাঝে তার উচ্চারণ যুক্তি থেকে বিযুক্তির যে কোনো একটা দিককে নিজের বলে মেনে নেবে। তখনই তার জীবনের সব গল্প বাস্তবতা এবং কল্পনার মাঝে এক অস্থির বিন্দু খুঁজে পাবে। অরক্ষণীয়া এক জীবন। পেটের দায় তাই ফেলা যায় না, মনের দায় তাই রাখা কষ্টের। আর সেখানেই বাস্তবতা আর বিভ্রমের সংমিশ্রণে না গল্পের জন্ম। এবং তা এবসার্ড হল তো তাই। না হল তো ক্ষতি কী থাকতে পারে। জীবন তো আর স্বর্গের পথে নিয়ে যাচ্ছে না। সেখানে এবসার্ডিজম থাকবে নাইবা কেন?
একটা নৈরাশ্যের মাঝে পড়ে থেকে থেকে একসময় কারোর সমস্ত চেতনা এক আত্ম-জিজ্ঞাসায় পরিণত হল। এবং তার প্রতিফলন দেখা গেল তার বিশ্বাসে তার প্রত্যয়ে। সে কি পারবে এই সব? সে নিজেও জানে না, সে পারবে কিনা। বা তার পারা উচিৎ হবে কিনা। বা উচিৎ বলেই তাকে এগোতে দেওয়া হবে কিনা? সে তার গ্রাম্য জীবন থেকে উঠে এসে কোম্পানির কোয়াটারের মেঝেতে শুয়ে ভেবেছে, সে কি বিরাট কোনো স্ববিরোধের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে? কেন-না চোখের সামনে যা কিছু দৃশ্যমান তা বর্ণনা যোগ্য নয়। আবার যা বর্ণনা যোগ্য তা দেখা যাচ্ছে কই! তাহলে আমি কোথায়? আমি কি শিল্পায়নের পাথর কাঁধে নিয়ে পাহাড়ের সানুদেশে। এবং আমাকে সেই পাথর মাথায় নিয়ে উঠে যেতে হবে উপরের দিকে, যাতে সে পাথর আবার নীচে গড়িয়ে পড়ে। এই আত্ম-জিজ্ঞাসায় বেড়ে ওঠে প্রসব বেদনা। সারা দেহ মোচড় দিয়ে বেরিয়ে আসে দলা দলা শব্দ। এবং তার উচ্চারণ। বাধাহীন। এক তরঙ্গ যে তার শক্তি প্রবাহিত করে যায়। আগামী প্রজন্মের জন্য।
তাহলে মূলত কী পেলাম। ভাষাকে তার স্বাধীনতা দেওয়া। এবং তার জন্য যা প্রয়োজন তা হল নতুন ভাষা নির্মাণ। মৃণাল বণিকের সাথে এক শিল্প শহরের নিবিড়তায়, তার হাড় মাংস সমেত আত্মার ক্ষতগুলোকে সাজিয়ে রাখা অগোছালো চিন্তার মাঝে। যেভাবে আমাদের একাগ্রতা কমে আসছে। যাকে বলে ডিগ্রি অফ কনসেনট্রেশন, তা কমে আসছে নাটকীয় ভাবে। এখন কেউ আর কারোর দিকে এক ভাবে তাকিয়ে থাকতে পারে না। এখন কেউ আর কারোর কথা এক ভাবে শুনতে পারে না। কারোর জীবনকে স্পর্শ করার মনোযোগ নেই। সবাই একসাথে অনেক কিছু করতে ব্যস্ত। এবং তা সতত অগভীর। কোনো তল ছুঁয়ে আসার ক্ষমতা থেকে দূরে। মানুষ তার নিজেরই বানানো নৈরাশ্যে বন্দি। অথচ এ ঘেরাটোপ তার প্রাপ্তিও বলা যেতে পারে। কতটা কীর্ণ তার জীবন রেখা। কতটা রিক্ত বিবিক্ত এক অধ্যায়ের মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য। অথচ বাঁচতে তো হবে।
শিল্পের আড়ালে মানব জীবনের এই যুক্তিহীনতা, এই শৃঙ্খলাহীনতা, এসবই হয়ে উঠে ছিল তার লেখার বিষয়। এবং তা কিন্তু প্রথম নয়। ইউরোপীয় শিল্পের এবং চিত্রকলায় তা আমরা আগেই লক্ষ করেছি। যুদ্ধোত্তর পৃথিবীতে মানুষের জীবনে নেমে আসা নিচতা, বিপন্নতা, মানুষকে নিকৃষ্টতম কাজ করতে বাধ্য করিয়েছে। এবং শিল্পে তার প্রতিফলন হিসাবে সমস্ত নিয়মকে ভেঙে ফেলার প্রতিরূপ হয়ে উঠে এসেছে সুররিয়ালিজম। সালভাদর দালির মতো মানুষ, যে ব্যাখ্যা করেছে ‘কী সুররিয়ালিজম’, দেখ আমাকে আমিই সুররিয়ালিজম, যার কোনো কেন্দ্রিকতা নেই। ডাডাবাদিরা যেখানে প্রচলিত সামাজিক মূল্যবোধকে নস্যাৎ করতে চেয়ে ছিল। যেখানে তারা রাজনীতি এবং শোষণের মাঝের তফাৎটা তুলে ধরতে পারবে। ভণ্ডামি থেকে মানুষের প্রাপ্তিকে তুলে ধরতে পারবে। এক নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমাজের এক অন্তর্নিহিত অর্থের কাছে পৌঁছাতে পারবে। সেখানে সুররিয়ালিজম আরও এক ধাপ এগিয়ে দেখিয়ে ছিল মানুষের অবচেতনের অধিকার। এবং প্রকৃত সত্য সেখানেই অবস্থান করে। মৃণাল বণিকের সাহিত্যের লক্ষ সেখান থেকেই মানুষকে তুলে দেখানো তার পাওনা গণ্ডা।
কেন একজন মৃণাল বণিক
এখন মৃণাল বণিক জন্মাচ্ছে
এখন সে স্কুলে যাচ্ছে
বড় হচ্ছে এখন
এবার চাকরি বিবাহ
তারপর লেখালেখি
আর যে মুহূর্তে সে লেখার কথা মাথায় আনছে, গর্ভপাত হচ্ছে তার। একটা দ্রবীভূত আন্দোলন পাক খাচ্ছে ঠিক এই সময়। সে তার খোলা মুখ ফার্নেসের মাঝে নিজেকে ঠেলে দিতে দিতে ভাবছে। লেখক হওয়ার ইচ্ছে হওয়া মাত্রই যদি কেউ আত্মহত্যা করে তাহলে?? তাহলে কি সব প্রশ্নগুলো কুপোমুণ্ডুকতায় নিজেদের চরম পরিণতি দেখতে পাবে? সব শুভবোধ থেকে উঠে এসে অ্যাবসোলিউড ডার্কনেস দেখতে পাবে জীবনের। তাকে নিয়ে ঘর করতে পারবে? শুতে পারবে একই বিছানায়? এবং এক অনিয়ন্ত্রিত প্রতিক্ষার সাক্ষী হয়ে থাকতে পারবে রাতভর। আসলে রাতভর কিন্তু একটা প্রতিক। রাতভর মানে রাতভর নয় অন্য কিছু। স্বর্গ মর্ত পাতাল যে কোনো কিছু। সেখানে তার প্রতিক্ষায় বসে আছে কেউ। আর মৃণাল তার ছবি আঁকছে। রাডার গল্পগ্রন্থের 'সামনে অরণ্য' গল্পের মাঝে নায়কের কানে একটা সুর বাজে সব সময়। 'ঠিকাছে ঠিকাছে' যেভাবে প্রত্যেকেই বলে আমি ভালো আছি, সেভাবেই। সেই সুরের অনুরণন নিয়ে ঘুরে বেড়ায় সে। ঘরে আসে। ঘর থেকে ফিরে যায় কোথায়। ঘরে নন্দিনী। ঘরে পাওয়ার ফেরিওর। সে মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃদু আলোয় নন্দিনীর মোহাচ্ছন্ন শরীর। অথচ মোমবাতি হয়তো কিছুক্ষণ পরেই নিভে যাবে। ঠিক সে সময় দরজায় শব্দ। সেই শব্দ নিয়ে নায়ক ভাবছে ডাকাত আর চোরের মাঝে পৌরুষ আর নপুংসকতার কথা। আর লিখতে লিখতে মৃণাল ক্রুশ বিদ্ধ এক টোটেম হয়ে উঠছে।
দুর্গাপুরে কেউ দুর্গাপুরের নয়। কেউ উদ্বাস্তু, কেউ পরিযায়ী, কেউ আবার নিজ মাটিতেই ছিন্নমূল। মৃণাল বণিকও তেমনই কিছু। জন্ম ১৯৪৬ সালে নোয়াখালী জেলায়, তারপর দেশভাগে দুর্গাপুর আসা। প্রাথমিক স্কুলিং রনডিহায়। তারপর ১৯৬০ সালে মানকর স্কুল থেকে স্কুল-ফাইনাল। তারপর বর্ধমান কলেজ এবং তা অসমাপ্ত রেখেই দুর্গাপুর অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্টে চাকরি। এ শহর সবাইকে রুজিরোজগার দিয়েছে অথচ তাকে বুকের মাঝে অনুভব করার মতো কোনো আশ্বাস দেয়নি। দিন শেষে সবাই ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতে বাধ্য হয়েছে। এক আত্মিক সংযুক্তির অভাব থেকে গেছে কোথাও। যারা এখানের স্থানিয় ছিল তারা তাদের স্বাভাবিক পরিবেশ ছেড়ে আরোপিত কংক্রিটের মাঝে কোথায় যে হারিয়ে গেছে বোঝাই যায়নি। যারা দূর থেকে এসেছিল তারা দূরেই রেখেছে নিজেদের। সার্বিক ভাবে এক আত্মা হয়ে ওঠেনি। উদ্বাস্তু বা পরিযায়ী হয়ে অনুভব করেছে আত্মিক শূন্যতা। মনে দ্বন্দ্ব। কোথাও ফিরে যাওয়ার টান। তারই মাঝে মৃণাল তার বাবাকে পেয়েছে কারখানার শ্রমিক হিসাবে। এই পরিবর্তনশীল সমাজের কাঠামোকে দেখার জন্য যে চোখ দরকার তা তার জীবন দর্শন থেকে উঠে এসে সাহিত্যের অঙ্গাঙ্গি ভূমিকা পালন করেছে। তারুণ্যের অস্থির মন বুঝেছে সমাচ্ছন্ন প্রতিটি শ্রমিকের আত্মার সুচ কোথায় আঘাত করে যাচ্ছে। আর সেখান থেকেই উঠে এসেছে গল্পকার।
সে দেখছে ‘গজানন শুয়ে আছে’। এই গল্পে গজাননের রাতে ঘুম নেই সে শুয়ে আছে এবং কিছু একটা ঘটার অপেক্ষায় বসে আছে। কিন্তু তা কী? জানা নেই। অথচ কিছু একটা, অসম্ভব কিছু একটা ঘটবে মন বলছে তার। তার মনে হচ্ছে এখন নিশ্চয়ই প্রহরী কারাগারে ঘণ্টায় দড়ি বাঁধছে। মনে হচ্ছে তীর্থযাত্রা এবং চুমু খাওয়ার মাঝে কোনো তফাৎ নেই। মন প্রশ্ন করছে ধর্মরাজকে, মৃগয়ায় সুখ কি মৃগহত্যায় না মৃগসন্ধানে? অর্থাৎ এই রাতে অসম্ভব যৌন জিজ্ঞাসার মন উত্তাল। আর তার উত্তর হয়তো অজস্র অবান্তর কল্পনায় স্বপ্নহীন। অন্যদিকে একটি মেয়ে শকুন্তলা যে দাদার ঘরে অবাঞ্ছিত। উপায়হীন। গতর খাটিয়ে খায়। স্বপ্নহীন ঘুম ঘুমায়। ঘুম ভাঙে শীত শীত করে তার, বুকের কাছে হাত রেখে চাদর খোঁজে। পায়না। অর্থাৎ এখানেও এক অতৃপ্তি। গজাননের মাঝে অনেকগুলো মুদ্রা কাজ করে। তার চিত হয়ে শুয়ে ভাল লাগলো না। সে বাঁ পাশে ফিরল, সে ডান পাশে ফিরল কিন্তু বুকের মাঝে এক খোঁচা পেল। আর তারপর উপুর হল, এবার স্বস্তি। কিন্তু তারপর শকুন্তলা যদি সত্যি চলে আসে। যদি বলে আমি এসেছি, তবে এ স্বস্তি কি বজায় থাকবে। সে কি যৌন জাহাজে উড়ে এসে জড়িয়ে ধরবে আকাঙ্ক্ষিত মেয়েটিকে? না তা করবে না? কিন্তু কেন? মৃণাল যখন গল্পকার তখন এই বাস্তবতা তার কাছে উলঙ্গ।
আরও কিছু বাস্তবতার কাছে যাই। কোনো এক অবাস্তব কল্পনা কি ভবিষ্যতে বিদ্রুপ হয়ে উঠে আসতে পারে? যা কিছু আজ একেবারে অপ্রাঙ্গিক তা কি আজ থেকে তিরিশ কি চল্লিশ বছর পরে আমাদের সমাজের বিকৃত রূপ হয়ে উঠে আসতে পারে? না হলে ‘হুকুম নেমে এস’ গল্পে এই তির্যকতা কি ভাবে সম্ভব হয়, যেখানে গণ্ডারের পেচ্ছাপ পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এবং তা আজ থেকে গোটা তিরিশ বছর আগে? আর সেখানেই রয়েছে এক আকস্মিক অন্বেষণ। ‘খোঁজ’ গল্প উদ্দালকের কথা মাথায় আনে। যে গুরুদেবের জমির আলে সাতারাত শুয়ে ছিল জল ধরে রাখার জন্য। এখানে সেই উদ্দালক যেন সাবিত্রিদির চিঠি নিয়ে শ্রীমন্তকে খুঁজে চলেছে। এবং এক সময় তার সামনে সেই শ্রীমন্ত উঠে এসে বলেছে হ্যাঁ আমিই শ্রীমন্ত, কেন কি হয়েছে? তার কিছু পরেই এক শবযাত্রীদের দল, মৃত দেহের সাথে শ্রীমন্ত, শ্রীমন্ত বাবু, নাকি শ্রীমন্তদা, বা তেমনই এক স্থায়ী সম্পর্কহীন মানুষের মুখের মিল। আর তারপরেই শ্রীমন্তর দোকানে বিক্রির আকস্মিক বৃদ্ধি, আমাদের মননেও এক চিরস্থায়ী অভিঘাত রেখে গেছে। ‘রাডার’ গল্প গ্রন্থের প্রতিটি গল্প এভাবেই প্রেমের প্লেটোনিক বিন্যাস থেকে নেমে এসে গণিকালয়ের পাশ দিয়ে হেঁটে গিয়ে দেখেছে, মানুষের যৌনাঙ্গ আর মুখ একই খিদের দুটি ভিন্ন প্রতিফলন।
মৃণালের উত্তরাধিকার
এখন আমরা জানি যে সমাজতান্ত্রিক জীবন কিন্তু অনস্তিত্বের শিল্প তত্বের পরিপন্থী ছিল। বা হয়তো বিপরীত মেরুতে তারা তাদের বাস্তবতা রেখে ছিল। আমরাও যদি সেই বাস্তবতার আঘাত নিয়ে ভাবি তা হলে হয়তো কোনো এক জায়গায় এসে মনে হতে পারে, যেকোনো ভাবাদর্শের দায়বদ্ধতাই একমুখি। এবং তা জীবনের সব রং দেখাতে পারেনা। তার জন্য এক সংবেদনশীল মন চাই। যা চরম বাস্তবতার মাঝেও স্বপ্নের উড়ানকে ধরে রাখতে পারবে। ব্যাক্তিমানুষের অসহায়তা কে প্রাতিষ্ঠানিক ফোকাস থেকে সরে এসে দেখাতে পারবে। এবং যা দিয়ে এই লেখার শুরু, মানে যে প্রোভোকিং ফ্যাক্টর এক সময় এই গদ্যের মুল বিষয় ছিল, সেই প্রোভোকিং ফ্যাক্টরই যদি না থাকে। বা তার জায়গায় মানুষের অসহায়তা যদি এমন জায়গায় চলে যায়, যেখানে বেঁচে থাকাই দুর্বিষহ। তার বেশি সে কিছু ভাবতে পারে না আর। সেই প্রোভোকিং ফ্যাক্টরই যেখানে আকাঙ্ক্ষিত। তাহলে সাহিত্য কোন জায়গায় থাকবে তা দেখাতে পারবে।
অর্থাৎ যে সাহিত্য পুঁজিবাদী কারখানা সাম্রাজ্যের পত্তনের সময়কার, সে সাহিত্য সেই কারখানার বন্ধ মুখের সামনে এসে নিজেকে কেমন দেখবে? কেমন হবে মৃণাল বণিক আজকে যদি বেঁচে থাকত, তবে তার গল্প? আজকে সেই প্রোভোকিং ফ্যাক্টর কারখানা কেন্দ্রিকতা থেকে সরে এসে কীভাবে অবস্থান করত আমাদের মাঝে? কেন-না এখন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অধিকার, অধিকারবোধ এবং অধিকারসংরক্ষণের মাঝের ভারসাম্য ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর। art of communication তার অবস্থান পরিবর্তন করে overloaded data তে পরিণত হয়েছে। অপ্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে মাথা ভারি। বেঁচে থাকার মূল্যায়ন সঙ্গত ভাবেই দুরূহ হয়ে উঠেছে। প্রেম রয়েছে অথচ তার প্রকাশ নিরীশ্বরবাদী।
তাহলে আমরা দেখলাম উদ্দেশ্যহীন ভাবে ছড়িয়ে পড়া প্রেমের জন্য আমাদের কিছু সমবেদনা রয়েছে। তাদের হাতে ধরা ভাঙা ধ্বজা। তাদের গায়ে মরা সঙ্গমের দাগ। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। ব্যাক্তিগত পর্দায় একটা সরু ব্লেড দিয়ে হয়তো নিজেই চিরে রেখেছে। চোখ যেন স্বাধীনতা পায়। পরবর্তী প্রজন্ম বন্ধ কারখানার দরজার ফাঁক দিয়ে দেখতে পায় মরচে পড়া কলকব্জায় পিতৃ পুরুষের ঘাম।
বিপরীত মেরু
কে আবার হৃদয় খুলে রাখে?
সমস্ত জীবন আমি নাভিকুণ্ড ঘিরে
নিজেকেই গড়েছি ফিরেছি
সমস্ত সময় আমি দুই হাতে ঘিরে
শিশুদের লালন করেছি (কে?)
প্রতিটি মানুষের মাঝেই এক বিপরীত মানুষ থাকে। একই দেহে বাস করে দুটি ভিন্ন রূপ। একই ভাত, একই বিছানা, একই জামা কাপড়, অথচ তার ভিত্তি আলাদা। আত্মা কখনও চিতাভস্ম মেখে উলঙ্গ কখনওবা নদীর পারে অনন্ত যাত্রার অভিমুখী। যাত্রা বর্ণহীন, স্বাদহীন, নির্গুণ নিরাকার। তাকে শুধু অনুভব করা যায়। ব্যাক্ত করা যায় না। কাউকে বোঝানো যায় না। লেখা তো অসম্ভব। তাহলে না গল্প, অল্প গল্প, তিক্ত বিরক্ত গল্প, তাদের কী হবে? জানি না।
তোমার চিঠি এলো চৈত্রের দুপুরে
তখন আকাশ জুড়ে
সূর্যের খর রৌদ্র, নিষ্করুণ
জারুল ছায়ার নিচে পাখিটি নিঝুম (এ পরবাসে রবে কে)
অথবা
সন্তর্পণে এগিয়ে যাচ্ছি শেষের দিকে।
পথের শেষ যে কোথায়!
যতটুকু আবরণ ছিল অথবা খোলস
সব ঝেড়ে ফেলে দিতেই, বিসর্জনের বাজনা বেজে ওঠে। (অন্তিম দিনের কথা)
আত্মহত্যাকামী যা কিছু আমাদের ভিতরে ঘাপটি মেরে বসে আছে। দেখতে গেলে একই জিনিস। শুধু তার প্রকাশ আলাদা। বাস্তবে সাহিত্যের ইতিহাস মানে তো তার আঙ্গিকের ইতিহাস। যাকিছু বলার ছিল তা তো কত বার বলা হয়েছে। কত রকম ভাবে বলা হয়েছে। তাকেই নিজের মতো করে বলা। এই তো পারি, তাছাড়া কি বাকি রইলো এই অবাধ আস্তরণের মাঝে। (শঙ্খ ঘোষ)।
একটি ভাতের থালাকে ঘিরে বসে আছে পাঁচজন
নিভে যাওয়া উনুনের পাশে।
ছাই মেখে ষষ্ঠজন, এক চার বছরের পুং
চালিয়ে যাচ্ছে অপুষ্টির ঘুম।
একটি ভাতের থালাকে ঘিরে পাঁচজন।
একটু দূরেই থমকে আছে আঘ্রাণের রোদ
একজন ভাত মাখে
বাকী চারজন সতর্ক থাবা মেরে রাখে
--------
---------
মাঝে মাঝে ভাবে, ষষ্টজনের হঠাৎ যদি ঘুম ভেঙে যায়
তাই সতর্ক তারা (ক্ষুধা)
আর কি বলার থাকে এ লেখার পরে। বিপরীত মেরুই বলি। কেননা এখানে নির্যাস বহুমুখী। তা কোনো একটা ধারায় নিজেকে বেঁধে রাখতে চায় না। বরং বহুপথগামী সে ফিরে এসে দেখাতে চায় জীবনের অর্থ জীবনকে প্রতিফলন করা। মানুষের ভিতরেও যে মানুষ ঘাপটি মেরে বসে আছে তাকে তুলে দেখানো। প্রকৃত স্ট্রাগেল কাকে বলে। সংগ্রাম কাকে বলে। রূঢ় যা কিছু বাস্তবতা আমাদের ঘিরে আছে।
আর এখানেই মৃণাল বণিকের কবি জীবনের সার্থকতা। তার প্রথম কবিতার বইয়ের সাথে আমাদের দেখা হয় ১৯৮০ সালে, ‘অমাবস্যার চাঁদ কিম্বা ডুমুরের ফুল’ শিরনামে, তারপর একে একে ‘জ্যোৎস্নায় না আঁধারে না’ ১৯৮৯, ‘টানছে ছিলা অন্ধ কিরাত’ ১৯৯৭, আর ‘এই বেশ ভাল আছি’। ক্লাসিক্যাল বাংলা কবিতার ঘরানায় এক জীবনচর্যার প্রতিরূপ, যা তার নিম চিন্তা ভাবনার রেখা থেকে নিজেকে কেমন ভাবে যেন স্বতন্ত্র রেখেছে। ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্য সম্বলিত এক নিঃসঙ্গ জার্নির শেষ অধ্যায়। যা দেখেছে তা লিখেছে। তাই কখনওই আরোপিত মনে হয় না। বরং সেই যে বন্ধ কারখানার ভাঙা দেয়ালে যে ছেলে চোখ রেখে দেখছে অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। তার কাছে মৃণাল বণিকের এই লালন তুরীয় হয়ে ওঠে। বা হয়তো নাভিকুণ্ড খুঁড়ে উনি নিজেই উঠে আসেন প্রজন্মের জন্য।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন