কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ইন্দ্রপুরী রহস্য

 


(তেরো)

পাঞ্চজন্যেন

কাকভোরে আশুদা আমাকে ডেকে দিয়ে বলল,"চল বেরোই।" আমি অবাক হয়ে চোখ কচলাতে কচলাতে বললাম, "কোথায়?"

আশুদা বলল, "হাঁটতে বের হবো একটু। সঙ্গীত সরণির দিকে যাব।"

অগত্যা তৈরি হয়ে নিলাম। ঘড়িতে সকাল সাড়ে পাঁচটা। আশুদা যে নেহাতই মর্নিংওয়াকের সঙ্গী করে আমাকে নিয়ে যাচ্ছে না, এবিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ সঙ্গীত সরণিতে কেন? এসব প্রশ্নর উত্তর জানার সহজ পথ, আশুদার সঙ্গে বেরিয়ে পড়া।

সাদার্ন এভিন্যিউ দিয়ে হাঁটছিলাম দু'জন। গতকাল রাতের বিনতার ফোনের বিষয়ে আশুদাকে এখনও কিছুই বলিনি। আশুদা হাঁটতে হাঁটতে বলল, "কেন আমার এই শহরটাকে ভালো লাগে জানিস? গোটা শহরে একটা রাস্তার নাম সঙ্গীত সরণি। এটা একমাত্র প্যারিসে হওয়া সম্ভব। আর এখানে। এই শহর কলকাতায়!"

-হঠাৎ সঙ্গীত সরণি কেন?

-২৬/বি সঙ্গীত সরণি। ডাক্তার অলোকেশ দত্তর বাড়ির ঠিকানা। শুভায়ুকে দেওয়া ওর প্রেসক্রিপশনের একটা ছবি পাঠিয়েছিল আমাকে। ভাবলাম আজ রবিবার। তোকেও সঙ্গে পাবো। তাই ঘুরে আসি।"

-জেরা করবে?

-ঠিক জেরা নয়। প্রশ্ন বলতে পারিস। আমার ধারণা, সেইসব প্রশ্নর উত্তর অলোকেশ জানে। কিন্তু আমাদের বলেনি। কেন বলেনি সেটাও প্রশ্নর। এখন উত্তরগুলো আমাকে পেতে হবে...

-বিনতার দেওয়া ওই গ্রুপটায় অলোকেশ আছে।

-আন্দাজ করছিলাম।

বলতে বলতে আশুদা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। আমিও দাঁড়িয়ে পড়লাম। আশুদা সাফারি পার্কের দিকে তাকিয়ে বলল,"চল রে অর্ক। মনে হয় আমাদের আর অতোদূর যেতে হবে না..."

বলতে বলতে আমরা পার্কে ঢুকে পড়লাম। আশুদা ক্ষীপ্রগতিতে এগিয়ে গেল। হঠাৎ দেখলাম কানে ইয়ারফোন গুঁজে অলোকেশ দত্ত জগিং করছে। আশুদাকে দেখে সে থমকে দাঁড়াল। তার সৌজন্যর হাসি হেসে বলল,"এ কী দাদা। আপনারা? মর্নিং ওয়াক?"

আশুদা সামান্য হেসে বলল,"ওই আর কি। আপনার সঙ্গে কয়েকটা কথা ছিল। চলুন বসি কোথাও..."

রবীন্দ্রসরোবরের এই সবুজবিতান এখনও শহরের ফুসফুস হয়ে বেঁচে আছে। পার্কের গাছগুলোর গায়ে যত্ধমন করে তাঁদের বাঙালি নাম আর বৈজ্ঞানিক নাম লেখা রয়েছে। আমরা তেমনই একটি বনকরবী গাছের পাশে গিয়ে বসলাম। গাছের কাণ্ডে লেখা 'নেরিয়াম ইনডিকাম'। বেঞ্চে বসে অলোকেশ দত্ত কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল,"বলুন। কী জানতে চান?"

আশুদা বলল।

-শুভায়ু দের যে প্রেসক্রিপশনটা আপনি আমাকে পাঠিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট করে ওর রোগের নামটা লেখা নেই। আপনি একটু বলবেন, শুভায়ুর রোগের লক্ষণ গুলো ঠিক কেমন ছিল?

অলোকেশ চিন্তা করে বলতে লাগল। আমি দেখলাম তার হাতের উনালোম চিহ্নটির নীচে আরো একটি নতুন ট্যাটু। সেই ট্যাটু দেখলে মনে হবে আকাশের বিদ্যুৎ।

-শুভায়ু দেকে আমি আগে যতোবার দেখেছি, ওর বোধবুদ্ধির কোনও অভাব দেখিনি। আশ্চর্য স্মৃতিশক্তি। তবে সন্দেহপ্রবণ। দুবার চেম্বারে এসেছিল আমার। একবার সঙ্গে নবনীতা আসেনি। একাই এসেছিল। সেবার ও আমাকে বলেছিল, ওর মনে হচ্ছে ওর আশেপাশের সব মানুষ আসলে 'ফেক'। বডি ডাবল দিয়ে তাদের স্থানান্তরিত করা হয়েছে। শুভায়ুর কথাবার্তায় অসংলগ্নতা ছিল না। বরং চরম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই ও এই কথাগুলো বলেছিল। ও এটাও বলেছিল যে 'নবনীতা' বলে যে মেয়েটি ওর সঙ্গে আসে, সে আসলে 'নবনীতা' নয়। নবনীতার মতো দেখতে কেউ..."

-ক্যাপগ্রাস সিণ্ড্রোম!!!

আমি চমকে উঠে বলে ফেলি। আশুদা সপ্রশংস আমার দিকে তাকিয়ে হাসে। অলোকেশ দত্তও মাথা নেড়ে বলে," কারেক্ট। আমার সেটাই ধারণা ছিল।এই অসুখে রোগীর মনে হয় তার আশেপাশের সব চেনাজানা মানুষকে তাদের নকল দিয়ে ভরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক ধরনের বিরল ডিলিউশনাল ডিসর্ডার। বা একধরনের স্কিৎজোফ্রেনিয়াও বলতে পারেন। কিন্তু শেষবার যখন ওর ফ্ল্যাটে আমি গিয়েছিলাম, তখন দেখলাম, রোগের লক্ষণ সম্পূর্ণ পালটে গেছে!"

-কী রকম? আশুদার কৌতূহল দেখায়। অলোকেশ বলে চলে।

-শেষদিন ও ভায়োলেন্ট ছিল। বোধহয় একটা সাইকোটিক এপিসোডের ভিতর ছিল। কারোকে চিনতে পারছিল না। আমাকেও না। এমনকি সে কোথায় আছে, সেটাও বলতে পারছিল না...

-আই সি।

আশুদা রবীনাদ্রসরোবরের জলতরঙ্গর দিকে তাকিয়ে রইল। ছটা বাজবার সঙ্গে সঙ্গেই সাঁতারে উৎসাহী মানুষজন ঝাঁপিয়ে পড়েছে জলে।আশুদা সেদিকে তাকিয়েই বলল,"আপনি ট্যাটু করাতে ভালোবাসেন অলোকেশবাবু?"

অলোকেশ সামান্য অপ্রস্তুত হয়ে বলে,"তেমন কিছু নয়। আজকাল কতো লোকেই তো ট্যাটু করে। এটাই তো এখন ট্রেণ্ড।"

আশুদা হেসে বলে, "কিন্তু সকলে আপনার মতো শহরের কোটি টাকার ট্যাটুপার্লার ছেড়ে সুদূর অনন্তপুরায় ছুটে যায় কী?"

অলোকেশ দত্ত চমকে ওঠে। "মানে?"

-মেনতেনু ক্লিনিক। আমি আর অর্ক গিয়েছিলাম সেখানে। আপনার নাম রয়েছে মহেন্দ্র নাইডুর রেজিস্টারে...

অলোকেশ আবার ঘাম মুছতে মুছতে বলল,"হ্যাঁ। গিয়েছিলাম। একটা বিশেষ কাজে।"

-সেই 'বিশেষ কাজ'টাই কী, জানতে চাইছিলাম অলোকেশবাবু।

অলোকেশ দত্ত আমতাআমতা করে বলে,"হ্যাঁ। গিয়েছিলাম। পাঁচবছর হয়ে গেল আশুদা। চৈতালী আমার ব্যাচমেট। কলেজের দিন থেকেই ওকে চিনি। আমাদের মধ্যে বোঝাপড়া মোটামুটি ভালোই। কিন্তু ওর একটা সন্তান চাই। সব পরীক্ষা করেছি দুজনের। সব নর্মাল। দুবার আইভিএফ চেষ্টা হয়েছে। ব্যর্থ হয়েছে। চৈতালী মুখে বলে না কিছু। কিন্তু আমি ওর মনের ভাব বুঝতে পারি। ওর বয়স বেড়ে যাচ্ছে। এদিকে আমার এই সমস্যা। শুভায়ুর সঙ্গে কথা হত ফোনে। ওই একদিন মহেন্দ্রর কথা আমাকে বলে। শুভায়ুর ক্যাপগ্রাস সিণ্ড্রোমের পাশাপাশি ট্যুরেট ছিল। ও সেই রোগের চিকিৎসার জন্য মহেন্দ্রর ক্লিনিকে বছরে দুবার করে যেত। ফলত আমিও যোগাযোগ করে গেলাম।

-ফল পেলেন?

অলোকেশের মুখের ভাব দেখে বোঝি গেল মেনতেনুতে গিয়ে তার বিশেষ কোনও লাভ হয়নি। আশুদা তার সদ্য করা বিদ্যুতচিহ্নর ট্যাটুর দিকে তাকিয়ে বলল।

-এই ট্যাটুটাও কি ওখান থেকেই করা।

অলোকেশ জানাল সে ওই ট্যাটুটা একজন চেনাজানা ট্যাটুশিল্পীকে দিয়ে বাড়িতেই করিয়েছে।

-আপনি আফিফকে চিনতেন?

অলোকেশ দত্ত সপ্রতিভ হয়ে বলল, "ওই তো আমার এই উল্কিটি করে দেয়। এর নাম উনালোম..."

আশুদা তাকে কথা শেষ না করতে দিয়েই বলে, "জানি। আপনি বোধহয় জানেন না, পুলিশ খবরটা গোপন রেখেছে। আসিফ কয়েকদিন আগে তার নিজস্ব পার্লারে খুন হয়ে গেছে।"

খবরটা শুনতেই অলোকেশের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে কেমন ভয়ে ভয়ে বলল,"প্রথমে সুনন্দ। তারপর আসিফ। আপনাদের কী মনে হয়, শুভায়ুর হত্যার সঙ্গে এই মার্ডারগুলোর লিঙ্ক আছে?"

আশুদা হেসে বলল, "যোগাযোগ তো থাকতেই পারে। আবার নাও থাকতে পারে। তবে আপনার কাছে আমার অনুরোধ এতোটুকুই যে আমাদের কাছে কোনও কিছু লুকোবেন না। লুকোলে আপনারই বিপদ।"

অলোকেশ কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠে পড়তে চাইল এবার।

-বেলা বাড়ছে। আমি এবার যাই। একটা কথা। একজন আছে। আমি তাকে একবারই দেখেছি। আপনাদের আগে বলা উচিত ছিল আমার। প্রাসঙ্গিক মনে হয়নি তাই বলিনি। সেদিন ঠিক যখন আমি শুভায়ুকে দেখে বেরোচ্ছি, একটি হেলমেট পরা লোক লিফটের দরজা দিয়ে বেরিয়ে ওই ফ্ল্যাটের দিকে চলে যায়।

-লোকটার মুখটা দেখতে পেয়েছিলেন?

-না। হেলমেট পরে থাকায় মুখটা দেখতে পাইনি। তবে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ছিল জানেন? লোকটা একটা কালো গেঞ্জি পরেছিল। গেঞ্জির আড়ালে দেখছিলাম, তার দুই হাত পরিষ্কার থাকলেও পিঠজোড়া ট্যাটু ছিল।

-ট্যাটুর ছবিটা মনে আছে?

অলোকেশ মাথা নেড়ে বলল,"একঝলক দেখা তো। বুঝতে পারিনি। তাছাড়া অল্প আলো, কালো গেঞ্জি, অতো মনোযোগও দিইনি। তখন তো আর জানতাম না, এতো কিছু ঘটে যাবে...

আমরা সাফারি পার্কের অপর প্রান্ত দিয়ে বের হতে হতে আশুদা হঠাৎ বলল,"অলোকেশবাবু, একটা কথা জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে। এই যে বিদ্যুতচিহ্নর ট্যাটুটা আপনি করিয়েছেন, এই চিহ্নটা কি আপনিই নির্বাচন করে দিলেন?

অলোকেশ মাথা নেড়ে বলল,"না। এই উনালোমটাও উনিই করে দেন। এই চিহ্নটাও উনিই সিলেক্ট করে দিলেন। আমার গ্রহনক্ষত্র দেখে বললেন এটাই আমার শারীরিক অবস্থার জন্য যথাযথ চিহ্ন।

-এই লোকটার কোনও কার্ড বা কিছু আছে?

অলোকেশ মাথা চুলকে বলল, "আসিফই দিয়েছিল এনার সন্ধান। তবে অদ্ভুত লোক। সারা মুখ উল্কি কাটা। দেখতে বীভৎস লাগবে বলে মুখে মাস্ক আর মাথায় ক্যাপ পরে থাকেন।

-নাম?

-আসিফ বলেছিল একবার নামটা। সুরেন্দ্র না কি যেন। তবে এ ইণ্ডাস্ট্রিতে অনেকের শরীরেই ট্যাটু করে যায়। ওকে সবাই 'পিকে' বলেই চেনে। একটা কার্ড আছে আমার কাছে। আমি ঘরে ফিরে আপনাদের ছবি তুলে পাঠাচ্ছি।

আশুদা চিন্তিত হয়ে বলল,"বেশ। পাঠান। তবে এই কটাদিন বৈদ্যুতিক তার বা ট্রান্সফর্মার জাতীয় কোনও যন্ত্রের কাছে খুব সাবধানে যাবেন।"

অলোকেশ আবার ফ্যাকাশে মুখচোখ করে বলল,"কেন?"

আশুদা হেসে বলল,"এমনিই। মনে হল তাই বললাম। কিন্তু কথাটা মেনে চলবেন। আপনারই ভালো হবে।"

অলোকেশ দত্ত সঙ্গীত সরণীর দিকে চলে গেলে আমি আশুদাকে বললাম, "এই সুরেন্দ্র যাদবই আসিফকে উল্কির রঙ দিত না?"

আশুদা চিন্তিত হয়েই বলল,"ঠিক তাই। অনেকগুলো ছায়ামানুষ আমাদের ঘিরে ধরেছে, বুঝলি অর্ক। এক। এই সুরেন্দ্র যাদব। যার সারা মুখে উল্কি কাটা। যে মাথায় টুপি আর মুখে মুখোশ পরে ঘোরে। ইণ্ডাস্ট্রিতে এমন কোনও লোক আছে কিনা সোহরাব বলতে পারবে। ওকে আর একবার জিজ্ঞেস করব। আর দুই। ওই হেলমেট পরা লোকটা। যে কালো গেঞ্জি পরে। যার পিঠে ট্যাটু..."

-পুরন্দর দেব। বিনতা বলেছে। বিনতার বয়ফ্রেণ্ড। এই দেখো।"

বিনতার গতকাল রাতে পাঠানো ছবি আর মেসেজগুলো এইবার আমি আশুদাকে দেখালাম। আশুদা মনোযোগ দিয়ে দেখতে দেখতে বলল, "খুব ইন্টারেস্টিং জানিস অর্ক। আর্কটিকে একধরনের শিকারী ছিল আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে। তারা মৃলত হিংস্র শিকারী ছিল। তাদের শিকারের থাবা থেকে মানুষও বাঁচত না। মজার ব্যাপার এটাই যে তারা তাদের সারা শরীরে ট্যাটু এঁকে রাখত। প্রতিটা শিকারের ছবি তারা সাংকেতিকভাবে এঁকে রাখত তাদের দেহে। প্রাচীন শামান মতে এই উল্কির ভিতর দিয়ে শিকারগ্রস্থ প্রাণীর বিদেহী আত্মা সেই শিকারীর শরীরে প্রবেশ করে তাকে আরও শক্তিশালী করে তুলত। বিনতার পাঠানো এই পুরন্দরের ছবি দেখে মনে হল এই মানুষটাও একজন শিকারী। এখন আমাদের বের করতে হবে কে এই পুরন্দর। কেই বা সুরেন্দ্র! তবে একটা কথা মনে রাখিস, তুই যে আমাকে এই মেসেজটা দেখিয়েছিস, এ কথা বিনতাকে জানাবি না। তাহলে আমরা মূল সত্যিটা কী কোনও দিন জানতে পারব না।

ফ্ল্যাটে চলে এসেছিলাম। শহর সচল হয়ে গেছে। মহানগরীর কোনও রবিবার নেই। আমি লিফ্টে উঠতে উঠতে বললাম, "অলোকেশের ব্যাপারে কোনও লিড দিল তথাগত?"

আশুদা হেসে বলল, "তথাগত এখনও ভাইরাল ফিভার কাটিয়ে কাজে নিয়মিত যোগ দিতে পারেনি। তবে নাসিমা আমাকে একটা অদ্ভুত আপডেট দিল জিনিস। শুভায়ুর মৃত্যুর রাতে ইন্দ্রপুরী রেসিডেন্সির সিসিটিভি ফুটেজগুলো আমি দেখতে চেয়েছিলাম। তথাগত ঠিকই বলেছিল। সিঁড়ির লবির সিসিটিভিটা বিকল থাকায় ওখান থেকে কোনও লিড পাওয়া সম্ভব নয়। তবে ওই টাওয়ারের মেইন এন্ট্রান্সের ফুটেজগুলো নাসিমা আমাকে দিয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে অলোকেশ টাওয়ারে ঢোকে রাত এগারোটা আঠাশ। আর বেরিয়ে যায় বারোটা আটত্রিশ। এদিকে ময়না তদন্ত আর নবনীতার বয়ান জানাচ্ছে ঘটনাটি ঘটে বারোটা দশ নাগাদ।"

-তার মানে ঘটনার সময় অলোকেশ দত্ত ওই টাওয়ারেই ছিল!

-ঠিক তাই।

-আর ওই হেলমেট পরা লোকটা?

-তার কোনও চিহ্ন কিন্তু ফুটেজে নেই। অবশ্য আরো একটা ইনফরমেশন দিয়েছে নাসিমা। ওই টাওয়ারের বেসমেন্ট থেকে নাকি একটা মেইনটেনেন্সের সিঁড়ি আছে। সেই সিঁড়ি দিয়ে কেউ উপরে উঠে যে কোনও তলা থেকে লিফ্ট ধরলে তাকে মেইন এন্ট্রান্সের ফুটেজে ধরার উপায় নেই।

-হয়তো কোনও হোম ডেলিভারি?

-বা হয়তো পুরন্দর। কে বলতে পারে!

 

রবিবারগুলো সোমবারের শোকপালন করতে করতেই কেমন ঝড়ের মতো কেটে যায়। তবে দুপুর হতে না হতেই আশুদা উৎসাহী হয়ে বলল, "সা নো বিশ্বা অতি দ্বিষঃ স্বসৃরন্যা ঋতাবরী। অতন্নহেব সূর্যঃ। সূর্য যেমন আলো দেয়, ঠিক তেমনই বিদ্বেষ সরিয়ে সত্য আমাদের আলো দেখাবেই। রেডি হয়ে নে। বেরোতে হবে। অলোকেশ সুরেন্দ্র বলে লোকটার ঠিকানা পাঠিয়েছে। নাসিমা জানালো ওটা ব্রজলাল বাজোরিয়ার অফিসের ঠিকানা। ইতিমধ্যেই তথাগতর টিম ব্রজলালের চিতপুরের গোডাউনে হানা দিয়েছে। সেখানে প্রচুর বেনজোডায়াজেপিন, অ্যাঞ্জেল ডাস্ট আর পারদগাছের নমুনা পাওয়া গেছে। এবার দেখতে হবে ব্রজলালের অফিসে কী সন্ধান পাওয়া যায়।

তথাগত আর নাসিমা আমাদের বাড়ির সামনেই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমরা বেরিয়ে পড়লাম। লোকেশন টালিগঞ্জ  মেট্রোস্টেশনের কাছেই। টলিপাড়া থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। কিন্তু সেখানে ব্রজলালকে পাওয়া গেল না। খবর পেয়ে হয়তো সে আগেই গা ঢাকা দিয়েছে। তথাগতরা রেইড করে তেমন কিছুই পেল না। কেউ যেন নিখুঁতভাবে পরিষ্কার করে দিয়েছে সব। আশুদা বিড়বিড় করে বলল,"খবরটা ব্রজলাল কোনও ভাবে পেয়ে গিয়েছিল মনে হয়। যাই হোক ।ওর নামে একটা ওয়ারেন্ট বের করতে হবে। ওকে ধরা গেলে আমাকে একবার জানিও তোমরা।" রাত হয়ে গেল। আমরা ফিরে এলাম ফ্ল্যাটে। আজ সারাদিন ইন্দ্রপুরী রহস্য যেন ব্যবচ্ছেদের নতুন নতুন স্তর খুলে দিচ্ছে আমাদের সামনে। এক অংশ ধরা দিলে আরেক অংশ যেন ঢাকা পড়ে যাচ্ছে। ঘরে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়ে দিতে যাব, হঠাৎ আমার ফোনটা নড়ে উঠল। বিনতার মেসেজ।  পরপর দুটো ভিডিও পাঠিয়েছে বিনতা। প্রথমে ডাউনলোড হতে চাইছিল না। তারপর সেই দুটি দেখামাত্র আমার সারা শরীর বেয়ে হিমশীতল প্রবাহ বয়ে গেল যেন। যা দেখলাম, তা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না আমি।

 

(ক্রমশ)

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন