![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
পারুলবালার গল্প
হ্যাঁ, হতো, তখন এমনই হতো। পারুলবালা বলেছে, আমার নিজের কানে শোনা। বলেছে জোর দিয়েই, খুব জোর দিয়ে। বলেছে, চাইলেই চাঁদ উঠত আকাশে, রোজ বললে রোজ। চাইবার নাকি জোর ছিল তখন, চাইবার দম ছিল তখন মানুষের। এটাও পারুলবালারই কথা যে, চাইতে পারার জন্য তখন এতো বিস্তৃত আয়োজন ছিল না বলে চাইবার সীমিত সম্বলের প্রত্যেকটার উপর মনের জোর পড়ত অনেক বেশী। সেই জোর সত্যি করে তুলত প্রাপ্তিকে। চোখে মায়া ছিল বলে রূপকল্প মিশে যেত প্রাপ্তির সাথে। বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিন্তু ঘরে ঝলমল করত পারুলবালার জ্যোৎস্নার গল্পের আলো। সেই গল্পের আসরে কিসের যে এক রূপকল্প মিশে থাকত তা স্পষ্ট করে বুঝতে না পারলেও পরে তার সাদৃশ্য পেয়েছি বাসর ঘরের সাথে।
কে পারুলবালা বা কী তার সত্যিকারের স্বরূপ তা আজও বুঝতে পারিনি। কেন তাকে পারুলবালা বলে ডাকতাম তা কিছুটা জানি, বাকিটা জানি না। এটুকু জানি পারুলবালা তার নাম নয়, তবু ঐ নামেই ডাকতাম। সবার সামনে নয়, আড়ালে। মা শুনলে বকত, সেই ভয়ে। সে আমায় ডাকত কত্তা বলে। কর্তার অপভ্রংশ কত্তা। বাবা বলত, এমনকি মার মুখেও শোনা, আমি হওয়ার আগে নাকি ঠাকুমা স্বপ্ন দেখেছিলেন ঠাকুরদাকে। ঠাকুরদা নাকি এসে নিশ্চিত করে জানিয়ে গিয়েছিলেন যে তিনি আসছেন। ওদিকে মা'র তখন প্রথম গর্ভ, তাও নাকি একেবারে প্রথম দিক। খানিক অনুমান করতে পারলেও জ্ঞান গম্যির অভাবে নিঃসন্দেহ হতে পারেনি বলে জানাজানি হতে দেয়নি মোটেও। তারই মাঝখানে যখন শোনা গেল ঠাকুমার স্বপ্নের কথা, তখন নিশ্চিত হয়েছিল মা। তারপর মিলে গেল স্বপ্নের আরেকটা কথাও, জন্ম হল পুত্র সন্তানের।
প্রায় এই একই গল্প যখন ঠাকুমার মুখে শুনি তখন অতিরিক্ত আরেকটা কথাও শুনেছিলাম। স্বপ্নে যখন ঠাকুরদা এসেছিলেন, তখন নাকি পারুলবালা নামেই ডেকেছিলেন ঠাকুমাকে। নামটা তাঁর নিজেরই রাখা, আলাদা করে সরিয়ে রেখেছিলেন অভিসার কালের জন্য। কোন দূর অতীত দিনের ডাক আবার যখন শুনলেন সেদিন স্বপ্নে, চমকে উঠেছেন অমনি। ঐ মানুষটাই যেন তফাৎ হয়ে অন্য মানুষ হয়ে যায় যখন ঐ নামে ডাকেন, এমনই সে নামের মাহাত্ম্য। ঠাকুরদা তার নাম ধরে ডেকে বললেন, পারুলবালা, পারুলবালা, আবার আসছি গো তোমার কাছে।
আমার জন্মের পর ঠাকুমা আমায় আগলে রাখতেন। মা'র তখন বয়েস অল্প, সংসার জীবনে নতুন, শাশুড়ি মা আগ বাড়িয়ে সব করে দিতেন বলে যেন বেঁচে যেতেন। এভাবে চলতে চলতে কখন যে আমি তার হেফাজতে চলে গেলাম, তা কেউ টের পায়নি। ঠিক জানি না মুখে কথা ফুটেছিল কোন শব্দ প্রথম উচ্চারণ করে, মা বাবা না পারুলবালা। সামনে যখন কেউ নেই তখন ঠাকুমার আদরের ভাষা যেত পাল্টে। বলো কত্তা, বলো, চিনতে পারলে কিনা? ডাকো একবার পারুলবালা বলে। তারপর একটু যখন বড় হলাম তখন আড়াল পেলেই ডাকতাম পারুলবালা বলে। বলতাম, গল্প বল পারুলবালা। নাম ধরে না ডাকলে বুড়ির গল্পগুলো সব শুকিয়ে মরা কাঠ হয়ে যেত, নদীর মতো বহতা থাকত না তাতে। কিন্তু খেয়াল করে একবার ঐ নাম ধরে ডাকলেই খুশির ঝলক লাগতো চোখে মুখে। হাসতে হাসতে বলত, "কত্তার মন পাওয়া বড় দুষ্কর। আগের জন্মেও পুড়িয়েছে মেল, এ জন্মেও তাই। কথার মানে বুঝতে পারতাম না, কিন্তু পারুলবালাকে হাসতে দেখে তার সুরে হাসতাম। কখনো কখনো পারুলবালা গোপন কথা বলার মতো সন্তর্পণে মুখের কাছে মুখ এনে জিজ্ঞেস করত, "কী কত্তা, কিছু কি মনে পড়ে? এখনো মনে পড়ে না? তাহলে তাড়াতাড়ি বড় হও দিকি। নিজের থেকে মনে না পড়লে হাজার বলে দিলেও মনে পড়বে না!" জিজ্ঞেস করতাম, "কী কথা? ও পারুলবালা বলো না!" পারুলবালা বলত, "বড় হও, বড় হও, আরেকটু বড় হলে সব দেখাব"।
বড় হলাম আরেকটু। পারুলবালা বলল, "সময় আর কোনোদিনও হবে কিনা কে জানে, এসো কত্তা, আজ তোমায় দেখিয়ে দিই কী লিখেছিলাম তোমায়। সে চিঠি তো পৌঁছায়নি তোমার কাছে, আজ একবার দেখে নাও, না বুঝতে পারলে বড় হয়ে দেখে নিও আবার"। তারপর পড়ে শোনাল। সত্যিই বুঝতে পারিনি সব, ভাঁজ করে রেখে দিলাম নিজের বইয়ের তাকে। পারুলবালা বলেছিল, "সাবধানে রেখো, কারো হাতে যেন না পড়ে!”
তাই করেছিলাম। সাবধানে রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম বড় হওয়ার পর। হঠাৎ আজ মনে পড়ল পারুলবালার অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে। দরজায় এসে আগুন ছুঁয়ে, লোহা ছুঁয়ে, নিমপাতা মুখে দিয়ে ভিতরে ঢুকে জামাকাপড় সব ছেড়ে তাড়াতাড়ি স্নান সেরে এসে চিঠিটার খোঁজ শুরু করলাম। বেশী দেরী হয়নি খুঁজে পেতে, কিন্তু বেশী দূর অবধি পড়তে পারিনি সে চিঠি। ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল দুই চোখ। তার আগে অবধি যেটুকু পড়তে পেরেছিলাম, "তুমি তো প্রায়ই আক্ষেপ করতে, সে কী? এই যে আমরা ভালবাসায় জুড়ে গিয়েছি, মৃত্যু এসে বিচ্ছিন্ন করে দেবে আমাদের? একসাথে পেরিয়ে যাওয়া যাবে না জীবনের সীমানা? স্বর্গ হোক বা নরক হোক, একসাথে পৌঁছতে পারব না সেখানে? তুমি বলতে এসব মান না তুমি। বলতে হাত ধরে থাকবে এমন শক্ত করে যাতে কখনই বিচ্ছিন্ন করা না যায়। কই কথা রাখলে কত্তা? আমি যে পড়ে রইলাম একা! কত্তা একবার এসো, এসে হাত ধরো একবার। আর যে..." আর পড়তে পারলাম না। মনে মনে বললাম, "এখন যে আমি পড়ে থাকলাম পারুলবালা? এমনি ফেলে রেখে যাওয়ার জন্যেই কি ডেকে এনেছিলে? এমনি করে শোধ তুলবে বলে?" অমনি চমকে উঠলাম নিজের ভাবনার গতি প্রকৃতি দেখে, কেমন করে পারুলবালার মতন আমিও বিশ্বাস করতে শুরু করলাম আমি আমার ঠাকুরদারই পুনর্জন্ম। সেকি শুধুই পারুলবালা বিশ্বাস করত বলে?

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন