ফ্ল্যাশব্যাকে থিয়েটার পাঁচালি : ‘কুণ্ডুবাবু’ একটি নাটকের নাম নয়
প্রতি
হে দর্শক,
সেদিন সন্ধ্যায় একাডেমিতে শো দেখতে হাজির। মেঘনাদ ভট্টাচার্য অভিনয় করছেন জেনে আকর্ষণ অনেক বেড়ে যায়। হল প্রায় ভর্তি। অনেকদিন পর এরকম হল যে একাডেমির নিচ তলা পুরো ভর্তি। মানে নাটকের শোয়ের জন্য।
একটা পুরনো বাড়ির সেট হল মঞ্চ। আর সেটাই ওপেনিং সিন। বাড়িটা যেকোনও দিন ভেঙে পড়তে পারে। অথচ বাড়িটা এখনও ছেড়ে যায়নি একজন মানুষ। তিনি কুণ্ডুবাবু। তিনিই মেঘনাদ ভট্টাচার্য। বোঝা যাচ্ছে নাটকের বিষয় সিরিয়াস কিছু হবে। কারণ, আবহ নির্মাণ আর আলো। দর্শকের মনে জায়গা তৈরি করতে করতে চলেছে।
মঞ্চে মেঘনাদ ভট্টাচার্য এলেই বোঝা যায়, এই নাটকের আসল গল্প শুধু একটা মানুষের নয়। একটা সময়ের। যে সময় চলে গেছে, কিন্তু তার মানুষগুলো এখনও রয়ে গিয়েছে। এবং নাটক আরও এগোলে বোঝা যায় এই সময় আসলে এক আদর্শে বিশ্বাসী এক মানুষ, কর্মীর গল্প। সাধারণ মানুষ যে। এরকম মানুষ আমরা দেখেছি। এই মানুষটা পরের উপকার করেন। কারো গরু প্রসব করতে সাহায্য করাটাকেও তিনি এগিয়ে যান। এবং সেদিনই ওই মানুষটির জন্মদিন। সেই জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজন নেই তবে শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে একজন প্রতি বছর তাঁর জন্য রেঁধে পাঠান। এই মুহূর্ত সংলাপে চরিত্রে অভিনয়ে জীবনের কথা শেখায়।
সায়ক নাট্যদলের প্রযোজনা ‘কুণ্ডুবাবু’ সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের দিকে তাকায়। কিন্তু নস্টালজিয়া দিয়ে নয়। বরং একটু দূর থেকে, কখনও হাসতে হাসতে, কখনও অস্বস্তিতে, কখনও একটা দীর্ঘশ্বাসের মতো।
কুণ্ডুবাবু দীর্ঘ অপরিবর্তনীয় রাজনৈতিক বিশ্বাসে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। তাঁর চারপাশের পৃথিবী বদলে গেছে। যে আদর্শ একদিন মানুষের জীবনকে চালিত করত, তার ভাষা এখন অনেকটাই পুরনো। কিন্তু কুণ্ডুবাবু পুরনো হয়ে গেলেও তাঁর বিশ্বাসটা কি পুরনো হয়ে যায়? নাকি মানুষের সঙ্গে তার বিশ্বাসের সম্পর্ক এত সহজে শেষ হয় না? দেখা যায়, যে বিশ্বাসে তিনি মানুষের জন্য কাজ করেন, সেটা কিছু ফিরে পাওয়ার জন্য নয়। বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা মন থেকে, আদর্শ থেকে, সেটাই তাঁর জীবনের দর্শন।
এই নাটকের গল্প... গৌরহরি কুন্ডু-কে ঘিরে। তিনি একজন পেছনের সারির পার্টি হোলটাইমার। বয়স হয়েছে তাঁর। এলাকার লোকেদের কাছে তিনি কুন্ডুবাবু বলে পরিচিত।
একটা প্রায় ভেঙে পড়া ভূতুড়ে বাড়িতে তিনি ঘাঁটি আগলে বসে আছেন। যেটা একদা তাঁর পার্টির লোকাল অফিস ছিল। এখন সে অফিসে প্রায় কেউই আসেন না।
এই জমিদার বাড়িটা পার্টিকে দিয়ে গেছেন বর্গা আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা কমরেড ধরণীধর সর। নাটকের একটা বিশেষ ঘটনা হল তাঁর প্রেতাত্মা এ বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। আর ফিসফিস করে বলেন— 'অপারেশনে যাবি না গৌর?'
খুব স্বাভাবিক কারণে কায়েমী স্বার্থের মানুষজনের নজর এই বিশাল বাড়ি আর তৎসংলগ্ন জমিটার ওপর। একা কুম্ভর মতো এর বিরুদ্ধে চলে কুণ্ডুবাবুর একক লড়াই আর সেই সূত্রে বেরিয়ে আসে বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং কুন্ডুবাবুর ব্যক্তিগত জীবনের অজানা কাহিনী। এক কথায়, কুন্ডুবাবু সেই হাজার হাজার অনাদৃত পার্টি কর্মীদের গল্প, যাঁরা বিশ্বাস ও আদর্শের জন্যে জীবনের সবটুকু দিয়েছেন, যাঁরা স্বপ্ন ছেড়ে গেলেও স্বপ্নকে ছাড়তে চান না।
নাটক এখানেই নাটকীয়।
এ সরাসরি রাজনৈতিক বক্তৃতার নাটক নয়। বরং রাজনীতি কীভাবে একজন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে ঢুকে থাকে, কীভাবে একটা বাড়ি, একটা সম্পর্ক, একটা স্মৃতি, এমনকি একজন মানুষের জেদও রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে—‘কুণ্ডুবাবু’ সেই জায়গাটায় পৌঁছতে চায়। মেঘনাদ ভট্টাচার্য সেই জায়গায় নিয়ে পৌঁছে দেন।
মঞ্চের পুরনো বাড়িটা তাই শুধু বাড়ি নয়। একটা সময়ের চিহ্ন। তার দেওয়ালে যেন আটকে আছে পুরনো স্লোগান, পুরনো বিশ্বাস, পুরনো বন্ধুত্ব, পুরনো পরাজয়। আর সেই বাড়িকে ঘিরেই বর্তমানের অন্য হিসেব এসে দাঁড়ায়। জমির হিসেব, ক্ষমতার হিসেব, সুবিধার হিসেব। বন্ধুত্বের মূল্য। সময়ের সঙ্গে পালটে যাওয়া নীতি। বা একই রাজনীতির দর্শনের বিবিধ মানুষের বিভিন্ন ধরনের কাজ, নীতিহীন যুক্তি।
এই সংঘাতকে খুব বড় করে দেখানোর দরকার পড়ে না। ছোট ছোট ঘটনাতেই প্লট তার কথা বলে। আর মেঘনাদ ভট্টাচার্যও। আর সেই জায়গায় মেঘনাদ ভট্টাচার্যের অভিনয় নাটককে অন্য মাত্রা দেয়। কুণ্ডুবাবু চরিত্রে তিনি কেবল একজন ‘পুরনো কমিউনিস্ট’ হিসেবে অভিনয় করেন না। তাঁর মধ্যে রাগ আছে, হাস্যরস আছে, আত্মসম্মান আছে, অসহায়তা আছে। নিজের সময়কে হারাতে দেখেও নিজের ভিতরের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলেননি তিনি। তিনি একটা সময়ের দিকে তাকিয়ে দেখান যে সময়ের আমরা পরবর্তী অবস্থানে রয়েছি। ক্ষমতার পালা বদলের ইতিহাস হল এই প্লট। এই দ্বৈততাই ‘কুণ্ডুবাবু’র নাট্যগুণ।
এখানে খুব সহজে দর্শকের সামনে কোনও ‘ভিলেন’ দাঁড় করায় না। বরং সময়ের পরিবর্তনটাই ধীরে ধীরে সবচেয়ে বড় চরিত্র হয়ে ওঠে। কুণ্ডুবাবু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেন না। কিন্তু প্রশ্নটা তখন তাঁর একার থাকে না। আমরা যারা কোনও না কোনও বিশ্বাস, সম্পর্ক, স্মৃতি বা মূল্যবোধকে আঁকড়ে বেঁচে থাকি, তাদের প্রত্যেকের কাছেই প্রশ্নটা ফিরে আসে—সময় বদলালে কি বিশ্বাসও বদলাতে হয়? ‘কুণ্ডুবাবু’ সেই উত্তর দেয় না। বরং প্রশ্নটা রেখে দেয়।
সায়কের প্রযোজনায় এই অনুচ্চারিত প্রশ্নটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মঞ্চের পুরনো বাড়িটা ধীরে ধীরে একটা জীবন্ত স্মৃতির মতো হয়ে ওঠে। আর তার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা কুণ্ডুবাবু যেন নিজেই নিজের সময়ের শেষ সাক্ষী। অ্যাকাডেমির মঞ্চে নাটকটি দেখতে দেখতে তাই মনে হয়, আমরা কোনও এক মানুষের গল্প দেখছি না। আমরা দেখছি একটি সময় কীভাবে ধীরে ধীরে মঞ্চ থেকে নেমে যায়। কিন্তু পুরোপুরি চলে যেতে পারে না।
কারণ কিছু মানুষ থেকে যান। কিছু বাড়ি থেকে যায়। আর কিছু বিশ্বাস যা মানুষের জন্য কাজ করে, সেটা থেকেই যায়। যতই পুরনো হয়ে যাক—সহজে মরে না। কুণ্ডুবাবু তাই একটা সামাজিক প্লট বরাদ্দ করা নয়। এটা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চলা। কুণ্ডুবাবুর রাজনৈতিক আদর্শ, একসময়ের বামপন্থী স্বপ্ন, তার অবক্ষয় এবং সেই স্বপ্ন আঁকড়ে থাকা এক প্রান্তিক মানুষের একাকিত্বের নাটক।
সায়কের ‘কুণ্ডুবাবু’ প্রযোজনার নাটক রচনা করেছেন অরিজিৎ বিশ্বাস। নির্দেশনায় মেঘনাদ ভট্টাচার্য। নাটকের আবহ ও সংগীত পরিচালনা মুরারি রায়চৌধুরী। সেট ডিজাইনে সৌমিক পিয়ালি। আলো বিন্যাসে সোমনাথ চ্যাটার্জী। রূপসজ্জায় রয়েছেন মহঃ আলি। শিল্প ও প্রচারের দায়িত্বে অনুপম দাশগুপ্ত। ১০ মিনিটের বিরতিসহ মোট ২ ঘণ্টা ২০ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই নাটকের প্রথম প্রদর্শনী আয়োজিত হয়েছিল ২০২৬ সালের ২৫শে মার্চ কলকাতার অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসে। প্রযোজনার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন শব্দ পরিচালনায় রানা দাস, রিকুইজিশনে সুব্রত ভাওয়াল, মেকআপ সহযোগী হিসেবে গৌতম সেন ও অমিত বিশ্বাস, পোশাকে সমীর দেব ও কার্তিক মৈত্র। সেট তৈরিতে অরুণ মণ্ডল, সেট সহযোগী হিসেবে উত্তম দে এবং মঞ্চ পরিচালনায় জয়ন্ত দাস। এই নাটক আরও যাঁদের সহায়তায় সমৃদ্ধ-- অমৃতা মুখোপাধ্যায়, প্রকৃতি মুখোপাধ্যায়, প্রত্যুষ মুখোপাধ্যায় ও সংঘমিত্রা আইচ।
নাটকের প্রধান চরিত্র ‘কুণ্ডুবাবু’র ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মেঘনাদ ভট্টাচার্য। পাশাপাশি অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন অর্নিশ কর্মকার (অর্ণ), অনামিকা ভট্টাচার্য (মৌসুমী), সমীরণ ভট্টাচার্য (বিক্রম), ইন্দ্রজিতা চক্রবর্তী (ফিরোজা), বিশ্বনাথ রায় (ধরণীধর), সুব্রত ভাওয়াল (ব্রজেন), অর্ণব দাশগুপ্ত (আক্রাম), অশোক দাস (জনৈক কমরেড), রূপসা ভট্টাচার্য (পুষ্পিতা), কার্তিক মৈত্র (ডঃ হাবিব), পরিমল চক্রবর্তী (প্রবোধ জানা), প্রান্তিক ঘোষ (নটু), সমর দাস (বীরেশ্বর), আশিস ঘোষ (দিলীপ), সুশান্ত দাশগুপ্ত (হেবো), গৌতম সর্দার (সাধন দাস), সমীর দেব (অমৃতা), রুনা মুখোপাধ্যায় (কমল), মানস সেনগুপ্ত (সুধা), সুখময় দাস (আয়েশা) এবং শান্তি দি-র চরিত্রে যৌথভাবে অভিনয় করেছেন ঝর্ণা মান্না ও ভারতী দাস।
সবশেষ, অপ্রয়োজনীয় তথ্য, এই নাটক চলাকালীন ঘোষণা মতো একটাও মোবাইল রিং টোন শব্দ শোনা যায়নি।
ইতি
একুশ শতকের এক ফ্ল্যাশব্যাক সত্ত্বাধিকারী

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন