![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
অক্সিজেন মাস্ক
ছত্রপতি শিবাজি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট, মুম্বাই। এথিয়াড বোয়িং ৭৭৭ এক দৈত্যের মত
দাঁড়িয়ে। বাইরে অঝোরে আষাঢ়ে বৃষ্টি। ঘড়িতে ভোর সাড়ে চারটে। যাত্রীরা সবাই উঠে পড়েছে।
যাত্রী সংখ্যা ৪৫১; একটা সীটও খালি নেই। এই ভরা বর্ষায় সারা মুম্বাই শহর জল থৈ থৈ;
যাত্রীরা কীভাবে এয়ারপোর্টে পৌঁছেছে কে জানে? বিমান আকাশে উড়তে তখনো আধঘণ্টা বাকি।
আমার ঠিক পাশে যে দুজন বসেছে পোশাক আর চেহারা দেখে মনে হল একজন মসজিদের ইমাম
অন্যজন কোনও মন্দিরের গেরুয়া তিলকধারী মহারাজ। দুজনের কাছাকাছি বয়স ৬০-৬৫-র মধ্যে।
একজনের কাঁচা-পাকা লম্বা দাঁড়ি, লম্বা সুঠাম, ফর্সা; দেখে মনে হলো ইরানের বাসিন্দা। অন্যজন
শ্যামবর্ণ সুঠাম, চওড়া ভুঁড়ি, একটু বেঁটে, দাঁড়িগোঁফহীন, মাথায় গেরুয়া পাগড়ি, গেরুয়া বসন।
দুজনকে দেখে মনে হলো ভোগে-শয়নে-যাপনে-বিলাসে বেশ সুখের অলস জীবন। একজন উর্দু বলেন
অন্যজন বাংলা; কেউ কারো ভাষা বোঝেন না। আমার সুবিধে, আমি দুজনের কথা বুঝতে পারছি। এরই
মধ্যে দুজনই নিজ নিজ ভাষায় সীট বদলের অনুরোধ জানিয়েছে সুন্দরী মহিলা কেবিনক্রুর কাছে,
কিন্তু কোনো লাভ হয়নি; বিমানে একটাও সীট খালি নেই। কার গন্তব্য কোথায় ঠিক বোঝা যাচ্ছে
না। আমি জানালার সীটে, তার পর পর ওরা দুজন। আমি আবুধাবি হয়ে আমেরিকার ডালাসে যাব;
ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি তখন গবেষক। উৎসুক হয়ে আমি ওদের হাবভাব লক্ষ্য করছি।
দুজনেই পাশাপাশি বসে বড় অস্বস্তিতে। দুজনেরই গায়ে বোটকা গন্ধ, অনেকদিন স্নান না করে
উগ্র পারফিউম গায়ে ছড়ালে যেমন উৎকট গন্ধ বেরোয়। আমার বমি পাচ্ছিল। দুজনই নিশ্চয়ই
ভাবছে, সামনের তিনঘণ্টা পরস্পরকে মুখ বুজে সহ্য করতে হবে! আমিও ভাবছিলাম, এ সময়
ওদের সহ্য করতে হবে!
আকাশে ওড়ার ঠিক আগে সুন্দরী কেবিনক্রু আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আপদকালীন সংকটে
যাত্রীদের কী কী সুরক্ষা পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে তা ওদের লম্বা পেলব হাত নাড়িয়ে নানা
প্রপের সাহায্যে বুঝিয়ে বলল। আমি জানি আকাশে সংকট হলে এসব জারিজুরি কোনও কাজে আসবে
না। তবু হাতে কোনও কাম নাই তাই সুন্দরীদের সুঢৌল উন্নত বুক মিষ্টি মুখ আর শান্ত ঢেউয়ের
মতো মুভমেন্টগুলো দেখছিলাম। দেখলাম ইমাম আর মহারাজ দুজনেই কামাতুর চোখে কম বয়সী
সুন্দরীদের শরীর মাপছে। ওদের মনে ঠিক কী কী কুচিন্তা আসছিল তা সঠিকভাবে জানার কোনও
উপায় ছিল না। মানুষের মন দেখার যন্ত্র থাকলে খেল বেশ জমে যেত। আমার বয়স তখন ২৭,
অবিবাহিত পূর্ণ যৌবন, নারী-সঙ্গ-প্রসাদ লাভে বঞ্চিত। অতৃপ্ত কামনা বুকে চেপে আমিও মহিলা
ক্রুকে মাপছিলাম। ভাবছিলাম, এরকম জীবন সঙ্গিনী পেলে মন্দ হতো না।
কেবিন ক্রু হাত নাড়িয়ে বোঝাল যদি জলে আপদকালীন অবতরণ করতে হয় তবে কেমন করে লাইফ
জ্যাকেট পরতে হবে, জ্যাকেট সামনের সীটের নিচে রাখা; প্লেন যদি অনেক উপরে ওঠে তাহলে
অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাবে তখন আপনাআপনি উপর থেকে অক্সিজেন মাস্ক নেমে আসবে।
বলল, “ইন কেস অফ এমারজেন্সি প্লিজ পুট অন দ্য অক্সিজেন মাস্ক, দেন হেল্প আদারস্ পুটিং
ইট অন”। আমি শেষের কথাটা শুনে চমকে উঠলাম। এ ঘোষণা প্রতিবার বিমান যাত্রায় শুনেছি,
কিন্তু আজকের মত শিহরিত হইনি কখনো; হয়তো মন দিয়ে শুনিইনি আগে, কিংবা ভাবিনি যে এর
মধ্যে এক গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে। চকিতে দার্শনিক রুশোর কথা মনে পড়ল – “মানুষ নিজেকে
ভালোবাসে আবার দরদ দিয়ে অন্যের পাশেও দাঁড়ায়; এটাই মানুষের প্রকৃতি”। ভাবলাম, এর থেকে
মানবিক কথা আর কী হতে পারে!
বাইরে বৃষ্টি একটু ধরে এসেছে। রাতের গাঢ় অন্ধকার হালকা হয়ে আসছে। আশপাশের বিমানগুলি
দানবের মতো নড়াচড়া করছে, আকাশে ডানা মেলছে; পেছন থেকে মিটিমিটি আলো জ্বলছে। আমাদের
বিমান রানওয়েতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল, মনে হলো, দৌড় শুরু করার আগে গভীর লম্বা শ্বাস নিল;
তারপর লম্বা রানওয়েতে ছুটল উর্ধশ্বাসে দুরন্ত শিকারি চিতার মতো। মসৃণভাবেই আমাদের
বিমান জমাট কালো মেঘের বুক চিরে ডানা মেলল। ঘন মেঘের ধুম্রজাল কাটিয়ে উপরে উঠতে ভোরের
সূর্যের প্রাণ জুড়ানো রঙ-খেলা দেখলাম। রঙের এ বাহার দেখলে অবাক হতে হয় প্রাকৃতিক মূল
রঙের সংখ্যা মাত্র সাত; আমার মনে হচ্ছিল শত শত বাহারি রঙ কতভাবে মিলেমিশে বিচ্ছুরিত
হচ্ছে। নিচে তখনো ঘন মেঘের পাহাড় আরব সাগর অদৃশ্য করে রেখেছে।
সেই সন্ধ্যায় দমদম থেকে বিমানে চেপেছি। রাতেও ঘুমনোর সুযোগ হয়নি। সারাদিনের ক্লান্তি,
অচিরে আমার ঝিমুনি এল। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই। হঠাৎ এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে ধড়পড়িয়ে
উঠলাম। বিমান প্রচণ্ড কাঁপছে। অনেকে ভয়ে চিৎকার করছে। কেবিনক্রুরাও বেপাত্তা, কোনও
ঘোষণাও ভেসে আসছে না। মহারাজ আর ইমামের দিকে চোখ পড়ল। মহারাজ দুচোখ বন্ধ করে
গেরুয়া ঝোলায় হাত ডুবিয়ে মালা জপছে; ইমাম সামনে দুহাত মেলে চোখ বুজে প্রার্থনা করছে।
হঠাৎ করে বিমানের আলো নিবে গেল। ভয়ে কাঠ হয়ে আসা শুষ্ক গলায় শূন্য মস্তিষ্কে চোখবুজে
আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে নাস্তিক আমি মা কালী, মা দুগ্গাকে ডাকতে লাগলাম। ঘন অন্ধকারে
একটা নজরুল গীতির কলি ভেসে আসছিল চেতনায় -
মোর না মিটিতে আশা ভাঙিল খেলা,
জীবন প্রভাতে এলো বিদায় বেলা।
মিনিট দুয়েক পর বিমানে আলো ফিরে এলো। বিমান তখনও ভয়ে কাপছে। পুরুষ কণ্ঠে ঘোষণা এলো,
‘পাসিং থ্রু অ্যা ষ্টর্ম, উই আর অ্যাসেন্ডিং; দেয়ার কুড ড্রপ ইন অক্সিজেন লেভেল”। এর পর
বিমানক্রুর গলা ভেসে এল, “নাথিং টু ওয়ারি, অক্সিজেন মাস্ক উইল ড্রপ বিফোর ইউ”; “প্লিজ ডু
নট প্যানিক”; তারপর আবার সেই বিখ্যাত ঘোষণা “প্লিজ পুট অন দ্য অক্সিজেন মাস্ক, দেন
হেল্প আদারস্ পুটিং অন”।
আমার চোখের সামনে অক্সিজেন মাস্ক নেমে এল। হাসপাতালে অনেক শেষ বেলার রোগীর মুখে
প্রায় এরকম মাস্ক দেখেছি। আমি নিমেষে মাস্ক পরে নিলাম। আমার পাশে বসা ইমাম অতি
ক্ষিপ্রতায় মাস্ক পরে নিল। এবার আমি ইমামের পরের সীটে বসা মহারাজের দিকে তাকালাম। এরই
মধ্যে মিনিট খানেক কেটে গেছে। মহারাজ মাস্ক হাতে নিয়েছে ঠিকই তবে কিছুতেই পরতে পারছে না।
সমানে হাতড়ে চলেছে; প্রচণ্ড ঘামছে। বিমান উপরে, আরও উপরে উঠছে। মুহূর্তে ভাবনা এলো,
আমরা কি তবে পৃথিবীর আকর্ষণ পেরিয়ে মহাকাশে পাড়ি দিতে চলেছি! ততক্ষণে বিমানে হয়ত
অক্সিজেন মাত্রা কমে এসেছে। দেখলাম ইমাম শান্তভাবে মহারাজের মুখে মাস্ক পরিয়ে দিলেন।
মহারাজ ধড়ে প্রাণ ফিরে পেয়ে নিশ্চিন্ত হয়ে সীটে ধপাস করে বসে পড়লেন। জোরে জোরে শ্বাস নিতে
লাগলেন। দুচোখ বুজে হয়ত ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন। তারপর ইমামের দিকে তাকিয়ে মলিন হাসি হাসলেন;
কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মাস্কের ভিতর থেকে বললেন “থ্যাঙ্ক ইউ”। ইমাম ডান হাতের থাম্ব দেখিয়ে
হাসার চেষ্টা করলেন। ধীরে ধীরে বিমানে কম্পনের মাত্রা কমে এল। এবার শান্ত বিমান নিজের
স্বাভাবিক যাত্রাপথে নেমে এল। বাইরের আকাশ তখন শত-রঙে উজ্জ্বল। ঘোষণা এল, “অ্যাটেশন
প্লিজ, ইউ ক্যান নাউ টেক অফ ইওর মাস্ক, দ্য টারবুলেন্স ইজ ওভার”। আমি জানালা দিয়ে নিচে
তাকালাম, দেখলাম, শান্ত গভীর নীল আরব সাগর সূর্যালোকের উষ্ণতা পেতে দুবাহু প্রসারিত
করেছে!

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন