কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

শ্রেষ্ঠা সিনহা

 

রাজনীতির আলো-আঁধারে শরৎচন্দ্র: ঔপনিবেশিক সমাজ, ক্ষমতা ও ব্যক্তিজীবনের টানাপোড়েনে তাঁর উপন্যাস

 


শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের নাম শুনলেই আমাদের মনে যে ছবিগুলো আগে ভেসে ওঠে, তার বেশির ভাগই ঘরের ভেতরের। তুলসীতলার প্রদীপ, বিধবা দিদির রান্নাঘর, দাওয়ায় বসে থাকা অভিমানী মেয়ে, কিংবা এক আধপাগলা ভবঘুরে যে অন্যের সংসারে নিজের ঠাঁই খুঁজে নেয়। বাংলা সাহিত্যের পাঠকসমাজ প্রায় এক শতাব্দী ধরে তাঁকে ‘দরদী কথাশিল্পী’ বলে ডেকে এসেছে, আর সেই ডাকের মধ্যে একটা নিরীহ নিশ্চিন্ততা লুকিয়ে আছে। যেন শরৎচন্দ্র কেবল হৃদয়ের কথাই লিখেছেন, রাষ্ট্র বা ক্ষমতা বা আন্দোলনের কথা নয়। এই ধারণাটা আমার কাছে বহুদিন ধরেই অসম্পূর্ণ মনে হয়েছে। গত কয়েক বছর ধরে বাংলা উপন্যাসে রাজনীতির উপস্থিতি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে বারবার দেখেছি, শরৎচন্দ্রকে কেবল ঘরোয়া আবেগের লেখক বলে সরিয়ে রাখলে তাঁর রচনার অর্ধেক শক্তিই আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।

প্রশ্নটা তাই শুধু এই নয় যে শরৎচন্দ্র কয়েকটি রাজনৈতিক উপন্যাস লিখেছেন কি না। ‘পথের দাবী’ যে লিখেছেন, তা তো সকলেই জানেন, ব্রিটিশ সরকার বইটি নিষিদ্ধ করেছিল বলেই হয়তো কথাটা আরও বেশি করে মুখে মুখে ফেরে। আমার জিজ্ঞাসা অন্যখানে। রাজনীতি বলতে আমরা কী বুঝব, সেটাই আগে ঠিক করা দরকার। যদি রাজনীতি মানে হয় দলীয় কর্মসূচি আর স্লোগান, তাহলে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের মাত্র একটি-দুটি অংশ সেই সংজ্ঞায় পড়ে। কিন্তু যদি রাজনীতি মানে হয় ক্ষমতার বিন্যাস, অর্থাৎ কে কার ওপর কর্তৃত্ব করছে, কার মুখ বন্ধ, কার জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, কাকে ‘চরিত্রহীন’ বলে সমাজ থেকে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে, তাহলে শরৎচন্দ্রের প্রায় প্রতিটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাসই রাজনৈতিক। এই প্রবন্ধে আমি দ্বিতীয় অর্থটিকে পথ ধরে এগোতে চাই, তবে প্রথম অর্থটিকেও বাদ দেব না। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, গ্রামীণ জমিদারি ক্ষমতা ও কৃষকের অবস্থান, শ্রেণি ও মতাদর্শের বিতর্ক, নারী ও জাতপাতের প্রশ্ন, এবং ভাষার রাজনীতি, এই পাঁচটি স্তরকে আলাদা করে দেখা এবং তারপর পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে পড়া আমার উদ্দেশ্য।

আলোচনার ভিত্তি হিসেবে আমি শরৎচন্দ্রের উপন্যাস ও কিছু প্রবন্ধের মূল পাঠ ধরেছি। সেই সঙ্গে তাঁর ভাষাশিল্প নিয়ে একটি গবেষণা-অধ্যায়, সত্তর ও আশির দশকের নাগরিক রাজনীতির উপন্যাস নিয়ে জয়দেব ব্যানার্জীর ২০২২ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ, এবং সাধন চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে লেখা আরেকটি গবেষণা-অধ্যায়ের সাহায্য নিয়েছি। শেষের দুটি লেখা সরাসরি শরৎচন্দ্র নিয়ে নয়, কিন্তু তাদের পাশে রেখে পড়লে শরৎচন্দ্রের রাজনীতির একটা দীর্ঘ ছায়া চোখে পড়ে, সে কথা যথাস্থানে বলব। আরও একটা কথা গোড়াতেই স্বীকার করে নেওয়া ভালো। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘রাজনৈতিক উপন্যাস’ কথাটা বেশ পিছল। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ যেভাবে রাজনৈতিক, শরৎচন্দ্রের ‘পল্লীসমাজ’ সেভাবে নয়, অথচ ক্ষমতার গঠন-প্রক্রিয়া বোঝার দিক থেকে ‘পল্লীসমাজ’ হয়তো আরও খোলামেলা। এই অমিলটাকেই আমি আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে চাই।

শরৎচন্দ্রের আগে বাংলা উপন্যাসে রাজনীতির যে ঐতিহ্য তৈরি হয়ে গিয়েছিল, তার দিকে একবার ফিরে তাকানো দরকার। জয়দেব ব্যানার্জী তাঁর প্রবন্ধে ঠিকই দেখিয়েছেন যে ঔপনিবেশিক যুগ থেকেই জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার রাজনীতি, স্বাধীনতা আর সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্ন বাংলা উপন্যাসে জায়গা করে নিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র সেই ধারার পথিকৃৎ। ‘আনন্দমঠ’ (১৮৮২) এমন একটি উপন্যাস, যার ‘বন্দেমাতরম্’ গান কেবল সন্ন্যাসী বিদ্রোহের স্মৃতি নয়, পরবর্তীকালে সারা ভারতের জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতীক হয়ে উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ (১৯১০) আর ‘ঘরে বাইরে’ (১৯১৬)-তে সেই জাতীয়তাবাদের ভেতরের টানাপোড়েন ধরা পড়ল, কলকাতার নগর-রাজনীতির প্রভাব যেখানে বেশ স্পষ্ট। স্বদেশিয়ানার আবেগ কোথায় গিয়ে সংকীর্ণতায় বদলে যায়, তার প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথ তুলেছিলেন গভীর দার্শনিকতায়, কিন্তু সেই দার্শনিকতার জগতে সাধারণ কৃষক, জেলে বা গ্রামের নিচু জাতের মানুষের ঠাঁই ছিল সামান্যই।

এই জায়গাতেই শরৎচন্দ্রের আবির্ভাবকে আমি একটু অন্যভাবে দেখতে চাই। চলতি ইতিহাস-বই বলে, তিনি বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথ দুজনের কাছেই ঋণী, আবার দুজনের থেকেই সরে এসেছেন। কথাটা ঠিক, তবে ‘কোথায় সরে এসেছেন’ সেটা বলা হয় কম। আমার পাঠে, তিনি সরে এসেছেন ক্ষমতার দৃষ্টিকোণ থেকে। বঙ্কিম ইতিহাসের বিশাল পটে জাতির পুনর্জাগরণ দেখেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ব্যক্তির অন্তর্লোক আর জাতীয়তাবাদের নৈতিক সংকট দেখেছিলেন। শরৎচন্দ্রের দৃষ্টি নামল মাটিতে, মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত গৃহস্থের উঠোনে, গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে। তাঁর ভাষাশিল্প নিয়ে যে গবেষণা-অধ্যায়টি আমি পড়েছি, তার একটি পর্যবেক্ষণ এখানে প্রাসঙ্গিক। সেখানে বলা হয়েছে, শরৎচন্দ্র সমাজ-সম্পর্কিত সমস্যার উত্থাপনে ও বর্ণনার রীতিতে রবীন্দ্রনাথকে অনেকটাই অনুসরণ করেছেন, কিন্তু বঙ্কিমের রক্ষণশীল মতবাদ ও অতিরিক্ত নীতিপ্রাণতার বিরুদ্ধে আধুনিক মানুষ হিসেবে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এই ‘প্রতিবাদ’ শব্দটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। শরৎচন্দ্রের সাহিত্যিক জীবনের গোড়া থেকেই একটা বিরোধিতার সুর আছে, আর সেই সুরের উৎস একান্ত সাহিত্যিক নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক।

শরৎচন্দ্রের জীবনের কিছু ঘটনাও এখানে মনে রাখা দরকার, কারণ তাঁর উপন্যাসের রাজনীতি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। ১৯০৩ থেকে ১৯১৬ পর্যন্ত তাঁর দীর্ঘ রেঙ্গুন-জীবন কেটেছে ব্রহ্মদেশে, অর্থাৎ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এমন এক প্রান্তে যেখানে ভারতীয় শ্রমিক, ব্যবসায়ী আর নির্বাসিত বিপ্লবীরা একসঙ্গে বাস করতেন। সেখানকার প্রবাসী বাঙালি সমাজ, শ্রমিকদের অবস্থা আর সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ ধারণা তৈরি হয়েছিল। দেশে ফিরে আসার পর বিশের দশকে তিনি সক্রিয়ভাবে কংগ্রেসের কাজে জড়িয়ে পড়েন। হাওড়া জেলা কংগ্রেস কমিটির সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা সুপরিচিত, আর চিত্তরঞ্জন দাশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ফলে অসহযোগ আন্দোলনের পরিবেশ তিনি ভেতর থেকে দেখেছিলেন। তাই যখন তিনি রাজনীতি নিয়ে লেখেন, সেটা বাইরের দর্শকের কল্পনা নয়, সভা-সমিতি, চাঁদা-তোলা, জেলে-যাওয়া কর্মীদের পরিবারের দুর্দশা, এসবের চেনা গন্ধ তাতে লেগে থাকে। আবার সেই সঙ্গে একটা দূরত্বও থাকে। তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপাত্র হয়ে উপন্যাস লেখেননি, বরং দলীয় রাজনীতির ভেতর থেকেই তার সীমাবদ্ধতা দেখে নিয়েছিলেন। এই দ্বিমুখিতাই তাঁর রাজনৈতিক উপন্যাসগুলিকে প্রচারপত্র হওয়া থেকে বাঁচিয়েছে।

পথের দাবী’ থেকে শুরু করাই স্বাভাবিক, কারণ এখানেই শরৎচন্দ্রের রাজনীতি সবচেয়ে সরাসরি। উপন্যাসটি ১৯২৬ সালের ৩১ আগস্ট গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, তার আগে ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরিয়েছিল। প্রকাশক ছিলেন উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। বই বেরোনোর কিছুদিনের মধ্যেই তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার একে রাজদ্রোহমূলক বিবেচনা করে বাজেয়াপ্ত করে। যে-তথ্যটা আমার কাছে সবচেয়ে কৌতূহলজনক, তা হল সরকারি পদ্ধতি। লেখক, প্রকাশক বা মুদ্রাকরের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি, শুধু বইটির প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্র একটি সাহিত্যকর্মের ক্ষমতাকে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছিল যে তাকে আদালতে নিয়ে গিয়ে বিতর্কের সুযোগ না দিয়ে নিঃশব্দে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। নিষেধাজ্ঞা উঠে যায় শরৎচন্দ্রের মৃত্যুর পরে, ১৯৩৯ সালে। যে লেখক নিজের জীবদ্দশায় বইটির বৈধ প্রচার দেখে যেতে পারেননি, সেই ঘটনাটাও ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ও সাহিত্যের সম্পর্কের একটি ছোট্ট ইতিহাস।

উপন্যাসের পটভূমি ব্রহ্মদেশ। এই নির্বাচনের একটা তাৎপর্য আছে, যা অনেক আলোচনায় চাপা পড়ে যায়। বাংলার কোনো শহর বা গ্রামকে পটভূমি করলে সরাসরি ব্রিটিশ পুলিশ-প্রশাসনের মুখোমুখি হতে হত, আর তখন বর্ণনার সংযম রাখা শক্ত হত। রেঙ্গুনের দূর প্রান্তে বসে লিখলে একদিকে অভিজ্ঞতার সত্যতা থাকে, অন্যদিকে ভারতের বাইরে বিদেশি রাজশক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামরত ভারতীয়দের কাহিনিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করা যায়। যে গবেষণা-অধ্যায়টি আমি দেখেছি, তাতে ঠিক এই কথাই বলা হয়েছে যে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার জন্য সংগ্রামী ভারতীয়দের যে অংশ ভারতবর্ষের বাইরে বিদেশি রাজশক্তির বিরুদ্ধে লড়ছিল, তাদের একখণ্ড কাহিনিই ‘পথের দাবী’। সেই অধ্যায়ের আরেকটি লক্ষণীয় মন্তব্য হল, ব্রহ্মদেশ পটভূমি হলেও কোনো আঞ্চলিক পরিচিতি এখানে প্রকট নয়। কোথাও কোথাও ব্রহ্মদেশবাসীদের উল্লেখ ও তাদের জীবনযাত্রার ছবি এসেছে, কিন্তু ভাষায় কোনো পৃথক বৈশিষ্ট্য বর্ণিত হয়নি। এই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমি একমত, আর এর থেকে একটা প্রশ্নও জাগে। ব্রহ্মদেশ কি তাহলে শরৎচন্দ্রের কাছে একটি বাস্তব দেশ, নাকি রাজনীতির একটি রঙ্গমঞ্চ? আমার ধারণা, দুটোই। শরৎচন্দ্রের কাছে সেটা একটা নিরাপদ মঞ্চ, যেখানে বাংলার সমাজের ভেতরের বিতর্ক আর বাইরের সাম্রাজ্যবিরোধী লড়াই পাশাপাশি রেখে দেখা যায়।

সব্যসাচী চরিত্রটি নিয়ে কথা না বললে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সব্যসাচীর একনিষ্ঠ তপস্যা পাঠকের মনে রেখাপাত করে। তার মুখে উচ্চারিত কথায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভারতের স্বাধীনতাই তার একমাত্র লক্ষ্য, তার একটি মাত্র সাধনা। ‘আমি’ আর ‘আমার’-এর ব্যবহারে বক্তব্যের জোর যেন অন্যায় ও সত্যহীনতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মতো বেজে ওঠে। কিন্তু আমার কাছে সব্যসাচীর যা সবচেয়ে মনোগ্রাহী মনে হয়েছে, তা তার আত্মত্যাগ নয়, তার ঠান্ডা মাথার হিসেব। সে ভাবালুতার বিপদ জানে। অপূর্বর মতো আবেগপ্রবণ, ধর্মভীরু এবং আচারনিষ্ঠ শিক্ষিত বাঙালি যুবক তার সামনে এসে দাঁড়ালে সব্যসাচী কেবল ভর্ৎসনা করে না, সে দেখিয়ে দেয় সমাজের ভেতরের দাসত্ব আর দেশের বাইরের পরাধীনতা আসলে একই গাছের দুই শাখা। যে সমাজ ছোঁয়াছুঁয়ির বিচারে নিজের মানুষকে দূরে সরিয়ে রাখে, সেই সমাজ বিদেশি শাসকের কাছে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। কথাটা সোজাসুজি বলা হয়নি, তবে উপন্যাসের গড়ন সেই দিকেই ইঙ্গিত করে। এখানে শরৎচন্দ্র তাঁর সমকালীন জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটি মূল দুর্বলতাকে ধরেছেন। যে আন্দোলন সামাজিক সংস্কারকে ‘পরে হবে’ বলে ঠেলে রাখে, সে আন্দোলন গভীরে পৌঁছোতে পারে না।

নারী চরিত্রগুলির কথাও এখানে বলতে হয়। সুমিত্রা, ভারতী, তাদের উপস্থিতি রাজনৈতিক চেতনার সঙ্গে প্রেমের জটিলতাকে জড়িয়ে দিয়েছে। উপন্যাসের পাঠ-পরিকল্পনায় অনেক সময় বলা হয়, হৃদয়ানুভূতিময় আবেগের চেয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের উত্তাপই এখানে বেশি। কথাটা আংশিক সত্য। মানব-হৃদয়ের রহস্য আর প্রেমের সৌরভ কিছুটা জায়গা জুড়ে থাকলেও বড় হয়ে উঠেছে স্বাধীনতা-সংগ্রামের অক্লান্ত আত্মত্যাগের কাহিনি। অথচ আমার একটা খটকা থেকে যায়। ভারতী যেভাবে সব্যসাচীর প্রতি আকর্ষণ আর অপূর্বর প্রতি দুর্বলতার মাঝখানে দোলে, তাতে নারী-চরিত্ররা রাজনীতির মূল প্রশ্ন থেকে খানিকটা পাশে সরে থাকে। তারা আন্দোলনের সহযোগী, উপকরণ বা নৈতিক সমর্থক, কিন্তু সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে নয়। শরৎচন্দ্র যে ‘নারীর মূল্য’ নামের প্রবন্ধে নারীর অধিকার নিয়ে এত স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, সেই লেখকই কেন তাঁর সবচেয়ে রাজনৈতিক উপন্যাসে নারীকে রাজনীতির নেতৃত্বে বসালেন না, এই প্রশ্নের একমাত্র উত্তর হয়তো তাঁর সময়ের সীমাবদ্ধতা। সশস্ত্র বিপ্লবী দলে নারী নেতৃত্বের কল্পনা তখনও বাংলা কথাসাহিত্যে সহজে আসেনি।

আরেকটা বিষয় নজরে পড়ে। ‘পথের দাবী’-র ভাষা তার অবস্থান নিজেই ঠিক করে দিয়েছে। গবেষকদের মতে, এই উপন্যাসে বিবৃতির ভাষা সাধু গদ্য, আর চরিত্রের মুখে চলিত গদ্য, যা বক্তব্যকে বাঙ্ময় করে তুলেছে। সাধুভাষার গাম্ভীর্যে বর্ণনা চলে, কিন্তু সব্যসাচীর সংলাপে আসে ক্ষুরধার চলিত। এটা শুধু শৈলীর প্রশ্ন নয়। রাজনৈতিক বিতর্কে যখন মানুষ সোজাসুজি তর্ক করে, তখন তার ভাষায় আলংকারিক গাম্ভীর্য টেকে না। ‘আরে’ আর ‘ছিঃ’ জাতীয় অব্যয় পদের ব্যবহার ক্ষোভকে বাস্তব করে তোলে। আরেকটা ছোট্ট কথা। উপন্যাসের কোথাও কোথাও রাজনৈতিক তর্ক এত দীর্ঘ হয়ে পড়ে যে কাহিনির স্বাভাবিক গতি থমকে যায়। রবীন্দ্রনাথ নাকি এই প্রচারধর্মিতার দিকটা নিয়ে শরৎচন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন বলে শোনা যায়, তবে আমি এই বিষয়ে প্রামাণ্য সূত্র না পেয়ে সেটাকে প্রবাদ হিসেবেই রেখে দিতে চাই।

‘পথের দাবী’-র পাশে রাখলে বোঝা যায় শরৎচন্দ্র রাজনৈতিক উপন্যাসের ঘরানাকে কোথায় সরিয়ে দিয়েছিলেন। বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’-এ বিদ্রোহীরা এক ধর্মীয়-নৈতিক বৃত্তের মধ্যে আবদ্ধ, রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’-তে সন্দীপ ও নিখিলেশ দুজনেই মূলত ভাবজগতের মানুষ। শরৎচন্দ্রের সব্যসাচী কাজের মানুষ। সে সংগঠন করে, টাকা জোগাড় করে, ঝুঁকি নেয়, আর আদর্শের জন্য আবেগকে বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত। এই বাস্তবমুখী বিপ্লবী চরিত্র বাংলা উপন্যাসে অনেকটাই নতুন। তবে নতুন বলেই তার সীমা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সব্যসাচীর রাজনীতিতে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কোথায়? শ্রমিক বা কৃষক কি এখানে সংগঠনের অংশ, নাকি শুধু দুর্দশার উদাহরণ? আমার পাঠে উত্তরটা কিছুটা অস্বস্তিকর। উপন্যাসে শ্রমিকদের ওপর শোষণের প্রসঙ্গ আছে, কিন্তু আন্দোলনের চালিকাশক্তি তারা নয়, গুটিকয় শিক্ষিত আত্মত্যাগী মানুষই সেখানে ইতিহাস গড়ে। ‘গণ’ এখানে অনুপস্থিত, আর সেই অনুপস্থিতিই বোধহয় বিশ শতকের গোড়ার বাংলার সশস্ত্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আসল চেহারা।

‘পথের দাবী’ যদি শরৎচন্দ্রের রাজনীতির ঘোষিত দিক হয়, তবে তাঁর রাজনীতির অঘোষিত, অথচ আরও গভীর দিকটি লুকিয়ে আছে গ্রামবাংলার উপন্যাসগুলিতে। ‘পল্লীসমাজ’ (১৯১৬) সম্ভবত এর সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ। এই উপন্যাস প্রথম প্রকাশিত হয় ‘ভারতবর্ষ’ পত্রিকায়, পরে বই আকারে বেরোয়। সামন্ততান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর প্রেক্ষিতে পল্লীবাংলার সামাজিক চিত্র, তার বহুবিধ সমস্যা, জটিলতা এবং ভবিষ্যৎ সমাজতান্ত্রিক সমাজের পূর্বাভাস, এসবই এই উপন্যাসের বিষয়বস্তু বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন। শেষের কথাটা, ‘সমাজতান্ত্রিক সমাজের পূর্বাভাস’, আমি একটু সাবধানে নিতে চাই। ১৯১৬ সালে বসে শরৎচন্দ্র সমাজতন্ত্রের কথা ভেবে এই উপন্যাস লিখেছিলেন, এমন দাবির সপক্ষে প্রমাণ নেই। বরং বলা যায়, সামন্ততান্ত্রিক গ্রামসমাজের যে ভেতরের কাঠামো রমেশ আবিষ্কার করছে, তার মধ্যে এমন কিছু বৈষম্য আর অচলায়তন ধরা পড়েছে, যা পরবর্তী পাঠকের কাছে শ্রেণিবিভাজনের ইঙ্গিত বহন করে।

রমেশ শহর থেকে গ্রামে ফিরে এসে দেখে, গ্রামের শাসনযন্ত্র চলে এক ধরনের অলিখিত চুক্তিতে। বেণী ঘোষালের মতো প্রভাবশালী জ্ঞাতি, ধর্মের নামে সামাজিক বিধিনিষেধের ধ্বজাধারী পুরোহিত-সমাজ, আর নির্বিকার গ্রামবাসী মিলে এমন এক সমীকরণ তৈরি করেছে যেখানে ক্ষমতার স্বার্থ আর ধর্মীয় আচার একে অপরকে ঢেকে রাখে। রমেশ জলনিকাশের নালা কাটতে চায়, পাঠশালা বসাতে চায়, গরিব প্রজাকে খাজনার ঝামেলা থেকে বাঁচাতে চায়, আর প্রতিবার সে বাধা পায় ঠিক সেই জায়গা থেকে, যেখানে সে সমর্থন আশা করেছিল। এখানে লক্ষ করার বিষয় হল, রমেশের পরাজয় ঘটে ‘খলনায়কের’ কাছে নয়, ঘটে একটা কাঠামোর কাছে। বেণী ঘোষাল ব্যক্তি হিসেবে হয়তো খল, কিন্তু তার পেছনে যে জড় সামাজিক সম্মতি দাঁড়িয়ে আছে, তাকে হারানো কোনো এক ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়। এই উপলব্ধিটাই ‘পল্লীসমাজ’-কে সাধারণ গ্রাম-কাহিনি থেকে আলাদা করে। এখানে ব্যক্তিগত সততার সীমাবদ্ধতা দেখানো হয়েছে, আর এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

রমা-রমেশের প্রেমের কাহিনিও এই ক্ষমতার সমীকরণ থেকে আলাদা নয়, আর ঠিক এই জায়গাটিই পরবর্তী লেখকেরাও বারবার ফিরে দেখেছেন। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস নিয়ে লেখা গবেষণা-অধ্যায়ে প্রসঙ্গক্রমে ‘পল্লীসমাজ’-এর রমা ও রমেশের কথা এসেছে, ক্ষমতাতন্ত্রের কাছে ব্যক্তিগত প্রেমের অসহায়তার একটি উদাহরণ হিসেবে। কথাটা ঠিক। রমা যখন আদালতে সাক্ষ্য দেয়, তখন সে আসলে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও সামাজিক ভয়ের মাঝখানে পিষ্ট এক নারী। যে সমাজ বিধবাকে একা চলতে দেয় না, সে সমাজই তাকে সাক্ষীর কাঠগড়ায় এমন এক অবস্থানে ঠেলে দেয় যেখানে সত্য বলার স্বাধীনতা তার থাকে না। এখানে প্রেম আর রাজনীতি আলাদা দুটি সুতো নয়, একই সুতোর পাক।

সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষমতার আরও একটি রূপ ধরা পড়ে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের নির্মাণে। ‘পল্লীসমাজ’-এ আকবর লাঠিয়াল বা অন্যান্য প্রান্তিক মুসলমান চরিত্র কেন্দ্রীয় নয়, কিন্তু তাদের উপস্থিতিতে একটা জরুরি সত্য ধরা পড়ে। গ্রামের সংঘাতে হিন্দু-মুসলমান বিভাজনের চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল জমির মালিকানা আর প্রভাবের সম্পর্ক। আমি জানি, এই সিদ্ধান্ত একটু সরলীকৃত শোনাতে পারে, কারণ বিশের দশকের শেষ দিকে বাংলার গ্রামে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ক্রমে প্রবল হয়ে উঠেছিল এবং শরৎচন্দ্র নিজেও তা লক্ষ করেছিলেন। তাঁর বিশের দশকের হিন্দু-মুসলমান সমস্যা বিষয়ক প্রবন্ধগুলিতে সে-চিন্তার ছাপ পাওয়া যায়। তবু ‘পল্লীসমাজ’-এর গ্রাম এখনও সেই বিভাজনের আগের সময়ের, যেখানে ক্ষমতার রেখা ধর্মের চেয়ে জমি আর জাতের মধ্য দিয়ে বেশি স্পষ্ট।

এখানে ‘মহেশ’ গল্পটির কথা না বললে চলে না, যদিও সেটি উপন্যাস নয়। ‘বঙ্গবাণী’ ও ‘পল্লীশ্রী’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই গল্পে গফুর জোলার সঙ্গে তার ক্ষুধার্ত ষাঁড় মহেশের সম্পর্ক, আর জমিদারি ক্ষমতা ও ব্রাহ্মণ্য প্রতাপের মুখোমুখি এক দরিদ্র মুসলমান চাষির অসহায়তা, বাংলা সাহিত্যে বিরল রাজনৈতিক বিবৃতি। গবেষকেরা এই গল্পকে প্রায়ই করুণ রসের দৃষ্টান্ত হিসেবে পড়েন, কিন্তু আমার মনে হয় ‘মহেশ’ আসলে ভূমি-অর্থনীতির গল্প। গোচারণের জমি জমিদারের গ্রাসে চলে গেছে, খাজনার চাপে গফুরের নিজের অন্ন নেই, আর সেই অন্নহীনতার মধ্যে তার পশুটির অনাহারও জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত। গল্পের শেষে গফুরের ক্ষোভ আর অসহায়তা যেভাবে ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন হয়ে ওঠে, তাতে ঔপনিবেশিক-সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর প্রান্তিক মানুষের নীরব অভিযোগ ধ্বনিত হয়। এটা কোনো স্লোগান নয়, কিন্তু যে কোনো ঘোষিত রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে এর প্রভাব গভীর।

‘দেনাপাওনা’ (১৯২৩) উপন্যাসেও গ্রামীণ ক্ষমতার চেহারা অন্য পথে ফুটে ওঠে। চণ্ডীগড় গ্রামের ভৈরবী ষোড়শী আর মাতাল, দুশ্চরিত্র, অর্থলোভী জমিদার জীবানন্দের সম্পর্ক এই উপন্যাসের কেন্দ্রে। এখানে জমিদারের ক্ষমতা কেবল জমির ওপর নয়, মানুষের শরীর আর বিশ্বাসের ওপরও প্রসারিত। মন্দিরের ভৈরবীর ওপর জমিদারের হস্তক্ষেপ আর তার প্রতিরোধ, এই দ্বন্দ্বে ক্ষমতার সঙ্গে ধর্ম, অর্থনীতি আর নারীর অবস্থান একসঙ্গে পাক খায়। শেষ পর্যন্ত জীবানন্দের চরিত্রে যে রূপান্তর আসে, তা নিয়ে পাঠকের মনে সংশয় থাকতে পারে, কারণ নৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সামন্তপ্রভুকে ‘উদ্ধার’ করে ফেলা কিছুটা সহজ সমাধান বলে মনে হতে পারে। তবু ষোড়শীর আত্মমর্যাদা আর প্রতিরোধের জায়গাটি স্পষ্ট, এবং সেই জায়গা থেকেই উপন্যাসের রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা বোঝা যায়।

এই তিনটি রচনার পাশাপাশি পড়লে আমার চোখে একটা বিষয় ধরা পড়ে, যা সচরাচর আলোচিত হয় কম। শরৎচন্দ্র গ্রামসমাজকে কখনওই আদর্শায়িত করেননি। রবীন্দ্রনাথের গ্রাম-ভাবনায় যেখানে পল্লীউন্নয়নের স্বপ্ন আর স্বাবলম্বনের আদর্শ প্রধান, শরৎচন্দ্রের গ্রাম অনেক বেশি অন্ধকার, অনেক বেশি আত্মঘাতী। ‘পল্লীসমাজ’-এর শেষ দৃশ্যে রমেশ গ্রাম ছেড়ে যায়, আর এই প্রস্থান কেবল ব্যক্তিগত পরাজয় নয়, এক ধরনের ঐতিহাসিক রায়ও। যে সমাজ নিজের ভেতরের বৈষম্য দূর করতে অক্ষম, বাইরের কোনো সংস্কারকের পক্ষে তাকে বদলানো কঠিন। এই হতাশার মধ্যে কিন্তু একটা প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক প্রশ্নও আছে, সংস্কার কি কেবল বাইরে থেকে, শহরের শিক্ষিত মানুষের হাত ধরেই আসবে, নাকি ভেতর থেকে, গ্রামের মানুষের সংগঠিত উদ্যোগে? এই প্রশ্নের উত্তর শরৎচন্দ্র দেননি, কিন্তু প্রশ্নটা তুলে দিয়েছেন।

শরৎচন্দ্রের শেষ পর্বের দুটি উপন্যাস, ‘শেষ প্রশ্ন’ (১৯৩১) আর ‘বিপ্রদাস’ (১৯৩৫), আমার কাছে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার সবচেয়ে পরিণত অবস্থা। ‘পথের দাবী’-তে প্রশ্ন ছিল, কীভাবে বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। শেষ পর্বে প্রশ্নটা আরও ভেতরে ঢুকে যায়: কীভাবে বাঁচতে হবে, কোন মূল্যবোধের ওপর সমাজ দাঁড়াবে, কার কাছে ইতিহাসের হিসাব চাইব। এই দুটি উপন্যাসেই রাজনৈতিক বিতর্ক বক্তৃতা থেকে নেমে এসেছে ঘরোয়া আসরের কথোপকথনে, আর এখানেই শরৎচন্দ্র সবচেয়ে ধারালো।

‘শেষ প্রশ্ন’ লেখা হয়েছিল শরৎচন্দ্রের শেষ বয়সে, অসুস্থ অবস্থায়। গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হওয়ার আগে ভারতবর্ষ পত্রিকায় দীর্ঘদিন ধরে মাঝে মাঝে ছেদ দিয়ে দিয়ে বেরিয়েছিল। বইটি বেরোনোর পর সমালোচক মহলে প্রবল বিতর্ক হয়। প্রগতিশীল ব্যক্তিরা যেমন একে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন, তেমনই সংরক্ষণশীল পক্ষ এর নিন্দায় মুখর হয়ে উঠেছিল। এই বিতর্কের ধরনটাই আমার কাছে তথ্য হিসেবে মূল্যবান। কারণ এটা দেখায়, সেকালের পাঠকসমাজ উপন্যাসটিকে সাহিত্যিক রচনার চেয়ে বেশি দেখেছিল একটি সামাজিক-রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে। এই উপন্যাসে কমল নামের চরিত্রটি জীবন, বিবাহ, নৈতিকতা আর প্রথাকে যেভাবে প্রশ্ন করে, তা সমকালীন সমাজের মূল ভিত্তিতে ধাক্কা দেয়। ‘সংযম’ শব্দটি বহুদিন ধরে বহু মর্যাদা পেয়ে এমন স্ফীত হয়ে উঠেছে, এই অভিযোগ সে তোলে। স্বামীর স্মৃতি বুকে নিয়ে বিধবার দিন কাটানোর মতো সংস্কারকে পবিত্র বলে মেনে নিতেও তার আপত্তি, যদি না তা যুক্তি দিয়ে প্রমাণিত হয়।

আমি কমলের এই অবস্থানকে দেখি একটি তাত্ত্বিক অস্ত্র হিসেবে। সে এমন এক রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছে, যা সরাসরি ক্ষমতা নিয়ে নয়, বরং ক্ষমতা কীভাবে আমাদের নীতিবোধের ভেতর দিয়ে কাজ করে তা নিয়ে। যখন কোনো সমাজ একটা আচারকে ‘স্বতঃসিদ্ধ পবিত্র’ বলে ঘোষণা করে, তখন সেই ঘোষণার মধ্যে ক্ষমতার এক নিঃশব্দ ভাষা থাকে। কমল সেই ভাষাকে তার মুখে ফিরিয়ে দিতে চায়। উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র, অজিত, অক্ষয়, আশুবাবু, নীলিমা, শিবনাথ, মনোরমা, রাজেন, প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সামাজিক অবস্থানের প্রতিনিধি। আশুবাবুর পুরনো মূল্যবোধ আর অজিতের দ্বিধা, এসবের পাশে কমল হয়ে ওঠে এক বিরুদ্ধ-কণ্ঠ। উপন্যাসের এই ‘বহুস্বর’ গড়নে আমি একটা রাজনৈতিক সততা দেখতে পাই। লেখক কমলের পক্ষে দাঁড়ালেও অন্য চরিত্রদের বিদ্রুপ করেননি, প্রত্যেকের যুক্তিকে শোনার সুযোগ রেখেছেন। বিরোধী মতকে কত সম্মান দেওয়া হচ্ছে, সেটাই কোনো রচনার গণতান্ত্রিকতার একটি মাপকাঠি।

‘শেষ প্রশ্ন’-এর আরেকটি অংশ আমাকে বারবার টেনে এনেছে, সেটা হল তাজমহল নিয়ে কমলের বক্তব্য। কমল বলছে, সম্রাট ভাবুক ছিলেন, কবি ছিলেন, শক্তি আর সম্পদ দিয়ে এত বড় একটা সৌন্দর্যের বস্তু প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, কিন্তু মমতাজ ছিল এক আকস্মিক উপলক্ষ মাত্র। তার আরও বক্তব্য, ধর্ম উপলক্ষ হলেও ক্ষত থাকত না, সহস্র লক্ষ মানুষ বধ করা দিগ্বিজয়ের স্মৃতিও হয়তো এমনি টলে যেত। এখানে একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটছে। প্রেমের স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে যে বিখ্যাত রোমান্টিক ভাবনা প্রচলিত, তাকে সরিয়ে কমল দেখাচ্ছে সাম্রাজ্যের ক্ষমতা, শ্রম আর রক্তের ওপর দাঁড়ানো এক ইমারত। এখানে ‘ক্ষমতা’ বিষয়ে একটা পরোক্ষ সতর্কবার্তা আছে। ইতিহাসের বড় কীর্তি অনেক সময় অগণিত অনামা মানুষের ঘামের ওপর দাঁড়ায়, আর সেই কীর্তিকে ‘প্রেমের দান’ বলে ডাকা মানে ক্ষমতার দায়কে ঢেকে দেওয়া। এই চিন্তার পেছনে মার্ক্সীয় বীক্ষার প্রভাব স্পষ্ট কি না, সে বিতর্কে আমি যাব না, তবে শরৎচন্দ্রের পাঠকসমাজ যে সেই সময়ে বামপন্থী ভাবনার সঙ্গে কিছুটা পরিচিত ছিল, সেটা মনে রাখলে এই অংশটি আর অপ্রাসঙ্গিক থাকে না।

‘বিপ্রদাস’ লেখা হয়েছে ‘শেষ প্রশ্ন’-এর পরে, আর এখানে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের একটি আকর্ষণীয় তথ্য আছে। উপন্যাসটি প্রথমে ‘বেণু’ নামের একটি পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়, যে পত্রিকাটি ছিল বিপ্লবী দলের মুখপত্র। বাংলা ১৩৩৬ থেকে ১৩৩৮ সালের মধ্যে এটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক কারণে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে বেরোয়, তারপর ১৯৩৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বই আকারে। একজন লেখকের উপন্যাস কোন পত্রিকায় ছাপা হচ্ছে, সেটা তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের একটা সূত্র। যখন এক সময়ের পাঠকপ্রিয় ঔপন্যাসিক বিপ্লবী দলের মুখপত্রে লেখেন, তখন তাঁর লেখাকে আর কেবল পারিবারিক উপন্যাস বলে পড়া যায় না।

এই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে এক পরিবারের দুই ভাইয়ের ভিন্ন জীবনাদর্শ। বিপ্রদাস প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের প্রতি অনুরক্ত, আর তার ছোট ভাই দ্বিজদাস আধুনিক ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তার দিকে ঝুঁকে। বন্দনা ইংরেজি-শিক্ষিতা, আধুনিকা তরুণী, যে বিপ্রদাসের পরিবারের সংস্পর্শে এসে নিজেকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলে। উপন্যাসটি প্রায়ই পড়া হয় ঐতিহ্য বনাম আধুনিকতার সংঘাত হিসেবে, আর কিছু সমালোচক বলেন, এখানে শরৎচন্দ্রের হিন্দু সামাজিকতা-অনুরাগী হৃদয় প্রকাশ পেয়েছে। আমি এই পাঠের সঙ্গে আংশিক একমত। বন্দনার আত্মসমর্পণ আর বিপ্রদাসের আদর্শায়ন একটু বেশি আগ্রহ নিয়েই করা হয়েছে, এ কথা মানতে হবে। কিন্তু উপন্যাসের একটি বিশেষ অংশ আমার কাছে এর রাজনৈতিক জোরের প্রমাণ। বলরামপুর গ্রামের চাষাভূষোদের এক বৈঠক, রেললাইনের কুলি গ্যাং রবিবারের ছুটির ফাঁকে সভায় যোগ দেয়, কলকাতা থেকে আসা নামকরা বক্তারা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেন, আর সভা শেষে শোভাযাত্রায় ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি তোলা হয়। এই দৃশ্যে সামন্তবাদী উন্নাসিকতা আর ভবিষ্যৎ সমাজতন্ত্রী গণঅভ্যুত্থানের মুখোমুখি হওয়ার সূক্ষ্ম আভাস আছে। শ্রেণিসংগ্রামের কথা এখানে সরাসরি আসেনি, কিন্তু আসন্ন ঝড়ের গন্ধ ঠিকই এসেছে।

তবু ‘বিপ্রদাস’-এর বিশেষ আকর্ষণ আমার কাছে বন্দনার সংলাপের তীক্ষ্ণতা। বিপ্রদাসের নিরাপদ বিশ্বাসের সামনে সে বলে, বিশ্বাসের বিরুদ্ধে তর্ক চলে না। এই কথাটা নিছক ভাবালু শ্রদ্ধা প্রকাশ নয়। এর মধ্যে একটা সচেতন রাজনৈতিক সত্য আছে: ক্ষমতা যখন বিশ্বাসের চেহারা নেয়, তখন যুক্তি দিয়ে তাকে আঘাত করা কঠিন। এই উপলব্ধিই শরৎচন্দ্রকে ঔপনিবেশিক ভারতের একজন জটিল রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক করে তুলেছে।

এ পর্যন্ত যে উপন্যাসগুলোর কথা বললাম, সেগুলোতে রাজনীতি অন্তত কোনো না কোনোভাবে ‘বাইরের’ জগতের ব্যাপার, রাষ্ট্র, জমিদারি, আন্দোলন। কিন্তু শরৎচন্দ্রের সবচেয়ে মৌলিক রাজনৈতিক অবদান আমার মতে অন্য জায়গায়: তিনি ঘরের ভেতরের ক্ষমতাকে রাজনীতির আওতায় এনেছেন। কে ‘সতী’, কে ‘চরিত্রহীন’, কার বিয়ে হবে, কে বিধবা হয়ে একাদশীর উপবাসে দিন কাটাবে, এসব সিদ্ধান্ত কে নেয় আর কোন ক্ষমতার জোরে নেয়, এই প্রশ্ন তাঁর অনেক উপন্যাসের অন্তর্নিহিত কাঠামো। ‘ব্যক্তিগত বিষয়ই রাজনৈতিক’ কথাটা বিশ শতকের শেষ দিকে নারীবাদী তত্ত্বের হাত ধরে বিখ্যাত হয়েছে, কিন্তু শরচন্দ্র তা নিজের মতো করে বহু আগেই অনুভব করেছিলেন।

‘চরিত্রহীন’-এর কথাই ধরা যাক। কিরণময়ী, সাবিত্রী, সতীশ, উপেন্দ্র, দিবাকর, এঁদের পারস্পরিক সম্পর্কের জটিলতা একদিক দিয়ে ব্যক্তিগত প্রেমের কাহিনি। কিন্তু উপন্যাসের নামটাই একটা রাজনৈতিক ঘোষণা। ‘চরিত্রহীন’ শব্দটি সমাজের হাতে এমন একটি হাতিয়ার, যা দিয়ে সে ক্ষমতাহীন মানুষকে চিহ্নিত ও বিচ্ছিন্ন করে। শরৎচন্দ্র সেই শব্দকে উপন্যাসের নামে ব্যবহার করে উল্টে দিলেন। যাঁদের সমাজ ‘চরিত্রহীন’ বলে, তাঁদের মধ্যেই তিনি দেখালেন মানবিক মহত্ত্ব। কুলটা বলে গণ্য সাবিত্রী যে প্রেমের পবিত্রতা দেখায়, তার সামনে সমাজের ‘সতী’ ধারণা ফিকে হয়ে যায়। কিরণময়ী প্রখর ব্যক্তিত্বসম্পন্না, বুদ্ধিমতী, অথচ বিবাহিত জীবনের দাম্পত্য সুখ থেকে বঞ্চিত। তার ভালোবাসা সামাজিক স্বীকৃতি পায় না, আর সেই অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত ধ্বংসাত্মক রূপ নেয়। কিরণময়ীর ট্র্যাজেডি আসলে এমন এক সমাজের চার্জশিট, যে সমাজ প্রতিভাবান নারীর জন্য প্রেমের সম্মানজনক পথ খোলা রাখেনি। সমালোচক মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায় বহু আগে ‘কালি-কলম’ পত্রিকায় ঠিক এই কথারই একটি দিক ধরেছিলেন। তাঁর মতে, শরৎচন্দ্রের কথাসাহিত্য পাঠকের সামনে এই প্রশ্ন তুলে ধরেছে যে নারীত্ব বড় না সতীত্ব বড়। জগদীশচন্দ্র গুপ্ত লিখেছেন, জীবনানন্দ, ষোড়শী, অভয়া, অচলা, বামুনের মেয়ে আর কিরণময়ী, এঁরা আছেন বলেই বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে অন্যরকম। আমি এই তালিকাটাকে পড়ি একটি রাজনৈতিক তালিকা হিসেবে। এঁরা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো সামাজিক বিধির শিকার বা তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো মানুষ।

‘বামুনের মেয়ে’ (১৯২০) জাতপাত ও কৌলীন্য প্রথার ওপর সরাসরি আক্রমণ। কুলীন ব্রাহ্মণের কন্যাদায়, বহুবিবাহ, আর সেই সুযোগে সামাজিক নেতাদের ভণ্ডামি, এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। সন্ধ্যা আর অরুণের সম্পর্কের পটভূমিতে জাতিভেদের জটিলতা এমনভাবে বোনা হয়েছে যে পাঠক বুঝে যান, ব্যক্তি-সম্পর্কের স্বাধীনতা আসলে সমাজের জাতবিন্যাসের সঙ্গে কতটা জড়িত। এই উপন্যাস যে সময়ে লেখা, তখন বাংলার রাজনীতিতে সমাজসংস্কার বনাম রাজনৈতিক স্বাধীনতার পুরোনো তর্ক চলছিল। কংগ্রেসের একটি অংশ মনে করত, আগে স্বরাজ, তারপর সমাজ-সংস্কার। শরৎচন্দ্র সেই ক্রমকে মানতে রাজি ছিলেন না। যে সমাজে কুলীন কন্যার বিয়ে নিয়ে ব্যবসা চলে, সেখানে স্বাধীনতার ডাক কতটা খাঁটি হতে পারে, এই প্রশ্ন ‘বামুনের মেয়ে’-র পাতায় পাতায় লেগে আছে।

‘নারীর মূল্য’ প্রবন্ধটির কথাও এখানে স্মরণ করা দরকার। এটি তিনি ‘অনিলা দেবী’ ছদ্মনামে ‘যমুনা’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন, পরে ১৯২৪ সালে বই আকারে বেরোয়। প্রবন্ধে নারীর মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি একটি তীক্ষ্ণ তুলনা টানেন। মণি-মাণিক্য মহামূল্য বস্তু, কারণ তা দুষ্প্রাপ্য, আর জল নিত্য প্রয়োজনীয় হলেও তার দাম নেই, কারণ তা সুলভ। সংসারে নারী দুষ্প্রাপ্য নন বলেই তাঁর মূল্য কম ধরা হয়, কিন্তু কোনোদিন যদি নারী বিরল হয়ে ওঠেন, সেদিন তাঁর প্রকৃত মূল্য বোঝা যাবে। এই যুক্তি আসলে চাহিদা-যোগানের অর্থনৈতিক কাঠামোয় নারীর সামাজিক অবস্থানকে বিশ্লেষণ করে। একজন ঔপন্যাসিকের কাছ থেকে এই ধরনের প্রায়-অর্থনৈতিক যুক্তি আশা করা যায় না, আর সেটাই প্রবন্ধটির বিশেষত্ব।

‘গৃহদাহ’ উপন্যাসে অচলা, মহিম আর সুরেশের ত্রিভুজে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আর সামাজিক-ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি এক জায়গায় এসে মেলে। ব্রাহ্ম-হিন্দু ভেদ, ধর্মান্তর ও বিবাহ নিয়ে সামাজিক বিধিনিষেধ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় সংকটের অংশ। অচলা যে এক নিদারুণ সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে আটকে যায়, তার পেছনে ব্যক্তিগত দুর্বলতা যতটা আছে, তার চেয়ে কম নেই সমাজের ধর্ম-সংক্রান্ত সংকীর্ণ কাঠামোর ভূমিকা। ‘শ্রীকান্ত’-এ অভয়া ও রোহিণীর চরিত্র একইভাবে সমাজের নীতিবিধানের সামনে প্রশ্ন তোলে। অভয়া স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়ে ব্রহ্মদেশে একটি নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, আর সমাজের ‘বৈধতা’-র সংজ্ঞাকে সে নিজের জীবন দিয়ে প্রশ্ন করে।

এই সব পাঠের পাশে রেখে একটা সতর্কতার কথাও আমাকে বলতেই হবে। শরৎচন্দ্রের নারী-দরদ কতটা নারীর নিজস্ব রাজনৈতিক কর্তৃত্বের স্বীকৃতি, আর কতটা পুরুষ লেখকের সহানুভূতি, এই প্রশ্ন সমালোচকেরা বহুবার তুলেছেন। আমার মনে হয়, দুটোই সত্য। শরৎচন্দ্র নারীর ওপর সামাজিক অন্যায়কে অসাধারণ সংবেদনশীলতায় দেখিয়েছেন, কিন্তু সেই নারীদের মুক্তির পথ অনেক সময় তাঁর উপন্যাসে ব্যক্তিগত ত্যাগ বা মৃত্যুর মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে। সংগঠিত নারী-আন্দোলন বা সমষ্টিগত প্রতিরোধের কল্পনা তাঁর সময়ের উপন্যাসে প্রায় নেই। এটা ব্যর্থতা নয়, বরং ঐতিহাসিক সীমা, আর সেই সীমা চেনাটাই সৎ সমালোচনার কাজ।‘শ্রীকান্ত’-কে সচরাচর রাজনৈতিক উপন্যাসের তালিকায় ধরা হয় না, আর আমি নিজেও প্রথমে ধরিনি। চার পর্বে বিস্তৃত এই আত্মকথনধর্মী ভ্রমণ-কাহিনিকে ভবঘুরে এক মানুষের স্মৃতিচারণ বলেই পড়া হয়েছে এতদিন। কিন্তু আবার পড়তে গিয়ে আমার চোখে পড়ল, এই উপন্যাসের পুরো গড়নটাই একজন ‘বাইরের মানুষ’-এর দৃষ্টিতে তৈরি। শ্রীকান্ত কোথাও স্থির হয়ে বসে না, কোনো সামাজিক বৃত্তের পুরো সদস্য হয় না, ঠিক সেই কারণেই সে সমাজের নানা স্তরকে নিরপেক্ষ চোখে দেখতে পারে। ইন্দ্রনাথের দুঃসাহসিক, নিয়ম-না-মানা জীবন, রাজলক্ষ্মীর সামাজিক পরিচয়ের জটিলতা, অভয়ার স্বামী-পরিত্যক্ত অবস্থায় রেঙ্গুনে নতুন জীবন গড়ার চেষ্টা, এই প্রতিটি অংশে সমাজের মূল ভিত্তির প্রতি একটা নীরব প্রশ্ন আছে। গঙ্গাপাড়ের নদীর স্রোতের মতো কাহিনি এগিয়ে চলে, আর যাওয়ার পথে যে সব চরিত্রকে ছুঁয়ে যায়, তারা প্রত্যেকেই প্রচলিত ‘ভদ্র’ সমাজের কিনারে দাঁড়ানো মানুষ।

এই ‘কিনারের’ দৃষ্টি আমার কাছে শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক অবস্থানেরই একটি রূপ। সমাজের কেন্দ্রে বসে থাকা মানুষ প্রায়ই ক্ষমতার কাঠামোটাকে দেখতে পায় না, কারণ সেটা তার কাছে স্বাভাবিক। প্রান্তে দাঁড়ানো মানুষ দেখে, কারণ সেই কাঠামো তাকে বারবার ধাক্কা দেয়। শরৎচন্দ্র নিজে ব্রহ্মদেশের দীর্ঘ প্রবাসে, আর্থিক টানাটানির জীবনে, সামাজিক বিধিনিষেধের বাইরে থাকার অভিজ্ঞতা পেয়েছিলেন। সম্ভবত সেখান থেকেই তাঁর এই প্রান্তিক দৃষ্টি, যাকে একটু বাড়িয়ে ‘অভিজ্ঞতালব্ধ রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা’ বলা যায়। এ কথাটা আমি জোর দিয়ে বলছি না, শুধু একটি সম্ভাব্য সূত্র হিসেবে রাখছি, কারণ লেখকের জীবন থেকে সরাসরি রচনার ব্যাখ্যা টানা সবসময় নিরাপদ নয়।

রাজলক্ষ্মীর চরিত্রটি এখানে আলাদা করে ভাবার মতো। সমাজের চোখে সে ‘পতিতা’, অথচ শ্রীকান্তের জীবনে সে এমন এক শক্তি, যে সংসার চালায়, ধর্মকর্মে মন দেয়, আবার নিজের ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেয়। শরৎচন্দ্র এই চরিত্রের মাধ্যমে ‘পবিত্রতা’ ও ‘অপবিত্রতা’র সামাজিক সংজ্ঞাকে নাড়িয়ে দেন। কেউ হয়তো বলবেন, শেষ পর্যন্ত রাজলক্ষ্মীকে ‘ঘরণী’-র ভূমিকায় ফিরিয়ে এনে লেখক প্রচলিত সামাজিক মানদণ্ডের কাছেই আত্মসমর্পণ করেছেন। এই সমালোচনায় সত্য আছে, আর আমি তা উড়িয়ে দিতে চাই না। তবে সেই সঙ্গে এটাও সত্য যে সমাজ যাকে ‘বাইরে’ ঠেলে দিয়েছিল, তাকে কাহিনির কেন্দ্রে আনাটাই তখনকার দিনে একটি রাজনৈতিক কাজ ছিল।

আরেকটি দিক নিয়ে সংক্ষেপে বলি, সেটা শরৎচন্দ্রের সমকালীন পাঠপ্রতিক্রিয়া। ‘পথের দাবী’ বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনাটা সরকারি দিক থেকে ঘটেছিল, কিন্তু সামাজিক দিক থেকে সমান্তরাল প্রতিক্রিয়া এসেছিল ‘চরিত্রহীন’ আর ‘শেষ প্রশ্ন’-এর বিরুদ্ধে, যেখানে রক্ষণশীল সমাজ উপন্যাসগুলিকে নীতিবিরোধী বলে নিন্দা করেছিল। অর্থাৎ শরৎচন্দ্র একই সময়ে দুটি ক্ষমতার চাপের মুখোমুখি ছিলেন, বাইরে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র আর ভেতরে সামাজিক রক্ষণশীলতা। সাধারণভাবে বলা হয়, ‘পথের দাবী’ তরুণ বিপ্লবীদের মধ্যে ব্যাপকভাবে পড়া হয়েছিল, আর বহু স্মৃতিকথায় তার প্রভাবের কথা পাওয়া যায়। যদিও প্রতিটি আলাদা দাবিকে যাচাই করা দরকার, সামগ্রিক চিত্রটা বিশ্বাসযোগ্য। যে বই নিষিদ্ধ হয়, সে বই প্রায়ই আরও বেশি করে হাতবদল হয়।

এখানে একটা বড় কথা বলার আছে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাস নিয়ে আমাদের সাহিত্য-সমালোচনা বহুদিন ধরে ‘আবেগ বনাম বুদ্ধি’-র একটা ভাগ টেনে এসেছে। তাঁর উপন্যাস পাঠকের হৃদয় ছোঁয়, কিন্তু বুদ্ধিকে চ্যালেঞ্জ করে কম, এই ধারণা বহুল প্রচলিত। আমি মনে করি, এই ভাগাভাগিই শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক শক্তিকে আড়াল করে রেখেছে। আবেগ তাঁর কাছে রাজনৈতিক বোধের একটি বাহন। যে পাঠক সাবিত্রীর ব্যথায় কাঁদেন, তিনি অজান্তেই এমন একটি সমাজের কথা ভাবতে শুরু করেন, যেখানে সাবিত্রীর মতো মানুষকে সম্মান দেওয়া হত। আবেগের এই ‘অনুবাদ’ ক্ষমতা, অর্থাৎ ব্যক্তিগত সহানুভূতিকে সামাজিক প্রশ্নে রূপান্তরিত করা, শরৎচন্দ্রকে বাংলা সাহিত্যে অন্য সবার থেকে আলাদা করে।

ভাষার প্রশ্নটাকে আমি আলাদা করে রাখতে চাই, কারণ সাধারণত শরৎচন্দ্রের ভাষা নিয়ে আলোচনা হয় সৌন্দর্য আর সারল্যের পরিভাষায়, রাজনীতির পরিভাষায় নয়। অথচ কোন ভাষায় একটি উপন্যাস লেখা হবে, সেই সিদ্ধান্তের মধ্যেও ক্ষমতার প্রশ্ন জড়িয়ে থাকে। বাংলা গদ্যের ইতিহাসে এক সময় সংস্কৃতঘেঁষা সাধুভাষা ছিল সাহিত্যের ‘ভদ্র’ ভাষা, আর মুখের ভাষা ছিল নিচু স্তরের। বঙ্কিমচন্দ্র সেই সাধুভাষাকে সহজ, গতিময় আর বিষয়ের উপযোগী করে তুলেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তাকে করেছিলেন শিল্পিত ও ব্যঞ্জনাধর্মী। শরৎচন্দ্র এলেন ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে সাধুভাষা আর চলিত ভাষার মধ্যে একটা সেতু বানানো দরকার ছিল।

শরৎচন্দ্রের ভাষা নিয়ে যে গবেষণা-অধ্যায়টি আমি পড়েছি, তার একটি তথ্য আমার কাছে চমৎকার লেগেছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাঁর গল্প-উপন্যাসের বহিরঙ্গ বা কাঠামো সাধুগদ্যের, আর সংলাপ চলতি গদ্যের। অর্থাৎ বর্ণনায় সাধুভাষা, কিন্তু চরিত্রের মুখে চলিত। এখানে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত লুকিয়ে আছে। যদি সমস্ত উপন্যাস সাধুভাষায় লেখা হত, তাহলে গফুর জোলা বা গ্রামের বিধবা বা সন্ধ্যা-কালিতার মুখের কথা কৃত্রিম শোনাত। শরৎচন্দ্র তাদের মুখে এমন ভাষা বসালেন, যা তাদের নিজস্ব। ফলে পাঠক আর এই মানুষদের ‘বর্ণিত বস্তু’ হিসেবে দেখেন না, তাদের কণ্ঠস্বর সরাসরি শুনতে পান। যে সময়ে সাহিত্যিক ভাষা ছিল শিক্ষিত উচ্চবর্ণের সম্পত্তি, সেই সময়ে এটি একটি ছোট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ।

শরৎচন্দ্র নিজে এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন। সুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত তাঁর সম্পর্কে লিখেছিলেন, শরৎচন্দ্রের শৈলীর প্রধান গুণ হল সাধুভাষা আর চলিত ভাষার সমন্বয়, যেখানে চলিত ভাষার স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা এবং সাধুভাষার সমৃদ্ধির মধ্যে তিনি সামঞ্জস্য গড়েছেন। সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় এই ভাষারীতির শক্তিকে ব্যাখ্যা করেছেন প্রবহমানতার ভাষায়। তাঁর মতে, এ ভাষার শক্তি এখানে যে এ অবাধ, নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহের মতো একটানা এগিয়ে যেতে পারে। সুকুমার সেন একে বলেছিলেন ‘গল্পরসবাহী, স্বচ্ছ, মনোরম ও পর্যাপ্ত’। এই সব মন্তব্য ঠিক, কিন্তু আমি সেগুলোর পাশে আরেকটি প্রশ্ন রাখতে চাই। যে ভাষা এত সহজ ও স্বচ্ছ, সেই ভাষা কি কখনও রাজনৈতিক বক্তব্যকে কিছুটা ঢেকে দেয়? আমার অভিজ্ঞতায়, হ্যাঁ। শরৎচন্দ্রের গদ্য এতটাই মোহময় যে পাঠক অনেক সময় গল্পের প্রবাহে ভেসে গিয়ে ভাবতেই ভুলে যান, এই উপন্যাস সমাজের কোন কাঠামোকে আঘাত করছে।

আরেকটি দিক হল শরৎচন্দ্রের নিজের ভাষা-ঋণের স্বীকারোক্তি। তিনি বারবার বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বঙ্কিম সম্পর্কে তাঁর মত ছিল, ভক্তিশ্রদ্ধায় আমরা কারও চেয়ে কম নই, আর সেই শ্রদ্ধার জোরেই আমরা আগে চলতে দ্বিধা বোধ করিনি। তাঁর মতে, মিথ্যা ভক্তির মোহে ত্রিশ বছর আগের সাহিত্যের ছাঁচকে আঁকড়ে থাকলে গতির অভাবে বাংলা সাহিত্য মরণদশায় পৌঁছত। এই মন্তব্যে একটা সাংস্কৃতিক রাজনীতি আছে। পূর্বসূরির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও তাঁকে অতিক্রম করার অধিকার, অর্থাৎ ঐতিহ্যের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার সাহস, শরৎচন্দ্র নিজের জন্য দাবি করেছিলেন, আর তাঁর উপন্যাসের নায়িকারাও ঠিক এই দাবিই করে সমাজের কাছে।

এই প্রসঙ্গে একটা তুলনামূলক পর্যবেক্ষণ আমি যোগ করতে চাই, যা আমার নিজের পাঠ থেকে এসেছে। শরৎচন্দ্রের সমকালীন কল্লোল-কালিকলমের লেখকেরা বাংলা কথাসাহিত্যে আধুনিকতা এনেছিলেন, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের ভাষা ছিল আরও সচেতনভাবে শহুরে আর মনস্তাত্ত্বিক। শরৎচন্দ্রের ভাষায় সেই আত্মসচেতন আধুনিকতা কম, কিন্তু একধরনের সামাজিক ব্যাপ্তি বেশি। তাঁর উপন্যাসে ব্রাহ্মণ, মুসলমান জোলা, বৈষ্ণবী, জমিদার, মাতাল, ব্রহ্মদেশের প্রবাসী, সবাই নিজের মতো করে কথা বলে। রাজনৈতিক সাহিত্যের একটা বড় শর্ত হল বহু কণ্ঠের উপস্থিতি, আর সেই শর্ত শরৎচন্দ্র অনেকটাই পূরণ করেছেন।

এখানে আরও একটি কথা বলা দরকার। শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার একটা রাজনৈতিক দিক আছে। সুমিতা চক্রবর্তী লিখেছেন, বিশ শতকের প্রথম পাদের উপন্যাস সাহিত্যে তিনি প্রধানতম ব্যক্তিত্ব, আর তাঁর জনপ্রিয়তার একটা বড় কারণ তাঁর সরল ও উচ্ছ্বাসহীন ভাষা। অজিতকুমার ঘোষ ভাষার মধ্যে লেখকের গভীর বেদনার প্রতিফলন দেখেছেন। জনপ্রিয়তা মানে শুধু বিক্রি নয়, মানে ক্ষমতার সঙ্গে যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম। এমন একজন লেখক, যাঁর বই ঘরে ঘরে পড়া হয়, তিনি যখন সতীত্ব, জাতিভেদ বা সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন সেই প্রশ্ন ঘরোয়া আলোচনায় ঢুকে পড়ে। ব্রিটিশ সরকার ‘পথের দাবী’-কে নিষিদ্ধ করেছিল সম্ভবত এই কারণেই। বইটির সাহিত্যমূল্যের চেয়েও তার পাঠকসংখ্যাই তাদের কাছে বিপজ্জনক ছিল।

শরৎচন্দ্র কেবল উপন্যাসেই রাজনৈতিক ছিলেন না, তাঁর প্রবন্ধ আর বক্তৃতাতেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। উপন্যাসের পাশে সেই লেখাগুলিকে রাখলে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার একটা বড় ছবি পাওয়া যায়। কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র কয়েকটি প্রবন্ধগ্রন্থও রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে তিনটি উল্লেখযোগ্য, ‘তরুণের বিদ্রোহ’, ‘স্বদেশ ও সাহিত্য’ এবং ‘নারীর মূল্য’।

‘তরুণের বিদ্রোহ’ গ্রন্থে রংপুর শহরে অনুষ্ঠিত একটি প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সম্মিলনীতে তাঁর অভিভাষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বইটি ১৯২৯ সালের ১৮ এপ্রিল প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থের শিরোনামই তাৎপর্যপূর্ণ। শরৎচন্দ্র বিদ্রোহের ভার দিতে চেয়েছিলেন তরুণ প্রজন্মের হাতে, যারা পুরনো সামাজিক বিধিনিষেধ আর ঔপনিবেশিক শাসন, দুটোকেই প্রশ্ন করতে পারে। তাঁর চলিত গদ্যে লেখা এই প্রবন্ধগ্রন্থে তরুণদের স্বদেশি মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহ্বান আছে। ‘স্বদেশ ও সাহিত্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালের আগস্ট মাসে। বইটি দুই ভাগে বিভক্ত। ‘স্বদেশ’ অংশে শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক চেতনা, আর ‘সাহিত্য’ অংশে সাহিত্য-বিষয়ক প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। এই বিভাজনটাই বলে দেয়, তিনি রাজনীতি আর সাহিত্যকে দুটো আলাদা বাক্সে ভাবতেন না, অথচ তার ভেতরের দুই ধরনের কাজ আলাদা করে সাজিয়েছেন। আমার কাছে এটি একজন সচেতন লেখকের স্বীকারোক্তি: আমি রাজনীতি করি, আবার সাহিত্যও লিখি, আর এ দুটোর সম্পর্ক জটিল।

এই প্রসঙ্গে একটি প্রশ্ন আমাকে ভাবিয়েছে। শরৎচন্দ্র যদি সত্যিই রাজনীতির প্রতি এত সক্রিয় ছিলেন, তবে তাঁর কংগ্রেস-জীবন শেষ পর্যন্ত কেন মোহমুক্তিতে শেষ হল? এ বিষয়ে প্রামাণ্য জীবনীগ্রন্থ থেকে যতটা জানা যায়, তিনি সক্রিয় সাংগঠনিক রাজনীতির ভেতরে থাকতে থাকতে দলীয় রাজনীতির আত্মকেন্দ্রিকতা, গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আর আদর্শহীন ক্ষমতালোভ দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। আমি এই কথাটা জীবনীগত ঘটনার প্রমাণ হিসেবে নয়, বরং তাঁর উপন্যাসের একটি পাঠ-সূত্র হিসেবে উপস্থাপন করছি। ‘পল্লীসমাজ’-এ গ্রাম্য কোন্দল, ‘পথের দাবী’-তে বিপ্লবী সংগঠনের ভেতরের টানাপোড়েন আর ‘শেষ প্রশ্ন’-এ আদর্শবাদের ফাঁকা বুলি নিয়ে বিদ্রূপ, এই তিনটি জায়গায় একটা সাধারণ সুর আছে। শরৎচন্দ্র রাজনীতির আদর্শকে সম্মান করতেন, কিন্তু রাজনীতির মানুষদের নিয়ে তাঁর সংশয় ছিল গভীর। একই সুর আমরা পরবর্তীকালে সাধন চট্টোপাধ্যায়ের ‘পক্ষ বিপক্ষ’-এও শুনতে পাই, সে কথায় একটু পরে আসব।

হিন্দু-মুসলমান প্রশ্নে শরৎচন্দ্রের অবস্থান নিয়ে আলাদা করে কিছু বলা দরকার, কারণ বাংলার ঔপনিবেশিক রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িকতা ক্রমে প্রবলতর সমস্যা হয়ে উঠছিল। বিশের দশকের শেষ দিক থেকে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়, আর শরৎচন্দ্রের লেখায় এর প্রতি তাঁর উদ্বেগ ধরা পড়ে। তাঁর উপন্যাসে মুসলমান চরিত্র অনেকক্ষেত্রেই সহানুভূতির সঙ্গে আঁকা, গফুর জোলার মতো চরিত্রে সেটা স্পষ্ট। কিন্তু একটি অস্বস্তিকর সত্য এখানে মেনে নিতে হয়। এই চরিত্রগুলি প্রায়ই নিপীড়িত, দরিদ্র বা প্রান্তিক, আর তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রায় অনুপস্থিত। তারা আমাদের করুণা জাগায়, কিন্তু ইতিহাস গড়ে না। উপরন্তু ‘পথের দাবী’-র মতো উপন্যাসে জাতীয়তাবাদের যে ভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, তার ওপর বঙ্কিমী হিন্দু-জাতীয়তাবাদের ছাপ একেবারে মুছে যায়নি, যদিও লেখক নিজে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক ছিলেন না। এই দ্বন্দ্ব ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যাই হোক, উপনিবেশ-কালীন বাঙালি ভদ্রলোক সমাজের একটি প্রামাণ্য দলিল হিসেবে এটি আজও গুরুত্বপূর্ণ।

এবার সেই দীর্ঘ ছায়ার কথায় আসি, যার উল্লেখ আমি গোড়ায় করেছিলাম। জয়দেব ব্যানার্জীর প্রবন্ধে সত্তর ও আশির দশকের নাগরিক রাজনীতির যে উপন্যাসগুলোর কথা আছে, তাপস ঘোষের ‘সামনে লড়াই’ (১৯৭১), মহাশ্বেতা দেবীর ‘হাজার চুরাশির মা’ (১৯৭৪), সমরেশ মজুমদারের ‘কালবেলা’ (১৯৮৩), শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ‘মানবজমিন’ (১৯৮৮), তাদের কোনোটাই সরাসরি শরৎচন্দ্রের অনুসারী নয়। কিন্তু একটা প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে: একজন তরুণ বা সংবেদনশীল মানুষ যখন ক্ষমতার সামনে দাঁড়ায়, তার ব্যক্তিগত জীবন কীভাবে ভেঙে পড়ে? ‘পথের দাবী’-র সব্যসাচী, ‘কালবেলা’-র অনিমেষ আর ‘হাজার চুরাশির মা’-র ব্রতী, এই তিন চরিত্রের মধ্যে সময়ের ব্যবধান যত বড়ই হোক, একটা পারিবারিক সাদৃশ্য আছে। শরৎচন্দ্রের সময় থেকে বাংলা উপন্যাস শিখে গিয়েছিল যে ব্যক্তিজীবনের ক্ষতি রাজনৈতিক ঘটনার একটি জরুরি নথি।

শরৎচন্দ্রের সময়ের বৃহত্তর রাজনৈতিক আবহের সঙ্গে তাঁর উপন্যাসের সম্পর্কটা আরেকটু খুলে বলা দরকার। বিশের দশকে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন সারা ভারতকে নাড়া দিয়েছিল, আর বাংলায় তার উত্তাপ এসেছিল চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দলের মধ্য দিয়ে। জয়দেব ব্যানার্জী যে লিখেছেন, গান্ধীজির নেতৃত্বে সারা ভারত রাজনৈতিক মননভাবনায় যুক্ত হয়ে পড়ল, সেই কথাটা বাংলার ক্ষেত্রে আরও সত্য। কিন্তু এই আন্দোলনের প্রতি শরৎচন্দ্রের সম্পর্ক ছিল জটিল। তিনি আন্দোলনের সাধারণ মানুষকে টেনে আনার ক্ষমতাকে শ্রদ্ধা করতেন, আবার সেই আন্দোলনের কিছু প্রবণতা, যেমন আবেগের আতিশয্য বা সামাজিক প্রশ্নকে পিছিয়ে দেওয়ার ঝোঁক, তাঁকে অস্বস্তিতে ফেলত বলে মনে হয়। আমার পাঠে ‘পথের দাবী’ ও ‘শেষ প্রশ্ন’ দুটি উপন্যাসেই এই অস্বস্তির ছাপ আছে। সব্যসাচীর কঠোর বাস্তববাদ আর কমলের নির্মোহ যুক্তি, দুটোই যেন সমকালীন আন্দোলনের ভাবালুতার বিরুদ্ধে একটা স্বাস্থ্যকর প্রতিষেধক।

এখানে আরেকটা সূক্ষ্ম বিষয় আছে, যেটা অনেক সময় চোখ এড়িয়ে যায়। শরৎচন্দ্রের রাজনীতি কোনো একটি দলের সীমানায় বাঁধা পড়েনি। তিনি কংগ্রেস-ঘনিষ্ঠ ছিলেন, আবার বিপ্লবীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, আবার সমাজতান্ত্রিক চিন্তার সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন, ‘বিপ্রদাস’-এর শ্রেণিসংগ্রামের আভাসে যার ছায়া দেখা যায়। এই বহুমুখিতাকে অনেক সময় দ্বিধা বলে পড়া হয়েছে। আমার ধারণা, এটা তাঁর সময়ের বাঙালি বুদ্ধিজীবীর স্বাভাবিক অবস্থান। ১৯২০-এর দশক থেকে ১৯৩০-এর দশকের মধ্যে বাংলার রাজনীতিতে গান্ধীবাদ, সশস্ত্র বিপ্লববাদ, কমিউনিস্ট চিন্তা, সব একসঙ্গে বইছিল। কোনো সংবেদনশীল লেখকের পক্ষে একটিকে সম্পূর্ণ আঁকড়ে ধরা এবং বাকিগুলিকে সম্পূর্ণ বাতিল করা সহজ ছিল না। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে এই সব স্রোত আলাদা আলাদা চরিত্রের মুখ দিয়ে কথা বলে, আর সেটাই তাঁর কথাসাহিত্যকে একটি ঐতিহাসিক দলিল হিসেবেও মূল্যবান করে তুলেছে।

সাধন চট্টোপাধ্যায়ের ‘পক্ষ বিপক্ষ’ (১৯৮৮) এখানে একটি আকর্ষণীয় তুলনার জায়গা, কারণ এই উপন্যাসের গবেষণা-আলোচনায় ‘পল্লীসমাজ’-এর প্রসঙ্গ সরাসরি এসেছে। ১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় আসে, আর ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ও ভূমি-সংস্কারের মাধ্যমে গ্রামবাংলার পুরনো কাঠামো ভাঙার চেষ্টা শুরু হয়। ‘পক্ষ বিপক্ষ’ এই সময়ের গল্প, কালনা ২ নম্বর ব্লকের যুগবেড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের বোর্ড মিটিং থেকে যার শুরু। সেখানে গোকুল ভাঙ্গি, প্রয়াত গগন ভাঙ্গির ছেলে, নিজের দলেরই পঞ্চায়েত প্রধান বাদল কর্মকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব। শিক্ষিকা দুলালীর সঙ্গে তার সম্পর্ক, জমিদারি-পরবর্তী মণ্ডল পরিবারের জমি-বিবাদ, ভাগচাষির অধিকার, সবই এই পঞ্চায়েতি রাজনীতির ভেতর দিয়ে বাঁক নেয়।

শরৎচন্দ্র আর সাধন চট্টোপাধ্যায়ের গ্রাম-রাজনীতিকে পাশাপাশি রাখলে একটা চমকপ্রদ বিপরীত সম্পর্ক ধরা পড়ে। ‘পল্লীসমাজ’-এ রমেশ একা, সংগঠনহীন এক সংস্কারক, যার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সমাজের জড়তা আর কয়েকজন স্বার্থান্বেষী জ্ঞাতি। ‘পক্ষ বিপক্ষ’-এ গোকুল একা নয়, সে একটি রাজনৈতিক দলের সদস্য, একটি ক্ষেতমজুর সংগঠনের ব্যক্তিত্ব, আর তার প্রতিপক্ষও বাইরের কেউ নয়, নিজের দলের ভেতরের লোক। অর্থাৎ শরৎচন্দ্রের সময়ে গ্রামের ক্ষমতা ছিল জমিদারি-ব্রাহ্মণ্য কাঠামোয়, আর সাধনের সময়ে ক্ষমতা সরে গেছে দলীয় সংগঠনের ভেতরে। জমিদারের জায়গায় এসেছে পঞ্চায়েত প্রধান, বেণী ঘোষালের জায়গায় ‘লবি’, কাটমানি আর উপদল। ক্ষমতার কাঠামো বদলেছে, কিন্তু ব্যক্তির অসহায়তা বদলায়নি। গোকুলও রমেশের মতো দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের ব্যক্তিজীবনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার সম্পর্কে মিথ্যা কলঙ্ক রটানো হয়।

কিন্তু একটা গুরুত্বপূর্ণ তফাত আছে, যেটা আমার কাছে এই তুলনার সবচেয়ে মূল্যবান ফল। শরৎচন্দ্রের রমেশ শেষ পর্যন্ত গ্রাম ছেড়ে চলে যায়, কারণ সমাজ তাকে গ্রহণ করে না। সাধনের গোকুল টিকে থাকে, কারণ তার পেছনে ক্ষেতমজুর সংগঠনের ভিত্তি রয়েছে। এই পরিবর্তন সামান্য নয়। এটা দেখায়, বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যক্তিগত নৈতিক সাহস থেকে সাংগঠনিক শক্তির দিকে সরে এসেছে। অথচ সাধনের উপন্যাস এটাও জানে যে সংগঠনও দুর্নীতিগ্রস্ত হতে পারে। দুলালীর মতো শিক্ষিকা, যে বেতন পায় না, সহকর্মীদের কাছে একঘরে হয়, আর প্রেম ও নীতির দ্বন্দ্বে দুলতে থাকে, সে আসলে রমার উত্তরসূরি। রমার সামনে ছিল সামাজিক নিন্দার ভয়, দুলালীর সামনে দলীয় ক্ষমতাকেন্দ্র। আমার কাছে মনে হয়, সাধনের এই উপন্যাস ‘পল্লীসমাজ’-এর একটি অনুচ্চারিত উত্তর, আর সেই উত্তরের সূত্র আসলে শরৎচন্দ্রেরই হাতে বোনা।

জয়দেব ব্যানার্জীর প্রবন্ধে একটি মন্তব্য আছে, যা শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক উপন্যাসের পাঠ-ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তিনি লিখেছেন, বিশ শতকের ষাট-সত্তর দশকের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক কালচিত্র বাঙালি জাতিসত্তার আত্মানুসন্ধানের চিত্র, আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের জীবনধারা যে রাজনীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, সেই রাজনীতির প্রতিফলন এ সময়ের সাহিত্যে এসেছে। এই বক্তব্যের মধ্যে একটা ধারণা আছে, যা শরৎচন্দ্রের উপন্যাসেও ছিল: রাজনীতি মানুষের জীবনধারার ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি শক্তি, যার থেকে সরে থাকার কোনো উপায় নেই। প্রবন্ধকারের মতে, গান্ধীজির নেতৃত্বে সারা ভারতবর্ষ যখন রাজনৈতিক মননভাবনায় যুক্ত হয়ে পড়ল, তখন বাংলা উপন্যাসে নগরজীবনে এই রাজনীতির উত্তাপ তুলে ধরতে ঔপন্যাসিকেরা সচেষ্ট হলেন, এবং এই প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্রের ‘পথের দাবী’ (১৯২৬) উপন্যাসটির উল্লেখ করা যায়। আমি এই অবস্থানকে সমর্থন করি, তবে একটু যোগ করতে চাই। ‘পথের দাবী’-কে কেবল নগর-রাজনীতির উপন্যাস বললে পুরোটা বলা হয় না, কারণ এর পটভূমি সাম্রাজ্যের প্রান্তবর্তী প্রবাসী সমাজ, আর এর ভাষা ও সংগঠন নগরের চেয়ে অনেক বেশি আড়ালের।

আরেকটি বিষয় তুলনার জন্য প্রাসঙ্গিক। জয়দেব ব্যানার্জী যে বলেছেন, ‘সাহিত্যের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কের গভীরতা অস্বীকার করা যায় না’, সামাজিক জীবনে বসবাস করে রাষ্ট্রের অধীনে জীবন চালিয়ে সাহিত্যিকেরা রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এড়িয়ে যেতে পারেন না, শরৎচন্দ্রের জীবন ও রচনা এই বক্তব্যের এক প্রামাণ্য উদাহরণ। তিনি রাজনীতিকে এড়াতে চাননি, আবার রাজনীতির কাছে নিজের সাহিত্যকে সম্পূর্ণ সমর্পণও করেননি। এই মাঝামাঝি অবস্থানই, আমার মতে, তাঁর রাজনৈতিক উপন্যাসগুলির দীর্ঘস্থায়ী আবেদনের উৎস।

শেষ করার আগে এই প্রসঙ্গে একটি তুলনা না টানলে অসম্পূর্ণ থাকে, সেটা হল সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ (১৯৪৫) আর পরবর্তী লেখকদের সঙ্গে সম্পর্ক। জয়দেব ব্যানার্জীর তালিকায় মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘প্রতিবিম্ব’, সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’, গোপাল হালদারের ‘অন্যদিন’ নামগুলি এসেছে। এই লেখকেরা শরৎচন্দ্রের পরের প্রজন্ম। তাঁরা শরৎচন্দ্রের মতো আবেগ-উচ্ছ্বসিত নন, অনেক বেশি সংযত, অনেক বেশি তত্ত্বসচেতন। কিন্তু তাঁদের উপন্যাসে রাজনৈতিক আবর্তে আটকে পড়া মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযন্ত্রণা লিপিবদ্ধ হয়েছে, আর সেই বিষয়ের প্রথম বড় পাঠ শরৎচন্দ্র দিয়েছিলেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় যে শরৎচন্দ্রের প্রতি ঋণ স্বীকার করেছেন, আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর শ্রদ্ধার্ঘ্য শরৎচন্দ্রের প্রতি নিবেদন করেছেন, সেটা কেবল সৌজন্য নয়। মানিক যেমন লিখেছেন, ‘চরিত্রহীন’ তাঁকে অভিভূত ও বিচলিত করেছিল, আর বাংলা সাহিত্যের কত দৃঢ়মূল সংস্কার যে এই উপন্যাসে চুরমার হয়ে গিয়েছিল, সে কথা তিনি মনে রেখেছিলেন। এই স্বীকৃতিতে একজন পরবর্তী ঔপন্যাসিকের রাজনৈতিক-সামাজিক ঋণের কথা আছে।

এতক্ষণ যা বলেছি, তাতে হয়তো শরৎচন্দ্রের রাজনীতিকে একটু বেশি সুসংহত করে দেখানো হয়ে গেল। সততার খাতিরে কয়েকটি সীমাবদ্ধতার কথা আলাদা করে মেনে নেওয়া দরকার। প্রথমত, শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক চিন্তা কখনও পূর্ণাঙ্গ মতাদর্শ হয়ে ওঠেনি। তিনি ‘পথের দাবী’-তে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে জোরালো ভাষা দিয়েছেন, ‘শেষ প্রশ্ন’-এ প্রচলিত সংস্কারকে ভেঙেছেন, ‘বিপ্রদাস’-এ আবার ঐতিহ্যের প্রতি এক ধরনের মমতাও দেখিয়েছেন। এই ওঠানামাকে কেউ বলবেন অস্থিরতা, কেউ বলবেন সততা। আমার ঝোঁক দ্বিতীয় ব্যাখ্যার দিকে। যে লেখক সব প্রশ্নের একটাই উত্তর জানেন, তাঁর রচনা সাধারণত প্রচারে পরিণত হয়, আর শরৎচন্দ্রের রচনা তা হয়নি, তার একটা বড় কারণ তাঁর এই অনিশ্চয়তা।

দ্বিতীয়ত, শরৎচন্দ্রের পাঠক-সমাজ মূলত মধ্যবিত্ত শিক্ষিত বাঙালি, আর তাঁর উপন্যাসের রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণও সেই শ্রেণির। গ্রামের কৃষক, শহরের শ্রমিক বা প্রান্তিক জাতির মানুষ তাঁর উপন্যাসে এসেছেন, কিন্তু প্রায়ই সহানুভূতির পাত্র হিসেবে, সক্রিয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নয়। এই সীমাবদ্ধতা ‘পথের দাবী’-তে যেমন স্পষ্ট, ‘মহেশ’-এও তেমনি। গফুর কাঁদে, প্রতিবাদ করে, কিন্তু তার প্রতিবাদ ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্ন। কৃষক-সংগঠন, তেভাগার ভাবনা বা শ্রমিক-ইউনিয়নের সংগঠিত রাজনীতি শরৎচন্দ্রের সময়ে বাংলায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠছিল, কিন্তু তাঁর উপন্যাসে তার ছাপ পড়েছে সামান্যই। ‘বিপ্রদাস’-এ কৃষক-সভার একটু আভাস আছে, সেটাই ব্যতিক্রম।

তৃতীয়ত, একটা প্রশ্ন আমাকে সবসময় অস্বস্তিতে রাখে। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে ব্যক্তিগত ত্যাগ, আত্মোৎসর্গ আর বেদনাকে যে অসাধারণ মহিমা দেওয়া হয়েছে, তা কি রাজনৈতিক পরিবর্তনের বিকল্প কল্পনাকে কিছুটা দুর্বল করে দেয় না? যে পাঠক সাবিত্রীর আত্মত্যাগে চোখের জল ফেলেন, তিনি কি সেই চোখের জলের বদলে সমাজ বদলানোর কথা ভাবেন? এই প্রশ্নটা শরৎচন্দ্রের একার নয়, বহু করুণ রসের লেখকেরই। সমালোচকেরা একসময় বলতেন, শরৎচন্দ্র পাঠককে কাঁদান, কিন্তু ভাবান না। আমি এই অভিযোগকে পুরোপুরি মানি না, কারণ ‘শেষ প্রশ্ন’ বা ‘পথের দাবী’ পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে। কিন্তু অভিযোগটাকে সম্পূর্ণ উড়িয়েও দিই না, কারণ তাঁর কয়েকটি উপন্যাসে করুণরস রাজনৈতিক ক্ষোভের জায়গা নিয়ে নিয়েছে।

এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও আমার মনে হয়, শরৎচন্দ্রের রাজনীতির মূল শক্তি অন্য জায়গায়। তিনি রাজনীতিকে আমাদের চোখের সামনে এনে দিয়েছেন মানুষের গায়ে-গতরে, সম্পর্কে, আচরণে, ভাষায়। যে সমাজ নিজেকে অরাজনৈতিক বলে ভাবে, তাকে তিনি দেখিয়েছেন, তোমার প্রতিটি রীতি, প্রতিটি নিষেধ, প্রতিটি ‘সতী-অসতী’ বিভাগের ভেতরে ক্ষমতার একটা হিসাব লুকিয়ে আছে। এটাকে আমি বলব রাজনীতির ‘নিম্নস্বর’ রূপ, কোনো ঘোষণাপত্র নেই, কিন্তু পাঠকের চেতনায় তার প্রভাব স্থায়ী।

গবেষণার কাজে একটা সময় এসে আমার একটা বিশ্বাস কিছুটা বদলেছে। শুরুতে আমি ভাবতাম, ‘পথের দাবী’ই শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক উপন্যাসের চূড়া, আর বাকিগুলো তার সামাজিক বা পারিবারিক প্রেক্ষাপট। এখন আমার মনে হয় হিসেবটা উল্টো। ‘পথের দাবী’ আসলে শরৎচন্দ্রের রাজনীতির সবচেয়ে বাইরের, সবচেয়ে ঘোষিত অংশ, আর তার গভীরতর কাজ ‘পল্লীসমাজ’, ‘চরিত্রহীন’, ‘বামুনের মেয়ে’ বা ‘শেষ প্রশ্ন’-এর মতো উপন্যাসে। ব্রিটিশ সরকারের বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্ত আমাদের এই ধারণাকে আরও জোরালো করেছে। তারা যে বইটিকে ‘বিপজ্জনক’ মনে করল, সেটা আসলে শরৎচন্দ্রের রাজনীতিরসবচেয়ে সহজে বোঝা যায় এমন অংশ, কিন্তু যে বইগুলো তারা নিষিদ্ধ করেনি, সেগুলোই হয়তো সমাজের ভেতরে ধীরে ধীরে বেশি কাজ করেছে।

শেষ কথা হিসেবে আমি বলতে চাই, শরৎচন্দ্রকে ‘রাজনৈতিক লেখক’ আর ‘সামাজিক লেখক’-এর মধ্যে ভাগ করার প্রয়োজন নেই। ঔপনিবেশিক বাংলায় সমাজ আর রাজনীতি এতটাই জড়ানো ছিল যে একটিকে ছেড়ে অন্যটিকে লেখা সম্ভবই ছিল না। শরৎচন্দ্র সেই সত্যটা সবচেয়ে সহজ ভাষায়, সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় ভঙ্গিতে আমাদের শুনিয়েছেন। তাঁর উপন্যাসে ক্ষমতা কখনও জমিদারের চেহারায় আসে, কখনও সমাজপতির, কখনও ঔপনিবেশিক পুলিশের, আবার কখনও আচারের। আর প্রতিরোধ আসে কখনও গফুরের হাহাকারে, কখনও কমলের যুক্তিতে, কখনও সব্যসাচীর অস্ত্রে, কখনও রমার নীরবতায়। এই বহুমাত্রিকতাই শরৎচন্দ্রের রাজনৈতিক উপন্যাসকে এক শতাব্দী পরেও জীবন্ত রেখেছে। সাধন চট্টোপাধ্যায়ের পঞ্চায়েত-রাজনীতি থেকে শুরু করে সত্তরের দশকের নাগরিক বিদ্রোহ পর্যন্ত পরবর্তী বাংলা উপন্যাস যে প্রশ্নগুলো নিয়ে আজও ঘুরপাক খায়, ক্ষমতা কার হাতে, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর কোথায়, ব্যক্তিগত সততার দাম কত, সেই প্রশ্নগুলোর প্রথম বড় সূত্র আমরা শরৎচন্দ্রের উপন্যাসেই খুঁজে পাই।

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন