কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

মধুশ্রী সেন সান্যাল

 

কবিতার কালিমাটি ১৬২

 

ম্যাগনোলিয়া সূর্যাস্ত কথা

এই সেই সোনালি বিকেল

যেখানে সূর্যাস্ত নেমে আসে ধীর পায়ে,

ছায়াঘেরা বিস্মৃত জন্মের মেঘ-মেঘ পথ

পাহাড়ি রাস্তায় ছোঁয় নিঃসীম বিস্তার

 

নেতারহাটের মাটির রং আরও

গাঢ় হয় বিকেলের মায়াময় রোদে

হাওয়ায় শালের শুকনো পাতা উড়ে-উড়ে

খোলে যেন পুরনো ডায়রির কোনো ছেঁড়াপাতা-

 

বাঁশির মদির সুরে ছিল এক অলৌকিক টান

এলোমেলো করে দিত দিনলিপি যত,

ম্যাগনোলিয়া, বিদেশিনী, সাহেবের মেয়ে

সব ফেলে ছুটে আসে... সুরের শেকড় খোঁজে,

দেখায় বিহ্বল ঝরাপাতা সেই চেনাপথ-

যেখানে রাখাল আদিবাসী ছেলে

পাহাড়ে জঙ্গলে বোনে বাঁশির মূর্চ্ছনা-জাদু

 

মুগ্ধতা গাঢ় করে সুরের অমোঘ মোহ,

কিশোরী মেয়েটি যেন সমর্পণে ভিজে

মেঘে-মেঘে লেগে থাকা চাঁদের মতন

ভেসে যায় কুঞ্জের মোহন সুরে -

 

হঠাৎ ভীষণ ঝড়, মেঘের ভ্রুকুটি

অনাবিল প্রকৃতিতে অদম্য-দূষণ ধোঁয়া

সাহেব বাড়ির উষ্ণ গনগনে ফায়ার-প্লেস

নিমেষে নির্মূল করে বাঁশির স্বপ্নিল সুর-

 

ভালোবাসা অসহায় হলে ক্রমশ উন্মত্ত হয়

খুঁজে চলে অবিরত কৃষ্ণের বৈভব বাঁশি,

না পেয়ে কোথাও, সেই অশ্বারোহী রাধা

হাহাকার গায়ে মেখে ঝাঁপ দেয়

পাহাড়ের অতল গভীর খাদে...

সূর্যাস্ত যন্ত্রণা ঢাকে মেঘের চাদর মুড়ে-

 

ম্যাগনোলিয়া সানসেট পয়েন্ট, পর্যটক আজও

শোনে এক অনন্ত প্রেমের গান, বাঁশির করুণ সুরে

 

ম্যাকলাস্কিগঞ্জ

ওখানে থাকেন কারা?

ভুলে যাওয়া কিছু নাম সাহেবি কটেজে!

ওই শাল বনের ভেতর দিয়ে চলে গেছে

পুরনো রাস্তাটা আরও গভীর অতীতে...

 

ঢালু ঢালু ছাদের বাংলোর জানলাগুলি

বন্ধ বহুকাল ধরে,

তার কাঁচে মুখ রেখে পর্যটন তবু দ্যাখে

ইংরেজি বিকেল আটকে আছে -

দিনান্তের রোদ এসে বসে

বারান্দার জংধরা চেয়ারে

গোলাপের বুনো ঝোপ, বোগেনভিলিয়া, শুকনো ফোয়ারা,

দেওয়ালে- টালিতে লেগে থাকা শ্যাওলা

শোনায় পুরনো গল্প-কথা...

 

কলকাতা নগর থেকে

আর্নেস্ট ম্যাকলাস্কি এসে রাঁচির অদূরে

কিনে দশ হাজার একর জমি সবুজের সমারোহে,

গড়েছেন তিলে তিলে স্বপ্নের মুলুক

এক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান আলোর বসতি -

এল দূর-দূরান্ত থেকে নানা পেশা একে-একে

নিরাপদ নিশ্চিত আশ্রয়ে...

 

ধীরে ধীরে সেজে ওঠে স্কুল, ক্লাব, সুগন্ধি বেকারি,

ডাকঘর, দোকান আর চার্চের পবিত্র ঘণ্টাধ্বনি-

দেদার আলোয় ভাসে ক্রিসমাসের রাত

ক্যারলের সুর, নাচ ও কেকের ওমে, কিংবা

আতসবাজির কারসাজি নিয়ে যেন

জেগে ওঠে এক ‘মিনি ইংল্যান্ড’ দুনিয়া –

 

এদিকে স্বাধীন হল দেশ,

নতুন ঠিকানা ক্রমে পাড়ি দেয় পৃথিবীর নানান প্রান্তরে...

পুরনো মুলুক পড়ে থাকে একা

স্মৃতির কুয়াশা মেখে প্রাচীন আসবাবে-

সময়ের ধুলো তবু খুঁড়ে চলে

উত্তরসূরীর কিছু ঐতিহ্য গরিমা...

ডেগাডেগি নদী, সর্ব ধর্মস্থল আর

নাকটা পাহাড়ের উপকথা তাই

মেলে ধরে মায়াবী বিন্যাস এক,

যেখানে সূর্যাস্ত নামে পাহাড়ের

চেনা কোল ঘেঁষে, কিটি মেমসাহেবের বাড়িতে...

 

বাংলাভাষা

উশ্রীর পাথর ঘিরে

ছিল কত যে জোৎস্নার স্বপ্ন বর্ণমালা,

শাল আর ইউকেলিপটাসের গাছে ঢাকা

বড়ো বড়ো বাংলোয় ছড়ানো-

অন্তরীক্ষে জ্বলে উঠত আলো

প্রখর নক্ষত্র সমাবেশে...

শব্দে-শব্দে শুধুই বঙ্গের টেরাকোটা

প্রতিটি নিঃশ্বাসে-

বাংলার ঐতিহ্য-মোহ ঢেকেছিল

নদী, গাছ, মাটি আর টিলা...

ইতিহাস এখন সেসব

দখল হয়েছে স্থান, কাল, ভাষা

সবই ক্ষয়ে গেছে সময়ের ভিড়ে

 

এদিকে হাঁকডাক করে এসে যায়

স্থানীয় অক্ষর মেঘ,

ঢেলে দেয় দম্ভের প্রবল ঝঞ্ঝা-

ঢুকে পড়ি একান্ত নিজের ঘরে

যেখানে অভাবী মন,

জেগে ওঠা উচ্চারণে

শহরের অলিগলি খুঁড়ে

খোঁজে মাতৃভাষার সুশ্রূষা...

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন