কালিমাটি অনলাইন

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

চতুর্দশ বর্ষ / অষ্টম সংখ্যা / ১৪৭

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬

সমরেন্দ্র বিশ্বাস

 

সমকালীন ছোটগল্প

 

সংযুক্তাকে, একটা চিঠি

‘Love may be defined as any activity which finds its end and value in maintenance and increase of value in another mind’

মনে করে নাও, একটা ছেলে পথ হাঁটছিল। একদিকে যৌবনের উন্মত্ততা, অন্যদিকে তার স্থিতি। মাঝখানে একটা ব্রীজ। ছোট্ট লোহার ব্রীজটাকে কাঁপিয়ে ভয়াবহ শব্দে ছুটে গেলো ট্রেনটা – একটুও স্পীডটা কম করলো না। চারধার কাঁপিয়ে দিয়ে মিলিয়ে গেল দৃশ্যটা!

তখনই ছেলেটার মনে পড়লো, এই ট্রেনটাতেই তো তার যাবার কথা ছিল। একটা হতাশা বাতাসে ছড়িয়ে দিল অন্ধ কুয়াশা। চারধার বোবা, স্পন্দনহীন, চেতনাহীন!

কথা ছিল তোমাকে ভালোবাসার। কথা ছিল একটা চেতনাতে আরো কিছু চেতনা যোগ করে আগুন জ্বালাবার। একই ফেস্টুনের দুপ্রান্ত দুজনে ধরে জীবনের মিছিলে পথ হাঁটবার। এম্নি ছিল আরো অনেক অনেক কথা!

সংযুক্তা, কেন আজ এসব লিখতে বসেছি, জানি না। কেন এতদিন লিখিনি, জানি না! তুমি তো জানো, সাইক্লোন যখন আসে, তখন সে আসে তার উন্মত্ততা নিয়ে। আসে তার ভয়াবহতা নিয়ে। কেন আসে, তা কি সে জানে? সে জানে শুধু নিজের যন্ত্রণা, সে চেনে শুধু ভেতরে তৈরী হওয়া ঘূর্ণাবর্ত!

এখন তুমি আমার কাছে নেই। তাই তোমার মুখোমুখি হওয়াটা আমার কাছে অনেক সহজ। তোমাকে ঘিরে আমার অনেক না-বলা প্রশ্ন। তোমাকে দেখেছি অনেকদিন। তোমার জীবন্ত সত্ত্বাকে আমি গোপনে, তোমার অজান্তেই, বারবার পোষ্টমর্টেম করেছি।

আমার জীবনটা তো ছন্নছাড়া। তার বিপরীতমুখী তুমি একটা সমান্তরাল জীবন। জীবনের বন্ধনহীন ব্যাপ্তি বা রূপ, তার কোনোটাই দেখনি তুমি। অথবা ইচ্ছে করেই দেখতে চাওনি। কেন, কেন জীবনটাকে তুমি এম্নিভাবে চকের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখতে চেয়েছো?

এখন সন্ধ্যা। হয়তো তুমি টিভি খুলে বসেছো। অথবা কোন বান্ধবীর সাথে চায়ের পেয়ালাতে আড্ডার তুফান তুলছো। অথচ খবর রাখোনি, তোমাদের ফ্লাটের বাইরে যে দুনিয়াটা, সেখানে বেজায় ঠান্ডা। বরফের মতো ঠান্ডা সময় কুঁকড়ে দিচ্ছে জীবনকে। এই অসময়ে মানুষেরা অসহায় ঠকঠক কাঁপছে। এই কাঁপুনির চোটেই একদিন ভূমিকম্প হবে। বেরিয়ে আসবে ভূগর্ভস্থ লাভা। দিকে দিকে দাউদাউ আগুন।

সংযুক্তা, অস্বীকার করবো না তোমার উপস্থিতি আমাকে মুগ্ধ করে। তুমি কিছু ভুল বললে, আমি তার প্রতিবাদ করি! তুমি প্রায়ই নীরব থাকো। আমার সামনাসামনি তোমার এই চুপ-থাকাটাই আমাকে অসহিষ্ণু করে। যেন তুমি একজন নীরব দার্শনিক। অথচ আমি চেয়েছি, তুমি আমার সাথে তর্ক করো। আমি জীবনকে দেখতে চেয়েছি বাঙ্ময়। তুমি কি কোনোদিন সোজাসাপ্টা মারকাটারি বিশ্লেষণ করতে চাওনি, তোমার চারপাশটাকে। তোমার চুপচাপ থাকার এই অভ্যেসটি আমার অসহ্য লাগে। নিপাত যাক তোমার এই নীরব দার্শনিকতা!

এই জীবনে কী চাই? তা সব সময়ে আমরা হয়তো বুঝে উঠতে পারি না। মনে পড়ে, ভয়াবহ ট্রেনটার লোহার ব্রীজ পেরোনোর সে সব অস্থির দিনগুলোর কথা! যা কিনা আমার নিজস্ব। বুঝে উঠতে পারতাম না, ঠিক কী  করা উচিত। সে সব দিনগুলোতে আমিও জানতাম না – আমার কী চাই! হয়তো চাইতাম চিৎকার করতে করতে শহরের রাজপথ দিয়ে ছুটে যেতে। হয়তো চাইতাম, একটা রিভালবার কোমরে গুঁজে তরাই-এর কোন এক জঙ্গলে রাত কাটিয়ে দিতে। হয়তো চাইতাম, অজস্র মুখের মধ্যে খুঁজে নিতে আমার প্রিয়তম সঙ্গিনীকে। চাইতাম তোমার মতো কাউকে, বুকের মধ্যে জড়িয়ে, নিবিড় ভালোবাসতে।

সংযুক্তা, তোমার মনে পড়ে না আমার জীবনের সে সব উদভ্রান্ত দিনগুলোর কথা? ঝড়ো কাকের মতো  চেহারা। চোখে মুখে একটা বিধ্বস্ততা। মাঝে মধ্যেই হাজির হতাম তোমাদের বাড়িতে। আড্ডা দিতাম। বকবক করতাম। কখনো তোমার মা, কখনো তুমি, আমার সামনে এগিয়ে দিতে চায়ের কাপ আর টোস্ট বিস্কুট। খেতাম, বসতাম, তারপর পালিয়ে আসতাম কিছুক্ষণ পরে। ভালো লাগতো না কিচ্ছুই।

মাঝে মাঝেই মুখে উগরে দিতাম বুকের আগুন। তুমি চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে থাকতে। জানি না, ভাবতে কিনা আমি বাচাল! মাথাগরম! তুমি মাঝে মাঝে আমাকে দেখে হাসতে। মনে হতো, তোমার সেই হাসিতে মিশে আছে ঘৃণা আর উপহাস। সেই হাসিতে আমার মাথাটা পাগল পাগল করতো! আমি আরও আরও উদভ্রান্ত! আরও আরও আগুন! ভেতরে বাইরে আমি জ্বলতাম। তুমি কি বুঝতে না?

একটা রাস্তা চলে গেছে উত্তরের পার্বত্য এলাকাতে, অন্যটা মিশে গেছে দক্ষিণের সারি সারি তমাল ছায়ার স্নিগ্ধতায়। তার একটা পথ তোমার। আর অন্য পথটা আমিই নিজেই বেছে নিয়েছি। আমি ধরেই নিয়েছি, পৃথিবীর সব রাস্তা একই দিকে যায় না। এম্নি একটা হিসেব আমি আমি স্বতঃসিদ্ধ মেনে নিতে পারতাম, যদি না মাঝে মধ্যে আমাকে অবাক করে দিয়ে, তুমি আমার মনের চৌহদ্দিতে ঢুকে না পড়তে!

সেবার কলেজ অবরোধ করতে গিয়ে পুলিশের প্যাদানি খেয়ে আমি হাসপাতালে। দিন কয়েক পরে তুমি হাসপাতালে আমাকে দেখতে এলে, একাই। মাথায় করে নিয়ে এলে কিছুটা ঝড়। বললে – ‘ভালোই হয়েছে!’ কিছুক্ষণ আমার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তুমি ঝড়ের মতো বিদায় নিলে।

জীবনে কোনদিন আমি কনসোলেশন চাইনি। এমন কি আজও না। সেটা যে বড় ঘেন্নার মনে হয়। তবুও যে প্রশ্নের উত্তর আজও আমি পাইনি, কেন তুমি এম্নি করতে? সে কি একটা যুবকের জন্যে শুধুই অনুকম্পা? আমার ক্ষিপ্ত লাগামছাড়া ভবঘুরে মানসিকতাটার বিরুদ্ধে, জানি, ছিল তোমার ক্ষোভ। দারুন ঘেন্না! তবুও আমি খুঁজতে চেয়েছি, তোমার এই ঘৃণার উৎস? সংযুক্তা, তোমার এই ঘৃণার পেছনে কি লুকিয়ে ছিল একটা গোপন ভালোবাসা? সেই অদৃশ্য ভালোবাসার ম্লান আঁচকে আমি অনুভব না করে পারিনি। নিজস্ব ভালোবাসার বাগানে আমি ফোটাতে চেয়েছিলাম গোলাপ। নিজের বোধ দিয়ে, রক্ত দিয়ে! হয়তো পারিনি! আর এজন্যেই পালিয়ে এসেছি। ভীরুতা বা কাপুরুষতা নয়। হয়তো ক্ষোভে, নিজের প্রতি অভিমানে।

তোমাকে বোঝাতে চেয়েছিলাম, এই পৃথিবীতে আমাদের অনেক অনেক কাজ। আপাত ধ্বংসের মধ্যেই আমাদের জীবনের হিরন্ময় প্রস্তুতি! জানি না, এসব বুঝে বা না বুঝে তুমি সরে সরে গেছো কিনা! তবুও জীবনের প্রস্তুতি চলছে। মানুষের কাজ তো আর থেমে থাকতে পারে না। তা চলবে। হয়তো আমার ব্যক্তিগত জীবনে আমি অনুভব করবো শূন্যতা।

আমার এখনকার খবর? শুনে আর কিই বা করবে? এখন আমার এমন কোন খবর নেই, যা তোমাকে স্বস্তি দিতে পারে। উত্তরে আমাদের কমরেডরা ঘাটি গেড়েছে, এটা একটা আদিবাসী অধ্যুষিত বনাঞ্চল। আমরা এখান থেকেই নিচ্ছি সর্বাত্মক প্রস্তুতি। অন্যেরাও কাজ করছে তোমাদের শহরগুলোতে। গ্রাম থেকে এগিয়ে যাবো শহরে। আমরা লড়ে যাচ্ছি একটা খাঁটি সূর্যের জন্যে। আমাদের সংগ্রাম একটা খাঁটি দুনিয়ার জন্যে। সেবা ভালোবাসা আর রক্তাক্ত লড়াইয়ের পথ ধরে আমরা এগিয়ে যেতে চাই। মাথার উপরে সূর্যটা চির সত্যের মতো আমাদের সাক্ষী। আমরা কি দেখতে চাইনি নতুন দিনের রোদ বৃষ্টি? নির্মল পৃথিবীর আলো?

এই লড়াইতে আমি তোমাকে, আমার প্রিয়তম বান্ধবীকে পাশে পাইনি। জানি, তাকেও একদিন রাস্তায় নামতে হবে। কোন একটা দিন সে যেন একটা ঝান্ডা নিয়ে ঘুরে যায়, এই উত্তরের জেলাগুলো। বিশ্বাস করো, বা নাই করো, মিছিলে-মিছিলে, লড়াই-এর মাঠে মাঠে আমি যে মুখ আজও খুঁজে বেড়াই, তা তোমারই মুখ।  তোমাকে নিয়ে যে স্বপ্ন, তা আজও ভুলতে পারিনি।

সংযুক্তা, জীবনে অনেক কিছুই হয় না। অনেক কিছুর মধ্যে কম্প্রোমাইজ করতে হয়। সবই বুঝি। কিন্তু ভালোবাসা খুবই অবিবেচক! সে তার পৃথিবীকে খোঁজে নিজস্ব স্বপ্নের আদলে। দেখতে চায় নিজস্ব প্রতিবিম্ব, প্রিয়তমা নারীর বুকের আর্শিতে! এখানেই হয়তো ব্যক্তি মানুষের ভালোবাসার পূর্ণতা বা অপূর্ণতা! কল্পিত পূর্ণতা বা অপূর্ণতাকে আমি স্বপ্নে, দিন-মানে ভেবে ভেবে পাগল হয়েছি। আমার যন্ত্রণাময় দিনগুলোতে শিকার হয়েছি মানসিক নিঃসঙ্গতার।

এই চিঠি লিখতে গিয়ে আমার বর্তমান সময়কে আমি অনেক পিছিয়ে নিয়ে এসেছি। যে কথাগুলো মুখোমুখি তোমাকে আমি বোঝাতে পারিনি, তা এই নিঃসঙ্গ মুহূর্তে কেমন গলগল বেড়িয়ে আসছে।

ওই দিকে গোলাগুলির আওয়াজ। বাতাসে বারুদের গন্ধ। আমার হাতে এখন বেশি সময় নেই। তাড়াতাড়ি এ চিঠি লেখা শেষ করতে হবে। পারলে পরে তুমি আমার মাকে তার ছেলেটার সংবাদ দিও। বোলো, সে ভালো আছে। তার তো আরও ছেলেরা আছে। তাদের নিয়ে সে যেন সুখী থাকে।

মনে আছে, সেই শেষ ডিসেম্বরে। তুমি চেয়েছিলে আমার একটা ফটোগ্রাফ। বলেছিলাম, দেবো। আর দেয়া হয়নি। কি হবে বলো একটা ফটো দিয়ে? যে জীবন আমাদের দুজনের পথকে দূরত্ব দিয়ে বেঁধে দিয়েছে, সেই জীবনে দূরত্বের মধ্যেই ভালোবাসাকে খুঁজো।

অনুরোধ, তুমি যখন তখন তোমার কাল্পনিক উপস্থিতি হাজির করিও না আমার মনের দরজায়। আমি যে তোমার কথা ভাবলে আজও বিবশ! পাগল পাগল হয়ে যাই! প্লীজ তোমার অশরীরি আত্মাকে হাজির করিও না আমার বুকের ভেজা ভেজা ডায়াফ্রামে, রক্তাক্ত পর্দার স্ক্রিনে!

সংযুক্তা, মনে রেখো, অন্ধকার যুগের শেষে সুন্দর একটা দিনে, যে দুটো হাত তোমাকে নিবিড় আলিঙ্গন করে নেবে, তা আমারই।  ভাল থেকো।

ইতি – তোমার অরণ্যদা, ৮ই আগষ্ট ১৯৭৪

 

 

 

 

0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন