বর্ণমালার সাতকাহন
(পর্ব ৪৩)
জীবনের আনন্দঘন মুহূর্তগুলো খুব তাড়াতাড়ি নিঃশেষ হয়ে যায়। হয়ত মনের ভুল। একটা দীর্ঘ অখণ্ড সময় ধরে যখন একের পর এক সংগ্রাম করে চলেছি নিজের সঙ্গে, বেঁচে থাকার জন্য, আর্থিক অনটনের সঙ্গে নিকটতমের প্রতারণার সঙ্গে এবং এই পুরুষ তান্ত্রিক সমাজের সঙ্গে একটা অখণ্ড বর্ণমালার মতো ছায়া ফেলেছে একাকীত্ব। একেকটা সময় একেকটা লড়াই। নীরব নিঃশব্দ অদৃশ্য লড়াই। বন্ধুহীন আধো অন্ধকার কুয়াশাচ্ছন্ন পথে চলতে চলতে মনেই হতে পারে জীবনের সমস্ত দূঃখই নিজের ডেকে আনা। নিজের দোষে যাবতীয় কষ্ট ভোগ। যে দীর্ঘ দিন ধরে একা একটা ধূসর মরুভূমির ভেতর দিয়ে হাঁটছে। সে শুধু দগ্ধ হচ্ছে তীব্র সূর্যের তাপে, ঘূর্ণির ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে মানুষ, মেয়েমানুষেরা খড়কুটো পেলেও আঁকড়ে ধরে।
আমার জীবনের দুঃখ আমারই ডেকে আনা। সবারই তাই হয়ত। সেই দুঃখের ভার বহন করা খুব সহজ নয়। যেখানে সমাজ মেয়েদের কাছে আজও শ্বাপদ শঙ্কুল এক জঙ্গল। শিয়ালের দল হায়নার দল ওঁত পেতে বসে আছে। তিলমাত্র অসাবধান হলেই খতম। পোষাকের আড়ালে সমাজের আসল রূপটা আজও এতোটাই কঙ্কালসার। কৈশোর আর যৌবনের চৌকাঠে যে দুর্ঘটনা ঘটে গেছে একবার তার জের আজীবন বইতে বইতে ক্লান্ত বর্ণমালার সাতকাহন কেবল উঁকি দিতে চায় মধুময় অতীত স্মৃতির ভেতর।
আমার বাবা। আমার প্রিয়তম পুরুষ। তাঁর কারণেই আমার বই পড়ার অভ্যাস। বইপোকা ছিলাম তখন। এবং তার পরেও। বই পড়া দেখে বড় হওয়া। বাবা যেমন যেমন বড় হচ্ছিলাম তেমন তেমন বই সাজেস্ট করতেন। মাকে জ্ঞান হওয়া ইস্তক দেখেছি ঘর ভর্তি বইএ ডুবে। একঢাল কোঁকড়া চুল খুলে বসে দেশ পত্রিকার পাতা উল্টোতে নিবিড়ভাবে। দিদিমাকে দেখেছি একান্নবর্তী পরিবার সামলে দুপুরে নবকল্লোল খবরের কাগজ শরৎ চন্দ্রয় ডুবে থাকতে। রোজ বিকেলে গোলপার্ক রামকৃষ্ণ মিশন যেতে।
মানুষের বেশিটাই নিজস্ব নয়। প্রারব্ধ। আমার মুখে মায়েরই গঠন। আমার স্বভাব তাঁদেরই স্বভাব। আমাদের চরিত্রের গুণ বা দোষ অনেকটাই রক্ত বাহিত।
বাবার সাজেশনেই ছোটোবেলায় পড়েছি মহাস্থবির জাতক। বনফুলের জঙ্গম। আরণ্যক। পাঁচ বছর বয়সে মা এনিড ব্লাইটনের ব্লু ড্রাগন কিনে এক পাতা করে পড়ার অভ্যাস করালেন। দশ বছর বয়স হতে রোজ বিকেলের খেলা থেকে বাড়ি ফিরে কথামৃত পড়া ছিল বাধ্যতামূলক। তাতে কী?
লেখা ও পড়া যদি শান্তি দিতে পারত পৃথিবীর ইতিহাসে এতো সাহিত্যিক আত্মহত্যার পথ বেছে নিতেন না যশ ও প্রতিষ্ঠা পাবার পরেও। নিকটতম মানুষটির অকৃতজ্ঞ আচরণ বন্ধুহীন জীবন অবসাদগ্রস্থ করে তোলে। তিতবিরক্ত লাগে সবকিছুই। মন মৃত্যুমুখী করে তুলেছিল একসময়। ব্যক্তি জীবনের বেদনা সম্পূর্ণ আলাদা। সমুদ্রের জলরাশির মতো জীবন উপচে পড়ে। জয় আর পরাজয়। সংকটের তটভূমিতে অন্তরাত্মা বলে ওঠে "পথিক তুমি কি পথ হারাইয়াছ। "
"A great literature is the mirror upon which the realities of life are reflected,blended with the sparks of truth and sincere interpretation of human quest for the perfection of soul as well asof knowledge of Absolute Truth" (Swine Burn)
বেকার জীবনসঙ্গী,নির্যাতন সন্তান পালন আর সমাজের চোখে হেয় হতে হতে বর্ণমালা শেষ হয়ে যায় এখনও আমার মত সহস্র নারীর জীবন দেশের কোণে কোণে। যারা ঘুরে দাঁড়ায় যারা রুখে দাঁড়ায় আলোর দিকে এই হিতাকাঙ্খী সমাজ আশ্চর্য জনকভাবে খুব খুশি হয় না। যতটা কেউ যন্ত্রণায় আছে দেখলে তারা স্বস্তি পায় আয়নায় নিজেকে দেখে সে অবশ্যই গোপন চিলেকোঠার অন্ধকার। সত্য অধিকাংশ সময়েই তিক্ত,নগ্ন। তাই ঢেকে রাখার প্রয়োজন পড়ে। মুখোশের ভিড়ে কটা মানুষের মুখই বা আর দেখা যায়।
আমার সঙ্গে সল্প কিছু বছর আলাপ এবং বন্ধুত্ব হয়েছিল বাংলা সাহিত্যের একজন অবাধ্য লেখকের। তাঁকে বিশেষ কেউ মনে রাখেনি আমরা গুটিকয়েক ছাড়া এবং বাংলা সাহিত্য নিজে ছাড়া। তাঁর নাম অজিত রায়। কিন্তু কী অকথ্য জীবন তিনি পেয়েছিলেন তাঁর নিকটতম মানুষদের থেকে। করুণ সেই মৃত্যু আত্মহত্যা নয়, খুনই বলা যায়। ‘শহর’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। আমরা কজন সেখানে বাংলা সাহিত্যের সনাতন পণ্ডিতদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বাধীন ভাষায় জীবনের নগ্ন ভাষায় লিখতাম। অজিত রায়ের অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাসের মধ্যে "যোজন ভাইরাস" অন্যতম। বাংলা সাহিত্যের ঘরে তিনি তেমন গ্রহণযোগ্য হতে পারেননি। ব্যক্তিগত জীবনেও। এসব হয়েই থাকে কী যেন বলে, বড় বড় শহরে এমন ছোটো ছোট...ইত্যাদি। অতএব হয়েছে। অজিতদার একমাত্র দোষ ছিল তিনি লিখতেন। তাঁর মৃত্যুর কারণ দারিদ্র্য, অপমান পারিবারিক নির্যাতন। তবে তিনি কিন্তু পুরুষ ছিলেন একথাও মনে রাখার। যাইহোক সেসব কথা, এসব লিখতে গিয়ে যেটা মনে হলো, বাঙালি একসময় টাকাপয়সার থেকে কালচারকে প্রাধান্য দিত। আর্থিক অবস্থা যাই হোক কালচারটা তারা মেনটেন করত। সেটা তাদের অহংকার ছিল। আর তাই কাউকে আনকালচার্ড বলা একটা অপমান করা ছিল এখন আনকালচার্ড বলতে গেলে গাঁ উজাড় হবে। কালচার মানে লোকসঙ্গীত থেকে ব্রাহ্মগীতি অতুল প্রসাদ রজনীকান্ত নজরুল। কালচার বলতে বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ মাইকেল। কালচারাল একটা ডায়াসপোরার ভেতর এই আমাদের বড় হওয়া পাতি মধ্য শ্রেণী থেকে উচ্চ শ্রেণী। বাঙালি ডাল ভাত খেত কিন্তু একটা কালচার তার থাকতেই হবে এমনটা ভাবনা ছিল।
রবিবাবু লিখেছিলেন শিক্ষা কমল হিরে আর তার বিচ্ছুরণ হলো কালচার। সেই কথা মানলে বলতে হয় আজ বাঙালি অশিক্ষিত এবং অর্ধশিক্ষিত। এখন শিক্ষা মানে কালচার নয় শিক্ষা মানে সহবত নয়।শিক্ষা অর্থোপার্জনের পথ। ওইটুকুই। লেখাপড়া করে যে গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে_ মোক্ষ।
বাঙালির একসময়ের এই কালচার ও প্রকৃত শিক্ষার প্রতি ঝুঁকে থাকার ভাবনা থেকেই তাদের ভেতর জন্মেছিল বামপন্থী আদর্শ প্রায় সবারই।আমাদের ।একজন শিক্ষিত মানুষ মাত্রেই বামপন্থী আদর্শ কেই সমর্থন করবে এমনটা ছিল। কিন্তু সেই সঙ্গেই, ছিল বেকার সমস্যা বন্ধ জুটমিলের গল্প আর ভিখারি পাসোয়ান অন্তর্ধান রহস্য। বিরোধীতা এবং তর্ক কে আমাদের ছোটোবেলায় বন্ধ করে দেয়ার চল ছিলো না। বিরোধীতা ছিল সুস্থতা। এখন সেই সুস্থতা নেই। বাঙালির এখন কালচারের থেকে অর্থ বেশি প্রিয়। যে চটুল নৃত্য ও হিন্দি সিনেমা আমার ছোটোবেলায় দেখা নিষিদ্ধ ছিল আজ নতুন প্রজন্মের মা বাপেরা শিশুদের সেই সব নাচ আত্মীয় সমাগমে নেচে দেখাতে উৎসাহ দেয় বিন্দুমাত্র লজ্জিত হয় না।
এই বিপুল জনতার একটা ভগ্নাংস শ্রেণী বাংলা কবিতা লেখে। লেখা প্যাসন নয় ফ্যাশন এখন। আনুষ্ঠানিকতাই এখন নির্জনতার শব্দ মালা যার নাম কবিতা। সে প্রসঙ্গ পরে।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন