![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি বাড়ি যায়...
ফর্সা হলে ঈষৎ লালচে গাল, ফোলা ও ঝোলা। ঢুলু ঢুলু চোখ, তার নিচে চর্বির চন্দ্রপুলি, মুখে আলগা হাসি। মধ্যপ্রদেশ যেন তিমি মাছের মাথা। তাছাড়াও শরীরের এখানে সেখানে মেদ মৌচাকের মত ঝুলে আছে। সন্তুলন একটু বেগড়ানো অর্থাৎ ভলভো বাস হটাত ব্রেক কষলে যেমন দুদিকে দোল খায় - তেমনি দুলছেন। পেঁচো মাতালের সঙ্গে এইখানেই ফারাক ভদ্র সুরা-সেবীর। তিনি নড়েন - কিন্তু নালায় পড়েন না। মোটামুটি উচ্চ / মধ্যবিত্ত মাতালের সর্ব জানিত চেহারাটি এমন হয়ে থাকে।
দুখিরামের সোমরস ... শুধু সোম ই কেন - মঙ্গল, বুধ বেস্পতি - কোনো রসেই অভিরুচি নেই। দু একবার 'প্রগতিশীল' হতে চেষ্টা করেছিল যৌবনে। কিন্তু স্বাদ গন্ধ - তা সে রাশিয়া / স্কটল্যান্ডের হোক বা গ্যাংটক / গোয়ার - তার বিলকুল পছন্দ হয়নি। বন্ধুরা সখেদে বলেছে 'মুর্খ বড়, সামাজিক নয়'। তা বলুক গে। গাঁয়ের ছেলের যাত্রা বদল ধাতে সয়নি। ফিরে গেছে বেশী করে দুধে সেদ্ধ আদি ও অকৃত্রিম সর পড়া চায়ের কাছে। কিন্তু সমস্যা হল - উপরোক্ত দু একটি শারীরিক চিহ্ন সে বহন করে। তাই ঘনিষ্ঠ বন্ধুমহল ছাড়া - তার সুরা পান না করার এই 'জাতে না উঠতে চাওয়া' স্বভাব - কেউ বিশ্বাস করে না। চাকরি পাবার পর থেকে তার মধ্যপ্রদেশে গোল হওয়া শুরু। বিশেষত পাণি পীড়নের পর সেই গোলমালের বৃদ্ধি - ভারতীয় মূল্য সূচকের মত বেড়েই চলেছে। মাঝে মধ্যে বৃদ্ধি একটু থমকে যায়, এক দু কদম পিছিয়ে দাঁড়ায়। মে মাসে যেমন মহার্ঘ্য ভাতা পিছু ফিরে দেখে মাঝে মধ্যে। তারপর আবার অক্টোবর থেকে বিকাশের পথে গড়ায় তার অগ্রগতির রথ।
চাকরি জীবনের প্রথম বছর দশেক কেউ সন্দেহজনক ভাবে টেরিয়ে তার ভুঁড়ি দেখলে - দুখিরাম দুখী হত। সপক্ষে কেস লড়ার একটা ক্ষীণ চেষ্টা করত। বিবাদীরা সঙ্গে সঙ্গে সহমর্মিতায় কলকণ্ঠ। মুক্ত কণ্ঠে জানাত 'আরে সে তোমাকে বলতে হবে না। তুমি আর মদ্যপান? রাম কহো। কত পুণ্যবান বাবার ছেলে। আমরা সব বুঝি'। তারপরে একটু তফাত গিয়েই জনান্তিকে মেহের আলির মত বলতো 'সব ঝুট হৈ। এক নম্বরের হত্তেল ঘুঘু। সিঙ্কিং সিঙ্কিং ড্রিঙ্কিং ...। আমার নজর কে ফাঁকি দেবে, ওই নেয়াপাতি ভুঁড়ি, লাল গাল - অ্যালকোহল ছাড়া হয়? আমরা বুঝি না? ভাবো একবার কোন বাবার ছেলে ... হরি হে'।
বহুকাল তাই সে চেষ্টা ছেড়েছে দুখিরাম। বরং কোন সদাশয় মহাশয় গেলাস বাড়ালে - রহস্যময় হাসি হেসে নিজের হাত পকেটে ভরে রাখে। যে যার মত মানে করে, আর চাপ দেয় না। তবে প্রত্যেক কালোতেই অল্প চমক থাকে। সাঁওতাল মেয়ের কান আলো করে যেমন থাকে ক্যামেলিয়া। এই চেহারার বাবদে অন্তত দু বার লাভ হয়েছে। না দুখিরামের নয় - অন্য কারুর। সে গল্প আজ বলা যাক।
প্রথম কাহিনী - দুখিরামের চাকরি জীবনের তখন ভোর। খুব জমিয়ে আছে কয়লা শহরে বন্ধু বান্ধব সহ। চাকরি জীবনের বন্ধুত্বে বয়স অন্তরায় হয় না, তরঙ্গ দৈর্ঘ্য মিললেই হল। তেমনি এক অফিসতুতো দাদা অফিস থেকে গাড়ি পেলেন। হাল্কা সবুজ রঙের অ্যাম্বাসাডার। (দুখিরামের সংস্থায় বিপণন সঙ্গী হলে এমন হতে পারে, পরবর্তী জীবনে দুখিরামেরও নসিব হয়েছে।) আশির দশকে অফিস থেকে গাড়ি পাওয়াটা তার অর্থমূল্যে ওজন হত না। সম্মান মূল্যে - সেটি কিনে আনা গাড়ির চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকত। গাড়ি পেয়েই সেই দাদা বললেন -
- 'শোন তোরা কয়েক দিন ছুটি ম্যানেজ কর। এই গাড়ি চালিয়ে আমি যাব হাজারীবাগে শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুর অভ্র কারখানার বড় সাহেব। তার ভালুকের মত গাড়িতে একবার হাত দিয়েছিলাম বলে চাকর ডেকে মুছেছিল, বলেছিল 'অফিসের গাড়ি তো'। এবার অফিসের দেওয়া আমার এই গাড়ি দাঁড় করাবো ওর পোর্টিকোতে আর দেখিয়ে দেখিয়ে হর্ন বাজাবো। তোরা সাক্ষী থাকবি'।
অবিবাহিত দুখিরামরা - তার মনোব্যথা বা হঠাৎ নবাবির ঝলক - কিছুই তেমন বুঝতে পারল না। কিন্তু ঘুরতে যাবার প্রসঙ্গে তারা এক পায়ে খাড়া। সুতরাং এক শীত সকালে ধানবাদ থেকে রওনা হল নতুন অ্যাম্বাসাডার। সঙ্গে সেই দাদা, বৌদি, খুদে, আর দুখিরামরা তিনজন। ঠিক হাজারিবাগে নয় - ভুরকুন্ডার দিকে।
একটু প্রসঙ্গান্তর। যতই নতুন নতুন গাড়ি প্রতিদিন বাজারে আসুক - পুরাতন পাঠক / পাঠিকারা নিশ্চিত দুখিরামের ধুয়ো ধরবেন - অ্যাম্বাসাডার হল গাড়ির জগতে ছবি বিশ্বাস। চলায় ফেরায় তার মেজাজই আলাদা। বসলে মনে হত যেন খাস বৈঠক খানায় , সোফা সেটিতেই বসে থাকা। আজকের তুলনায় চালানোটা হয়ত কিছুটা কঠিন ছিল - কিন্তু তাতে কি ? দুখিরামের ভগ্নীপতি কিনেছিলেন অ্যাম্বাসাডার আর দাদা প্রিমিয়ার পদ্মিনী। তুলনায় গেলে এরা দুজন যেন পাশাপাশি হেক্টর ও হেলেন, সিজার ও ক্লিওপেট্রা কিম্বা দারা সিং ও মমতাজ। প্রথম জীবনের মোহ হতে পারে কিন্তু সেই দুজনের চলে যাওয়া যেন আত্মীয় বিয়োগ।
যা হোক - এদিক ওদিক নবাবী মেজাজে ঘুরে ফিরে আর মাঝে মধ্যে খাদ্য পানীয়র বিরতি সহ পৌঁছতে বিকেল হল। সেকালে মুঠোফোন ছিল না কিন্তু ভূমি ফোন ছিল। খবর দেওয়া যেত কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত-ভাবেই না দিয়ে আসা হয়েছে। এক অভ্র কারখানার ছোট্ট জনপদ। সাহেবি আমলের বিরাট বাংলো বাড়ি। গাদা গুচ্ছের ঘর কিন্তু থাকেন মাত্র দুজন আর তিনটি খিদমতগার। হঠাত করে অ্যাম্বাসাডার ভ্যাঁপো ভ্যাঁপো করে বাড়ির দরজায় চেঁচামেচি শুরু করতে শ্বশুর, শাশুড়ি মায় তিনটি কাজের লোক ডাকাত পড়েছে ভেবে হৈ হৈ করে বেরিয়ে এলেন। তারপর যা হয়। কোলাহল বাড়ল বই কমলো নাট। শাশুড়ি মা এসে গাড়িতে তেল সিঁদুর লাগিয়ে দিলেন, নাতিকে কোলে নিয়ে অল্প করে সাম্বা নাচলেন, তারপর দৌড়লেন রান্নাঘরে। শ্বশুরমশাই তোম্বা মুখ করে আড়চোখে তার পুরনো স্ট্যান্ডার্ড হেরাল্ড গাড়িটি দেখলেন। মিনিট পনেরো পরে সবাই জমিয়ে বসা গেল বিরাট বৈঠকখানায়। শ্বশুর-মশাই ও তেনার জামাই এর মৃদু গলায় কথোপকথন হল এ রকম -
- 'নতুন গাড়ির ব্যাপারটা তো সেলিব্রেট করতে হবে। তুমি ... মানে তোমরা তো বোধহয় গেস্ট হাউসেই থাকবে'?
= ' সে আর বলতে। এখানে মা আছেন না'।
- 'হুম। আমি তাহলে এখানেই দু তিন পেগ ...। তা সঙ্গে জিনিষপত্র আছে তো? এখানে তেমন দোকান নেই। তাছাড়া আমার জামাই যদি এদিক ওদিক ঘুর ঘুর করে ... মানে ছোট জায়গা ... সবাই সবাইকে চেনে ...'।
= ' বাবা আপনি থাকতে ...'।
- 'হুম। তোমার শাউড়ী মা কোথায়? রান্নাঘরে? তবে চুপি চুপি চল ওদিকে। (বাজখাঁই গলা নিচু করার চেষ্টা করে) তা কি রকম লাগব? সঙ্গের ওরা কি তেমন ...'?
= 'পাঁড় পাঁড়। আপনাকে - আমাকে - বলে বলে উইকেট ফেলে দেবে'।
- 'হুম। সে অবশ্য আমার চোখ বলছিল। বিশেষ করে ওই ছেলেটি ... ওই যে কোনার দিকে বসে। ওরকম লাল্টুস চেহারা ... ও আমি দেখেই বুঝেছি। তাহলে দুটোই নাও'।
ঘরের কোণায় রাখা বিরাট হিমানী আলমারি খুলতেই দুখিরামের আড়চোখ ছাতার মত খুলে গেল। শুধুই প্রগতি ভরা। বরফের রাজ্যে যেন নানা রঙের সিন্ধু ঘোটক এ ওর ঘাড়ে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে। সেখান থেকে দুটি উচ্চকোটির বোতল - শিশির মেখে বেরল আর হাত বদল হল। অফিসতুতো দাদা সে দুটি বগলদাবা করে ছুটলেন বাইরে কোথাও নিরাপদে রাখতে। তার শ্বশুরমশাই আবার আগের আসনে আসীন হয়ে দুখিরামকে চোখ পাকিয়ে উপর নিচে দেখলেন বার পাঁচেক। তারপর গলা ঝেড়ে বললেন -
- 'হুম'।
সেটা আশি দশকের শেষ। দুখিরামের কপালে ওঠা চোখ আর নামেই না। এমন 'প্রগতিশীল' শ্বশুর জামাই সে কালে ঘরে ঘরে হত না। কিন্তু তাকে নিয়ে কি যেন কথা হল ওদের মধ্যে? ওহ। তাই একাধিক বোতল বেরল। তার চোখ আর গাল - দুই লাল হল আরেকটু। তা হোক। বাকিদের হাসি চওড়া হল। বিশেষত সেকালে যখন তাদের তিন অঙ্কের তংখা। এ তাদের কাছে 'নোবেল' না হোক 'ম্যাগসাইসাই' পুরস্কার।
তারপর আর কি? শাশুড়ি মা কত অনুনয় / চেঁচামেচি করলেন জামাইকে ঘরে থাকার জন্যে। শ্বশুরমশাই 'শুন্ডি রাজার প্রজার ' মত মৌনী বসে রইলেন। বৌদি নিজের ঘরে ছেলেকে ঘুম পাড়াতেই থাকলেন। আর্দালি খানসামা মুখ লুকিয়ে অল্প হাসল। রাঁধুনি গেল মুর্গী পকোড়া ভাজতে। পরিশেষে সেই বাংলো বাড়ির সংলগ্ন কোম্পানির গেস্ট হাউসে - প্রায় রাতভোর সেই দুই শিশি - দশ দিশী - মাতিয়ে রাখল। দুখিরাম আধো ঘুমে জাগরণে প্রত্যক্ষ পাঠ নিল 'ঝুলন' কবিতার। 'আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে হট্টগোল, দে দোল দোল'। প্রসঙ্গত দুখিরামের বাণী - মাতালকে শ্রদ্ধা করা শিখুন। কোভিডে অর্থ ব্যবস্থায় যে ক্ষত হয়েছিল - তার অনেকটাই নাকি এনারা সারিয়ে তুলেছিলেন। তবে সে সবের গল্প তো এটা নয়। দুখিরামের গোল গাল আর ভুঁড়ির অনৈতিক জয় জয়কারের কাহিনী। দ্বিতীয়টাও বলা যাক।
এর পটভূমিও ধানবাদ তবে মাঝে পেরিয়ে গেছে বছর পনের। তখন দুখিরামের দ্বিতীয়বার সপরিবার বাসা বেঁধেছে সেই দেশে। বিপননে জুড়েছে, গাড়ি হয়েছে, দিকদারি বেড়েছে অনেক - সৌজন্যে তার সংস্থা। তাদের সর্বাধিনায়ক এক জাঠ সর্দার। কথা কাঠ, কাঠ এবং বেশ কঠিন। হালচাল প্রায় সন্ত্রাসবাদীদের মত।
দুখিরামের প্রতি তার ঈষৎ নেক নজর ছিল - কারণ তিনটি। প্রথমত দুখিরামের শাখার নাম - গোবিন্দপুর, সর্দারজি উচ্চারণ করেই মাথায় হাত ঠেকাতেন। দ্বিতীয়ত হুজুরের জাঠ জিভের হিন্দি। সে সময় ধানবাদের বেশ কিছু বিপণনের মাথারা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গবাসী। তাদের হিন্দিতে ব্যুৎপত্তি - সাধারণত যেমন হয়। কেউ কেউ তো আবার 'আমি যা তা, তুমি আতা' ধরনের। দুখিরাম আজন্ম জামশেদপুরে মানুষ। সে শহর বহুভাষায় ভাসাভাসি - পাঞ্জাবী, দক্ষিণ ভারতীয়, কাশ্মীরি, বাঙ্গালী, বিহারি সবাই মিলে মিশে থাকে। তাকেই হুজুরের 'বিয়াস -সতলজের' জল মেশানো হিন্দি বুঝতে বেশ ঘোল খেতে হত। সে পরিস্থিতিতে আজন্ম বাঙ্গালীরা হাবুডুবু খাবেন তাতে আর আশ্চর্য কি? চেষ্টায় থাকতেন কথা কমিয়ে - মাথা নাড়িয়ে - কাজ সারতে। দুখিরামকে সর্দারজি তাই মাঝে মাঝে দোভাষী করতেন। তৃতীয়ত দুখিরামের শাখার কাছে ছিল এক পাঞ্জাবি ধাবা যার জবজবে মাখন লাগানো আলুর পরোটার সঙ্গে সর্দারজির বিশেষ প্রণয়। প্রায়ই দুখিরাম সেখানে নিয়ে যেত বিভাগীয় প্রধানকে। গাড়িতে বাজাতো হংস রাজ হংসের ভজন। এই নাম মাহাত্য, দুই সেবা এবং সে সময় ব্যাবসায়িক ভিত্তিতেও তাদের শাখার কিছুটা উন্নতি - এরকম ত্রাহস্পর্শ যোগে দুখিরাম কিছুটা সুবিধেজনক অবস্থানে থাকত। অবশ্য সবই গুরুর কৃপা।
পৃথিবীর নবম আশ্চর্য বলা যায় এই রুঢ় ভাষী ভদ্রলোক ছিলেন নিরামিষাশী এবং মদ বিরোধী। (অবশ্য হিটলার ও তেমন ছিলেন। পশু মারতে তার প্রাণ কাঁদত কিন্তু মানুষ মারতে ... সে কথা থাক।) এমন বিজাতীয় মানুষ - বিশেষত পঞ্চ নদের তীরে পাওয়া বেশ কঠিন। দুখিরামের গোল চেহারা তখন আরো গোল বাধিয়েছে। হুজুর প্রথম দর্শনেই দুখিরামকে জলবৎ বুঝে নিলেন। অফিসের কাজে তো গোবেড়েন করলেনই - আত্মশুদ্ধির মন্ত্র ও দিতে থাকলেন। যতবার পরোটা খেতে যান (মাসে দু বার তো বটেই) তত বারই তাকে মদ ছাড়তে বলেন। দুখিরাম সাধ্যমত বোঝাবার চেষ্টা করে যা সে ধরেইনি - তা ছাড়ে কি করে? হুজুর 'ঝুট মত বোলো' বলে চুপ করে যান, কিন্তু বলতে ভোলেন না। পরের বারেও তার বানী থাকে 'দারু ছোড় দো'। বিরক্ত দুখিরাম পরের দিকে হুঁ হ্যাঁ দিয়ে এড়াতে লাগল। দুখিরামের চাকরি জীবনে যা প্রবল অসুবিধে - তাই আবার কখনও কখনও পরম সুবিধে হয়ে দাঁড়াত। সহ্যের সীমা ছাড়াবার আগেই স্থানান্তরণ - তার বা তার হুজুরের। এবার হুজুরের পালা। অন্য হুজুর এসে গেলেন।
যখন দুই হুজুরের গপ্পো হয় - তখন পুরনোকে ধুপ দেখানোর লোক কম পড়ে। কাজেই পুরনো হুজুরকে ফুলের তোড়া সহ স্টেশনে ছাড়তে গেল দুখিরাম। বাকিরা নতুন হুজুরের চারপাশে কমান্ডোর কায়দায় ঘনিয়ে বসে।পুরোন হুজুর একটু ভাবপ্রবণ হয়ে পাগড়ির উপরটা চুলকাচ্ছে। দুখিরাম ভাবছে আর বড় জোর আধা ঘণ্টা তারপর ...শ্যামল সলিল গীতি - 'যাক যা গেছে তা যাক'। হঠাত হুজুর তার দিকে ফিরলেন এবং যা বললেন তার সারমর্ম হল - চাকরি জীবনে অনেক উত্থান পতন তিনি দেখেছেন। কখনো মেঘ, কখনও রোদ, কখনো জয়, কখনো হায়, তাতে কি আর আসে যায়। এসব কর্ম পথে হয়েই থাকে। কিন্তু এখান থেকে তিনি পরিপূর্ণ আনন্দ নিয়ে ফিরতে পারবেন যদি দুখিরাম কথা দেয় আগামীকাল থেকে সে আর সুরা স্পর্শ করবে না। তার জীবনের সেরা কীর্তি হয়ে থাকবে সেটি। দুখিরাম কি কথা দিতে পারবে না? বয়সেও তো তিনি অনেকটাই বড়। বিড়ম্বিত দুখিরামের সামনে যেন পাগড়ী পরা সুখেন দাশ।
এত মহা ল্যাঠা! দুখিরামের মনে হটাত একটু বৃষ্টি নামল। একবার যুধিষ্ঠির ও সত্যের ফোড়ন দেওয়া অনৃত ভাষণ করেছিলেন। তবে তাই হোক। সে বলল যে তার বিবেক জাগ্রত হল আজ। আগামীকাল কেন - আজ থেকেই সে আর কোনো রকমের মদ তো দূর-স্থান - হাঁড়িয়া / পচাই/ তাড়ি কিছুই ছুঁয়ে দেখবে না। কথাটা কিছুটা জামাই ঠকানো হল কিন্তু হুজুরের প্রায় চোখে জল আসে আর কি। ট্রেন এল, তিনি বিদায় হলেন। দুখিরামের লাভ ক্ষতির ঘরে কোনো আঁচড় পড়ল না তবে 'তিনি' - একটি ভুল পুণ্যের গল্প জিতলেন। আর বাকি জীবনে তার ছায়া পড়েনি দুখিরামের জীবনে। তিনি অনেকদিন ছিলেন ভারতের বিভিন্ন প্রেরণাদায়ক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। দুখিরামের এক সতীর্থ সহাস্যে একবার খবর দিল - তিনি তার প্রতিটি ক্লাসেই এই ঘটনার উল্লেখ করে অনুপ্রেরণার ফাটা কাঁসি বাজিয়েছেন। এই সব শিক্ষণ শিবিরে অনেক সাফল্যের গল্প শোনা যায়। সত্যি মিথ্যে বিচার করার কেউ দরকার দ্যাখে না।
অনেক সময় না জেনেই বৈজ্ঞানিকরা কিছু অপ্রত্যাশিত আবিষ্কার করে ফেলেন - যেমন ন্যাপথেলিন বা স্যাকারিন। দুখিরামের চেহারার লালিত্যে কেউ পেলো কারণবারি কেউ বা লাভ করল অলীক আত্মপ্রসাদের আনন্দ। দাড়িয়াল দুখিরামকে দেখিয়ে, পুলিশ বলে ভ্রমিত করে - একজন ফিরে পেয়েছিলেন অফিসের বকেয়া টাকা। সে গল্প আলাদা।
শেষের আগে একটি কথা না বললেই নয়। দুখিরাম কোনো নীতিপুলিশ নয়। আবার জল না খাওয়ার দরুন কোনো হীনমন্যতাতেও ভোগে না। কেউ নিত্য প্রসাদ পাচ্ছেন। বাড়িতে, হোটেলে, ক্লাবে, পার্টিতে, মিটিং এ, জঙ্গলে, বন্ধুদের সঙ্গে বন্ধ ঘরে, প্রকাশ্যে ডাবের খোলায়, ট্রেনের বাথরুমে, বিমান বন্দরে, যেকোনো আধুনিক সিনেমার পর্দায়, ওয়েব সিরিজে - কোথায় নয়। এনারা ভারতীয় অর্থ ব্যবস্থার - শিরদাঁড়া না হোন - ফিমার বোন। দেশকে দাঁড় করানোর সঙ্গে সঙ্গে যদি সমাজ ও পরিবারের কথাও ভাবেন তবে - তার চুমুক চমৎকার। আবার যিনি খাচ্ছেন না তিনিও তো আয়কর দিচ্ছেন ঠিকঠাক। কাজেই বিপুলা পৃথিবীতে সবার ঠাঁই আছে। শক্তি, সুনীল, সৈয়দ মুজতবা আলি যেমন আছেন - আছে দুখিরামরাও।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন