| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৫২ |
বৃষ্টি
অয়নের ইয়ারপডে বেজে চলেছে বাংলা ছবির একটি জনপ্রিয় গান। সেই সুরে একদম মজে আছে সে। অটোটা বাঁক নিতেই অয়ন দেখতে পেল সমুদ্রের উথাল-পাথাল ঢেউ।
মধুরিমা হাসি হাসি মুখ করে বলল, “অ্যাই… এই নিয়ে পুরী আমাদের পাঁচবার না ছ’বার গো?”
গানের লিরিকের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেছে অয়ন। মধুরিমার প্রশ্ন তার কানে পৌঁছল না। ইয়ারপডে গান শুনতে শুনতেই সামনে সমুদ্রের দিকে মগ্ন হয়ে তাকিয়ে আছে সে।
“অ্যাই অয়ন… কী বলছি, শুনতে পাচ্ছ না?” কনুই দিয়ে আলতো ঠেলা দিল মধুরিমা।
এবার কান থেকে ইয়ারপড বের করে সে বলল, “উঁ, কী?”
“বলছি, পুরীতে আমাদের আসা এবার নিয়ে ক’বার হল?”
চোখ কুঁচকে মাথাটা একটু চুলকে অয়ন বলল, “ছয়… ছয়… না না, পাঁচ। এবার নিয়ে পাঁচবার”।
একটু পরেই ব্রেক কষে থামল অটো। ওদের হোটেল এসে গেছে।
দুহাজার আঠারোর জুলাইতে প্রথমবার পুরীতে এসেছিল অয়ন-মধুরিমা। বিয়ের ঠিক পরপরই। এসে আকাশ মেঘলা দেখে মন খারাপ হয়ে গেছিল দুজনেরই। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ উড়িষ্যা উপকূলে অবস্থান করছিল সেবার। বাইরে বৃষ্টি আর হোটেলের রুমের ভেতরে নিভৃতে – কেবল দুজন। প্রবল বর্ষণে সমুদ্রের কাছে বেশি যেতে পারেনি ওরা। প্রথমবার পুরী ভ্রমণে এই অপ্রাপ্তিটুকু সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়েছিল।
এরপর আরও তিনবার ওরা পুরী এসেছিল। কাকতালীয়ভাবে প্রতিবারই বৃষ্টি হয়েছে। পুরী আর বৃষ্টি ওদের জীবনে যেন একসঙ্গে জড়িয়ে গেছে। কিন্তু এবার রোদ, সমুদ্র, আনন্দ - সবই আছে, শুধু বৃষ্টি নেই। অক্টোবর শেষের আকাশে ভেসে আছে পেঁজা তুলোর মতো শরতের সাদা মেঘ।
অয়ন ভেবেছিল, এবার তাহলে ব্যতিক্রম হল। মধুরিমাও তাই ভেবেছিল। কিন্তু ফেরার দিন দুপুরে হোটেলে লাঞ্চ করতে গিয়ে আচমকাই বৃষ্টির মুখোমুখি হয়ে গেল অয়ন।
তাদের চোখাচোখি হয়েছিল শুধু, কথা হয়নি, হওয়ার কথাও নয়। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে দুজনেই থমকে গিয়েছিল কয়েক মুহূর্ত। বৃষ্টির সিঁথিতে সামান্য সিঁদুরের ছোঁয়া দেখল অয়ন। তারপর দুজনেই পাশ কাটিয়ে চলে গিয়েছিল। অয়ন ভাবেইনি, এতদিন পর বৃষ্টির সঙ্গে এভাবে দেখা হয়ে যাবে।
রাতে পুরী এক্সপ্রেসের মিডল বার্থে শুয়ে অয়ন ভাবছিল, এবার বৃষ্টি হল না। তবে বৃষ্টির সঙ্গে দেখা হয়ে গেল - বহু বছর পর।
খুব সুন্দর গল্প। পড়ে আনন্দ পেলাম।
উত্তরমুছুন