কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

জয়িতা ভট্টাচার্য

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৩


শালিক জীবন

হেমপ্রভার ছবিটায় একটা শুকনো মালা। ভোরবেলা চোখ তুলে প্রথমে এটাই চোখে পড়ল। তারপর চোখে পড়ল জানলায় বসে থাকা একটা শালিক। পারিবারিক মন মেলা হয়ে গেল। বিরক্ত। পরপর দুটো নেগেটিভ বিষয়। ছোটো থেকে শিখে এসেছেন, ওয়ান ফর স রো, টু ফর জয়...

এই সত্তরবছর বয়সে এসে গোটা জীবনের ধকলের পরেও এক-শালিক দেখলেই মন খুঁতখুঁত করে। শুকনো মালা তিনি সইতে পারেন না।

এইজন্য নয় যে হেমপ্রভা তাঁর একমাত্র স্বামীর মা এইজন্যেও নয় যে হেমপ্রভার সঙ্গে শেষের কুড়িবছর শাশুড়ি কিম্বা প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং সঙ্গিনী হয়ে উঠেছিল যাপনের বরং নিস্তরঙ্গ চোখ দুটোর চেয়ে সুতোয় বাঁধা শুকনো মালাগুলো অস্বস্তিকর লাগে। ঝরে পড়ার সময় পেরিয়ে গেছে তবু জোর করে আটকে রাখা। ভিডিওকল হচ্ছে। সবুজ তাঁর ছেলে জানেন। এই সময় সে মা কে দেখবে। কথা বলবে খানিক্ষণ। শেলি কাজ থেকে ফিরে ফোন করে। মোটামুটি একই কথা। শেলি মাঝেমাঝে অবশ্য তার কাজের কথা বলে। মেয়েটা ভালোই। রবার্ট দুবার অন্তত...।

হেমপ্রভার কথা মনে হলে আজকাল মনে হয় কী বিনষ্ট হয়ে যায় মানবসম্পদ। মানুষটা কত সুন্দর আবৃত্তি করতেন। ছবি আঁকতেন যামিনী রায় স্টাইলে। শ্বশুর সাধনচন্দ্র পার্ট করতেন। কিন্তু প্রদীপের নিচে অন্ধকার। সুন্দরী। ইন্টেলিজেন্ট। কি অপচয়। সারাজীবন রান্নাঘর আর স্বামীর যৌনসঙ্গী হয়ে কাটিয়ে দিলেন। প্রাতঃরাশ না করলে অসুবিধে। নন্দিতা  আসুক। না এলে সবিতা, কাকলি যে কেউ এসে যায়। সেভাবেই ব্যবস্থা করা। ল্যাপটপ খুললেন। এখন সাদামেঘ বা নীলাকাশ যাই দেখার ইচ্ছে হোক সব স্ক্রীনে-ই। পাহাড়ে মাথায় অথবা সমুদ্র। আর যাওয়া হবে না হয়ত কখনও।

এই হয়ত শব্দটা জীবনকে পজিটিভ রাখে নাহলে তো...। কখনও এভারেস্টের মাথায় কখনও এমাজনের গহীন অরণ্য। দরকার মতো পুরনো পুঁথিপাঁজি সবই দেখে নেওয়া যায়। তবু। মনে মনে চোখ বুজে চেষ্টা করেন সমুদ্রের লোনা বাতাসের গন্ধ নিতে। কাল মাঝরাত অবধি লিখেও গল্পটা শেষ হয়নি, ওটাই শেষ করবেন। বই রিভিউ-এর জন্য এসেছে কয়েকটা বই। অনুবাদের কাজ। সম্পাদনা। রান্নার লোক অতসী আসে। সেবিকা নন্দিতা আসে। সহকারি মলিনা, এখন বুড়ি তবু এসে কাজ করে কাছে বসে ঘুঘু পাখির মতো বকবক করে। জীবন শোনে পারমিতা সবার থেকে। তারপর অক্ষরে গেঁথে নেন। রোজই সন্ধ্যায় কেউ না কেউ আসে। গত দশবছর প্যারালিসিস হয়ে বিছানায় পড়ে। ম্যাসিভ স্ট্রোকের পর ছেলে সবুজ আর তার লিভইন পার্টনার শেলি এসেছিল শিকাগো থেকে। ছিল তিনমাস। তখনই শেলির বাবা রবার্টের কাছে শেখা জীবনের পাঠ আর ওদের নিপুণ ব্যবস্থাপনায় এই নতুন যাপনে মানিয়ে নেয়ার শুরু। এখন তিনি লক্ষ্য করে দেখেন, পৃথিবীর অধিকাংশ নরনারী দেহে সুস্থ হলেও মনে প্যারালিটিক। সারাজীবন শুধু আত্মপুজো অজ্ঞান তিমির জীবনে বসবাস। চিন্তা ভাবনা আগাছাগুল্মে জড়ানো। রবার্টের সঙ্গে এইসব নানা কথা আলোচনা হয় পৃথিবীর দুই প্রান্তর থেকে। নন্দিতা আর অতসী একসাথে ঢুকল দরজা ঠেলে। দুই শালিক।

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন