কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

গৌরাঙ্গ মোহান্ত

 

কবিতার কালিমাটি ১৫৩


উবারচালকের গান

উদার বাতাসের ভেতর উবারচালক অর্ফিয়াস হয়ে ওঠে — তার গান ট্রাফিকের ধ্বনি-বর্তনী থেকে শহরের শব্দগ্রহীতার দিকে ছুটে যেতে থাকে।

সূর্যাস্তে ভ্যান গোর পাইন-ঐশ্বর্য নিয়ে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকে সজনে, কদম, কলা ও আতাগাছ — সমস্ত পত্ররাজি বিস্মৃতপ্রায় ধবলাশ্রীর সংকেত খোঁজে।

রাস্তার স্বভাবে পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়। যাতায়াতের পথ রত্নাই নদীর তরঙ্গ-মৃদুতায় পূর্ণ হয়ে ওঠে — গতিময় হয় প্রাচীন সুরের সাম্পান।

তেলাকুচা লতা সুরকে স্পর্শ করে। তার ঝুলন্ত ডগায় মিনাড-নৃত্যের প্রতিধ্বনি জেগে ওঠে। আর গান রূপময় শরীরে রূপান্তরিত হতে থাকে।

একটি সুর অন্য সুরের হৃদয়ে প্রবেশ করে। পিথাগোরাসের সমস্ত সংখ্যা সুরের ঐশ্বর্য লাভ করে — সে সুর নিজেকে বাতাস ভেবে অবলীলায় পাতার ফাঁক দিয়ে ভেসে যায়।

তারপর নামে বৃষ্টি — দৃশ্যমান সমস্ত পাতার ধুলো মৃত্তিকায় সঞ্চিত হয়। বৃক্ষের সানন্দ অস্তিত্বের ভেতর প্রতিধ্বনিত হতে থাকে আকাশের গান।

বৃষ্টিজল অস্তিত্বের সম্পর্কসূত্রকে দৃঢ়বদ্ধ রাখে; মৃত্তিকার সঙ্গে একাত্ম হতে পারে বলে বৃক্ষের শেকড়রাজি নৃত্যপ্রজ্ঞা লাভ করে। শহরে স্পর্শময় হয়ে ওঠে বাতাসের কাঙ্ক্ষিত ঢেউ।

বৃক্ষরাজি স্বচ্ছন্দে শ্বাস নিলে তাদের স্মৃতি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে — অরণ্যের প্রাচীন ফুসফুস মানুষের প্রসন্নতার জন্য শহরে ছড়িয়ে দিত কুরচি-সৌরভ।

এ সময়ে বিশেষ ওষুধ উৎপাদনের প্রয়োজন পড়ে না। ফর্গলিন ক্যাপসুল লুপিহেলারে আবদ্ধ হয়ে অকারণে ঘর্ঘর করার অপমান থেকে মুক্তি পায়।

অরণ্যের কাছে কোনো হাসপাতাল থাকে না। বাতাসে সংরক্ষিত পতঞ্জলির নির্দেশ মানুষ বিনা তর্কে মেনে নিয়েছে।

শ্রীমদ্দি গ্রাম থেকে সংগৃহীত বাঁশি হাতে ইউটার্পি গাড়ি থেকে নামে, আর বাতাসে ষড়জ-প্রীতি শ্রবণসাধ্য হয়ে ওঠে।

পরিচিত শব্দরাজি কেঁপে ওঠে। প্রতিটি শব্দ থেকে ঝরে পড়ে অভিনব পদ্মজ্যোতি; পেইন্ট প্রসাধিত রুদ্ধ জানালার পাশে স্তুপীকৃত হয় অসংখ্য অভিধান।

কিছু সুরেলা বাতাসের রয়েছে অবিনাশী গতিপথ। সুরদেবতা ক্ষণিকের জন্য এসে শহরের তন্ত্রীগুলো সুরে বেঁধে চলে যায়।

এক সময় পরিবেশ উপশমক ছিল।সূর্যদীপ্ত ঘাস ও বৃক্ষের পাশে মানুষ খুঁজে পেয়েছে কাঙ্ক্ষিত সুর।

উচ্ছল পরিবেশে পৃথিবী নিজেই গুনগুন করে গেয়ে ওঠে। হিসেবহীন সুরপ্রবাহে বৃক্ষ ও মানুষ একটিমাত্র ফুসফুসের বরাভয় নিয়ে বেঁচে থাকে।

 

অন্ধকারের করিডর

যারা পথ থেকে বাতি সরিয়ে দেয়, তারা বিস্মৃত নির্দেশনার পরিপালক। দীর্ঘ যাত্রা শেষে আলো অর্জিত হয়।

আলোকহীন পথে মুখোশের প্রয়োজন নেই। অন্ধকার আশ্চর্য শক্তি দিয়ে মুখের রেখায় বিস্তৃত বিষরং ঢেকে দেয়।

অন্ধকার কোনো শূন্যতা নয়, এক সত্তা। চিহ্নিত করিডরে রয়েছে তার সর্বময় কর্তৃত্ব।

বরফের নিচে প্রবাহিত নদীতে ভেসে আসে অন্ধকারের আভা। পৃথিবীর সমস্ত আকৃতি ও বর্ণের ওপর তার রয়েছে অভাবনীয় প্রভাব।

নিঃশব্দে একটি গোষ্ঠী গঠিত হয়। প্রত্যেকের চোখে সূচিত হয় পরিবর্তন, পরিচিত দৃশ্য অচেনা হয়ে ওঠে।

তাদের দৃষ্টি আর প্রতিফলন খোঁজে না, নিজের সত্তা নিরীক্ষণ এবং ছায়া ও শূন্যতার ছবি সংরক্ষণ করে।

তাদের স্নায়ু অনিয়ন্ত্রিত। দৃশ্যত শরীর চলে, ক্রমে নির্বাসিত হয় অন্তর্গত সঙ্গীত।

গানের সমস্ত পংক্তি অন্তর্হিত হলে থাকে শুধু শ্বাস, সম্ভাবনার ক্ষীণবোধ।কোথাও ভোর অপেক্ষা করছে। যারা অন্ধকারে আয়নার দিকে চেয়ে থাকে তাদের জন্য ভোরের বার্তা অপ্রাসঙ্গিক।

সতর্ক ছায়া জেগে আছে; ভেসে চলে গতস্পৃহ, প্রতিশ্রুতিহীন।

ছায়া ফিসফিস করে। পথচারীর দৃষ্টি বিশ্রান্তি খোঁজে; পথ নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে।

পথের রয়েছে স্মৃতিশক্তি। তার স্মৃতির ভেতর আলোর গতিপথ, পদচিহ্নাবলি। ধুলো ও পাথরের নিচে রয়েছে নিষ্প্রভ নিদর্শন।

কেউ অপেক্ষা করছে — না পথিকৃৎ, না পর্যবেক্ষক। অপেক্ষক সচলতা ও স্থিরতার সাক্ষী।

অন্ধকারের বিস্তৃতির জন্য সম্মতি প্রয়োজন। অন্ধকার আলো সৃষ্টি করে না, আলোর বিলম্বন বা পরিশ্রুতি নিশ্চিত করে। অন্ধকারের রয়েছে পুনরাবর্তনের ক্ষমতা।

বাতি ফিরে আসে, অনিশ্চিত, রোখালো স্বভাব নিয়ে। দৃষ্টির ভেতর সঞ্চারিত হয় গভীরতা; পথের বাঁকে বাঁকে ক্রমান্বয়ে ধ্বনিত হয় আলোর শব্দাবলি।

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন