কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

শাশ্বত সিকদার

 

অর্ঘ্য দত্ত বকসীর ‘সত্যান্যাস’ প্রসঙ্গে

 


এর আগে, অর্ঘ্য দত্ত বক্সী'র কিছু নন-ফিকশন - ডিপ-রিডিং নয় - উল্টেপাল্টে দেখার সুযোগ হয়েছিল। সেগুলো ছিল একধরনের সাবজেক্টিভ, যুক্তিশাসনমুক্ত, কাল্পনিকউড়ালসমৃদ্ধ স্ফটিকগদ্য, ভার্বাল আর্টিফাইস, যা নিয়ে দশাননদশজিহ্বায় প্রতর্ক তুলতেই পারা যায়, কিন্তু তাকে স্কিপ করে এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই কোনো। তার প্রধান কারণ, হয়তো, প্রথাগত সাহিত্য-চর্চার তুলনায় এইপ্রকার লিখনশৈলী বড়ই ভূতুড়ে, অচেনা, জনরুচিহন্তারক, বাজারিনিয়মঅমান্যকারী, ১০০% স্বাধীন। সম্প্রতি নজরে এলো  অর্ঘ্য-এর, হয়তো বা, প্রথম ফিকশনের (উপন্যাসের) প্রথম কয়েক পর্বের খসড়া। সাতসকালে কয়েক পাতা পড়তেই নড়েচড়ে বসতে হল -- বেশ নজরকাড়া প্রকাশভঙ্গি আনলাইক ক্লাসিকাল কাঠামোর উপন্যাস, অবেক্ষ্যমাণ টেক্সট-টির শরীর ও আত্মা জুড়ে রয়েছে তুমুল নৈরাজ্য। উপন্যাস বলতে আমরা যেমন বানোয়াট একরৈখিক ঢাউসগতর গোলগল্পসমষ্টিকে বুঝি, যাকে আধুনিক সাহিত্য-সমালোচকরা 'প্লট' নামে চিনে থাকেন -- এই প্রকল্পটি তেমন চেনাছাঁদ ন্যারেটিভের উদাহরণ নয়, বরং বাগানকেয়ারিধাঁচ, যা এখনও, এই চালু পুরস্কারকাতর বঙ্গালীলিটমার্কেটে খুব কম নজর-আন্দাজে আসে। পুরোটাই এক নন-সিকোয়েন্সিয়্যাল উপস্থাপনা, যেখানে একরৈখিকতাকে পরিহার করে বহুরৈখিক বিস্তারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, টাইম আর স্পেস আচ্ছা করে ঘেঁটে দেওয়া হলো, আর তারপর শুরু হলো হতভম্ব পাঠকের নন-লিনিয়ার কথাভ্রমণ, যা সবসময়ই, বাইডিফল্ট, অসম্পূর্ণতার দিগন্ত ছুঁতে চায়। অক্ষরযাত্রার এহেন দোআঁশলা পরিসরে, থরেথরো সাজানো রয়েছে একাধিক উপাদান : চূর্ণগল্প, ব্যক্তিগত অনুষঙ্গ, থিয়েটারি সংলাপ, পর্নোপৃথিবীর টুকিটাকি, আত্মজৈবনিক স্মৃতিমেদুরতা, পপুলার কালচারের হদ্দমুদ্দ ব্যবহার (যেখানে বাংলাদেশের চটুল ফিল্মী গানের উপস্থিতি পর্যন্ত ব্রাত্য নয় -- এবং এখানে কারো ক্ষ্যাপা দার্শনিক জিজেকে'র অনবদ্য গ্রন্থ 'লুকিং অ্যারাই'-এর কথা মনে পড়ে যেতেই পারে), সর্বত্রগামী ও অতিপ্রজন সোশ্যাল মিডিয়ার যাবতীয় অকহতব্য অকথ্য, দৈনন্দিন খুচরো কথন, ফটো-গ্যালারি, আঙ্কিক সূত্র, রেখাচিত্র এবং আর অনেক কিছুই। এবং এই অনেক কিছুই এখানে জাক্সট্রাপোজড হয়েছে তুমুল অ্যাসেমব্লেজে। গ্যাঁর্গাতুয়া-মাফিক উদ্যোগে জড়ো করা এহেন বিপরীত মেরুর উপাদানগুলোর এমন বিচিত্র সহাবস্থান অনিবার্যভাবেই এক ধরনের বাচিক শিথিলতার জন্ম দিয়ে ফেললেও লেখক এবম্বিধ ভার্বাল ইনকোহেরেন্সকে সামলেছেন কুশলী বয়ানমোচড়ে। লেখকের ভাষা-ভাবনায়,সঙ্গত কারণেই, সাইকোলিঙ্গুইটিক্সের, যে পরিসরে মনস্তত্ত্ব আর ভাষাবিজ্ঞান কোলাকুলি করে, প্রভাব স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়। এবং এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এই লেখায় লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ভাষিক ভায়োলেন্স ব্যবহার করতে পেরেছেন।

শেষমেষ, তাই, গোটা বইটা, যা আমার কাছে এসে পৌঁছইনি, এক নব আঙ্গিকের রাজনৈতিক ভাষ্য হয়ে উঠেছে, যেন লেখক ড্রোনলেন্স-পাখিচোখে নিজে বুঝে, অন্যকে বুঝ দিতে চাইছেন, নিও-লিবারেল অর্থনীতির কারসাজিতে কিভাবে অহোরহ ভেঙে গুঁড়ো-গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে গণ(ব্যক্তি)প্রতিস্ব! ফলে এই বিপজ্জনক বইটিকে অরওয়েলিয়ান নিউস্পেক রাষ্ট্র (খুব চেনা চেনা লাগছে?) উইনস্টন স্মিথের মতন 'থটক্রিমিনাল' হিসেবে চিহ্নিত করতেই পারে!

বি. দ্র.: এই উপন্যাস, এই কমপ্লেক্স কোলাজকর্মটি, এভাবে চলতে চলতে মৃগনাভি সভ্যতার জন্ম দিতে পারে!


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন