‘তুমি
পিতামহ’ : অনন্য বীরের নির্জন জীবনের সার
“মহাভারতের কথা অমৃত সমান।
কাশীরাম দাসে কহে শুনে পূণ্যবান।।”
‘মহাভারত’, বঙ্গীয় সমাজ সংস্কৃতি
তথা ভারতবর্ষীয় পৌরাণিক কাহিনীর অনন্যতম সংস্করণ। মহর্ষি বেদব্যাস প্রণীত এই সংস্কৃত
সাহিত্যের মূল কাহিনি মধ্যযুগীয় সমকালে গ্রাম-বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অনুবাদ সাহিত্যের
মাধ্যমে বিকশিত হয়। স্বনামধন্য বিভিন্ন রচয়িতা মহাভারতের বিভিন্ন অংশের কাহিনিকে
কেন্দ্র করে নানান রচনা সংকলিত করেন। তাদের মধ্যে কাশীরাম দাস প্রণীত বাংলা মহাভারতের
খ্যাতি সর্বোত্তম। পৌরাণিক কাহিনির প্রচ্ছন্নতায় প্রাচীন ভারতের নানান লোকাচার সহ
আর্থসামাজিক বিষয় এবং সর্বোপরি যুদ্ধের নানা রণকৌশল আলোচিত হয়েছে এই গ্রন্থে।
কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ তথা হস্তিনাপুরের
সিংহাসন দখলকে কেন্দ্র করে কৌরব ও পাণ্ডবদের যুদ্ধের ইতিকথায় বলা যেতে পারে এই গ্রন্থের
মূল উপজীব্য। বিস্তীর্ণ বপুসম মহাভারতের কাহিনি সাম্রাজ্যবাদের পাশাপাশি নীতিহীনতা
ও কূটনৈতিক চিন্তা চেতনার নানান পর্যায় বিভিন্ন চরিত্রদের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে।
প্রবাদ বাংলা লোকসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ
একটি অঙ্গ। সেই প্রবাদ অনুসারে বলা যায়, ‘যাহা নাই মহাভারতে
তাহা নয় ভারতে’
অর্থাৎ, এই পুরাণাশ্রিত গল্পগাথার
মাধ্যমে ন্যায় নীতি সৌজন্য তথা শিষ্টাচারের কথাও যেমন প্রতিফলিত হয়েছে, সমান্তরালভাবে
আবেগের সামান্যতম অতিশয্য, হঠকারিতা কিংবা সামান্যতম চারিত্রিক স্খালন কীভাবে একটি
সমগ্র বংশের ক্ষয়কে সূচিত করে তার প্রতিলিপিও পরিলক্ষিত হয়।
ভরতবংশ তথা কুরুবংশের অন্যতম
রাজা প্রতীপের সন্তান শান্তনু ক্রমানুসারে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসেন। আসলে ভরত বংশীয়
রাজা হস্তির নামানুসারে নগরের নামকরণ করা হয় হস্তিনাপুর। তবে মহারাজ শান্তনু ব্রহ্মার
অভিশাপে মর্ত্যে কুরুবংশের সন্তান হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন। পূর্বজন্মের মহাভীষ তথা
শান্তনু ছিলেন ইক্ষাকু বংশীয়। কুরুবংশীয় এই অষ্টম পুরুষ পরবর্তীকালে ‘বরবর্ণিনী’
গঙ্গাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে নির্বাচিত করেন। তাদের অষ্টম পুত্র দেবব্রত মহাভারতের
সর্বোত্তম বলিষ্ঠ চরিত্র হলেও, নির্জনতার অন্ধকারে পর্যদস্তু হয়েছেন সর্বক্ষণ।
পুরাণ অনুযায়ী জানা যায়, অষ্টবসু
ঋষি অভিশাপে নরজন্ম লাভ করে। দেবী গঙ্গা ও মহারাজ শান্তনুর সাতজন পুত্র জন্মগ্রহণের
পরই ‘পতিতপাবনী’র পবিত্র জলস্পর্শে শাপমোচন ঘটে। অথচ অষ্টমপুত্র তথা অষ্টবসুর অন্তিমাংশ
হস্তিনাপুরের রাজ সিংহাসনের রক্ষক হিসাবেই জীবন অতিবাহিত করেন। ইতিহাসের পাতায় তিনি
দেবব্রত ভীষ্ম তথা কৌরব এবং পাণ্ডবদের পিতামহ হিসেবে পরিচিত। তাঁর অনন্যতম বলিষ্ঠতা
এবং নির্জনতার মরুবালুরাশি সম্পর্কই আলোচিত হয়েছে শ্রীত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় প্রণীত
‘তুমি পিতামহ’ রচনাংশে।
দেব লোকের অনুশাসনে পরিচালিত
গঙ্গাপুত্র জন্মের পরবর্তীতেই মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়। সমগ্র জগতের অন্যতম প্রতিপালিতা
গঙ্গাদেবী নিজ দায়িত্বে সর্বদা অবিচল। অথচ তাঁর প্রিয়তম পুত্র প্রতিপালিত হয়েছে
বশিষ্ঠ মুনি এবং অরুন্ধতী দেবীর স্নেহাশ্রমে। অন্যান্য ব্রাহ্মণ বালকদের মতই শান্তনু
পুত্রের শৈশব আবর্তিত হলেও, ভালোবাসার আকিঞ্চন স্পর্শ বরাবরই মরুভূমির মরীচিকার ন্যায়
তার জীবনের চতুর্দিকে আবর্তিত হয়েছে ঠিকই; কিন্তু কখনো তার কোমল স্পর্শ পাষাণ-পুরুষের
বলিষ্ঠতাকে স্পর্শ করেনি।
অনুবাদ সাহিত্যের কিংবা সংস্কৃত
সাহিত্যের আলোচিত ভীষ্ম চরিত্রটি মায়ের মত দায়িত্ব এবং কর্তব্যে যেমন অবিচল ঠিক
তেমনভাবেই রাজরক্ষক হিসেবে সর্বদা নিজের দায়িত্ব পালন করে গিয়েছেন হস্তিনাপুর সাম্রাজ্যের
প্রতি। অন্যান্য ক্ষত্রিয় বালকদের মতই ১২ বছর বয়স পর্যন্ত গুরুগৃহে তাঁর জীবন অতিবাহিত
হয়। পর্যায়ক্রমিকভাবে দেবগুরু বৃহস্পতি এবং মহাযোদ্ধা পরশুরামের সাহচর্যতায় দেবব্রত
ন্যায়-নীতি, আচার-অনুশাসন সহ-সর্বক্ষেত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। তাঁর রণকৌশলের সুচারিতা
মুগ্ধ করে হস্তিনাপুরের রাজাকে। যুবরাজ হিসেবে পিতার সঙ্গে রাজকার্যে মনোনিবেশ করেন
কুরুবংশের জ্যেষ্ঠপুত্র। কিন্তু ললাটের বিধান এবং নর-জন্ম উভয়েই ‘শাঁখের করাত’। দেবব্রত
দেবকন্যার পুত্র হলেও নরজন্মের যন্ত্রণা তাঁকে প্রবলভাবে ভোগ করতে হয়েছে। একদিকে
দায়িত্ব-কর্তব্যের প্রতি সুদৃঢ় মনোভাব এবং অন্যদিকে প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকার মত কঠিন পদক্ষেপ, উভয়ই ভীষ্মের জীবনে
কন্টক সজ্জা নির্মিত করে। রাজা কিংবা রাজ সিংহাসনের অধিকার সে না পেলেও সিংহাসনের
রক্ষক হিসেবে সর্বদা কাঁটার মুকুট তাঁর মাথায় শোভা পেয়েছে। শরশয্যায় সাহিত্য অবস্থায়
সেই ঠিক ভুলের তুল্য-মূল্য বিচারই বারংবার বিদ্ধ করেছে শান্তনু পুত্রকে। তিনি খুঁজে পেতে চেয়েছেন সঠিক উত্তরের
সমীকরণ; “জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল, সবচেয়ে অনুচিত কর্ম সেইদিনই করেছিলেন তিনি। সেইদিন প্রকৃত মৃত্যুই
হয়েছিল তাঁর। এরপর কি বেঁচে থাকার আদৌ কোনও প্রয়োজন ছিল?
শরশায়িত মানুষটির মুদ্রিত চক্ষু
দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। সেই চরম প্রতিজ্ঞার পরে এই দীর্ঘতম জীবনে কি কখনও সত্যিই মাথা
উঁচু করে বেঁচে থাকা ছিল? সারাজীবন শুধু কর্তব্যই করে যেতে হয়েছে। ভালো-ভালো নামে
তাঁকে অভিষিক্ত করেছে সবাই। কিন্তু ওই পর্যন্তই! বিন্দুমাত্র গ্রহণ করেছে তাঁর একবিন্দু
উপদেশ? তারা সকলেই জানত, ওই প্রতিজ্ঞার জন্যও সে কখনও ছেড়ে যেতে পারবে না। রাজপ্রহরীর
সঙ্গে তাঁর কীই বা পার্থক্য ছিল?
শুধুই ব্যর্থতা। শুধু নিষ্পন্দ
হিমালয়ের মতো সব সহ্য করে যাওয়া, মূক-বধির হয়ে অনাচার দর্শকের মতো দেখে যাওয়া... নাঃ!
কোনও প্রতিকার করার ক্ষমতা আর তাঁর ছিল না। ‘ভীষণ’ প্রতিজ্ঞা তাঁর দুইহাত চিরদিনের
মতো শৃঙ্খলিত করে দিয়েছিল।”
রণক্ষেত্রে অপ্রতিহত বীর বয়সে
প্রৌঢ় হলেও কর্তব্যে ন্যায়পরায়ণ। প্রিয়তম পাণ্ডু পুত্রদের প্রতি ধনুক ধারণ করতেও
তিনি পিছুপা হননি। কেবলমাত্র সেই যুক্তিহীন আবেগ এবং প্রতিজ্ঞাকে স্মরণ করে যুদ্ধের
প্রতিটি দিন পাণ্ডব সৈন্য দমনে পিতামহ বিশ্ব সুচারুভাবে রণসজ্জা সজ্জিত করেছেন। যদিও
তাঁর চরিত্রের এই দৃঢ়তা আসমিক জীবন থেকেই লক্ষ্য করা যায়। মহেন্দ্র পর্বতে নিবাসী
পরশুরামের সাহচর্যে রণশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন দেবব্রত। এই সময় ঘন গহীন অরণ্যে লক্ষ্য
করেছিলেন নদী তীরবর্তী অংশের মানুষদের নানান জীবনচিত্র প্রণালী। তাই অবিশ্রান্ত বর্ষণে
যখন বৈশিষ্ট মুনির আশ্রম প্রায় নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়; তখন কিশোর দেবব্রতর
উদ্যোগে আশ্রমিকরা মিলে নির্মাণ করেন বাঁধ। তাঁর নিশ্চিদ্র প্রহরায় বিপত্তি কেটে
যায়।
ক্ষত্রিয় হিসেবে যথাচিতভাবে
অস্ত্রশিক্ষা গ্রহণ করলেও অনুচিতভাবে কখনই কোন মানুষের প্রাণ হরণ বা তাকে বধ করা উভয়
ক্ষেত্রেই নিমরাজি ছিলেন তিনি। ভয়ংকর দস্যুদের দ্বারা আশ্রমের গোধন করায়ত্ত হয়,
অথচ সেই ক্ষত্রিয় বালক যেমনভাবে তার অস্ত্রশিক্ষার পাণ্ডিত্য প্রদর্শন করেছিলেন তেমন
ভাবেই একজন মানুষ হিসেবে দস্যুদের প্রধানের প্রতি মানবতার অমোঘ নিদর্শন তুলে ধরেন।
সেই সাময়িক যুদ্ধে আহত দস্যুর প্রধানসহ বাকিদের
আশ্রমে আশ্রয় দেন বশিষ্ট মুনি। দেবব্রত সহায়তায় তারা ধীরে ধীরে চাষাবাদ সহ নানান
কাজকর্ম শিখে সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে শুরু করে; ‘পনেরোজন দস্যুর জন্যে আশ্রমের এককোণে
কিছু কুটির নির্মিত হল। ওরাও সেজন্য কায়িক পরিশ্রম করল দিনরাত্রি। তারপর অকর্ষিত জমিতে
শুরু হল শস্যবীজ বপন। হল পুষ্করিণী খনন। কয়েক মাসের মধ্যে ছোট একটি পল্লী গড়ে উঠল,
যার বাসিন্দারা জন্ম ও কর্মসূত্রে রাক্ষসজাতির দস্যু। তাদের পোশাক পালটে গেছে, চেহারা
পালটে গেছে।
ওরা শস্যখেতে কাজ করে, গোপালন
করে, শস্য দুগ্ধ বিক্রি করে কাছের রাজ্যে। আর সকাল-সন্ধ্যা ওরাও যোগ দেয় সমবেত সামগান,
প্রার্থনায়। আশ্রমের গুরুমাতা অরুন্ধতী ওদেরও মা।’
যুদ্ধের সূচনায় শাপগ্রস্ত অষ্ট
বসুর অন্তিম সদস্য কৌরব এবং পাণ্ডবদের প্রতি সমানসহৃদয়তা বজায় রাখেন। কাশীরাম দাসের
কলমে বিধৃত হয়েছে সেই আখ্যান, “আমার কাছে গান্ধারী (ধৃতরাষ্ট্রের স্ত্রী) সন্তানেরা
আর কুন্তি ও মাদ্রীর (পাণ্ডুর দুই স্ত্রী) সন্তানেরা সমান প্রিয়।” যে বংশের রক্ষার
কারণে প্রবল দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি, অথচ পরিস্থিতি তাঁকে করে তোলে
অন্যতম ঘাতক। ভালোবাসার আপাতবিন্দু তাঁর জীবনে যেন মাকড়সার জালে জর্জরিত হয়েই থেকেছে।
শৈশবে জন্মদাত্রী মা থেকে পরবর্তীতে গুরুমাতা কিংবা। বৈমাত্রেয় মা কেউই বিশ্বের জীবনে
স্নেহের স্পর্শটুকু রাখতে সক্ষম হয়নি। সত্যবতী চেয়েছেন সিংহাসনের রাশ নিজের পরিবারের হাতে রেখে সুরক্ষিত বলয় গড়ে
তুলতে। অন্যদিকে দায়িত্বের খাতিরে বারংবার ভীষ্মকে কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছেন
তিনি। অযোগ্য প্রশাসক হিসেবে বিচিত্রবীর্যকে হস্তিনাপুরের রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করার
উদ্যোগ গ্রহণ করেন তিনি। মহারাজকে সংসারে ফেরাতে সত্যবতীর নির্দেশে কাশীরাজের তিন
কন্যাকে স্বয়ংবর সভা থেকে বাহুবলে হরণ করে রাজ্যে নিয়ে আসেন দেবব্রত ভীষ্মদেব। অম্বিকা
এবং অম্বালিকা, রাজবধূ হিসেবে কুরু বংশের অঙ্গীভূত হলেও রাজকন্যা অম্বা অচিরেই আত্মাহুতি
দিয়ে জাগতিক মায়া ত্যাগ করেন। তার যুক্তি-শৃঙ্খলতার প্রশ্নবাণ স্বয়ং পরশুরামকেও
প্রিয়তম শিষ্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করতে বদ্ধপরিকর করে তোলে। অথচ রাজরক্ষক ভীষ্ম
কেবল মহান হিসেবে মহীয়ান হওয়ার কার্যক্রমিতায় অন্যায় কেউ নেয় বলে মেনে নিতে বাধ্য
হন। অগোছার এই অবচেতন মন বারংবার ভুলে চলে ভুলের হিসেব-নিকেশ আর মহাভারতের এই অনন্য
বীরকে বিবেক দংশনের জ্বালা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত শরবিদ্ধ করে; “ভুল! সম্পূর্ণ ভুল!
যুক্তিহীন আবেগ, নিজের মহান হওয়ার ব্যর্থ প্রয়াস! নিঃসঙ্গ মানুষটি মর্মবেদনায় ছটফট
করে ওঠেন, এর চেয়ে সেই দিনেই তরুণ দেবব্রতর যমুনার জলে ডুব দিয়ে মরা উচিত ছিল।”
শেষমেষ যুদ্ধের নিয়মাবলী সবকিছুকেই
অতিক্রম করে যায়। সেখানে যোদ্ধার কাছে আবেগ ভালোবাসার পরিবর্তে বিধ্বংসী মানসিকতায়
প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু নিয়তির অমোঘ পরিণতির বিপরীত দিকে যাওয়ার ক্ষমতা নরজন্মে
কেউই পায় না। নরোত্তম রামচন্দ্র কিংবা বংশীধারী মুরারিমোহন কেউই এই চক্রব্যুহ ভেদ
করতে পারেননি। তাই যুদ্ধের ১৩তম দিন তথা অনুশাসন পর্বে শিখণ্ডীর সহায়তায় পাণ্ডবপক্ষ
অপরাজেয় বীর যোদ্ধা প্রিয়তম পিতামহকে শরসজ্জায় শায়িত করে। কিন্তু ইচ্ছামৃত্যুর
বর থাকা সত্ত্বেও প্রাণত্যাগ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না। একদিন নিয়মের বেড়াজালে তিনি
স্বয়ং নিজেকে আবদ্ধ করেছিলেন। অথচ ভাগ্যের পরিহাসে মহাকালের আবর্তমান রেখায় ঘন পিনবদ্ধ
অবস্থায় আবদ্ধ হন তিনি। কারণ ক্ষত্র-ধর্ম অনুযায়ী দক্ষিণায়ন বীর যোদ্ধার অন্তিম
অবসানের ক্ষেত্রে উপযোগী নয়। তাই পরবর্তী উত্তরায়ণ তথা আটান্নটি যন্ত্রণাদীর্ণ দিন
যাপন করতে হয় কুরু বংশের শ্রেষ্ঠতম পুত্রকে। আর সেই দিন যাপনের অবকাশেই তিনি বারংবার
সমগ্র জীবনের সমীকরণের সমাধানে নিয়োজিত করেছেন নিজেকে, "পিতামহ অস্ফুট বলতে
থাকেন, 'আসলে পৃথিবীর কেউ আমার স্বরূপ জানে না। সবাই জানে, আমি মহান্, আমি বীরশ্রেষ্ঠ,
ন্যায়ধীশ। আমি তা নই। আমি ভীরু। স্বার্থপর। কাপুরুষ।”
মহাভারতের একমাত্র অস্ত্রহীন
সারথি, শ্রীকৃষ্ণ সমগ্র পরিস্থিতি পরিদর্শন করার পাশাপাশি, যুদ্ধের ফলাফল কিংবা যুদ্ধ
সংক্রান্ত নানান বিষয়ে কূটনৈতিক পরামর্শ প্রদানে কখনোই পিছুপা হননি। জাগতিক ক্ষেত্রে
পরম করুণাময় পুরুষ হিসেবে তিনি পরিচিত। ব্রহ্মাণ্ডের পালনকর্তার কাছে মনুষ্যসমাজের
সকলেই সন্তান। যুদ্ধের নিয়মানুসারে বিপক্ষ শিবিরের সহায়ক হিসেবে কৃষ্ণ পরিচিত হলেও,
বিশ্বপিতা হিসেবে তাঁর দায়িত্বেও অবিচল। তাই শান্তনুপুত্র দেবব্রতর অন্তিম ক্ষণেও
তিনি গীতার পরম পবিত্র শ্লোক উচ্চারণ করেন। মুক্তিতে সহায়তা করেন মহাভারতের শ্রেষ্ঠতম
বলিষ্ঠ চরিত্র তথা অষ্টবসুর অন্যতম সদস্য গঙ্গাপুত্রকে। ভীষ্মপর্ব মহাভারতের অন্যতম
শ্রেষ্ঠ পর্যায়। কিন্তু পৌরাণিক আখ্যানের অগোচরে সেখানে কুরু বংশের এই বীর যোদ্ধার
হৃদয়ের সার সত্য প্রকাশিত হয়নি। অথচ উপন্যাসিক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়ের মুন্সিয়ানায়
ভীষ্ম চরিত্রের চারিত্রিক বন্ধ, সুচারুভাবে পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়েছে। গ্রীক দার্শনিক
অ্যারিস্টোটল বহু যুগ পূর্বেই বলেছিলেন, কাব্যের
সত্য এবং ইতিহাসের তথ্যের কথা। যেখানে কবি তথা সাহিত্যিক তাঁর অন্তরের অনির্বাচনীয়
দৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের থেকে সামান্যতম অতিরিক্ত বিষয়ই লক্ষ্য করেন। যার
ফলে সাহিত্যের নান্দনিকতা পাঠককে সম্মোহিত করে তোলে। ‘পিতামহ তুমি’ শীর্ষক উপন্যাসে
উপন্যাসিক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায়ের কলমে সেই নান্দনিকতাই প্রতিবিম্বিত হয়েছে।
0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন