কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

বিমান মৈত্র

 

সমকালীন ছোটগল্প


গল্প নয় - গল্প    

(১)                                                                                                              

মালিনী ছাতে দাঁড়িয়ে আকাশ পানে। সন্ধ্যে থেকেই যেমন ঝড় – আতসবাজির। নেশারু রাতে - ওয়াইন এক আতসপাখির নাম হতে পারত। বড়দিনের পথে বাজারে ভীড়, সে ভীড় বড় পসরাময়! আলোলতিকার রং-বাহাদুরিতে খিল্লিরা সেজে উঠেছে। খিল্লি! খিল্লি এক গতরের নাম, ফিক করে হেসে ফেলল মালিনী। রেস্তোরা ও বার্বিকিউ। বিশেষত। সেথায় বিবিধ তালিকা - বয়সের, খাদ্যের। জমকালো পরিধানে আলো যেমন। ইশারায় শরীরি আবেদন, মনে হয় কোথাও বাধাপ্রাপ্ত ছিল না অন্তত মালিনীর জন্য – জনসমুদ্র,  গায়ে গা, হাতে হাত, তাদের মাথায় টুপি, উঁচু নিচু এবং সুউচ্চ অবলোকনে এই ভূখণ্ডকে এক আকাশবাহী পথ মনে হয়, প্রীত মানুষের ঘনিষ্ঠ প্রবাহে ভরপুর। পথ, সে তবে কালো নয়, কালো কি করে হয়, আরশোলা নগরীর একটা ডোমেইনের অনুরূপ তার গঠন যথা বাতাস তাড়িত নদী, ছোট ছোট ঢেউয়ে অব্যাহত।

অনিয়ন্ত্রিত এই জনপ্রবাহ, মুখোশের বাগধারা, আলোর তিমির সজ্জা, গাঢ় বেগুনী বর্ণের কামার্ত সামিয়ানা রাত। পিন ফোটালেই  ফিনকে আসবে রক্ত। এই যেন গোবিন্দের মুখোমুখি বসে আছে, এমনতর মনে হতে মালিনী নিচে নেমে এল। নামার কথা ছিল না। বুঝি গোবিন্দ এসে গেছে, বুঝি তার পিছে পিছে ভয়ও এসেছে। সে ফিরে এসেছে, আজ আর যাবে না, মনের কোণে এই বিশ্বাস - মালিনীকে নিচে নামিয়ে আনলো। বিশ্বাস, যা কখনও মেলেনি- তা সত্ত্বেও।

-- এমন সুযোগ আর পাব না, আধাআধি বখরা মালিনী, নতুন বান্ডিল!

-- কিন্তু বাচ্চা? কে দেখবে ওকে? রেনুকা চলে গেছে। মালিনীর গলায় দৈন্যতা, ভয়ের, ঘৃণার।

-- ওরও তো বেরোতে ইচ্ছে করে। গোবিন্দর মুখে এ কথা যত না সংগত তার চেয়ে অধিক অন্য কিছু রেণুকার স্বপক্ষে রেণুকার জন্য - গোবিন্দর কাছে, মালিনীর এই অভিব্যক্তি চাপার যথাসাধ্য চেষ্টা - থাকল না। তীক্ষ্ণ বড় গোবিন্দর নজর। আর কথা বাড়ালো না মালিনী। কেবল উৎসবের সন্ধ্যার সমবেত আলোর বিষাদমন্ডলের অপরিচ্ছন্ন বরণডালা তাদের ঘরে - আর যাই হোক, তবুও আলো তো, বোধহয় এই কারণেই মালিনীর স্নেহবিজরিত মুখটি মাতা মেরীর মতো, এমনতর মনে হল গোবিন্দর।

-- তাহলে কে দেখবে? কেন, তুমি। বলেই হাসল গোবিন্দ। আমি! আমার শো আছে-- আজ আর কাল,

এই দুটো দিন তো, আমাকে যেতেই হবে। হ্যাঁ, সেটাই তো। - আজ আর কাল এই দুটো দিন আমারও যে মওকা। এই আনন্দ, এই উন্মাদনা, এই ঘোলাটে শিথিলতা, কোথায় পাব আর? আজকের মত? উদাস স্বগোতক্তির একটা সুর -- গোবিন্দ এড়িয়ে যেতে পারল না যে সুর তবু বিষাদের।

-- কিন্তু আমি, আমি এখন কি করব? মালিনীর টায়ার বাস্ট করল।

চুপচাপ কিছু গোবিন্দ, যেন অন্যমনস্ক, শিশুর ঘুমের দিকে তাকিয়ে সে, মালিনীর কোল তার নিশ্চিন্ত আশ্রয়। গোবিন্দ সাধারণত শ্যামলা, গড়াপেটা মুখটি তার, চোয়াল ভাঙ্গা গন্ডদেশ দুটো অর্ধবৃত্তাকার পাথর, প্রত্যয়ী চিবুক সামনে এগিয়ে ঈষৎ। গালের চামড়া দুপাশের মাড়ি পর্যন্ত সেঁধোনো, কপালে ভাঁজ, চিন্তা এবং বিরক্তিতে ভারি, কোটর-নিহিত  চোখের স্বচ্ছতা, উপচে পড়ল এখন শিশুর মুখে এবং নিশ্চিন্ত তার ঘুমন্ত ভাবটি, গোবিন্দর চোখের তরল পারদে প্রতিবিম্বিত দেখা যায়।

(২) 

মালিনী বসে আছে আঁশবটি নিয়ে। কেননা সে বাজারে কেনা মাছের আঁশ ছাড়াতো, কেননা বাবুদের পছন্দ মাফিক মাছের পিস করতে তার জুড়ি মেলা ভার, কেননা কান পাতলেই ওর গলার গান শোনা যেত। সত্য এ কথা, মালিনীর গলায় গান ছিল। এক এক জনের গুণ তার সব্বোনাশের কারণ। কেননা বড় সাবেক, বড় নিচু বটতলার কথাটি এই, দিনের শেষে সর্বোপরি মালিনীর উর্বর গতরখানি বড় বেশি গতর। একটু তাপে সে দীঘির জল শুকোবার নয়। এমন যে, যতই চাপা দেয়া যাক না কেন, পুরুষের ব্যঞ্জন আসক্তি তার শরীরের যাবতীয় আ্যনাটমি ঘেঁটে আসতে পারত নির্বিঘ্নে।

মাছ কাটা সেরে মালিনী গিয়ে বসতো জিতু কামারের সুঠাম মাংসপেশীর সুমুখে। সব বাজার বন্ধ হলে যে বাজার খুলে যায় তার একক খদ্দের মালিনী। এই বাক্যটার ভেতর সোঁদা আঁশটে গন্ধ, আঁশ বটির ধারওয়ালাকে কাছে টানে। বটি ধার দেয়ার মধ্যে যৌন উত্তেজনা থাকে - কামারশালে জিতু কামার বিড়ি খায়, অসময়ে হাপর-চুলা ঘুমায়, জিতুর হ্যাঁচকা টান তাকে জাগায়, যেমন জাগিয়ে তুলতে হয় গুলকয়লার মুড়ি দেয়া ধিরিধিরি আঁচের নিতম্বকে- যখন বেরিয়ে আসতো জিতু কামারের লকলকে শিখা, আছাড়ির মালিনীকে - জিতু একটানে - মালিনী গান, আরো আরো আরো আরও, এমনি করে আমায় …’ তীব্র সে রাগে হাপরের আলাপ - হাপর হৃৎপিণ্ডের - হৃৎপিণ্ডের হাপরের খিদে আর হাতুড়ির ঘায়ে কামনার লাল উথাল পাথাল - উপযুক্ত ধার হলে তৃপ্ত সে মালিনী জলে ডুব দিয়ে-- আহ্ কি আরাম!- নিয়ে ঘরে ফিরে যেত। প্রতিদিন। দেহসুখ সাধনার প্রারম্ভে যেমন তেলে মাছ, প্রথম প্রথম ছ্যাঁত করে উঠত - যেমন বুকের ভেতর যে কোন অব্যবহৃত নারীর, তার সলজ্জ ভীরু  সংস্কার, তেমনই বটির আছাড়ি ধার দেয়ার অন্তে - অন্তরা ও আভোগ – জলের বিস্তারে। আগে দেখলে যা মালিনীর মনে হত, বদলায়নি আজও। এখন মালিনী গোবিন্দকে দেখছে শিশু অবলোকনের আলোয়। প্রত্যয়ী, কঠিন ও পৌরুষের অপ্রাকৃতিকতায় স্নিগ্ধ।

মালিনীর গলায় গান ছিল। জিতুর হাতুড়ির ব্যবহার যেমন। গরম লোহা পিটিয়ে মূর্তি বানাতে পারতো সে। আরও যে কত কি, সব খবর রাখেনি মালিনী। রাখেনি বলেই এইভাবে নিত্য মাছ কাটা আঁশবটির ধারালো সুখ ছেড়ে যখন একদিন গোবিন্দর হাত ধরে মালিনী শহরে এলো – শহর কলকাতা! জিতুর কামারশালে বন্দুকের অংশাদি তৈরির  গন্ধ  পেয়েছিল পুলিশ। কিন্তু কিভাবে যেন মহাজন.... বড় চতুর, বড়  ধড়িবাজ। জিতুর ওরফে চালান হয়ে গেল পার্ক সার্কাসের এক বস্তিতে। তখন মালিনী মাতা মেরী, চোখের নিচে কালি, তখন - ভারী হচ্ছে মালিনীর গতর। পেট ভরা  স্বপ্ন। শহর কলকাতায় তবে এমনি এমনি শহরে আসেনি মালিনী। সুতরাং গোবিন্দ, নিশ্চিত সুপারি শ্যুটার, যা আজ, সেটা গোবিন্দ ভুলে গেল।

যদিও জিতুকে, প্রায়শই গোবিন্দর প্রসারিত হাত জিতুর জন্য মাঝরাতে গোবিন্দর ভাঙ্গা ঘুম ফেরত আসেনা এইসব অবোধ্য দুর্যোগ যেন সশরীর হয়ে ওঠে।

- তাই বলে আজও! যেতেই হবে? অন্তত দু দিনের জন্যও কি এ কাজটা বাদ দেওয়া যেত না? কাল খোকার জন্মদিন, ওর কথাটা অন্তত  ভাবো। মালিনীর সুযোগ নেবার শেষ চেষ্টা, আরও একবার। - সময় নেই। আটটা বাজতে আছে, আমি চললাম। রেণুকাকে ডেকে নাও। একথা যে বলা সে কাজ, মালিনীর মুখের দিকে একটা তাচ্ছিল্যের তাকান দিয়ে বাইপাস ধাবার অভিমুখে - গোবিন্দর পায়ের শব্দের সাথে মিলিয়ে গেল, তার কন্ঠস্বরও। মালিনী শুনতে পেল। মালিনী, পোষাক বদল করার আগে রেণুকাকে ফোন করে, যেন সে চলে আসে - যেন সে সাড়ে এগারোটার মধ্যেই চলে আসে - আসে যেন। মালিনী রাত একটার মধ্যে ফিরে আসবে, আসবেই - পুনরাবৃত্তির এই অঙ্গীকার, রেণুকাকে দিয়ে বারবার, পদে পদে ব্যর্থ হয় জেনেও, করিয়ে নিল।

(৩) 

মালিনী ছেলের পাশে শুয়ে পড়ল। নাইটির উর্ধাংশ খুলে বাইরে টেনে  আনলো তার দুধেল  মাতৃদ্বয়, অদ্যাবধি নিটোল। তাকালে এখনও শুকনো কিসমিসে, দাঁতের আলতো কামড়, শিহরিত নিশ্বাস - শোনা যায়। দুধের দাঁত - আলতো চাপ, কোথায় যেন জীতু, এই ঘরের আনাচে কানাচে এখনও, এখনও। মালিনী ভিজে গেল। ডান হাতে দুধভান্ড, বা হাতে শিশু। দুধের বোঁট মুখে গোঁজার আগেই ঘুমন্ত হাঁ মুখটি যেন  খোলাই থাকে। কারণ কোথাও বেরুবার আগে মালিনী দুধ দিয়ে যাবে তাকে। কবে থেকে লিবিডোর প্রথম পাঠ শুরু হয় শিশুর কামড়ে, মা ছাড়া তেমনটি আর কেউ জানেনা। ঘুম এসেছিল ঘুমিয়েই পড়ত। রেণুকা ডাকলো, কিছু বিধ্বস্ত, কিছু আতঙ্কিত। মালিনী দুধ ছাড়িয়ে নেবার আগেই ছেলেটা কেঁদে উঠল। রেণুকার ছিটকে এসে ছিল আতঙ্কের উল্কা। মুহূর্তের বিরতি। রেণুকার খোলা বুকের উপর জনসমুদ্রের একটা বিচ্ছিন্ন ঢেউ-এর মত মালিনী - বৌদিমনি গো-ও-ও… বলে আছড়ে পড়ল। রেণুকাকে পাশে সরিয়ে ছেলের মুখে পুনরায় মাই গুঁজে রেণুকার দিকে তাকাতেই: তাপস এখনও ফেরেনি- ফিরে আসবে দশটার মধ্যেই, বলে নিয়ে গেল গোবিন্দদা, হ্যাঁ, - ও তাই বলেছিল – আমার ভেতরটা কেমন করছে - গা গুলোচ্ছে। থর থর করে কাঁপছিল তার সর্বাঙ্গ।  আমি পালিয়ে এসেছি। – আজ সকালে, তখন তাপস বাইরে - মদন, হাতকাটা মাহাতো, পরিমল আর খোকন – এসে বাইরে থেকে তাপসকে ডাকল- বাইরে আয়, কথা আছে, সাথে আমাকেও। কি মনে হল,  বললাম গোবিন্দ নেই। ওকে কোই বাত নহী – আমরা বিকেলে আসছি, তোমরা দুজনেই রেডি হয়ে থাকবে। তারপর এলো গোবিন্দদা, কু ডাকলো মনে, সব শুনে গোবিন্দদা আমাকে বলল, তুই যাবিনা, আর তাপসকে – ‘আমার সাথে চল’ - গোবিন্দদা তাপসকে কোথায় নিয়ে গেল বৌদিমনি? কোথায়?

গোবিন্দদা কোথায়, গোবিন্দদা? যেন অপ্রকৃতিস্থ এক ভৌতিক অন্ধকার, যার নিচে তৈরি হচ্ছে তার নিয়তি – অন্ধকার ভর করেছে তার উপর - অজানা সন্দেহ নিয়ে এই কৌতূহল, শব্দের এই অযথা পুনরাবৃত্তি, রেণুকার কথা শুনতে শুনতে বিবশ হয়ে গিয়েছিল মালিনী। একটা অনিয়ন্ত্রিত স্বগোতক্তির ভূতঘোর - জানিনা, কোথা থেকে ফিরে কি একটা কাজ - খুব জরুরী - খুব - ফের বেরিয়ে গেল, যেন না গেলেই নয়, বিশেষ কাজ – বিশেষ; এও একটা ঘোর - একটা অশনিসংকেত - কোথাও ঘনীভূত হতে চলেছে, যা সব কিছু ভেঙে চুরমার করার, ভাসিয়ে নিয়ে যাবার ইঙ্গিত – ক্রমশ পরিষ্কার হয়ে ওঠে, ফ্রী-ল্যান্স ফটোগ্রাফারের স্টুডিওতে, ফটোশপের কারসাজি যেমন, শুধু এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী মুন্সিয়ানা কার, ছবিতে জীবন ও মরণ - দেয়ালে টাঙানো এমন! মালিনী সে - যথাসাধ্য বুক বেঁধে রেণুকাকে বলল, তুই দরজায় খিল মেরে এখানে থাক, বেরুসনে একদম। আমি জনাদাকে বলে যাচ্ছি, এ বাড়িতে ওদের কেউ ঢুকলেই খবর হয়ে যাবে। আমিও তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। ছেলেকে খেয়াল রাখিস। মালিনী বেরিয়ে গেল। ছেলেগুলো এলোনা। আর কেনই বা আসবে, শিকার তো এখন হাতের মুঠোয়। আরে, এটা তো রেনুকার মাথায় আসেনি! বিলাপ, ভয় আর কান্নাকাটি - ঘুমের ওষুধ বুঝি, কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখ জড়িয়ে এলো। আচমকা দরজায় আওয়াজ। পরিচিত গলা, দরজা খোল্, দরজা খোল্ আমি - আমি গোবিন্দ, শিগগির দরজা খোল্। জানে সে, জেনেই এসেছে – মালিনী ঘরে নেই।

একরকম ধড়ফড় করে উঠে বসল রেণুকা। কি করবে বুঝে উঠতে পারল না, এমনকি গোবিন্দর গলা শুনেও। দরজায় ক্রমাগত ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে গোবিন্দ। রীতিমত ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই-গোবিন্দ ঘরে ঢুকে – ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। বিধ্বস্ত, অসংবদ্ধ, নেশায় চুর, পা টলছে - জড়ানো গলায় বলল, ছেলে কই? কালের শিশু ঘুমিয়ে, আপাদমস্তক উলের পোশাকে ঢাকা, পা দুটো ফাঁক করা, হয়তো গলার শব্দে, অস্থির চোখের মনি, আড়মোড়া ভাঙাতে সে চোখ তাকায়, হাসে, আবার পাস ফিরে শুয়ে পড়ে, হয়তো স্বপ্নে – শব্দের চোখ ছিল না, থাকলে – কথা, কথাতেই জড়িয়ে রইল -রেণুকার মাথাটা সজোরে বুকের উপর চেপে - তুই আমার, শুধু আমার - কোই মাই-কা-লাল, আমার  হাত  থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। সামান্যই ছিল তার রেশ, আমি এখুনি ফিরে আসছি, দরজায় খিল দে; বৌদিমনিকে চিন্তা করতে মানা করিস; গোবিন্দ ছুটে বেরিয়ে গেল, কিছু বুঝে ওঠার আগেই। ঘটনা  বড় দ্রুত, অভাবিত - অবধারিত যেন। হতভম্ব রেণুকা। শুধু সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়া পায়ের শব্দের সাথে সাথে রেণুকাও খানিক ছুটল, স্তম্ভিত অচল সে পায়ের শব্দ, মাত্র নিয়তি নির্দিষ্ট শ্রোতাই সেটা শুনতে পায় আজ সেই আততায়ী অনির্দিষ্টের দিকে ওর বিপদ – বিপদ  কেটে যাবে, নিশ্চিত কেটে যাবে, মনে করে রেণুকার অপেক্ষা জেগে রইল।

আধঘণ্টা কেটেছে হয়তো, আবার ধাক্কা - ধাক্কা দেওয়া্র একটা নাম থাকে। প্রাণে জল এল রেণুকার। যেন কোন বিপর্যয়, সাংঘাতিক তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া – এমনতর আলুথালু তার চোখের ভাবখানা, গোবিন্দ এসেছিল, না? কোথায় গেল, কিছু বলে গেছে কিনা, কখন আসবে ..... ধরে রাখতে পারলি না, হাজারো তার ফুলঝুরির অন্ধকার - বলে চলল, অন্য সময় তো সায়ার ভেতর লুকিয়ে রাখতে পারলে বাঁচিস।  এখন পারলি না? আমি সব জানি, আয়নার সামনে দাড়াঁলে তোকেই দেখি। মেয়েদের শরীর যখন পথের গতর হয়, তার ওপর নোট ছাড়া কারোর অধিকার থাকেনা। এখন বুঝেছিস তো, অনেক বুঝিয়েছি এক সময়। টাকা মানুষের নাম পাল্টে দেয়, না হলে জীতু কামার কি করে গোবিন্দ হয়? বল্ কি করে হয়? কান্নায় ভেঙে পড়ল মালিনী। গতর পোড়ানোর তীব্রতা গতর পোড়ানোর আগে বিবেচনা পোড়ায়। নইলে বিবাহপূর্ব যৌনমিলনের বোঝা নিয়ে তাকে জিতু কামারকে ছেড়ে ওরফে জিতুর সাথে শহর কোলকাতার এই গোলকধাঁধায় হারিয়ে যেতে হয়? পদে পদে বিপদ আর অনিশ্চয়তার এ জীবন বড় দীর্ঘ মনে হয়। বিলাপ আদতে এক ঘুমের ওষুধ।

(৪) 

সকাল গড়িয়ে দুপুর – তার ফুরিয়ে গেল শেষ বিকেলের আলো – গোবিন্দ বা তাপস কারুর পাত্তা নেই। সন্ধ্যে হতে না হতে রীতিমত ভয় পেল মালিনী। একবার ভাবল জনাদার কাছে গিয়ে সব বলে, আবার ভাবল আর একটু দেখি। সময় যত যায়, ধৈর্য্য ততই কমতে থাকে।

আবার দরজায় শব্দ। এবার কড়া নাড়ার। মালিনী উঠে গিয়ে বলল, কে? একটু নিচু গলায়, জনাদা। তাড়াতাড়ি খুলে দিতেই জনাদা ভিতরে ঢুকে পড়ল। বসল। কিছুক্ষণ ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর জনাদা যা বলল, তার সারমর্ম এই: তাপসের যৌন অক্ষমতার সুযোগ গোবিন্দ এবং তার গ্যাং-এর অনেকেই নিয়েছিল। কিন্ত গোবিন্দ গ্যাং-লিডার হওয়ায় একাই রেণুকাকে ভোগ করার পরিকল্পনা করে এবং কাউকে সেটা জানতে দেয়না। আর একটা প্ল্যানও ছিল রেনুকাকে নিয়ে - সেটা হাতকাটা মাহাতোর, প্ল্যান-বি, চাটো আর বেচো। এদিকে, সন্ধ্যে বেলা মালিনী বারে চলে গেলে ছেলেকে দেখার জন্য গোবিন্দ রেণুকাকে নিযুক্ত করল। পাখি গান গাইবে, ডিমও পাড়বে। এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই চলছিল। (সংক্ষেপে, তাপস আর গোবিন্দর লাশ হাতে পাবার পর ধরা পড়া চারজনের বয়ান, পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও আশপাশের প্রতিবেশী সত্যান্বেষীদের অনুমান অনুযায়ী জনাদার সংযোজন)

তাপসকে দলে নিয়ে অন্য পরিকল্পনা শুরু হল। কিন্ত মাতাল তাপসের সাথে রেণুকার বচসা - গোবিন্দর বাড়িতে কাজ করা নিয়ে, গোবিন্দর কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ায় সে আর দেরি করেনি। বড়দিনের সন্ধ্যায় মক্ষিরাণী করে একসাথে মদ খাওয়ার প্রোগ্রামে রেণুকার নাম         ‘বখরা-খাতায়’ উঠতেই এক কথায় রাজি হয়ে গেল গোবিন্দ। ওদের দলেই হাত পাকাচ্ছিল তাপস। রেণুকাকে আড্ডায় যেতে বারণ করে পঁচিশ তারিখ সকালে তাপসকে সাথে নিয়ে নিল, সারাদিন দুজনে অনেক গল্প, অনেক আড্ডা, অনেক মদ, অনেক অনেক কিছু, এমনকি – আজই শেষ, এরপর এই কাজ আর ওরা করবেনা এবং পরিত্যক্ত একটা পোড়ো বাড়ি ওদের ঠেক - গিয়ে হাজির হল। তখনও কেউ  আসেনি। খুব সুচতুর ভাবে কাজ সারলো গোবিন্দ। ভরপেট মদ গিলিয়ে নিঃশব্দে গলার নলী কেটে বাড়ির বাগানের লাগোয়া এক ডোবায় ফেলে দেয়া কোন কঠিন কাজ ছিলো না।

(৫) 

মদন, হাতকাটা মাহাতো, পরিমল আর খোকন – গোবিন্দকে ঘিরে ওদের যত পরিকল্পনা। পদমর্যাদায় হাতকাটা মাহাতো গোবিন্দর পরে – সেও আজ গোবিন্দর পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল। গোবিন্দ কিছুই বলেনা, যদিও বাতাস ভারি ও বড় গম্ভীর। আরও কিছু পরে - পরিবেশ কিছু দম বন্ধ করা, কিছু একে অপরের দিকে চোখ চাওয়া-চায়ি মদ্যপান শুরুর প্রতীক্ষায় – মদ্যপান ওদের মাতাল করেনা বরং বুদ্ধির গোড়া তরল রক্তে শানিত, ওদের চেয়ে দেয়াল ঘড়িটার উত্তেজনা বেশি – রেফারি সে, আদিগন্ত সময়ের - বেশি উত্তেজিত। প্রথম মুখ  খুলল মাহাতো, = নিজে হাতে গ্লাসে ঢেলে মদ খাবার দিন আজ নয়, রোজের মত পেঁয়াজ নুন দিয়ে …

:: আমিও তাই ভাবছি। নিচের ঠোঁট বাঁ-হাতের দু আঙুলের ফাঁক দিয়ে চেপে - যেন চিন্তিত, আসছেনা কেন? গোবিন্দ বলল।

:: হ্যাঁ, আমরাও বলছি, আসছেনা কেন? রেণুকাকে চাই, চাই,  চাই, মাহাতো ছাড়া বাকি তিন জন এক সাথে যেন খেপেছে গোবিন্দকে ঘিরে - এইভাবে। প্রতিধ্বনি যেন শকুনের অট্টহাসির মত দেয়ালে দেয়ালে মাথা খুঁড়তে লাগল।

:: মনে হয় তাপসের সঙ্গেই আসবে রেণুকা। গোবিন্দর গলা শান্ত। হাওয়া গরম করে নির্দিষ্ট ছকে কাজ হাসিল করার এই পদ্ধতি গোবিন্দর চেনা। আচ্ছা আমিই দেখছি, যাবে কোথায়? এই বলে - কোথায় যাচ্ছ বস  তুমিই তো কান, তোমাকে ধরে না রাখলে তো মাথার খোঁজ পাব না ভাই। কী যাতা বলছিস? আর কথা বলার সুযোগ পায়নি গোবিন্দ।

মালিনীদের আর এ চত্বরে দেখা গেলনা। শুধু এটুকুই জানা গেল - মালিনী, তার ছেলে আর রেণুকা, জনাদার সাথে তার গ্রামে চলে গিয়েছে। কিন্ত কোথায় সেই গ্রাম সেটা উহ্যই রয়ে গেল, মালিনীর হয়ে তথ্য জানাবার দায় কারই বা থাকতে পারে! মালিনী – রেণুকা ও গোবিন্দর জীবন নানা কথা উপকথায় ধূসর হতে হতে একদিন গল্পে, যা বেঁচে থাকে থেকে গেল।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন