কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

অচিন্ত্য দাস

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৩


বড়দা

সীতেশ হালদার তাঁর অবৈধ কন্যাটিকে গোপনে বালিকা-গৃহতে দিয়ে এলেন। সীতেশ বড় দিদিমণিকে খুলেই বলেছিলেন, “ভুল একটা করে ফেলেছি, ওর মা-ও জন্ম দিয়ে ওপারে চলে গেল। বাড়িতে বৌ-ছেলে-মেয়ে আছে, সেখানে তো ঠাঁই দেওয়া যায় না! আপনিই ভরসা। দেখবেন, যেন আমার পরিচয়  কেউ জানতে না পারে।”

“হুঁ, তাহলে আপনি কোনোদিন এখানে আসবেন না।”

“আসব না!”

“না, আসবেন না। আপনি নামী লোক, ধরা পড়ে যাবেন।””

সীতেশ থুতনি চুলকালেন। মায়া-মমতার থেকে নামধাম, প্রতিপত্তির ওজন বেশি।

“তাই হবে, তবে জিনিস-টিনিস পাঠাতে পারব তো?”

“আলাদা করে নয়। দিতে হলে সকলকে মানে তেতাল্লিশটি মেয়েকেই দেবেন।”

সেই থেকে কচি মেয়েটি বালিকা-গৃহতে রয়ে গেল। নাম হলো নিরুপমা। একটু বড় হতেই দেখা গেল নিরুপমার বুদ্ধি, জানার ইচ্ছে অন্যদের থেকে বেশি। আশ্রমের দিদিমণি নমিতাদির সঙ্গে তার খুব ভাব। নমিতাদিদির কাছে গল্প শোনে, খবরের কাগজের খবর জানতে পারে। নিরুপমা বুঝেছে – প্রতিটি মানুষের অন্তত দুজন নিকটাত্মীয় থাকে। মা আর বাবা। তার মা-বাবা কোথায়?

সীতেশ বছর বছর দুর্গাপুজো, দেয়ালী, পয়লা বৈশাখ এসব উপলক্ষে জামা-কাপড়, মিষ্টি, উপহার পাঠান। তবে একটু খামখেয়ালি মানুষ তো, কখনো ভুলে যান, কখনো আবার যা পাঠান তাতে সবার কুলোয় না। বড় দিদিমণি, নমিতাদিদির চেষ্টা সত্ত্বেও কেউ বেশি পায়, কেউ কম।

নিরু নমিতাদিদিকে ধরে বসল, “এগুলো কে দেয় আমাদের?”

মহামুশকিল। সামাল দিতে নমিতাদিদি বললেন, “আছে একজন। অনেক দূরে থাকেন।”

“কিন্তু আমাদের কেন জিনিস দেয়?”

“তোর বড়দা, তোকে খুব ভালোবাসেন।”

“বড়দা? আগে তো বলনি! বড়দা কেন আমাকে জিনিস দেবে? সে কে? কোথায় থাকে, কেমন দেখতে … বল বল!”

মহা-মুশকিল! এ মেয়েকে কী করে শান্ত করা যায়!

“শোন, তোর বড়দা দূরে থাকলেও তোর খবর রাখেন। কখনো কিছু ইচ্ছে হলে মনে মনে বড়দাকে বলবি। যা চাইছিস ঠিক পাবি। বড়দা খুব ভালো”।

নিরু ব্যাপারটা না বুঝলেও বিশ্বাস করে ফেলল পুরোপুরি।

ঠাণ্ডা লেগে নিরুর সেবার জ্বর হলো। গা-হাত-পায় ব্যথা, মাথা ধরে আছে। কটা মেয়ে তাকে দেখতে এসে দেখে নিরু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বিড়বিড় করছে, “বড়দা, আমাকে ভালো করে দাও!”

আরেকবার অঙ্ক পরীক্ষার আগের দিন শোনা গেল সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলছে, “এবার যেন পাশ করে যাই, বড়দা!”

আশ্রমের স্পোর্টস। দৌড় শুরু করার দাগে দাঁড়িয়ে নিরু বিড়বিড় করেই যাচ্ছে, “বড়দা, আমি যেন জিতি!”

বড়দাকে নিরু দেখেনি, কোথায় থাকে তাও জানে না। নমিতাদিদির কথায় সে ধরে নিয়েছে বড়দা নিশ্চয় আছে – বড়দা তার ভালো ছাড়া খারাপ করবে না।

সেদিন কটা’মেয়ে তাকে চেপে ধরল, “তুই যে সবসময় বড়দা বড়দা করিস, দেখেছিস কোনদিন তাকে?”

“না”

“কোথায় থাকে জানিস?”

“না!”

“তাহলে কেন বোকার মতন বড়দা বড়দা করিস?” 

নিরুপমা এমনিতে শান্ত, কিন্তু সেদিন রেগে উঠে বলল, “তোরা তাহলে ভগবানকে কেন ডাকিস? দেখেছিস তাকে? জানিস, সে কোথায় থাকে?”

 





0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন