কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১৩৮

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২৬

শ্রাবণী দাশগুপ্ত

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ছেঁড়া শেকড়ের অন্তরাখ্যান

 


(১০)  

Colony … a body of people … settled in a distant, foreign country…

শহরটা শান্ত নেই। নানা তাতে অশান্ত হয়ে উঠছে প্রতিদিন। সরকার একরকম বলে, একরকম চায়, রাজনৈতিক দলগুলো সরকারি সিদ্ধান্তের ফাঁকফোঁকর বোঝাতে চায়। প্রবল গণহত্যার শেষে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যারা এদেশে এসে পৌঁছাল তাদের দিব্য পুনর্বাসনের ব্যবস্থা হতে পেরেছে। পূর্বপাকিস্তানের মানুষ শাটল কক, মার খাচ্ছে দুধারেই। ওধার থেকে মানুষ আসছে তো আসছেই প্রায় রোজই। শহরে গিজগিজে ভীড়। যেমন করে হোক মাথা গুঁজে থাকতে পারলেই হল। শিবনাথ যায় পার্কে-ময়দানে বিভিন্ন মিটিং মিছিলে। এপাড়া-ওপাড়া থেকে যায় আরও কেউ কেউ। যাতে নতুন এই ভিটে থেকে উচ্ছেদ না হতে হয়, যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা সঠিকভাবে পাওয়া যায় তার লড়াই। নেতৃস্থানীয়দের গরম বক্তৃতা শুনলে বুকে বল আসে। স্টেশন থেকে, রিলিফ ক্যাম্প থেকে মানুষ তুলে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে অন্যত্র। এরাজ্যে তাদের ঠাঁই হবে না কেন? এই বক্তব্যে যুক্তি যতটা আছে, তার বিরোধী যুক্তিও আছে। বাঙালিরা ছড়িয়ে পড়ুক দেশের বিভিন্ন স্থানে। লড়ে বাঁচুক। সমর্থন করছে একাংশ,

“মন্দ কী অইতাছে? জমি-জাগা পাইব, ঘর বাইন্দা থাকব। আমগ এইহানে গুইজ্যা-মুইজ্যা কোনওমতে থাকন লাগে।

শিবনাথদের পাশের পতিত জমিটার যে একাংশ খালি ছিল সেখানে আরও এক নতুন পরিবার এসেছে। এপাড়ায় রাস্তার কাছাকাছি খালি জায়গা আর পড়ে নেই। খানিক দূরে পানাপুকুর আছে বেশ বড়ো। পুকুরের ধারে আছে বড়ো এক পরিবার, প্রথমদিকে এ অঞ্চলে এসেছিল। বেশ অনেকটা জমিতে ঘর বেঁধেছে তারা। নিজেদের উদ্যোগে সেটা পরিষ্কার করিয়েও নিয়েছে। আরও মজা ডোবা আছে এদিক-ওদিক। তার কিনারে দু-চারটে পরিবার এসে থাকছে। দেখে বোঝা যায় এরা হতদরিদ্র।

শিবনাথরা বিজলিবাতির লাইন, পথঘাট ইত্যাদির দাবি জানিয়ে চলেছে। সরকারের আঠেরো মাসে বছর। হঠাৎ এসে-পড়া এত উদ্বৃত্ত মানুষ সামলে উঠতে গিয়ে দিশেহারা অবস্থা। এপাড়া থেকে রাস্তা ধরে মিনিটতিন হাঁটলে বাসের পাকা রাস্তা চলে গেছে অনেক দক্ষিণে – সেখানে নাকি মাছের ভেড়ি। এদিকে কাছাকাছি স্টেশন আছে, সেখান থেকে ট্রেনেও ক্যানিং যাওয়া যায়। আরও চলে গেলে সুন্দরবন, ম্যানগ্রোভস্ অরণ্য। পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ দুইয়েরই অংশ। শিবনাথ কতদিন একা একা ভাবে একবার ঘুরে আসবে। চাষের জমি, সমৃদ্ধ অঞ্চল, গ্রামগঞ্জ দেখে আসবে। যদি অমলা সঙ্গে যেতে রাজি হয়? খুব ইচ্ছে করে তাকে নিয়ে যেতে। নিশ্চয়ই সে খুশী হবে। শুধু অমলাকে নিয়ে গেলে অবশ্য পাড়াতে কথা উঠবেই। সঙ্গে দিদিকে নিতে হবে। শিবনাথ স্বপ্ন দেখে। অমলার গোল ফর্সা মুখ, লাজুক কালো দু-চোখ, শাড়ি পরার ধরন চোখের সামনে আনাগোনা করে। সে উত্তেজিত হয়ে পড়ে। শিবনাথের বড়দাদা যায় অফিসপাড়ায়, আধা-সরকারি দপ্তরে কী কাজ করে। মেজদাদা শ্রীরামপুরে কাপড়ের কলে কাজ। সবার ছোটো ভাই দেবনাথের কাজকর্মে মন নেই, চেষ্টাও নেই।

ধীরেন্দ্রনাথের বাসায় নানা পরামর্শ নিতে শিবনাথকে প্রায়ই যেতে হয়। সঙ্গে থাকে আরও দুচারজন ছেলে-ছোকরা। অমলাকে আর দেখতে পায়না। শিবনাথ তার দিদিকে ক-বার আগ্রহ করে জিজ্ঞেস করেছে,

“সে কইল কিছু? কথা হয়েছে?”

বাসন্তী ভাইকে আশার কথা শোনাতে পারে না। এমনিতেও বাড়িতে তার বিয়ের কথা এখন ভাবেনা কেউ।

ধীরেন্দ্রনাথের সামনের খোলা বারান্দার মেঝে সম্প্রতি লাল সিমেন্ট করে পাকা করা হয়েছে। বাকি ঘরদুটোও অমলার বিয়ের আগে করতে হবে বলে ক্ষেপেছেন তারাসুন্দরী। ধীরেন্দ্রনাথ ভেবে তল পান না ঘরের পেছনে এত খরচ করলে বিয়ের খরচ কেমন করে কুলোবে? সোনার ভরি আশি টাকা ছাড়িয়েছে। একমন সেরা কোয়ালিটির সরু চাল প্রায় চল্লিশ টাকা। আত্মীয়-পরিজন, গ্রামসুবাদের সম্পর্ক যারা এদেশে ইতিমধ্যে এধারে চলে এসেছেন তাদের নিমন্ত্রণ করা বাধ্যতামূলক। দেশের বাড়িতে যারা আছে, নিমন্ত্রণপত্র পাঠাতে হবে তাদেরও। সর্বোপরি পাড়ার মানুষ – একটি পরিবারকেও বাদ দেওয়া চলেনা। রোজগার করছে বটে দুই ছেলে। তবে বড়ো কিছু নয়। সংসারের খরচ দিয়ে কতটুকু আর জমেছে? তাদেরও ভবিষ্যৎ আছে। তাঁর নিজের সঞ্চয়ের কথা কতবার স্ত্রীকে শুনিয়েছেন,

“ব্যাগত্তা যে করতাছ, কই নাই তুমারে আমার ব্যাঙ্কে অহন আছে খট্টপুরাণ। ঝারা দিয়াও কিছু পাইতা না। কী করমু মাটি কাইট্টা ট্যাহা জুগামু, না মাঠে গিয়া হাল দিমু?”

“তয় কী করবা? নতুন জামাই আইন্যা মাটির ঘরে শোয়াইবা?”

এসব কথার জবাব দিতে ইচ্ছে করে না ধীরেন্দ্রনাথের। তাঁর শরীর যে বিশেষ জুতসই নেই আর, সে প্রসঙ্গ তোলেন না। আজকাল অবুঝের মতো করেন তারাসুন্দরী।

দুই পরিবারে মোটামুটি পাকা কথা হওয়ার পর ধীরেন্দ্রনাথ উত্তর কলকাতায় গিয়েছিলেন পাত্রকে দেখতে। তারাসুন্দরী যেতে চাননি, তাঁর নাকি শরম লাগে। ধীরেন্দ্রনাথের জ্ঞাতিভাই বেহালার দিকে বাসা নিয়েছেন। তিনি গেলেন সঙ্গে। কালীকিঙ্কর গম্ভীর মানুষ, কথা বলেন কম। ধীরেন্দ্রনাথ শিক্ষকতা করেছেন। কথা না বলে তিনি থাকতে পারেন না। পরিতৃপ্তি নিয়ে তিনি ফিরেছিলেন। লক্ষ করে তারাসুন্দরী জিজ্ঞেস করলেন,

“ক্যামন দ্যাখলা? মানায় অমুর লগে? কত না পাশ দিছে পোলা, হেইদিন কইয়া গ্যাসে হের বাপ-মায়ে! তুমার লগে কথা কইল?”

বুক খালি করে নিঃশ্বাস ফেললেন ধীরেন্দ্রনাথ। মাথা নাড়লেন সম্মতিতে। তারপর সংক্ষেপে বললেন,

“হ। মানাইব অমুর লগে।

“বাবা!”

অমলা ডাকল। চা এনেছিল, বুঝতে পারছিল না ভেতরে ঢোকা সমীচীন হবে কিনা। এমনিতে বেড়ার দেওয়াল দিয়ে তার মা-বাবার আলোচনা প্রায় সবই তার কানে আসে। ধীরেন্দ্রনাথ জামাকাপড় ছেড়ে লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে বিছানায় বসলেন। অমলার গলা শুনে ডেকে নিলেন তাকে, পাশে বসালেন। কালো কুচকুচে ঘন চুলভর্তি মাথাটায় হাত রাখলেন। সন্ধে হয়েছে খানিক আগে। বাড়ি-বাড়ি থেকে শঙ্খধ্বনি, বড় পবিত্র লাগে এসময়টা। সন্ধামণি, জুঁই, আকন্দ, আরও গাছপালার গন্ধের মিশেল বাতাসে। তারাসুন্দরীও একটু আগেই সন্ধ্যাবাতি দিয়ে এসেছেন। হ্যারিকেনের আলোয় মেয়ের নত সলজ্জ মুখখানা বড়ো নরম ঠেকল। কোথায় যেন কমলার সঙ্গে মিল পেলেন! বুকের মধ্যে ছ্যাঁৎ করে উঠল। তাড়াতাড়ি বললেন,

“সুখী অইবা অমু। মন খারাপ কইর না। পোলা বড় ভালা। উদার মন। আর শ্বশুরবাড়ি ত বুঝই, বুইঝ্যা চলন লাগে। তেনাগ একই পোলা, হের বউয়ের উপরে দাবী ত থাকবই। মন বুইঝ্যা, য্যামন কইবেন ত্যামন কইরা চলবা। তয় আমি কইছি, তুমি পরীক্ষা দিবা। তেনারা বেবস্থা করবেন। ক্যামন? অহন আমি শুইয়া বিশ্রাম নেই।

ছুটে পালাল অমলা। বাবার এমন আদরে চোখ ভিজে উঠেছে। তারাসুন্দরী বললেন,

“পোলার মায়ে কী কইল? তাইনের ক্যামন য্যান ত্যারাত্যারা বাইক্য। হের বুইন আইছিল? কী কয়?”

বিরক্ত হলেন ধীরেন্দ্রনাথ। গোটানো বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে হাত দিয়ে স্ত্রীকে চলে যেতে ইশারা করলেন। তিনি চোখ বুজে ভাবছিলেন। ভালো লেগেছে ছেলেটিকে। দীর্ঘ, শীর্ণদেহ। চোখে চশমা, প্রশস্ত কপাল। একদা অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলে, আভিজাত্যের আভাস তার স্বভাবে। বাবার মতো গম্ভীর, কথা বলে স্পষ্ট ধীর, মৃদুস্বরে। পূর্ববঙ্গের টান নেই বললেই চলে। স্পষ্ট রাজনীতিক মতামত আছে, দু-চার বাক্যে সেই আভাস পেলেন। মেজো ছেলে মনোরঞ্জনের কথা মনে পড়ল কতবছর পর! মধুসূদনের মতো শান্ত, নির্বিবাদী ছিল না সে। ছিল অনন্ত প্রাণশক্তিতে উচ্ছল। রাজনীতি নিয়ে সজাগ ছিল ওই বয়স থেকেই। কলকাতায় পড়তে এসছিল। প্রথম সারির নেতাদের মিটিং হলে উপস্থিত থাকতই। স্বপ্ন ছিল বৃটিশদের ছিবড়ে করে-দেওয়া দেশটাকে নতুন করে গঠন করার। বলত,

“দেইখেন বাবা, বৃটিশরা যাওয়ার উদ্যোগ নিলেও আমগ নেতারা তাগরে ছাড়ব না। তাগর কোট ধইরা ঝুইল্যা পড়ব!”

“কী যে কও তুমি মনু! ন্যাতারা কত যুদ্ধু করতাছেন  

“দেইখেন আপনে। আমি মিটিং-এ শুনছি, যিনি কইছেন তিনি সক্কলের চাইতে দূরদর্শী।

কমলাকে দেখতে আসার সময়ে সে চলে গিয়েছিল ইউনিভার্সিটি হস্টেলে, বলেছিল,

“আমি কয়দিন দেইখ্যা লইয়া পরে যামুনে।

তারপর পরিবার, রাজ্য ও দেশে ঘটে-যাওয়া বিপর্যয়ের সারি। মনোরঞ্জন হারিয়ে গেল। তার সেই টেলিগ্রাম থেকে ধীরেন্দ্রনাথ অনুমান করেন দাঙ্গার সময়ে নোয়াখালি গিয়েছিল সে। বুকের মধ্যে কষ্ট জমে আছে থকথকে কালো রক্তের মতো। ঘরে সে সময়ে কেউ ছিল না। কী এক টেলিপ্যাথি ঘটেছিল পাশাপাশি বসে। দিবাকর বলেছিল,

“কোনও চিন্তা করবেন না।

“কিয়ের চিন্তা? আমি ত চিন্তা করি নাই।

“আমার সব কথা বাবা-মা কি বলেছেন?”

অবাক হয়েছিলেন ধীরেন্দ্রনাথ। ছেলে মেধাবী, কিন্তু নানা কারণে লেখাপড়ার ব্যাঘাত ঘটেছে বারবার – তার বাবা-মা বলেছিলেন। দিবাকর নম্রস্বরে বলেছিল,

“আমার মনে হয় সব আপনাকে আমার জানানো উচিত।

সেভাবে শুনতে চাননি ধীরেন্দ্রনাথ, কে জানে কী জানাবে। তবু চাপা আগ্রহ জন্মেছিল। পূর্ববঙ্গ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়ে সে কলকাতায় আই-এস-সিতে ভর্তি হল। কলেজ হস্টেলে থেকে পড়াশোনা, পরীক্ষা দিয়ে ফিরে গেল বাড়িতে। কনকপ্রভা সে সময়ে বেশ অসুস্থ ছিলেন। তিনি একটু সুস্থ হলে ফিরে এল সে। কালীকিঙ্করের ইচ্ছা ছিল সে ডাক্তারি পড়ুক। তখন চারদিকে নানান গোলমাল। দিবাকর নামী এক কলেজে বি-এস-সিতে ভর্তি হল। ক্লাস করল কিছুদিন। তারপর দাঙ্গা, সমস্ত বন্ধ। দাঙ্গা মিটলে কালীকিঙ্কর লোক পাঠিয়ে তাকে জোর করে নিয়ে গেলেন নিজের কাছে। একমাত্র ছেলেকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু দিবাকরের রাজনীতির দীক্ষা ততদিনে হয়ে গেছে। দেশভাগ সম্পন্ন হলে তাঁরা সমস্ত ছেড়ে চলে এলেন কলকাতায়। দিবাকর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভুক্ত সাধারণ এক কলেজে বি-এস-সিতে ভর্তি হল। ডাক্তারির খরচ চালানোর অর্থ কালীকিঙ্করের পক্ষে দেওয়া আর সম্ভব ছিল না। দিবাকর নিজেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। সে তখন রাজনীতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ ও সক্রিয় সদস্য।

দম নিল দিবাকর। খানিক পরে প্রশ্ন করল,

“এসব বলার দরকার ছিল। আরও একটা কথা জানিয়ে দিই, পার্টির কাজ করতে গিয়ে আমি গ্রেপ্তার হয়েছিলাম। প্রায় দুই বছর জেলের ভাত খেয়েছি।

ধীরেন্দ্রনাথ চমকে উঠেছিলেন। সমস্ত শরীরে কাঁপুনি ধরল। তারাসুন্দরীকে জানালে এই মুহূর্তে বিয়ে নাকচ করে দেবেন। সেজন্য অমলাকে দেখতে গিয়ে বারবার দিবাকরের মা কনকপ্রভা বলছিলেন,

“বাপের ঘরে আসনের জন্য কান্না করবা না। হ, পূজাপার্বণে আইতে পারবা। আমার পোলারে যত্ন করবা। হের কত ভালা সম্মন্দ আইছিল, ঠিকুজি মিলে নাই কইয়া আউগাই নাই।

ধীরেন্দ্রনাথ তাঁর জ্ঞাতিভাইকে সঙ্গে নিয়ে বাসস্টপে এলেন। পাশে পাশে কালীকিঙ্কর। ধীরেন্দ্রনাথের হাতখানা ধরে বললেন,

“একটা কথা আপনেরে কওন লাগে। গৃহিনী কইতে দেন নাই। আমার পোলায়,”

“দুইবচ্ছর জেলে আছিল।

“কেডা কইছে? দিবাকর?”

“হ।

“আপনে কি পিছাইয়া যাইবেন?”

“না। আপনের সৎ, উপযুক্ত পোলা। দুর্নীতি, চুরি-ডাকাইতি করে নাই। এয়ার পর আমার কইন্যার ভাইগ্য। আমি দরিদ্র শিক্ষক। কিছু বুঝি আর না বুঝি সৎ মাইনষের চক্ষু দেইখ্যা বুইঝা ফালাইতে দেরি লাগে না।

“হেরে ঘরে বান্ধনের লাইগ্যা বিয়া দিতে চান আমার অর্ধাঙ্গিনী। মাইয়ারে জিগাইয়া লইয়েন।

ধীরেন্দ্রনাথ হেসেছিলেন। তিনি ঘরে কাউকে কিছুই জানাবেন না। এই নিয়ে তোলপাড় হোক তিনি চান না। যদি দিবাকর নিজে মনে করে, তবে বিয়ের পর সে নিজেই স্ত্রীকে জানাবে। কালীকিঙ্কর চলে যাওয়ার পর তিনি তাঁর জ্ঞাতি ভাইকে বললেন,

“যা শুনলা মনে রাইখ্য না। হেইগুলা তুমার বউদিদিরে ঘূণাক্ষরেও কবা না। আমার মন লয়, অমু এগো ঘরে সুখী অইব।

তারাসুন্দরী নিজের লুকোনো গহনার পুঁজি খুলে বসলেন। কাঠের বাক্সে সাদা আদ্দির কাপড়ে-মোড়া ছোট্ট এক পোঁটলা। একজোড়া পাথর-বসানো বাউটি, যদিও সামান্য ক্ষয়ে গেছে। নক্সা-করা মকরমুখী ফারপো বালাজোড়ার একখানা আছে, অন্যটা রমলাকে দিয়েছেন। গলার দু-ভরির মফচেনটা তাঁর শাশুড়ির দেওয়া। মাঝারিমাপের কানবালা একজোড়া, আর দুটো ছোট্ট গিনি। ছেলেমেয়েদের অন্নপ্রাশনের এতটুকু এতটুকু আংটি, সরু বালা পড়ে আছে। গলার সুতোর মতো চেইনের একটা নাতিকে দিয়েছেন। অন্যদুটো ভেঙে অমলার জন্য একটা গড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর নিজের গলায় পাতলা চেইন, কানে ক্ষয়ে-যাওয়া ছোট্ট তারাফুল। তারাসুন্দরীর চোখ জলে ভাসে। এমন শূন্যতা সহ্য করতে পারেন না। অমলাকে যাহোক কিছু দিতে পারলেও, এরপর ছেলেদের বউ আসবে। তাদের কী দেবেন? নাতি-নাতনিরা? এতটুকু গয়নার ভরসাতে ঘরের মেঝে পাকা করার জন্য স্বামীকে জোরাজুরি করছিলেন তিনি। তারপর চোখ মুছে সোজা হলেন। ঘরের মেঝে যেমন আছে থাক, ছেলেরা রোজগারপাতি বাড়লে নিজেরা করে নেবে। তিনি আর ধীরেন্দ্রনাথ মিলে ভিতটুকু তো রেখে দিয়ে যেতে পারছেন।

ঠিক করলেন, ধীরেন্দ্রনাথকে কাছাকাছি স্যাকরার দোকান খোঁজ করতে বলবেন। যা অক্ষত আছে, না ভেঙে পালিশ করিয়ে দেবেন।

(ক্রমশঃ)

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন