দোমোহনীর
মেছুয়া
পুতুলরাণী হাপিস হয়ে যাওয়াতেই হাফ-খরচা হয়ে গেল নিতাই শীর্ষেন্দুর মানবজমিনে। তবে দোমোহোনির মেছুয়া নিতাইয়ের এমনটা হয়নি। নিতাইয়ের বৌ ফুলমনি, নিতাই বলে নুনুর মা, সাপের কামড়ে গত হওয়ার পর নিতাই জটাও রাখেনি, কপালে সিঁদুরও পরেনি। কৌপিন ওকে রোজ ভোররাত্তিরে পরতে হয় যখন দোমোহোনিতে গাড়ির টিউবের নৌকোয় চেপে মাছ ধরতে জলে নাবে নিবারণ গৌরাঙ্গ আর দিবাকরকে নিয়ে।
রাত থাকতে সাইকেলের পেছনে টিউব জাল দড়িদড়া বেঁধে নিয়ে আসতে হয় এই দোমোহনীর ঘাটে।
মেছুয়ারা সাইকেলে বা পায়েহেঁটে দোমোহনীর ঘাটে পৌঁছোয়। সাইকেল দাঁড় করিয়ে দেয় ঘাটের বালিতে ভগবান ভরোসে।
নিতাই কনকনে শীতে প্রায় রোজ রাত্রিতে হাড় হিম হয়ে যাওয়া জলে প্লাস্টিকের সুতোয় বোনা জাল আর পলিথিনের দড়িতে বাঁধা ছোটোছোটো থার্মোকলের টুকরো নিয়ে টিউব নৌকা জলে ঠেলতে ঠেলতে হেলায় নেবে যায় একটা লাল কৌপিন গায়ে। গায়ের কাপড় সবই তো ভিজে চুপচুপে হয়ে যায় তাই গায়ে যথাসম্ভব কম কাপড়ই রাখে।
দোমোহানী সুবর্ণরেখার ধরে মেরিন ড্রাইভ ঘেঁষে গজিয়ে ওঠা পঞ্চবটি, নির্মলনগর ইত্যাদি বস্তিগুলোতে রাতদুটো বাজতেই ভোর। আধারাত্রের এই কর্মকাণ্ডে ছোটোবড়ো সবাই সামিল।
ছোকড়ারা
হাতে বাঁশের সিঁড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে
সুবর্ণেখার ধারে গড়ে ওঠা টিস্কোর ফ্যাব্রিকেশন ইউনিটের পাঁচিল টপকে লোহা চুরি
করতে। নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়াতে
কর্তৃপক্ষ পাঁচিল আর কাঁটাতারের উচ্চতা বাড়িয়েছে। পেটের টান ছোকরাদের উদ্ভাবনী
মুশকিল আসান করে দেয়। কখনো কাঁটাতার কেটে আলগা জুড়ে দেওয়া, যাতে প্রয়োজনে
ক্ষিপ্রগতিতে তার খুলে ভিতরে নেমে পড়া যায়। আক্রান্ত হলে সিকিউরিটি গার্ডদের ছিটকে
দেওয়ার জন্যে পাঁচিলের বাইরে দাঁডিয়ে থাকা পার্টনারদের কাছে নির্দেশ আসে ইটপাটকেল
বৃষ্টি করার। ওদের এই ছন্দবদ্ধ লোহাচুরির উদ্ভাবনী কর্মকাণ্ড আরো অন্যদিকে
বিস্তৃতি পেল। ওদের সংঘবদ্ধ ঐকতান একরাতে দোতলার ফ্ল্যাট থেকে আমার ল্যাপটপটা
হাপিস করে দিল।
ওদের
ডোবালো ডোবো ব্রিজ। ওটা চালু হয়ে যাওয়ার পার সবসময় দুটো লালনীল বাতিওয়ালা পুলিশ গাড়ি
দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিশ তাড়া করে ঘরে পৌঁছে যায় পয়সা ছিলতে। তাই ইদানিং লোহা চুরির
ধান্দাটা একেবারেই মার খেয়েছে।
অন্যদিকে
নুনুর মায়েদের ভোররাতে জুটে যেতে হয় সবদিক সামাল দিতে। দুটো ভাতের জোগাড়ে লেগে
পড়তে হয়। সাত সকালে ছানা গুলোর পেটে কিছু দিতে হবে। তারপর বাবুদের কাজের বাড়ি ছোটো।
বাবু বিবিদের কেউ দেরিতে ওঠে। আবার কেউ ভোর থাকতে অনলাইন সেবায় নিয়োজিত। কাজের
মেয়েদের অফিসটাইমের জটিল হিসেব ঠিক রাখতে ওদের আধারাত থেকে তৎপর হতে হয়।
সারাবছর ঘাটের চেহারা এক থাকে না। কখনো পানার জঙ্গল ঠেলে জলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যায়। কখনো অতিবৃষ্টিতে বানের জলে পানারজঙ্গল ভেসে নদী একদম সাফ।
টিউবের নৌকার আবার রকম ফের আছে। কেউ একটা টিউবে, আবার কেউ দুটো টিউবে বাঁধাবাঁশের ভেলা চাপিয়ে হুড়মুড় করে জলে ভেসে যায়। নাদির মাঁঝামাঁঝি গিয়ে জাল ফেলে মাছ ধরা। কত মাছ, কী মাছ ধরা দেবে সবটাই কপাল।
ডোবো ব্রিজটা হওয়ার আগে যখন নৌকা চলত তখন এভাবে মাছধরা
মাঝরাত্রে শুরু হতো। ফিরতে হতো খরকাই নদির দিকটা দিয়ে যেদিকে মানুষজনের উৎপাত নেই।
সেইসময়ে দুটো নৌকো ডিজেল মোটর চালিয়ে ভটভট শব্দে জল তোলপাড় করে মানুষ, সাইকেল, সবজির পুটলি, খড়ের আঁটি নাবিয়ে দিত দোমোহনীর ঘটে। মানুষ ছুটে আসছে আসছে দূরের গ্রাম শহরবেড়া, উত্তমডিহি, কান্দ্রাবেড়া, ডোবো, পুরিসিলি, কামারগোড়া, রগুড়ি থেকে। সকলকেই সময়ে পৌঁছাতে হবে গন্তব্যে। দেরি হলে বেচতে না পারা মালের বোঝা নিয়ে ফাঁকা পকেটে আবার ঘরে ফিরতে হবে।
সব্জি যাবে সোনারি আর কদমা বাজারে, বাচ্চারা যাবে স্কুল। তাদের মাস্টারাও ওই নৌকো থেকে সাইকেল নিয়ে নেমে দৌড়োবে। কখনো একটা গোটা মোটরসাইকেল নৌকোয় পার হতো।
ডোবো ব্রিজ চালু হওয়ার পর নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এখন যেকোনো সময় টিউব নৌকো ঠেলে জলে নেমে পড়া।
ব্রীজটা তৈরি হওয়ার আগে পারাপারের জন্য আরো একটা নৌকো চলতো। সেটা চলতো ঠিক যেখানে এখন ব্রীজটা হয়েছে ঠিক সেই সরলরেখায়। ব্রিজ আসতে সেই নৌকাটাও একদিন হারিয়ে গেল।
যতদিন
সেই নৌকো চলতো এক অপূর্ব নিসর্গ চিত্র জেগে উঠতো। সূর্য উঁকি মারার আগে শীতের ভোরে
ঘন কুয়াশায় সংগ্রামী ভঙ্গিতে মাঝি নৌকো বাইছে। এই নৈস্বর্গিক জলছবি একেক দিন একক
চেহারায় দিগন্তরেখার ক্যানভাসে আঁকা হয়ে যেত।
আর সূর্যোদয়ের পরে অন্যরকম আরেক ছবি। দোমোহনীর ঘাট থেকে দৃশ্যের এই বৈচিত্র কতবার ক্যামেরায় ধরেছি। আবার ফিরে এসেছি নতুন দৃশ্যের খোঁজে।
ডোবো ব্রীজের কল্যাণে সে ছবি গায়েব হয়ে গেছে। সারাবছর নদীর চেহারা এক থাকে না। খুব গরমে নদী শুকিয়ে প্রায় নালা হয়ে যায়। কোনোবার শীতেও নদী শুকিয়ে যায়। কিছু লোক তখন পায়ে হেঁটে জল ঠেলে আরাপার করে।
চান্ডিলা
ড্যামটা হওয়ার পর জল খুব কমে গেলে ছট জাতীয় পুজো পার্বণে প্রশাসন জল ছেড়ে নদীকে নদী বানায়।
আগে মাছের বৈচিত্র্য তেমন ছিল না। পুঁটি টেংরা আর সিলভার কাপ জাতীয় কছু উঠত। বহু মানুষকে উৎখাত করে চান্ডিলে সুবর্ণরেখাকে বেঁধে দেওয়ার পর মাছ চাষ শুরু হলো ড্যামের ঝিলে। আর সেই ঝিলের মাছ লিক করে সুবর্ণরেখায় আসতে শুরু করল। এখন সুবর্ণরেখায় অনেক রকমের মাছ - পাবদা, চিংড়ি, আড়, চারাপোনা। রুই কাতলা তো আছেই।
কিন্তু মাঝে মাঝেই বাদসাধে কলকারখানা থেকে ছাড়া রাসায়নিক বর্জ্য। সেদিন সব মরা পচা মাছ ওঠে। নিতাইরা মুখ পাংশু করে খালি ঝোলা নিয়ে ঘরে ফেরে।
নিতাইকে
জিজ্ঞসা করেছিলাম-
-হ্যাঁ রে মরা
মাছগুলা বেচিস না কেনে?
-ওই কেমকেলে মরা মাছ একবার বিকলে খইদ্দার ঘুইরে চইলে যাবে। আর থানা পুলিশ হইলে দমে পিটাবে।
ঠান্ডাজলে কাকভেজা নিতাই অবলীলায় জাল থেকে মাছ ছাড়ায়। আমি ক্যামেরা হাতে ডাঙ্গায় দাঁড়িয়ে থরথর করে কেঁপে মরি। নিবারণ বলে,
-আজ
দমে যাড়াইছে।
নিবারণ
গৌরাঙ্গদের মরা খড় কাঠকাঠি প্লাস্টিকের
আবর্জনা জলা আগুনে হাত ঘষে ঘষে তাপ পোহাতে থাকি।
নিবারণ
বেসুরে টুসুর গান জুড়ে দেয়।
আমাদের ছোটবেলায় টুসুর গান নাগরিক জটিলতা বিবর্জিত একই সুরে ছড়ায় বাঁধা একরকম ছিল
লাইগলো আগুন পিয়াঁজের দরে
পিয়াঁজ দেইখতে
চোখে জল ঝরে
তোকে কে দিলো
রে লাল শাড়ি
বিস্টুপুরের বুড়হা পাঞ্জাবি
ফচকে ছোঁড়ারা
স্টিকার লেগে থাকা গগলস চোখে মত্ত হয়ে
গাইত
খরকাই নদীর এক
গলা জলে
ও তোকে কইরবো
লো তলেতলে
ইউটিউব
আর মোবাইলের কল্যাণে টুসু গানের ভোল
পাল্টে গ্যাছে। নিবারণ বলে
-দেখেন
দাদা সীতারাম মাহাত মেমোরিয়াল কলেজে কুন্দন কুমারের গানে সবাই নাইচে দিলো।
দোমোহনির ঘাটে
এখন শুনতে পাবেন
শ্যাম্পু কইরে
চুল উড়াবো কানে লিবো দুল
ভদ্দর হইয়ে
যাবে হাইকে আমার দিব গুলাব ফুল
বাবুর বিহায়
দিনেই নাচে হিলাই দিব ঝামরা তল
হামিও কি
মাইনব সেদিন উড়াবো শাড়ির আঁচল
হিন্দি
গানের আদলে এখনো ডাবল মিনিং গানও শুরু হয়ে গেছে।
নুনুর মাইয়ের
গুনের কথা শুনলে পরে যাবেন কুথা
অচুর পাচুর
কইরতে ছিল ছোটকার সাথে
এগো নুনুর
বাপে দমে জোরে গুঁতাই দিল সইন্ধারাতে
যেদিন নিতাইয়ের দল অনেক রকমের বড় মাছ নিয়ে কিনারায় ফেরে সেদিন জাল থেকে মাছ ছাড়াতে ছাড়াতে নিবারণের দল বলের নেত্য খুব বেড়ে যায়। কখনো হিন্দি গান উত্তাল সুরও বাজে-
লাগাইলে তু
জব্ লিপিস্টিক
হিলেলা সারা
ডিসটিক
মানভূমের বাংলা এখনো সভ্য বাঙালির কাছে হাসির বস্তু। যখন স্কুলে পড়তাম প্রত্যন্ত এলাকা থেকে সাধারণত মাহাতো, ভূইঁয়া,গড়াই, বেড়া পদবীর যে ছেলেগুলো আসতো স্রেফ মানভূমি বাংলার জন্যই আমাদের তাচ্ছিল্যের শিকার হয়েছে। আজো অবস্থা বদলায়নি। আজো যখন পোটকা, গীতিলতা বা হলুদপুকুরে মেরাকি নাম একটি NGOর কর্মকান্ডে যোগদিতে যাই স্থানীয় মানুষ আমাদের সাথে বা আমাদের সামনে নিজেদের মধ্যেও বাংলা নয় হিন্দিতে কথা বলে। স্থানীয় স্কুলের হেডমাস্টার মন্মথ জানালো,
-হামরা
হামদের বাংলায় কথা বইললে হামার বেঙ্গল থেকে আসা
সহকর্মীরাও হাঁসে। হামদের কথা শুইনলে উহাদের হাসি পায়।
শুধু
হিন্দি নয় বাংলাও ভাষা সাম্রাজ্যবাদীদের দলে।
নিতাই,
নিবারাণদের বউয়েরা গজিয়ে ওঠা শত শত অ্যাপার্টমেন্টে কাজের
মেয়ে। এরা সকলেই প্রায় বাঁকুড়া আর পুরুলিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে ভিটেমাটি
ছেড়ে রুটি রোজগারের খোঁজে দোমোহনি সুবর্ণরেখার ধার ঘেঁষে মেরিন ড্রাইভ ঘিরে
গজিয়ে ওঠা পঞ্চবটি, নির্মলনগর
বা এরকম আরো কয়েকটি বস্তিতে মাথা গুঁজেছে।
নিতাইয়ের মতো আরো অনেক মেছুয়ার ছানারা টিউব নৌকোয় মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়ে। শিশু শ্রমিক এখানেও কাজ করে মাছ ধরতে, জাল থেকে মাছ ছাড়াতে। পঞ্চবটি বস্তির লাওয়ারিস বেকার শিশু শ্রমিক আবর্জনার স্তুপ থেকে লোহাটিনা প্লাস্টিক কুড়িয়ে সাপ্লাই করে ওই লোহাটিনার প্লাস্টিকের ঠেলাওয়ালাদের কাছে।
বৌ ফুলমনি মারা যাওয়ার নিতাই একদম স্থবির হয়ে গেলো। ছেলেপিলে সংসার ভুলে সুবর্ণরেখার ধরে অনর্গল নিজের মানে বকত। সর্পদেবী মনসাকে গালিগালাজ করতো। নিবারণ আর গৌড় পরিস্থিতি সামাল দিতে লাদনা বাঁকুড়া থেকে নিতাইয়ের স্বামী পরিত্যাক্তা শালীকে নিয়ে আসলো হাল ধরতে। মাসখানের পারে নিতাই কিছুটা ধাতস্থ হলো। নিবারণদের সাথে মাছ ধরাও চালু হলো।
যে বছর নিতাইয়ের বৌ সাপের কামড়ে মারা গেলো পঞ্চবটি বস্তিতে বাঁকুড়ার ধীবর কুল সে বছরও মনসা মায়ের পুজো দিলো। ওদের মনসা পুজোয় বেহুলা লখিন্দর মূর্তি পুজো হয়। রাত্রে মা মনসার মূর্তি হইহই করে ডিজে মিউজিক আর ডীস্কো লাইট জ্বালিয়ে দলবল মনসা মূর্তি জলে নাবাতেগিয়ে দেখলো নাদির জল বেড়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। বোধহয় ডোম থেকে জল ছাড়ছে। ভাসানপার্টি কোনোমতে দুটো সিঁড়ি নেমে মূর্তি দোমোহনীর জলে নামিয়ে দিয়ে ব্যান্ডবাজা নিয়ে প্রাণভয়ে পগারপার হলো।
- পরের দিন ভোরবেলায় নিতাই দেখতে পেলো আস্ত মূর্তি জল থেকে উঠে সিঁড়িতে বহাল তবিয়তে বসে আছে।
সাইকেল ঠেলে
পাড়ে উঠতে উঠতে নিবারণ বললো
হ্যাঁরে
পাতাললোকেও জাইগা মিলছে নাই তোর!
নিতাই গজগজ
করে বললো
-চাঁদসওদাগরের
অনেক পইসা তাই উহাকে তুই বাঁচাইলি। মরা গরিব জনমদুখহি নুনুর মা'কে মরালি। মা মনসা
না খালিভরী ছিনারি।শালী পইসা চিনহে।

















0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন