বর্ণমালার সাতকাহন
(পর্ব_
৩২)
আমাদের মায়ের দিকে যেমন সাহিত্য এবং লেখা লিখির একটা প্রচলন ছিল, দিদিমার বন্ধু ছিলেন প্রতিভা বসু, শরৎবাবুর বাসায় যাওয়া ছিল, ছোটবেলায় দেখেছি বাড়িতে কবি শম্ভু রক্ষিত, নবনীতাদিকে সব সময়, বাবার বাড়ির একান্নবর্তী পরিবারে কাকা জ্যাঠা সকলের ছিল শরীরচর্চা এবং ফটোগ্রাফির নেশা। সকলেরই একাধিক নিকন ছিল, বাড়িতে ছবি ওয়াশ করতেন, সেজঠাকুমা মোহনবাগান ক্লাবের সদস্যা ছিলেন, নিয়মিত যেতেন ক্লাবহাউসে বসে খেলা দেখতে। বাড়িতে ছিল নানা রকম পোষ্য পাখি-কুকুর-মাছ এবং বেড়াল। এঁদের এক সময় জমিদারি ছিল বজবজে সেকথা এঁরা কখনও বলতেন না।
এঁরা তিনপুরুষ ধরে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের
কর্মচারী ছিলেন। একটা সময় ছিল আমাদের ছোটবেলায় যখন কিছুমাত্র অর্থ প্রদর্শন বা ধনী
মানে সে বড়ো লজ্জার ছিল মানুষ সংকোচে গোপন করত সচ্ছলতা যেন কত অপরাধ।
এই বাড়ির কনিষ্ঠতম পুত্র ইঞ্জিনিয়ার।
তাঁর কথা আজও ভুলতে পারি না। একটি আলোকোজ্জ্বল দিন কিভাবে নির্মম কালো রাতের আঁধারে
শেষ হয়ে যায়।
বাড়ির বোধহয় সবচেয়ে মেধাবী ছেলে।
সব দাদারা কেন্দ্রীয় সরকারের অফিস করলেও সে ইঞ্জিনিয়ার হয়েই কিছুদিন পর চাকরি ছেড়ে
ব্যবসা শুরু করেন। ইমারসন হিটার, স্টোভ প্রভৃতি নয়া প্রযুক্তির ব্যবহারে নিজে তৈরি
করে অর্ডার সাপ্লাই এর ব্যবসা। এই মধ্য কলকাতার
বনেদি বাড়িটিতে কালো গোদা টেলিফোন তিনি প্রথম আনলেন। দারুন স্টাইলিশ যুবক। উত্তমকুমারের
ছায়া যেন। প্রসঙ্গত উত্তমবাবু থাকতেন নিকটে সেই সময় একটি ভাড়া বাড়িতে সুপ্রিয়া
দেবী সহ। খুব একটা আকাশ ছোঁয়া নয় স্বাভাবিক পড়শি। আমি জন্মাইনি অবশ্য। সেভাবেই শোনা
একটু বড়ো হয়ে উল্টো দিকের একটি বাড়ির মেয়েকে ভালোবাসতেন কাকা। বিয়ে হয়নি। হয়ত
বর্ণশ্রমগত জাত ধর্ম গত কোনও সমস্যার জন্য। মেয়েটির বিবাহ হয়ে যায়। আমার কাকা।
A loser in life, a damm lover. আবেগপ্রবণ। ব্যবসা চলেনি। গভীর অভিমানে গুটিয়ে নিলেন
নিজেকে। মানসিক অন্তরীণ মুক্ত করতে পথ দেখাতে সেদিন নজর দেয়নি বৌদিরা দাদারা কেউ।
বিরহের কবিতা লিখেছেন একের পর এক। তারপর ছাদে গিয়ে জ্বালিয়ে দিতেন। আবার বহু কবিতা
ফ্রেমে বাঁধিয়ে দেয়ালময় টাঙানো। দেখেছি সেসব। কেউ রাখেনি। বাড়ি প্রমোটারকে দিয়ে
দেবার পর সেসব ফেলে দিয়েছে সবাই। একরোখা এই
মানুষটিকে কেউ বুঝতে চায়নি। মা নির্ভর জীবন ছিলো। ঠাকুমা আকাশের দেশে চলে গেলেন। দেখাশোনার
জন্য যে চাকরটি ছিল সে সপরিবার বাস করতে শুরু করল। চৌকিদারের বাচ্চাটিকে ভালোবেসে ফেলেছিলেন।
কাকার ভাগের টাকা আত্মস্যাৎ করার লক্ষ্যে নিজের দেশে আদর করে নিয়ে গেল। ভালোবাসাকে
প্রতারণা করার লোক চিরদিনই। তৎপর। টাকাও ফুরোলো তারাও তাড়িয়ে দিল। কপর্দকহীন অসুস্থ
মানুষটিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এক দাদা। কিন্তু দুর্বার একরোখা মানুষটিকে কে আর সহ্য
করবে! দারুন অসুস্থ সেইসময়, প্রস্টেট সমস্যা, আলসার পেটে, হাত পা কাঁপে,অসাড়ে পায়খানা
করে ফেলেন। এসেছিলেন শেষবার আমাদের বাড়ি,
তাঁর ছোটোদাদার গৃহে। হয়ত ঘর নোংরা করে ফেলেন। বড্ড অভিমানি। কেউ আটকায়নি। রক্তের
সম্পর্কেরা ফিরে দেখেনি। আমার পায়ের তলায় সেদিন মাটি ছিলো না। ছোটোবেলায় আমার জন্য
আমুল চকোলেট কিশোরদের জন্য প্রকাশিত পুজোসংখ্যা, ফেলুদা...।
শোনা যায় নিজেদের আদি সেই বাড়ির
সামনের ফুটপাতে পেচ্ছাপ পায়খানা মেখে পড়ে থাকতেন। আশপাশের দোকানের লোকেরা রুটি, কখনও
একটা মিষ্টি ধরিয়ে দিতো। শীতরাতে, রোদে জলে মরে কাঠ হয়ে খাটিয়ায় পড়ে ছিল লোকটা।
দোকানদারেরা চাঁদা তুলে সদ্গতি করে। কেউ না খেয়ে আছে সহ্য করতে পারি না। একথাও মনে
হয় সেই মেয়েটি যদি বিয়ে করত...
প্রণয় এত নির্মম এত নিষ্ঠুর মানুষকে
কুড়ে কুড়ে শেষ করে দেয় কর্কট রোগের মতো!
"টের পাই যুথচারী আঁধারের
গাঢ় নিরুদ্দেশ
চারিদিকে মশারির ক্ষমাহীন বিরুদ্ধতা
মশা তার অন্ধকার সঙ্ঘারামে জেগে
থেকে
জীবনের স্রোত ভালোবাসে।"
আজ দিন মেঘলা। আঁধার। মনের অবাধ্য মাকড়সা জাল বুনে চলে। এই সময় আমি ক্রমশ একাকী হয়ে যাচ্ছি একটা জনবহুল দ্বীপের ভেতর। ধীরে ধীরে আনন্দ নিতে পারার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলছি। আজকের যুগে বহু দাম্পত্য শীতল হতে হতে গ্লেসিয়ার। রোজকার বাক্যবাণ, উতোর চাপান মন তিতিবিরক্ত অনেকের। অধিকাংশ পুরুষ কাজের জায়গার চাপ আর বাড়ির এই পরিস্থিতির হতাশা মদ খেয়ে ভুলে থাকতে চায়। ছেলে মেয়ে চাকরি হাজার কর্মযজ্ঞে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। মৃত্যু আকর্ষণ করে। এভাবে জীবন মৃত্যুর টাগ অফ ওয়ার চলতে থাকে। পৃথিবীতে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা আসে যায়। কখনও মরণ টানে কখনও ভালোবাসার খিদে। এর মধ্যে একঘেঁয়ে জীবন।
কীটপতঙ্গের জীবন। জৈবিক হিসেব মেনে
চলে যায় আর আসে নিশ্ছিদ্র কুয়াশা। একই বাড়ির ছাদের তলায় দুটি পৃথক দ্বীপ হয়ে বসবাস।
ভালোবাসা আসবে অনেক পরে বিকেলের আলোয় ক্ষণিকের। এবং শেষ স্টেশনে। সে গল্প আলাদা।
(ক্রমশ)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন