কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কাজল সেন

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৪


মেয়ে অসাধারণ

খবরটা ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত। এসব খবর দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। ইদানীং যাকে বলা হয় ভাইরাল হয়ে যাওয়া।  আসলে মানুষ শিক্ষিত হোক বা অশিক্ষিত, ভদ্র অথবা অভদ্র, বিনয়ী বা খিটকেল, অন্য কারও কেচ্ছাকাহিনী জানার বা শোনার অথবা পড়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকে। এবং জেনে-শুনে-পড়ে এক  অনস্বাদিত স্বর্গীয় আনন্দে নিমজ্জিত হয়। এই যেমন চন্দ্রলেখার কথাই ধরা যাক না কেন! চন্দ্রলেখা আমাদের পাড়ার মেয়ে। একটা নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের নিতান্ত সাধাসিধে মেয়ে। আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই সে একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছিল। কখনও কারও সঙ্গে ঝগড়া করেনি, মারামারি করেনি, কারও পাকাধানে মই দেয়নি। হঠাৎই একদিন তার মনে হয়েছিল, জীবন তো একটাই, তাহলে নেহাতই একটা সাধারণ মেয়ের মতো জীবনটা অতিবাহিত করবে কেন! সেও তো অসাধারণ মেয়ে হয়ে উঠতে পারে! গড় উচ্চতা থেকে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে! হাজারটা চন্দ্রলেখা নামের ভিড়ে তার চন্দ্রলেখা নামটা স্বতন্ত্রভাবে উচ্চারিত হতে পারে! না, এসব ভাবনার কথা সে কারও কাছে প্রকাশ করেনি। প্রকাশ করলেও কারও আপত্তি করার বা বিরোধ করার যুক্তি খুঁজে পাওয়া যেত না। অবশ্য অন্যকারও আপত্তি বা বিরোধ থাকলেও চন্দ্রলেখার কিছু যায়-আসে না! চন্দ্রলেখা নীরবে নিঃশব্দে নিজেকে সাধারণ মাত্রা থেকে অসাধারণ মাত্রায় উত্তীর্ণ করার দৃঢ়সংকল্পে ব্রতী হলো। অনেক চিন্তাভাবনা করে স্থির করল, কীভাবে সে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।

চন্দ্রলেখা একটা অতিসাধারণ সরকারী স্কুলে পড়ত। স্কুলপরীক্ষায় যেমন-তেমনভাবে উত্তীর্ণ হয়ে পরবর্তী ক্লাসে উঠত। কিন্তু হঠাৎই সবার, মানে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকা, স্কুলের সহপাঠী-পাঠিনী,পাড়া  প্রতিবেশীদের নজরে পড়ল, স্কুলের সব পরীক্ষায় প্রথম স্থানাধিকারিনী চন্দ্রলেখা। এবং শেখানেই থেমে যাওয়া নয়, একাদশ-দ্বাদশক্লাসে ভর্তি হলো একটি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে। সেখান থেকে মারাত্মক রেজাল্ট করে কম্পটিটিভ এক্সামে ভালো র‍্যাঙ্ক করে পড়া শুরু করল একটি প্রথমশ্রেণীর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। সেই কলেজ থেকে বি-টেক পাশ করে যোগ্যতা অর্জনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এম-টেক ডিগ্রি অর্জন করল।

চন্দ্রলেখা সম্পর্কে এতটা জেনে যে কেউ মন্তব্য করতে পারে, তার এই সাফল্যের জন্য তাকে অবশ্যই অভিনন্দন জানানো যেতে পারে, কিন্তু এরমধ্যে অসাধারণত্ব কিছু নেই। এবং সত্যিই তাই। আসলে এরপর কারও জানা ছিল না, চন্দ্রলেখা কেমন আছে, কোথায় আছে, কী করছে! চন্দ্রলেখা আমাদের পাড়া ছেড়ে  আগেই চলে গেছিল। বেশ কিছুদিন এভাবে অতিক্রান্ত হবার পর আচমকা একদিন চন্দ্রলেখাকে দেখা গেল একটি পাঁচতারা হোটেলে এক বিদেশীব্যক্তির দেহলগ্না হয়ে একটি স্যুইটে প্রবেশ করতে। দৃশ্যটা দেখেছিলেন আমাদের পাড়ার বাসিন্দা মিস্টার মেহেরা। পরদিনই খবরটা ভাইরাল হয়ে গেল, চন্দ্রলেখা এখন উচ্চবর্গীয় স্তরের দেহপোজীবিনী। যদিও সেদিনের এক দৈনিক ইংরেজি সংবাদপত্রে এক বিদেশি গুপ্তচরের ধরা পড়ার খবর ছাপা হয়েছিল। চন্দ্রলেখার নাম উল্লেখিত না হলেও পরোক্ষভাবে তার প্রশংসা করা হয়েছিল। বস্তুত কারও পক্ষেই একথা জানা সম্ভব ছিল না যে, উচ্চশিক্ষিতা চন্দ্রলেখাকে কেন্দ্রীয় সরকার নিযুক্ত করেছিল উচ্চস্তরের গুপ্তচরবৃত্তির কাজে, যে কাজে প্রয়োজনে শরীর ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন