সিনোগ্রাফি – নাটকের
প্রয়োজন? না কি অনুকরণের বকচ্ছপ?
সিনোগ্রাফি।
বাংলার নাট্যজগতের মানুষেরা এবং নাট্যমোদী দর্শকবৃন্দ ধীরে ধীরে এই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত
হয়ে উঠছেন। যদিও এ নতুন কিছু নয়, বরং গুরুদেবের ভাষায় – “অতি পুরাতন ভাব, নব আবিষ্কার”,
তবে এর পিছনে জড়িয়ে থাকা নব্য কলা-কৌশল অনস্বীকার্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ‘অতি পুরাতন’
বলতে কত পুরাতন? তা জানার আগে, বিষয়টি সম্পর্কে কিছু সম্যক ধারনা হওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ
‘সিনোগ্রাফি’ কী? নাটকের কোথায় এবং কীভাবে তার ব্যবহার হয়? অতীতে কারা কারা এবং কী
কীভাবে তার ব্যবহার করেছেন? বর্তমানেই বা তা কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে? ইত্যাদি… ইত্যাদি…
ইত্যাদি…
নাটক এক যৌথ শিল্পমাধ্যম, যেখানে সাহিত্য, অভিনয়, সংগীত, নৃত্য, আলো, মঞ্চসজ্জা—সবকিছু মিলেমিশে এক সামগ্রিক ও নান্দনিক দৃশ্যকল্প সৃষ্টি করে। এই সামগ্রিক দৃশ্যকল্পকে দৃশ্যমান ও কার্যকর করে তুলতে যে সমস্ত শিল্পকৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তারই সামগ্রিক নাম সিনোগ্রাফি। ‘সিনোগ্রাফি’ শব্দটি গ্রিক ‘স্কেনে’ (মঞ্চ) ও ‘গ্রাফিয়া’ (অঙ্কন বা নির্মাণ) শব্দ থেকে এসেছে। নাটকে সিনোগ্রাফি বলতে বোঝায়—মঞ্চের সামগ্রিক দৃশ্যরূপ নির্মাণ, যার মধ্যে থাকে মঞ্চসজ্জা, আলো, পোশাক, রঙের ব্যবহার, প্রপস বা উপকরণ, এমনকি কখনো কখনো শব্দ ও স্থান ব্যবস্থাপনাও বোঝায়। একজন সিনোগ্রাফার নাটকের পাঠ্য ও নির্দেশকের ভাবনা অনুযায়ী মঞ্চের ভিজ্যুয়াল ভাষা নির্মাণ করেন। এবং তিনি যদি দক্ষ সিনোগ্রাফার হন, তা হলে আলো ও রঙের মাধ্যমে দর্শকের অনুভূতিকে নাটকের প্রয়োজনানুগ পথে পরিচালিত করতে পারেন। অর্থাৎ, নাটকের প্রথম যুগে পর্দার উপর রং দিয়ে এঁকে যে দৃশ্যপট বোঝানো হতো, যাকে সাধারণত ব্যাক-ড্রপ বলা হোত, বা যে সাইক্লোরামায় আলো ফেলে আকাশ বা আগুনের দৃশ্যকল্প তৈরি করা হোত, তাও কিন্তু সিনোগ্রাফিই ছিল। সে যুগে এমন অনেক দৃশ্যই মঞ্চে হুবহু উপস্থাপন না করে ঐ ব্যাক-ড্রপ বা সাইক্লোরামার ব্যবহার দিয়ে বোঝানো হত। এতে অবশ্যই মঞ্চসজ্জার ব্যয়ভার অনেকটাই লাঘব করা যেত। একটি নাটকে তার নির্দেশক নাটকের দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ করেন, আর সিনোগ্রাফার সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে দৃশ্যায়নে সাহায্য করেন। সংলাপ, অভিনয় ও নির্দেশনার সঙ্গে মিলিত হয়ে সিনোগ্রাফি নাটককে দর্শকের কাছে জীবন্ত করে তোলে। একটি সফল সিনোগ্রাফি নাটকের বক্তব্যকে স্পষ্ট করে, আবেগকে গভীর করে এবং যথাযথ হলে তা দর্শকের স্মৃতিতে নাটককে স্থায়ী আসন পেতে সাহায্য করে।
শুরুর দিকে আমরা দেখেছি – পটভূমি রঙ করা কাপড়, হাতে আঁকা ব্যানার, আলো ও বিভিন্ন রঙ দিয়ে তৈরি করা পরিবেশ ইত্যাদি, কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে নাট্যশালায় প্রজেক্টর দিয়ে ছবি, আলো, ভিডিও বা ডিজিটাল অ্যানিমেশন প্রদর্শন করা হচ্ছে, যা নাটকের দৃশ্যে এক নতুন মাত্রা আনে। একটি স্থির মঞ্চসজ্জা যেখানে একবার তৈরি হলে পুরো নাটক জুড়ে একই রকম থাকে, সেখানে প্রজেকশনের মাধ্যমে মুহূর্তে মুহূর্তে দৃশ্য বদলানো সম্ভব। স্থানান্তর, সময় পরিবর্তন, স্মৃতি, স্বপ্ন কিংবা কল্পনার দৃশ্য—সবকিছুই সহজে তুলে ধরা যায়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নাটকের ভাষা আরও প্রতীকী ও বিমূর্ত হয়ে ওঠে। এর ফলে দৃশ্যগুলি আরও জীবন্ত, গতিশীল এবং দর্শকের মনের কাছে বাস্তব অনুভূতির মতো প্রতীয়মান হয়। সিনোগ্রাফিতে প্রজেকশন ব্যবহারের অর্থ হচ্ছে – কেবল মাত্র সাধারণ ব্যাক-ড্রপ বা সেট নির্মাণ নয়, বরং ডিজিটাল ছবি/ভিডিওকে মঞ্চের পটভূমিতে, পর্দায় বা এমনকি সরাসরি মঞ্চের বিভিন্ন উপাদানেও ছড়িয়ে দিয়ে একটি ডায়নামিক ও পরিবর্তনশীল দৃশ্য সৃষ্টি করা। পুরো নাটকের পরিবেশ পরিবর্তন, আবহ বদলানো, বিশেষ ভিজ্যুয়াল ইফেক্ট তৈরি — সবই প্রজেকশনের মাধ্যমে সহজে সম্ভব হয়। তবে এই যে আধুনিক প্রযুক্তির কথা বললাম, তা কিন্তু আদৌ ঠিক ততটা আধুনিক নয়। হ্যাঁ, এ কথা ঠিক যে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ১৯২০ – ৩০ সাল থেকেই এগিয়ে থাকা নাট্য নির্দেশকেরা এর বহুল ব্যবহার করা শুরু করেন, তবে তা যেন একটি পুরোনো বিষয়কে নতুন পোশাক পরিয়ে আধুনিকতার প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী ফিরিয়ে আনা। কারণ এর অনেক অনেক আগেই ‘ম্যাজিক লানটের্ন’ এবং ‘ফ্যান্টাস্ম্যাগোরিয়া’র মত সাংগীতিক উপস্থাপনায় এর ব্যবহার হয়ে গিয়েছে।
আমরা যদি খুঁজে দেখি যে আধুনিক সময়ে প্রজেক্টর ব্যবহার করার প্রথম কৃতিত্ব কার, তাহলে ১৯৩০-এর চেক নাট্যপরিচালক ‘এমিল ফ্রান্তিশেক বূরীহান’এর নাম খুঁজে পাই। ১৯৩৬ সালে বূরীহান তাঁর নাটক ‘স্প্রিং এওকেনিং’এ ‘থিয়েটারগ্রাফ’ নাম দিয়ে একটি পদ্ধতি প্রয়োগ করেন, যেখানে স্লাইড ব্যবহারের নজীর পাওয়া যায়। এটি ছিল প্রজেকশন ও লাইভ অভিনয়ের সংযোগকে একসাথে স্থাপন করার একটি প্রাথমিক উদাহরণ।
আবার ঠিক এই সময়েই জার্মান পরিচালক ‘এরউইন পিসক্যাটর’কে নাটকের দৃশ্যে প্রজেকশন ব্যবহার করতে দেখা যায়। তিনি বরাবরই থিয়েটারকে “শিক্ষা ও সমাজ পরিবর্তনের মাধ্যম” হিসেবে বিশ্বাস করতেন এবং প্রজেকশনকে রাজনৈতিক এবং সামাজিক বার্তা পৌঁছানোর একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাঁর নাটকে, হয়তো চলতি নাটকের সাথে প্রত্যক্ষ সম্পর্কযুক্ত নয়, কিন্তু সে নাটকের বক্তব্যের সঙ্গে সাযুজ্য আছে, এমন সব দৃশ্য স্লাইডের মাধ্যমে দেখানো হোত। এবং তাঁর দেখাদেখি অনেক পরিচালকই সেই পথ অবলম্বন করা শুরু করেন। কেন? কারণ –
ক) দৃশ্য পরিবর্তনের স্বাচ্ছন্দ্য ও গতিশীলতা –
প্রতিটি দৃশ্যে ব্যাক-ড্রপ বা সেট পরিবর্তন একটি সময় ও শ্রমসাধ্য বিষয়, কিন্তু প্রজেকশন এক ক্লিকে সে বদলে ঘটাতে সক্ষম। যেমন ধরা যাক কোনও একটি দৃশ্যে হয়তো জঙ্গলের আভাস থাকা প্রয়োজন, আবার হয়তো তার পরের দৃশ্যে প্রয়োজন কোনও শহরের ঝকমকে পরিবেষ। মঞ্চসজ্জার পরিবর্তন নয়, মাত্র একটি ক্লিক সহজেই সে বদল করে দিতে পারে। এতে দর্শকের অভিজ্ঞতা গতিশীল হয় বটে, তবে নাটক বাস্তবসম্মত হয় কি না তা ভেবে দেখার প্রয়োজনীয়তে আছে বৈকি।
খ) আর্থিক সাশ্রয় –
আগে মঞ্চসজ্জা সম্ভবত একটি নাটকের সবথেকে ব্যয়বহুল বিষয় ছিল। শেক্সপিয়ারিয়ান নাটকে বা এমন কি অনেক অন্যান্য সামাজিক নাটকেই মঞ্চসজ্জা এতটাই বড় হোত, যা তৈরিতে অর্থ, লোকবল ও সময় সবই লাগত অনেক বেশী। এই চাপ থেকে মুক্তির উপায় খোঁজার নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সাজেস্টিভ মঞ্চসজ্জার জন্ম। কিন্তু তাতে বাস্তবের থেকে কল্পনার উপর নির্ভর করতে হয় অনেক বেশী। সে তুলনায় ডিজিটাল প্রজেকশন ব্যবহার করে অতি সহজেই খরচ কমিয়ে নাটকে বিভিন্ন পরিবেশ দেখানো যায়।
গ) আবহ ও অনুভূতির উন্নতি –
প্রজেকশনের মাধ্যমে কেবল দৃশ্য পরিবর্তন নয়, বরং আবহ, মেঘ, আলো, ছায়া, গতিশীল বস্তুসমুহ (যেমন গাড়ী, ট্রেন বা প্লেন), সবকিছু মিশিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিবেশ তৈরি করা যায়, যা দর্শকদের মনের সঙ্গে যুক্ত হয়। আবার পিসক্যাট সাহেবের মত নাটক থেকে সাময়িক ভাবে দূরে সরে গিয়ে অন্য এমন দৃশ্যও দেখানো যায়, যা নাটকের বক্তব্যকে আরও দৃঢ় করে। যেমন ধরা যাক কোনও যুদ্ধবিরোধী নাটকে, প্রেক্ষাগৃহ অন্ধকার হয়ে যখন নাটক দৃশ্যান্তরে যাচ্ছে, তখন সেই অন্ধকারে স্লাইড বা মুভি সিনোগ্রাফিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখানো যেতেই পারে। ইত্যাদি ইত্যাদি।
ঘ) প্রজেকশন ডিজাইনের আধুনিক ধারা –
প্রজেকশন প্রযুক্তি এখন শুধু পটভূমি বানানোর মাধ্যম নয়, এটি নাটকের গল্প বলার এক গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। ডিজিটাল ভিডিও, অ্যানিমেশন, লাইভ ক্যামেরা ফিড — সবকিছুই এখন মঞ্চে জীবন্ত দৃশ্যসজ্জা তৈরি করে।
তবে আধুনিক প্রজেকশন ডিজাইন সম্পর্কে কোনও কথা বলতে হলে প্রথমেই যাঁর নাম করতে হয়, তিনি ‘ওয়েণ্ডাল কিন হ্যারিংটন’। তিনিই আধুনিক প্রজেকশন শিল্পের পুরোধা, যাঁকে ‘দি কুইন অফ প্রজেকশন’ বলা হয়। তিন দশকের বেশী সময় ধরে তিনি ব্রডওয়ে’তে প্রায় ৩৫টির মত নাটকে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে সিনোগ্রাফির কাজ করেছেন। ১৯৯২ সালে প্রথমবার তিনি ‘দি হুজ টমি’ নাটকে সিনোগ্রাফির ব্যবহার করেন, এবং সফল হন। এর পর অবশ্য শিল্পী দম্পতি ‘ডেভি’ এবং ‘ক্রিস্টিন ম্যাকগুইর’ তাঁদের নাটক ‘দি আইসবুক’ নাটকে প্রজেকশন ম্যাপিং এবং ইন্টার্যাক্টিভ এনিমেশন ব্যবহার করে সোরগোল ফেলে দেন, এবং সে ধারা আজও ব্যবহৃতই শুধু নয়, বরং উত্তরোত্তর বিকশিতই বলা উচিত, তবু এ শিল্পের জননী অবশ্যই ‘ম্যাডাম ওয়েণ্ডাল’, এবং তাঁর হাত ধরেই সিনোগ্রাফির আধুনিক যুগের সূচনা বলে ধরে নেওয়া হয়।
এবার আসি কয়েকটি এমন নাটকের বিষয়ে, যেগুলিতে সাফল্যের সঙ্গে সিনোগ্রাফি ব্যবহার করা হয়েছে। বিদেশী নাটকের কথা বলব না, কারণ তাতে লিস্টি অকারণ দীর্ঘ হবে, আমি বরং ভারতীয় নাটকের কথাই বলি। এ বাবদে প্রথমেই আসে মাননীয় ইব্রাহীম আলকাজি’র নাম। তিনি তাঁর পরিচালিত নাটক ‘তুঘলক’, ‘অন্ধাযুগ’ ইত্যাদিতে স্লাইড প্রজেকশন ও প্রতীকী ছবির মাধ্যমে যুদ্ধের ইতিহাস এবং মানসিক সংকটকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এরপর সতীশ আলেকর, আদিত্য চৌধুরী, ও এমন অনেক দিকপাল পরিচালকেরা এ পদ্ধতি অবলম্বন করেন। বাংলার দিকে তাকালে দেখা যায় একেবারে হালফিলের প্রথিতযশা পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম শ্রী কৌষিক সেন, শ্রী ব্রাত্য বসু, শ্রী দেবেশ চ্যাটার্জী’র মত মানুষেরা, সুন্দরম’এর মত ঐতিহ্যবাহী নাট্যদল, ব্যবহার করছেন এই মাধ্যম।
তাহলে কি মঞ্চের নাটককে বলিষ্ঠ করার জন্যে সিনেমা শিল্পের ব্যবহার গ্রাহ্য হয়ে গেল? নাটক তো নিজেই এক বলিষ্ঠ এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ গণমাধ্যম। হ্যাঁ নাটক অন্যান্য অনেক শিল্পের সমষ্টিগত রূপ, তা বলে তাকে অন্য শিল্পের উপর এতটা নির্ভরশীল হতে হবে কেন! নাট্যশাস্ত্র কি তবে লোকচক্ষুর অন্তরালে ক্রমক্ষিয়মান! মঞ্চের অভিনয়সৌকর্য কি সিনোগ্রাফির উজ্জ্বল চাকচিক্যে ঢাকা পড়ে যায় না? বা, এক সরলরেখায় চলতে চলতে অকস্মাৎ অন্য কাহিনীর বা অন্য দৃশ্যের ক্ষণিক বিচ্ছুরণ কি নাটককে দিকভ্রান্ত করে তোলে না? নাট্যমোদী দর্শকের একাগ্রতা কি নষ্ট হয় না তাতে? এর কি সত্যিই কোনও প্রয়োজন আছে, না কি এ কেবল অনুকরণপ্রিয় জাতীর হুজুগে ভাসা বকচ্ছপ সৃজন? সময় এ সমস্ত প্রশ্নের জবাব দেবে। কারণ যা ঠিক, তাই বাঁচে, যা ঠিক নয়, তা কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যায়।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন