বাগ্দেবী বিদ্যাদায়িনী
প্রচলিত যে দেবী সরস্বতীর বরে দেবীর বরপুত্র কালিদাস মহামূর্খ থেকে মহাপণ্ডিত হয়েছিলেন, সেই আদিকাল থেকে সনাতন ধর্মে, বৈদিক যুগ থেকে পৌরাণিক যুগ পেরিয়ে বর্তমান কালেও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে পূজিতা হয়ে আসছেন দেবী সরস্বতী। এই সুদীর্ঘ কালে সরস্বতী বন্দনায় সনাতন ধারায় কিছু বিবর্তন অবশ্যই ঘটেছে। ব্যুৎপত্তিগত অর্থে, সর:+ বতুপ +ঈ (স্ত্রী লিঙ্গে)। সর: শব্দের অর্থ জল বা জ্যোতির আধার, বতুপ্ অর্থে বিদ্যমান, আর তার সঙ্গে স্ত্রী লিঙ্গে ‘ঈ’ প্রত্যয় দিয়ে নামশব্দটি হল ‘সরস্বতী’। এভাবে সরস্বতী শব্দের লক্ষণার্থ হলো, যে দেবীর মধ্যে জল বা জ্যোতির প্রবাহ বিদ্যমান তিনি সরস্বতী। পরমপুরুষের অনন্ত অনাদি জ্ঞানের অপ্রকাশিত ভাণ্ডার অপার করুণা বলে বিগলিত হয়ে ধরিত্রীর বুকে সরস্বতী রূপে প্রবাহিত হচ্ছে।
খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে রচিত সুপ্রাচীন
ঋকবেদে সরস্বতী দেবতার কথা প্রথম পাওয়া যায়। আর্যাবর্তে প্রবাহিত সরস্বতী স্রোতস্বিনীকেই
ঋষিরা বন্দনা করেছিলেন দেবীরূপে। দুর্ভাগ্যক্রমে সরস্বতী নদী বর্তমানে লুপ্ত। এই নদীর
বাস্তবতা নিয়ে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলেও কোনো কোনো গবেষক আর্কিওলজিক্যাল ও জিওলজিক্যাল
সার্ভের মধ্য দিয়ে কিছু কিছু তথ্য এই নদী সম্পর্কে পেয়েছেন। তারা মনে করেন, এই নদীর
অস্তিত্ব প্রমাণিত হলে আর্যদের সম্পর্কে বহিরাগত তত্ত্ব ভুল প্রমাণিত হবে। অথচ এই সরস্বতী
নদীকেই আর্যরা তৎকালে প্রধান পবিত্র নদী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং দেবী হিসেবে শ্রদ্ধার
সঙ্গে আরাধনা করতেন। পরবর্তীকালে সনাতন ধর্মীয়দের কাছে গঙ্গা নদী উপাস্য। যাইহোক,
আর্যরা এই পবিত্র সরস্বতী নদীর তীরে সাধনা করতেন, স্তোত্র রচনা করতেন, যজ্ঞ সম্পাদন
হত, উদ্গীত মন্ত্রের ধ্বনি নদীর তীরে তীরে ছড়িয়ে পড়তো। শুধুমাত্র সাধন সহায়কই নয়, সরস্বতীর স্রোত মানুষের জীবন জীবিকারও
সহায়ক হয়ে উঠেছিল। সাধনার সিদ্ধি এবং জীবকুলের জীবন রক্ষায় এক পরম কল্যাণময় ভূমিকা
ছিল এই নদীর। তাই সরস্বতী শুধু নদী নয়, পরম ব্রহ্মের কল্যাণময়ী শক্তি হয়ে তাঁদের
কাছে ধরা দিয়েছিল। তাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছিল অনেক মন্ত্র বা সূক্ত। সরস্বতী নদী স্বাভাবিকভাবেই
বাগ্দেবীতে পরিণত হলেন।
(সরস্বতি) (সংস্কৃত: सरस्वती, সরস্ৱতী, উচ্চারিত [sɐrɐsʋɐtiː]) হতেন। প্রধান দেবী এবং জ্ঞান, শিক্ষা, অধ্যয়ন, শিল্প, বাক্, কবিতা, সঙ্গীত, পরিশুদ্ধি, ভাষা ও সংস্কৃতির দেবী হিসেবে পূজিত লক্ষ্মী ও পার্বতীর সঙ্গে তিনি ত্রয়ী গঠন করেন। সরস্বতী সর্বভারতীয় দেবী। তিনি শুধু হিন্দু ধর্মেই নয়, জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মেও পূজিতা হন। সরস্বতী মাতৃকা দেবী জ্ঞান, সংগীত, শিল্পকলা, বাক্য, প্রজ্ঞা, জ্ঞানার্জন ও নদী দেবী ব্রিটিশ লাইব্রেরির কিউরেটরের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, "বিদ্যা ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী, একটি নদীর তীরে উপবিষ্টা। তার পা একটি পদ্ম ফুলের উপর স্থির, বেদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি তাল পাতার পাণ্ডুলিপি তার পাশে রয়েছে এবং তিনি বীণা ধারণ করেছেন, একটি রাজহাঁস তাঁর বাহন হিসেবে কাছাকাছি অবস্থান করছে।" সংস্কৃত লিপ্যন্তর সরস্ৱতী Devanagariसरस्वती অন্তর্ভুক্তি। দেবী, নদী, ত্রিদেবী, গায়ত্রী আবাসসত্যলোক, মণিদ্বীপমন্ত্র॥ ওঁ ঐং সরস্বত্যই নমো নমঃ ॥ / ॥ ওঁ বদ বদ বাগ্বাদিনি স্বাহা ॥প্রতীকসমূহসাদা রং, পদ্মে অধিষ্ঠিতা, বীণা রঞ্জিতা, সরস্বতী নদী,তাঁর বাহনরাজহংস। উৎসব শ্রীপঞ্চমী ও নবরাত্রি উৎসবের সপ্তম দিন। ব্যক্তিগত তথ্য সহোদর লক্ষ্মীসঙ্গী সরস্বানসন্তানসারস্বত। তিনি বৈদিক যুগের অন্যতম প্রধান দেবী (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৫০০), এবং পরবর্তী সময়েও হিন্দু ধর্মেও তাঁর গুরুত্ব ধরে রেখেছেন। বেদে, তাঁর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে। নদীর সাথে সম্পর্কিত দেবী হিসেবে, সরস্বতী তার শুদ্ধিকরণ ও উর্বরতা বৃদ্ধির দ্বৈত ক্ষমতার জন্য পূজিত হন।পরবর্তী বৈদিক সাহিত্যে, বিশেষত ব্রাহ্মণ গ্রন্থগুলিতে, সরস্বতী ক্রমশ বৈদিক বাক্ দেবী রূপে বাকের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে ওঠেন, এবং পরবর্তীতে এই দুই সত্তা একীভূত হয়ে একক দেবী হিসেবে পরিগণিত হন।সময়ের সাথে সাথে তাঁর নদীর সাথে সম্পর্ক কমতে থাকে এবং বাক্, কবিতা, সঙ্গীত ও সংস্কৃতির সাথে সংযুক্তি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শাস্ত্রীয় ও মধ্যযুগীয় হিন্দু ধর্মে, সরস্বতী প্রধানত শিক্ষার, শিল্পের এবং কাব্যিক অনুপ্রেরণার দেবী হিসেবে স্বীকৃত, এবং সংস্কৃত ভাষার উদ্ভাবক হিসেবে গণ্য হন। তিনি সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মার কন্যা হিসেবে অথবা তাঁর সৃষ্টিরূপে যুক্ত। এই ভূমিকায়, তিনি তাঁর শক্তি উপস্থাপন করেন এবং বাস্তবতাকে একটি স্বতন্ত্র মানবিক বৈশিষ্ট্য প্রদান করেন। তিনি সেই বাস্তবতার মাত্রার সাথে যুক্ত হয়ে স্বচ্ছতা ও বৌদ্ধিক শৃঙ্খলাকে চিহ্নিত করেন।
শাক্তধর্ম প্রথায় সরস্বতীকে সর্বোচ্চ
দেবীর সৃজনশীল রূপ হিসেবে পূজা করা হয়। বৈষ্ণবমতে তিনি বিষ্ণুর অন্যতম পত্নী হিসেবে
গণ্য হন এবং তাঁর ঐশ্বরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করেন। তবে, এই পুরুষ দেবতাদের সাথে সম্পর্ক
থাকা সত্ত্বেও, সরস্বতী একজন স্বতন্ত্র দেবী হিসেবে সঙ্গী ছাড়াই পূজিত হন। তিনি শান্ত
ও দীপ্তিময় শুভ্র বর্ণের নারী হিসেবে চিত্রিত হন। তিনি সাদা পোশাক পরিহিতা এবং সাদা
পোশাক সত্ত্ব (পবিত্রতা ও কল্যাণ) গুণের প্রতীক। তাঁর চারটি বাহু রয়েছে, এবং প্রতিটি
হাতে একটি প্রতীকী বস্তু ধারণ করেন: একটি গ্রন্থ, একটি জপমালা, একটি পদ্ম বিশ্বজুড়ে
সরস্বতীর উদ্দেশ্যে নিবেদিত অনেকগুলি হিন্দু মন্দির রয়েছে। সেসবের মধ্যে কাশ্মীরে
অবস্থিত শারদা পীঠ (৬ষ্ঠ–১২শ শতাব্দী) অন্যতম প্রাচীন মন্দির। সরস্বতী সমগ্র ভারতে
বিশেষত তাঁর নির্দিষ্ট উৎসব দিন, বসন্ত পঞ্চমীতে ব্যাপকভাবে পূজিতা হন। বসন্তের এই
পঞ্চম দিনটি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সরস্বতী পূজা ও সরস্বতী জয়ন্তী নামেও পরিচিত। এই
দিনে শিক্ষার্থীরা তাঁকে জ্ঞান ও শিক্ষার অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসেবে সম্মান জানায়। ঐতিহ্যগতভাবে,
এই দিনটি ছোট শিশুদের প্রথম বর্ণমালা লেখা শেখানোর মাধ্যমে চিহ্নিত হয়।
বৌদ্ধধর্মে, তিনি বিভিন্ন রূপে
পূজিতা হন। সেসবের মধ্যে একটি হল পূর্ব এশিয়ার বেনজাইতেন (辯才天, "বাক্ ও প্রতিভার দেবী")। জৈন ধর্মে,
সরস্বতী তীর্থঙ্করদের উপদেশ ও বাণী প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত দেবী হিসেবে পূজিতা হন।
ঋগ্বেদের প্রথম, সপ্তম, অষ্টম ও দশম মন্ডলে সরস্বতী দেবতা নিয়ে অনেকগুলি সূক্ত পাওয়া
যায়। তার মধ্যে বাগ্দেবী প্রতিষ্ঠার সমর্থনে প্রথম মন্ডল এর তৃতীয় সূক্তের ১১ ও ১২
ঋক দুটি প্রণিধান যোগ্যঃ
চোদয়ীত্রি সুনৃতানাং চেতন্তী সুমতিনাং
যজ্ঞং দধে সরস্বতী।।১১
মহো: অন: সরস্বতী প্রচেতয়িতি কেতুনা।
ধিয়ো বিশ্বা বিরাজতি।। ১২
অর্থ: নিত্য সত্য প্রিয় বাক্যের
উৎসস্বরূপিনী, সুমতি ব্যক্তির চেতনা প্রদায়িনী সরস্বতী দেবী আমাদের যজ্ঞ অভিলাষ করেছেন।।১১
প্রভূত জল সৃষ্টিকারীনি ও জ্ঞানের
উদ্দীপনাকরিনী সমগ্র বিশ্বে বিরাজিত দেবী সরস্বতীর ধ্যান করি।।১২
ধ্যান ও প্রণামমন্ত্র অনুসারে দেবী
সরস্বতী শ্বেতবর্ণা, শ্বেতপদ্মাসনা, শ্বেতবস্ত্রাবৃতা, দ্বিভূজা, বীণা-পুস্তকধারিণী,
হংসরূঢ়া রূপে পূজিতা হলেও বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত তথা সকল জ্ঞানের আধার। মা সরস্বতী বিভিন্ন
পুরাণ, বেদ, তন্ত্রে বিচিত্র লীলাময়ীরূপে বর্ণিত হয়েছেন। দেবীর প্রতিটি রূপের আলাদা
আলাদা তাৎপর্য আছে।
ঋগ্বেদে বাগদেবীর তিনটে মূর্তির
কথা বলা হয়েছে, ভূঃ বা ভূলোকে ইলা, ভূবঃ বা অন্তরীক্ষে সরস্বতী এবং স্বর বা স্বর্গলোকে
ভারতী। জগতে দেবী সরস্বতী তাঁর জ্ঞানজ্যোতি দ্বারা চিন্ময়ীরূপে পরিব্যপ্ত। বৈদিক স্তুতির
মধ্যে দেবী সরস্বতীর তিনটি রূপের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। কোথাও ‘দেবীতমে’ অর্থাৎ দেবী
শ্রেষ্ঠা, কোথাও ‘অম্বিতসে’ অর্থাৎ মাতৃশ্রেষ্ঠা, আবার কোথাও ‘নদীতসে’ বা নদী শ্রেষ্ঠা
রূপে বন্দনা করা হয়েছে।
শিবপুরাণের সরস্বতী তপ্তকাঞ্চনবর্ণা,
চতুর্ভূজা, ত্রিনয়না, শিরে চন্দ্রকলাশোভিতা, বর ও অভয়মুদ্রা-শোভিতহস্তা, সর্বলক্ষণসম্পন্না,
শ্বেতপদ্মে উপবিষ্টা, নীলকুঞ্জিত কেশশোভিতা। অগ্নিপুরাণে সরস্বতী পুস্তক অক্ষমালিকা,
বীণাহস্তা চতুর্ভূজা।
আবার এই অগ্নিপুরাণেই অন্য এক স্থানে
‘বাগেশ্বরীর’ ধ্যানে সরস্বতী চতুর্ভূজা, ত্রিলোচনা, পুস্তক অক্ষমালা বর ও অভয়মুদ্রাধারিণী।
লক্ষ্যণীয় যে এই পুরাণেই আবার দেবী সরস্বতীকে অষ্টাভূজা রূপেও বর্ণনা করা হয়েছে। গড়ুর
পুরাণে দেবী সরস্বতীর শক্তি আট প্রকার। যথা শ্রদ্ধা, ঋষি, কলা, সেবা, তুষ্টি, পুষ্টি,
প্রভা ও মতি। তন্ত্রশাস্ত্রে এই আটশক্তি হলেন যোগা, সত্যা, বিমলা, জ্ঞানা, বুদ্ধি,
স্মৃতি, মেধা ও প্রজ্ঞা।
স্কন্দপুরাণে সুসংহিতায় সরস্বতীর
মস্তকে জটা, মুকুটে চন্দ্রকলা, ত্রিনয়না ও নীলগ্রীবা। দেবী এখানে শিবশক্তিরূপে বর্ণিতা।
বায়ুপুরাণে সরস্বতী চতুর্ভূজা,
হংসারূঢ়া, বামদিকের দুই হাতে গ্রন্থ ও বরমুদ্রা, আর ডানদিকের দুই হাতে যথাক্রমে জপমালা
ও বরমুদ্রা। দেবী এখানে ব্রহ্মশক্তি হিসেবে বর্ণিতা হয়েছেন।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে দেবী চতুর্ভূজা,
পীতবসনা, নানা অলঙ্কারে অলঙ্কৃতা, বীনাপুস্তকধারিণী, ব্যাখ্যা মুদ্রা ও বরমুদ্রাধারিণী।
এই বর্ণনা থেকে মনে হয় চতুর্ভুজা, পীতবসনা অর্থাৎ বিষ্ণুর শক্তি রূপে সরস্বতী বর্ণিত
হয়েছেন।
মার্কণ্ডেয় পুরাণে দেবী দুর্গার
অপর রূপ হিসেবে দেবী সরস্বতীকে দেখানো হয়েছে। এই পুরাণের শ্রীশ্রী চণ্ডীতে মহাসরস্বতী
রূপে শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করেছিলেন। এই মহাসরস্বতী গৌরবর্ণা, অষ্টভূজা। তাঁর হাতে ছিল
বাণ, শঙ্খ, চক্র, হল, মুষল, শূল ও ঘণ্টা। এখানে মা বিদ্যাদাত্রী রূপে নয় অন্যায়ের প্রতীক
দুষ্ট অসুরদ্বয়কে বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তবে একথা মনে রাখতে হবে যে বাঙালির
দুর্গাপুজোয় মা দুর্গার মেয়ে রূপে সরস্বতী অন্য ভাই বোনদের সঙ্গে পূজিতা হন। তবে
এই মা সরস্বতীর ধ্যানমন্ত্র প্রণাম মন্ত্র সব এক হলেও এই সরস্বতী পৌরাণিক সরস্বতী নন।
কালিকাপুরাণে সরস্বতীর বাম হাতে
বীণা ও পুস্তক আর দক্ষিণহাতে মালা ও কমণ্ডলু, শুক্লবর্ণধারিণী, মহাচলের পৃষ্ঠেস্থিতা,
শ্বেতপদ্মের ওপর উপবিষ্টা, শুক্লবস্ত্রা ও শুভ্র অলঙ্কার ভূষিতা। প্রাচীন ভারতবর্ষে
মা সরস্বতী সিংহের ওপর আসীনা ও হাতে শূল ধারণ করে আছেন এই মূর্তিতে পূজিতা হতেন। আমাদের
সমাজে মা সরস্বতী শুধু শুক্লাবর্ণা জ্ঞানদাত্রীরূপেই নয়, অন্য রূপে আলাদা মন্ত্রেও
পূজিতা হন। যেমন তন্ত্রমতে নীল তারা বা নীল সরস্বতী রূপ পূজিতা হন। এই দেবীর উপাসনা
করলে ভক্ত অপার জ্ঞানের অধিকারী হন। দশমহাবিদ্যার নবম ‘দেবী মাতঙ্গী’ আসলে তন্ত্রমতে
সরস্বতী।
বৈদিক মতে ও তন্ত্র মতে দেবী সরস্বতী
বিভিন্ন রূপে ও ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে পূজিতা হন। তবে সরস্বতীদেবী যে মতে যে রূপেই
পূজিতা হন না কেন তিনি কলুষতাহীন সদ্ জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রীদেবী। তাই প্রাচীন যুগ, আর্যযুগ,
পরবর্তী আর্য যুগ বেদ-পুরাণ থেকে শুরু করে তন্ত্রদেবী হিসেবেও দেবী সরস্বতী পূজিতা
হয়ে আসছেন।
বেদে ব্রহ্মশক্তি এবং দেবতাকে এক
করে দেওয়া হয়নি। ব্রহ্মশক্তি একক, অবিনশ্বর, অনন্ত, অসীম, অশেষ। এই পরমশক্তি সৃষ্টির
সমস্ত কিছুতেই বিরাজিতা, পৃথিবী, অন্তরীক্ষ, দ্যুলোকের যে যে প্রাকৃতিক বিষয়ের মধ্যে
শক্তির প্রকাশ দেখা যায় তা ব্রহ্মশক্তিরই প্রকাশ। প্রাকৃতিক বিষয়ে শক্তির বিশেষ প্রকাশকে
ঋষিরা দেবত্ব ও চেতনত্ব আরোপ করেছেন। সেই অর্থে সরস্বতী নদী দেবতা এবং মানবজাতির জ্ঞান
উন্মেষণে তাঁর কৃপা কামনা করেছেন।
কোন কোন ধর্মগুরু সরস্বতীকে বৈদিক
দেবতা বলে স্বীকার করতে চান না, তাঁদের মতে তিনি পৌরাণিক দেবী। কিন্তু পুরাণের সরস্বতী
সংক্রান্ত রূপক কাহিনী গুলি বিশ্লেষণ করলে বেদের মূলতত্ত্বের সঙ্গে তাঁর সামঞ্জস্য
খুঁজে পাওয়া কষ্টকর। পুরাণের সঙ্গে বেদের একটা গঠণগত পার্থক্য আছে। বেদে এক এবং অদ্বিতীয়
ঐশ্বরিক শক্তিকে বহুরূপে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের মধ্যে লক্ষ্য করা হয়েছে এবং সেই
সব বিষয়ে চেতনত্ব আরোপ করা হয়েছে। পুরাণে সেই শক্তির রূপবিকাশকে তত্ত্বভিত্তিক অবয়ব
বা রূপ দেওয়া হয়েছে এবং তৎসংক্রান্ত রূপক কাহিনী নির্মাণ করা হয়েছে। সব দেবতার মতো
পৌরাণিক সরস্বতী দেবতা ব্যতিক্রমী নন।
দেবী সরস্বতীর উৎপত্তি সম্পর্কে পুরাণে পুরাণে বৈসাদৃশ্য দেখা যায়। পুরাণকারগণ যে
যাঁর মতো করে সরস্বতী চিন্তাকে স্বাধীন রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কোন কোন পুরাণ মতে,
যেমন ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে সরস্বতী দেবী ব্রহ্মার মুখগহ্বর থেকে সৃষ্টি হয়েছিলেন।
পাশাপাশি পদ্মপুরাণে সরস্বতী কে দক্ষকন্যা বলা হয়েছে। আবার ভাগবত পুরাণে দেখা যায়,
সরস্বতীর সৃষ্টি বিষ্ণুর জিহ্বাগ্র থেকে। সুতরাং সরস্বতীর সঠিক পিতা বা উৎপত্তি নিয়ে
বিতর্ক আছে। অপেক্ষাকৃত আধুনিক মৎস্যপুরাণ পরমাত্মার মুখনিঃসৃত শক্তির মধ্যে সরস্বতীকে
প্রধান বলেছেন।
সরস্বতীর স্বামী নিয়েও একইভাবে
পুরাণকারদের মধ্যে পরস্পর বিরোধী মত পরিলক্ষিত হয়। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে তিনি বিষ্ণুপত্নী,
ভাগবত পুরাণ মতে দেবী ব্রহ্মার পত্নী, স্কন্দ ও শিবপুরাণে শিবের ঘরনী, পদ্মপুরাণে কশ্যপ
মুনির স্ত্রী। সুতরাং দেবী সরস্বতীর স্বামী নিয়েও ঘোর সংশয়।
তবে সবটাই ভক্তকুল পুরাণ রচয়িতাদের
কল্পনা এবং পুরাণ কারদের স্বতন্ত্র প্রতীক চিন্তা এরকম প্রভেদের মূল কারণ। কিন্তু কোনভাবেই
তাঁরা কেউই বৈদিক মূল সত্য থেকে বিচ্যুত হননি।
কারণ দেবতাদের পিতা -পতি কিছু হয় না। একই শক্তির ভিন্ন প্রকাশ। নিত্য সত্য
জ্ঞানের আকর স্বয়ং ব্রহ্ম’। সেই ব্রহ্ম’ শক্তিকে মহাব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির সময় ত্রিধাবিভক্ত
করা হয়েছে — সৃষ্টি-স্থিতি-লয় (ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর)। মহাসৃষ্টির জ্ঞান তথা ব্রহ্মার
মুখ থেকে নিঃসৃত হয়ে বিষ্ণু তথা পালন কর্তার জিহ্বাগ্র দিয়ে ঐশী জ্ঞানধারা সরস্বতী
রূপে ধরায় প্রবাহিত হয়েছে। যা ছিল স্তব্ধ,হিমালয়ের মতো অটল -অচল, তাই হল নির্ঝরিনী।
আর্য ঋষিরা মননের দ্বারা সেই জ্ঞান ধারণ করলেন আর বাঙ্ময় হয়ে শিষ্য শিষ্যান্তরে দান
করে গেলেন। এই হল সরস্বতী দেবীর উৎপত্তি ও প্রবহমানতার গূঢ় তত্ত্ব।
দেবী সরস্বতীর রূপকল্পনাতে বলা
যায় যে নিরাকার সাধনা সাধারণ মানুষের পক্ষে সহজ নয়।এজন্যই ঋষিরা অসীমকে সীমায় বাঁধতে
প্রতিমার রূপ দেন। জ্ঞান- সাধনার উপযোগী প্রতিমূর্তি সরস্বতী প্রতিমা তাঁদেরই ধ্যানোপলব্ধি।
দেবী সরস্বতী প্রতিমা সব পুরাণেই
চতুর্ভুজা। তবে বাংলা তথা পূর্ব ভারতে দ্বিভূজা দেখা যায়। পুরাণ অনুসারে দেবীর চার
হাতে অক্ষমালা, পুঁথি, বীণা,পদ্মফুল সহ বরাভয় মুদ্রা থাকে। এই চতুর্ভুজ চতুর্বেদের
প্রতীক কিংবা মন,সচেতনতা, বুদ্ধি, বৃত্তির পরিচয়।
অক্ষমালার মাধ্যমে সারস্বত সাধনায়
ত্যাগ,সংযম,একাগ্রতা ও নিরাসক্তির প্রয়োজনীয়তাকে বোঝানো হয়েছে। পুঁথি বা পুস্তক পরা
ও অপরা বিদ্যায় সম্যক জ্ঞানের আবশ্যিকতাকে সূচিত করে।বীণাযন্ত্রের অপূর্ব সুরমূর্ছনা
মহাজগতে বিস্তারিত পারমার্থিক আনন্দের প্রতীক। বরাভয় মুদ্রা ও পদ্মফুলে শুদ্ধ জ্ঞানার্জনে
একনিষ্ঠ সাধকের প্রতি দেবীর পরম আশ্বাস ব্যক্ত।
দেবীর নিকট যে যবের শীষ আর আম্রমুকুল
রাখা হয় তা নদী বিধৌত উর্বর ভূমিতে কৃষিবিদ্যা ও উদ্যানবিদ্যাকে নির্দেশ করে। লেখনী
ও মস্যাধার লিপিকৌশলে দক্ষতা অর্জনের ইঙ্গিত বহন করছে। পুরোহিত মন্ত্র বলেন,”… সরস্বতী
পরিবারেভ্য নমঃ”। আসলে দেবীর এগুলি নিয়েই পরিবার। পরিবারের আর এক সদস্য হল তাঁর বাহন।
প্রার্থনা মন্ত্রে বলা হয়েছেঃ
যা কুন্দেদুতুষারহারধবলা যা শ্বেতপদ্মাসনা।
যা বীণাবরদণ্ডমণ্ডিতভূজা যা শুভ্রবস্ত্রাবৃতা।।
দেবী সর্বশুক্লা—গাত্রবর্ণ, বস্ত্র,
অলঙ্কারাদি, বীণা,পদ্ম, সব কিছুই সাদা, নির্মল।
পদ্মপুরাণে স্তবমন্ত্রে বলা হয়েছেঃ
শ্বেতপদ্মাসনা দেবী শ্বেতপুষ্পোপশোভিতা।
শ্বেতাম্বরধরা নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা।।
শ্বেতাক্ষশুভ্রহস্তা চ শ্বেতচন্দনচর্চিতা।
শ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কার
শোভিতা।।
কিন্তু শিবপুরাণমতে দেবী তপ্তকাঞ্চনবর্ণা।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে তিনি শুভ্রবসনা নন, পীতবসনা। স্কন্দপুরাণে দেবীর মস্তকে জটা
এবং নীলগ্রীবা।
দেবী বহু নামে বন্দিত—–সরস্বতী,সারদা,
মহাশ্বেতা,শতরূপা,ভারতী, বীণাপানি, বাণী, সনাতনী, বাগ্দেবী, বাগীশা, বাগীশ্বরী, বাঙ্ময়ী,বিদ্যাদেবী,গীর্দেবী,কাদম্বরী,সর্বশুক্লা।মানুষ
মরণশীল কিন্তু মননশীল।তার মধ্যে সুপ্ত হয়ে
আছে অসীম শক্তি। জাগতিক মোহমায়ার আবরণ ছিন্ন করে নিত্য সত্য লাভ করে সে দেবত্বে উত্তোরিত
হতে পারে। মহীয়ান অমৃত জ্ঞানের স্তব্ধতার তপস্যা ভঙ্গ করে আলোকের ঝর্ণাধারায় অবগাহন
করতে পারে।বসন্ত পঞ্চমীর পুণ্যলগ্নে জ্যোতির্ময়ী দেবী সরস্বতীর নিকট অমৃতের পুত্রদের
একটাই প্রার্থনা হোকঃ সকল বিভবসিদ্ধৈ পাতু বাগ্দেবতা নঃ।।



0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন