কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

শর্মিষ্ঠা বিশ্বাস

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

দ্য ক্লাউড

 


(ঊনবিংশ পর্ব)  

নিমচাঁদ দাগা এখন পতাকায় আটকে থাকা মনোলগ। আমি পতাকা ছিলাম না কোনোদিন। আমি তো ছিলাম তেলঘন, হলুদ, সন্দেহের গন্ধমাখা। তবু আজ আমি পতাকার ভাঁজে ভাঁজে ঝুলে আছি। ২৬শে জানুয়ারি গেছে। কেউ টের পায়নি যে আমার শরীরটা নামানোর কথা ছিল লোকের। এখন স্মৃতি রাখারই সময় নেই, তো পুরনো পতাকা! রাষ্ট্র এখন বস্তুকে বদলায়। প্রশ্নকে নয়।

আমি উপরে উঠিনি। নিম্নস্তরের আত্মা কি-না, তাই আকাশ আমাকে নেয়নি।

তাই এই তিরঙ্গার মাঝখানে আমি ক্রমে সুতো হয়ে যাচ্ছি। পাতলা, ছেঁড়া, জরাজীর্ণ। নীচে যারা হাঁটে, তারা জানতো, আমি কী করতাম। সর্ষার মধ্যে শিয়ালকাঁটা মিশিয়ে তেল বানাতাম। কেউ ফেরত দেয়নি বোতল। কেউ ফেরত নেয়নি নৈতিকতা। মরলাম বিছানায়। চিৎকার করিনি, কারণ জীবনে কোনোদিন চিৎকারের দরকার পড়েনি। সবই ম্যানেজ হয়ে যেত। এখন আর কিছুই ম্যানেজ হয় না। পতাকার কাপড়ে আমার আত্মা আটকে থাকে। হাওয়ায় দুলে দুলে ক্ষয়ে যায়। দেশ এগোয়। আমি ঝুলে থাকি।

উৎপল এই প্রথম কথা বলে উঠলো।

উৎপল নিচে দাঁড়িয়ে, স্কেচবুক খুলে পতাকার নড়াচড়ায় তার নীরবতা ভাঙলো এই মুহূর্তে।

কে নড়ে ওখানে?

পতাকা তো বাতাস ছাড়া নড়ে না!

দাগা-

বাতাস নই আমি। আমি অপরাধের ওজন। তাই কাপড় আমাকে ছাড়ে না।

উৎপল একটু থেমে তোমার মুখটা তো নেই! তবু তোমার কথা আমি পরিষ্কার শুনছি।

নিমচাঁদ দাগা- মুখ থাকলে তো লজ্জা হতো। অবয়বহীন বলেই এতদিন ঝুলে থাকতে পারছি।

উৎপল- তোমাকে আঁকতে পারব না। তুমি রেখা নও, রঙ নও।

নিমচাঁদ দাগা- তাই তো ডাকলাম তোমাকে। যাকে আঁকা যায় না, সে কেবল চিত্রকরের সঙ্গেই কথা বলে।

উৎপল কিছু না বলে পেন্সিলটা নামিয়ে রাখে। এই প্রথম সে বোঝে কবরখানার মাঠ ছাড়াও আরেকটা প্রদর্শনী ক্ষেত্র আছে, যেখানে মৃতেরা নিজেরাই কথা বলে।

উৎপল চিত্রকরের ডেটা-ডায়েরি (নোট)

তারিখ: অনির্দিষ্ট

স্থান: পতাকাদণ্ডের নিচে, পুরনো স্কুলমাঠ।

সময়: হাওয়ার শব্দের পরে...

আজ এক অদ্ভুত আত্মার সঙ্গে দেখা। নামনিমচাঁদ দাগা। অপরাধ তার পরিচয় নয়, তার অবস্থা। সে পতাকায় আটকে আছে। এটি কোনো রূপক নয়। সে সত্যিই কাপড়ের ভাঁজে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

লক্ষণসমূহ:

মুখ নেই, কিন্তু বক্তব্য স্পষ্ট।

অনুশোচনার অনুপস্থিতি।

রাষ্ট্রীয় প্রতীকের সঙ্গে অদ্ভুত সহাবস্থান।

উপরের দিকে কোনো টান নেই।

পর্যবেক্ষণ:

মৃত্যুর পরেও শাস্তি ব্যক্তিগত নয়। সামাজিক অবহেলার ফল। আমি তাকে আঁকিনি। আজ প্রথমবার স্কেচ করিনি ইচ্ছে করে। কারণ কিছু আত্মা আছে, যাদের রেখায় ধরা মানে তাদের মুক্তি দেওয়া। আর মুক্তি দেওয়ার অধিকার আমার নেই।

আগামী পর্বে উৎপল পতাকায় আঁটকে থাকা নিমচাঁদ দাগার অবস্থান এখন ঠিক কোথায়, সে বুঝতেই পারেনি। কিন্তু এটুকু সে বোঝে, এক যে আছে চিত্রকর। সে আমার কথাকে আঁকে।

উৎপল চিত্রকর আজ আসেনি। কিন্তু কাল তো আসবেই! অতএব তার মনোলগ চলুক তার মতো করেই। জমে জমে পাহাড় হোক কথা। এরপর চিত্রকর এসে তাকে ডেটাবেস থেকে উদ্ধার করবে। এরপরে বর্তমান যার নেই, তার আবার ভবিষ্যৎ কী হবে, এসব ভাবতে ভাবতে নিমচাঁদ দাগা তার অতীতে মৃত্যুর কাছে চলে গেল।

মৃত্যু যে এভাবে আসে কোনো ঢাক, কোনো শঙ্খ, এমনকি পুলিশের সাইরেন ছাড়াও তা তার জানা ছিল না। আগের দিন পনেরোই আগষ্ট। পাড়ায় পাড়ায় মাইক বেঁধে দেশপ্রেম চলছিল। নিমচাঁদ দাগা শুনেছিল  শুয়ে শুয়ে। স্বাধীনতার গান তার কানে ঢুকছিল ঠিকই, কিন্তু শরীরের ভেতরে কোনো নড়াচড়া হচ্ছিল না। সে জানতো না, সেই রাতেই তার শরীর রাষ্ট্রের হিসাব থেকে বাদ পড়ে গেছে।

২৬শে জানুয়ারি কবে কেটে গেছে, দাগা ঠিক জানে না। সময় এখানে ক্যালেন্ডার মানে না। পতাকাটা বদলায়নি এইটুকুই তার প্রমাণ। যে পতাকায় আঁটকে আছে, সেটার রং একদিন গাঢ় ছিল। এখন সেই রং ক্ষয়ে গিয়ে তন্তু দেখা যায়। দাগা নিজেও তন্তু হয়ে গেছে। সুতো, ঝুরো, প্রায় অদৃশ্য।

নিম্নস্তরের আত্মাদের একটা নিয়ম আছে ওরা ওপরে উঠতে পারে না। উচ্চতা মানে স্মৃতি, আর স্মৃতি মানেই নাগরিকত্বের শেষ চিহ্ন। দাগার স্মৃতি নেই বলেই সে পতাকায় আঁটকে আছে। রাষ্ট্র তাকে মনে রাখেনি। তাই পতাকাও তাকে ছাড়ছে না।

দাগার মনোলগ শুরু হয় নীরবে।

আমি তো জানতাম, সবাই জানত। তবু চলছিল। তেলটা খারাপ, বীজ মেশানো কিন্তু দেশ তো খারাপ জিনিসেই চলে। আমি একা ছিলাম না। তা হলে আমার শাস্তিটা কেন এমন হলো?”

প্রশ্নটা কোথাও গিয়ে ধাক্কা খায় না। কারণ এখানে উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। পতাকা কোনো প্রশ্ন শোনে না।

এই সময়ই উৎপল চিত্রকর মাঠে ঢোকে। কবরখানার পাশের ওই ফাঁকা জায়গাটাকে সে স্টুডিও বানিয়েছে অনেক দিন হলো। আজ তার সঙ্গে ডেটা ডায়েরি। খাতা নয় এ এক অদ্ভুত যন্ত্র, যেখানে ছবি, সংবাদ, মৃত মানুষের ফাঁকা জায়গাগুলো জমা হয়। উৎপল জানে না, সে যা করছে, তা কি শিল্প? না-কি তদন্ত?

পতাকার দিকে তাকিয়েই সে থমকে যায়। একটা অস্বাভাবিক ভার আছে সেখানে। বাতাস নেই, তবু কিছু ঝুলে আছে। উৎপল দ্বিতীয়বার নিমচাঁদ দাগার কণ্ঠ শোনে শব্দ নয়, চাপ।

“তুমি আমাকে আঁকবে?”

উৎপল চমকে ওঠে। মানুষের সঙ্গে নয়, সে অভাবের সঙ্গে কথা বলছে।

ডেটা ডায়েরিতে একটা নতুন এন্ট্রি পড়ে

নাম: নিমচাঁদ দাগা (অনির্দিষ্ট)

অবস্থা: রাষ্ট্রীয় স্মৃতির বাইরে।

অবস্থান: পতাকা (অপরিবর্তিত)

উৎপল বোঝে, এটা কেবল একজন দুর্নীতিবাজের গল্প নয়। এটা পতাকার গল্প যে পতাকা বদলায় না, কারণ বদলানোর দরকার ফুরিয়ে গেছে। নাগরিক এখন ডেটা, আর ডেটার শরীর নেই। শরীর নেই বলেই অপরাধ, অনুশোচনা, মুক্তি সবই ফাইলের ভেতরে আটকে থাকে।

দাগা সুতো হয়ে আরও পাতলা হয়। উৎপল আঁকতে থাকে। এই প্রথম, শিল্প আর রাষ্ট্র একে অপরের দিকে তাকায় কিন্তু চোখ মেলায় না।  

(ক্রমশঃ)

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন