![]() |
| কবিতার কালিমাটি ১৫৪ |
ভিটেছাড়া
অপরাহ্ন। যেতে হবে। কতো দূর, জানা নেই। কিন্তু সত্যিই যেতে হবে। হ্যাঁ, এই বাধ্যতা তো তার-ই আয়োজন! প্রথমের ডাক তো তার! এখন উত্তর এসেছে। ফেরায় কী করে! তাই ফিরে আসার, আবার পিছু ডাকের মৃদু সম্ভাবনাময় ছবিটাকে মুছে ফেলতে হবে তাকেই। বেলা আর নেই। সত্যিই নেই। শেষবার পায়ের দিকে তাকালো সে। পায়ের দিকে। চারপাশেও। যাওয়া হবে তো! এই যে নিরবধি অস্থিরতা, প্রযুক্তির উচ্ছ্বাস, এগিয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক প্রয়াস, এর শেষ কোথায়! এর মধ্যে ওর এই একা চলা কী অবান্তর! আদৌ সম্ভব! সবাই, এমন কি মৃত্যু অবধি, কী রকম যেন আত্মপরিচয়ের সঙ্কটে ভুগছে। একা মানুষের শূন্যতা যেন আর বাইরের এই নানাবিধ অট্টহাসিতে আর বিবিধ নীতির বিচিত্র সমীকরণেও আর ঢেকে রাখা যাচ্ছে না। ফলত, ও একান্তেই টের পায়, কোথাও, খুব ধীরে কিন্তু নিশ্চিতভাবে মাথা উঁচু করছে অনৈতিকতার ভয়ঙ্কর এক আগ্নেয়গিরি।
এমন এক ভূমি ছেড়েই ও যাবে। যাবেই। দিনশেষের আলো।
সিলিং ছুঁয়ে। এখনো আছে। সে কি
কোন কষ্টবোধে! পায়ের নিচে মোজাইক। খোপকাটা, সতরঞ্জ, সাদাকালো। সামনে, পাশে পেস্তাসবুজ
দেয়াল। দেয়াল নাকি, আকাশ! স্থির। এই আয়তনেই তো এতকাল। একান্ত বসবাস। কতো না খেলা! স্বপ্ন, টুকরো টুকরো
ভাঙনের ঝুনঝুন। শিশুর হাসি তো এখানেই। এতদিন! এখন যেতে হবে। অভিজ্ঞতা, পরিকল্পনা,
শুরুর সেদিন থেকে সামান্য সামান্য বিরোধিতার ছায়া, পতন আর পলায়ন, সেইসব একটু একটু
নির্মাণ করেছে বর্তমানের পটভূমি, উইংস, আলো। এখন এ রঙ্গমঞ্চে একা সে। আর সবই বাহুল্য।
অথবা একেবারেই ‘না’ হয়ে আছে।
তবে একটা সময়ে নতুনের অপেক্ষা ছিল তার। আহ্বান, জড়িত
থাকার আপ্রাণ প্রয়াস ছিল। যেন এই নতুন ঘিরেই বেজে উঠবে বাঁশি।
নতুন প্রকরণে জেগে উঠবে ধ্বনি। ফুল ফুটবে, পাখি উড়ে যেতে যেতেও ফিরে এসে বসবে
কিশলয়ের আড়ালে। মানুষ অবসরে দুয়ারে দাঁড়াবে শীতল সন্ধানে। নতুনের ক্লান্তিহীন বয়ন এঁকে
দেবে নকশিকাঁথা। জীবনে জীবন। তাই নিদ্রাহীন শুধু রঙের খোঁজ, অপেক্ষা। চোখের সামনে
একটু একটু উন্মোচন উন্মুখ স্বপ্নের। আর কেবল অপার আনন্দের এক নিরন্তর সঙ্গ-ইচ্ছা।
এই নতুনের-ও আগে তবে কেমন ছিল উচ্চারণ! যাপন? সে কেন
হয়ে পড়লো উচাটন! সে আয়তনে কি বরজি ছিল তার পথের নিত্য গানের সঙ্গী! খোলামকুচি যেমন
থাকে! স্বপ্নের মতো বিবিধ বিচিত্র স্বেচ্ছাচারিতা ভাসিয়ে দিতে কি স্পর্ধা হত না সে
সুশীল অঙ্গনে! তবু সে ঘেরাটোপে যত মহৎ, যত পরম্পরাই থাকুক না কেন সে আহরণে, তত্ত্বাবধায়ক
কেউ না কেউ তো ছিলই। তার গতিবিধি নিয়ত থাকতো নজরে। আর ছিল দেয়ালে পেরেক। অজস্র। নিয়মানুগ
সভা বসতো অবরেসবরে। ছেঁড়াকাটা হতো প্রতিটি পদ, যতি, উচ্চারণ। আর যে কোন বিচ্যুতিতে অনিবার্য
আপাত কোমল শব্দঝর্নার নিরন্তর তিরস্কার। কত না বিধিনিষেধ, ছন্দের নিভাঁজ পাঠ,
শব্দের শুচিবায়ুতা! তবু এই ঘেটোর মধ্যেও কোনদিন ঘোড়ার কদম টের পেলেই তার আনন্দ। এত
অন্ধকারের মধ্যেও শক্ত গবাক্ষে উঁকি দিত স্বপ্নপাগলের মুখ! দরজা খোলার বাতিক,
জানলা পেরিয়ে উড়ান দেওয়ার তৃষ্ণা আর উড়ানের জন্য জানলার জন্য হাহাকার। সজাগ স্বআরোপিত
নানান পোষাকের অভিভাবকবৃন্দ। বসবাস তখন নিছক বিড়ম্বনা। তবে নিত্য শাসনেও যেমন হয়,
এক নিশ্চিন্ত আবাস ছিল সেটা। কোনো অনিয়ম-ই ঢুকে পড়তে পারবে না অন্দরে। ছন্দযতিশব্দের
স্পষ্টতা তোমাকে নিরাপত্তার বেষ্টনি দেবে, ভালবাসার ছলে আলোর মতো কিছু দেখাবে।
আবার নিয়ত আচরণে পারঙ্গম হলে তুমি শিরোপাও পেয়ে যেতে পারো। প্রকৃতি দ্যাখো তুমি, দেখতেই
পারো, দ্যাখো সবটুকু। যতোটা তুমি দেখতে পারো। তবে কলের নিয়ম ভেঙে নয়। পরম্পরার পরকলায় বিশ্বাস রেখো।
নারীতে উপগত হলে, হতেই পারো, কিন্তু পাপ এবং ধর্মকে পাশাপাশি রেখো।
মনে রেখো, এই বসবাস তোমার উত্তরপুরুষকে দেবে সামাজিক স্থিতি, দীর্ঘ উত্তরীয় আর
সুবৃহৎ একখানি তৈলচিত্র।
সেই অভিজাত চেতনা তাকে যেমন নষ্ট করছিল, অন্য দিকে
তাড়না ছিল পলায়নের, আসক্তি থেকে, ঘেটো থেকে। বসবাস কি চিরকাল স্থাবর হতে পারে! সে
তো অন্য ঘরে, অন্য শব্দে বেজে উঠতে চাইবে। অন্য বিভঙ্গে দেখতে চাইবেই নিজেকে। সে
কালে কাউকে তেমন তখন আর আত্মীয় মনে হচ্ছে না। যেন দমবন্ধ সব আয়োজন, তাবৎ স্বীকৃতি।
কেবল হরিণেরা উঠে আসছে সিঁড়িতে অবাধ, পেটানো ছাদের পাটাতনে একা অন্ধকারে মুখ দেখছে
এক তরুণ আর কোথাও কমলালেবু নতুন উৎপ্রেক্ষা হয়ে এসে বসছে সামনে। কী অমোঘ সে
প্রলোভন, অনিবার্য ডাক! যেন এতদিন বৃথা গেল শব্দ আর যাপনচর্চা!
চমৎকার ঈর্ষাযোগ্য সে সব নির্মাণ থেকে একদিন সরে
আসতেই হ’ল সুতরাং। এ ছিল যেন নিজের কাছে নিজের-ই দাবী। নিজের মতো করে নিজেকে দেখার
বাসনা। তাই তো ডাক। খুব কেউ নিষেধের স্পর্ধায় হাত তোলেনি। কেউ বলেওনি, আরে! ও এই
নতুন চলার ডানা পেলো কোথায়! আত্মীয়জন নিষ্পৃহ, স্বাভাবিকভাবেই অন্যমনষ্ক
অভিব্যক্তিহীন। সে-ও কি এমন প্রতিক্রিয়ার প্রতীক্ষায় ছিল! বোধহয়। প্রায় সংগোপনে উড়ান
এবং এই নির্মাণে আশ্রয় অতঃপর। দিনের পর রাত্রি জুড়ে একটু একটু যোগ আর বিয়োগ। রঙের
যোগ, শব্দের মুক্তি, স্বপ্নের শব্দায়ন। কেবল যেন নতুনের খোঁজ, কাছে অথবা দূরে
দাঁড়িয়ে নবোদিত সে অভিমানী আলম্ব পর্যবেক্ষণ।
সাধ যেন আর মেটে না। শেষ টেনে নিয়ে আসে অশেষকে। তাবৎ
ক্রিয়া বেঁকেচুরে নির্লজ্জভাবে কেবল যেন উঠে দাঁড়ায় দিন কিংবা দুপুরে। অগণন উঠোন,
অশেষ দুয়ার এবং শেষ আর যেন থাকে না কোথাও! অসম্পূর্ণতাই যেন তার অহংকার, সর্ব
অঙ্গে তার কেবল ‘না’ বেজে ওঠে। তবু সে এক আশ্চর্য উদ্ভাস! ভৈরবী বাজে না, কিন্তু
মালকোষ যেন আর শেষ হয় না। ফিরে ফিরে অশ্রু ডেকে আনে সে বহুকৌণিক প্রকাশ।
অতঃপর সে যেন নদীর অন্য
কোন পারে। তার তো ঈশ্বর নেই। তার শয়তান-ও নেই কোনও। সে নিজেই উপাসক নিজের। ঐ ঘাটে
সে একা, নির্জন। তার আশ্রয়, তার আবাস, তার ফুল বুনে যাওয়া অথবা সংহার, তার স্বমেহন,
বীর্যক্ষলনের ক্লান্তিজনিত তৃপ্তি অথবা, অশেষ যৌনজীবনের তৃপ্তি, শব্দের নিঃশব্দ
আন্দোলন, সবটুকুর উপভোক্তা সে নিজেই। দুয়ারে দাঁড়িয়ে কেউ যদি বলেছে, কী অনন্য এই
নির্মাণ, যেন উদ্ভিদ, সে তবে শব্দের একান্ত অন্ধকারে পা গেঁথে আবৃত্তি করেছে আরো
কোন নিগূঢ় শব্দ। দুই ইঁটের মধ্যবর্তী কাঁকড়ে আঙুল রেখে সে কেবল বলেছে, আরও নিভৃতি
কি তোমরা এখনো শিক্ষা করো নি! যদি প্রকৃতই তেমন করেছ, তবে এসো, আরো অন্য কোনো
স্রোতে। তোমরাই আমার স্মরণ, তোমরাই আমার ভজন। আমার তো আর ঈশ্বর বা ইবলিশ নেই।
সে আজ চলে যাবে। তার এক নদী আছে, এ জীবনে এমন জেনেছে
সে। ঘাট তার অজানা এখনো। তবু পাটাতন প্রাচীন মনে হতে থাকে তার। স্থবির সে রাত্রির
ঘনঘটায় সে যেন মধ্যরাত্রির এক আহত মহিষকে দেখতে পায়। রসালো লটকন ঝরে পড়ছে সিক্ত
ভূমিতে আর চতুর্দিকে চোখ, যেন ফসফরাস। অপেক্ষায় না থাকতে পেরে জল থেকে উঠে এসেছে
রক্তগন্ধে। ক্রমে কি কোথাও তবে ক্লান্তি জমেছিল! নতুনের ভার!
হাত রাখলো সে আলোর ফিরতি ছায়ায়। সে আঙুল রাখলো এতকাল
ব্যবহৃত সাদা বেদীর উপর। কালোসাদায় কতো না ইচ্ছা ফুটেছে একদিন! একে সে ‘নতুন’ এমন
অভিধা দিয়েছিল। নতুন কি ব্যবহারে, ব্যবহৃত হতে হতে সময়ের ধূসরে মলিন হয়! এর সাধারণ
উত্তর তার জানা নেই। তবু সে নতুনকে রেখে অপরে যাচ্ছে। সে যে ভিটেছাড়া। কতদূরে সে
আবাস, সেখানে বাক্য কি সম্পূর্ণতা পায়, তার জানা নেই। সে শুধু জানে, তাকে যেতে
হবে। অপরে। স্রোত তাকে ডাক দিয়েছে আবার। এক যুদ্ধ থেকে আরেক যুদ্ধে। যুদ্ধাজীব
মাত্র সে। সেখানে অবসান এই। সেখানে জয় নেই। কেবল নিজেকে সন্ধান, প্রায় এক অলৌকিক
লড়াই। তার প্রহরণ কেবল অভিজ্ঞতা, লৌকিক মাটির গন্ধবিজড়িত শব্দ, অভিমান আর এক
নাবিকহৃদয়। আব্সে রাখলো সে তাবৎ প্রবেশপথ, বন্ধ করলো না। হাত রাখলো পুনরায় ‘নতুন’-এর শরীরে।
ভালো থেকো।
তার সামনে এখন কেবল বহমান সময়, অপর এবং, সে, এক
ভিটেছাড়া।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন