![]() |
| কবিতার কালিমাটি ১৫৪ |
শহর ও দ্বিধাগ্রস্ত পত্রালি
পাতাগুলোর প্রকৃত রং দৃশ্যমান নয়। পাতা সবুজের অভিনয় করে— এ ধারণা অগ্রহণযোগ্য। ধুলো তাদের অস্থির ভাবনা ঢেকে রাখে। পাতার ফাঁকে কোনো পাখি নেই। পাখিরা অনুপস্থিতির বিধি শিখে নিজেদের নীরবতায় রূপান্তরিত করেছে।
পিচঢালা পথে ধুলো নেই, অথচ ধুলো রয়েছে সর্বত্র—
ফুসফুসের ভেতর, বাক্যের ভেতর ও ট্রাফিক লাইটের ফাঁকে ধুলোর তালুকদারি লক্ষণীয়।
মিডিয়ান স্ট্রিপের গাছগুলো শীর্ণ। তারা আকাশ ছোঁয়ার
অনুমতি পায় না। মাঝে মাঝে তাদের ছেঁটে ফেলে বিশেষ শৃঙ্খলা রক্ষা করা হয়।
আদর্শগত কারণে ভবন ভাঙা হয়। ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে
ওঠে নতুন ভবন। কংক্রিটের ভেতর থাকে বাক্যবিন্যাসের অভিনব ব্যাকরণ।
রাস্তা অপরিকল্পিতভাবে খোঁড়া হয়। মাটির অন্ত্রের
ভেতর পাইপ সেঁধিয়ে দেয়া হয় বলে রাস্তার স্মৃতিবিভ্রম ঘটে। দুয়েক সপ্তাহ পরে স্মৃতি
ফিরে আসে, রাস্তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে নিজের পরিচয়।
রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং নেই। মানুষ ট্রাফিকের গতি
দেখে রাস্তা পার হয়— দুঃসাহস কিংবা ভয়ের অভিনয় তাৎক্ষণিকভাবে মঞ্চস্থ হতে দেখা যায়।
গতি শব্দটি যে চেতনা ধারণ করে তার সাথে যানবাহনের
সম্পর্ক দৃঢ় নয়। সময় কখনো হাঁটে, কখনো থেমে থাকে। মানচিত্র অপরিবর্তিত থাকলেও দূরত্ব
বেড়ে যায়।
রাস্তার ধারে উচ্চাকাঙ্ক্ষা দ্বিধাগ্রস্ত। সীমিত
নতুন ভবনের ঔজ্জ্বল্য চোখে পড়ে, আর কিছু দূরে নির্মিত হতে থাকে রিয়াল এস্টেট ব্যবসার
আখ্যান।
মাঠ ও জলাশয় এখন মূলত প্রত্নরূপক। তারা টিকে আছে
প্রাচীন খতিয়ানে, আর সত্তরের গল্পে, যেগুলো ক্রমশ কল্পকথার মর্যাদা পেয়েছে।
ফুটপাতে জেঁকে বসেছে ক্ষুদ্র অর্থনীতি। সেখানে
হকাররা ছড়ায় প্লাস্টিকের স্বপ্ন।
ব্যাটারিচালিত রিকশার উৎপীড়ন বেড়েছে। প্রধান সড়কগুলোতেও
এ যান্ত্রিক প্রজাতি জয়পতাকা উড়িয়েছে। রিকশাদৃশ্যকে ভবিষ্যৎ বর্জন করবে এমন সম্ভাবনা
নেই।
বিচ্ছিন্ন ধ্বনির সাহায্যে শহর কথা বলে। হর্নের
শব্দ চিন্তাকে দাঁড় করিয়ে রাখে, ধুলোর ফিসফিসানি শ্বাস পরীক্ষা করে। দৃশ্যমান খণ্ডাংশে
শহর যে অর্থ ছড়িয়ে রাখে তার সুস্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই।
অস্থির কোলাহলের ওপর কোথাও জেগে থাকে এক ভাইরাসের
নাম। বাদুড়ের উচ্ছিষ্টের সাথে ঝরে পড়ে নিপা আতঙ্ক।
ডেস্কের ওপর কাজের স্তূপ। অথচ মন ট্রাফিক, ধুলো,
শূন্যতা ও আতঙ্কের বিক্ষিপ্ত শরীরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রত্যেকটি বৃক্ষের পাতা দ্বিধাগ্রস্ত। পাতারা
শহরের মনকে প্রতিফলিত করতে চেয়েছিল।
ফেরার দিন, নিস্তব্ধ যন্ত্রের অপেক্ষা
ফেরার দিন প্রায় নির্ধারণ-অযোগ্য; ক্যালেন্ডারের কোনো পৃষ্ঠায় তা স্থির হতে চায় না। কেউ কেউ বিক্ষত ধ্বনির শেকলে বেঁধে দিনটিকে সুস্থির করতে চায়; তাদের সাহস নির্ধারিত যাত্রাকে গল্পের প্রসাধন থেকে রক্ষা করে।
যে-কোনো দূরত্ব কুয়াশায় আচ্ছাদিত। প্রতিটি দিগন্তের
ওপারে সমস্ত রেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়। যাকে আমরা দূর বলি, তা দৃষ্টিবিরুদ্ধ— সেখানে
দৃশ্য আবছায়া পিকসেলে ভেঙে যেতে থাকে।
এক সময় সিদ্ধান্ত নির্ভর করত পাঠযোগ্য সংকেতের
ওপর। এখন সংকেত ধূসর পর্দায় পরিশ্রুত হয়ে আসে। সংকেতের বিকৃতি নিয়ে কেউ উচ্চকণ্ঠ নয়।
দীর্ঘকাল ধরে আমাদের দৃষ্টি সংকীর্ণ করিডরে নিবদ্ধ।
কাছের আলোয় সক্রিয় হয়েছে রেটিনার কোষ, দূরের আলোক-ইঙ্গিত খোঁজেনি আমাদের চোখ।
চোখে ক্রমশ জমেছে চাপ। এ অভ্যন্তরীণ ভার আকাশকে
নিচে নেমে এনেছে।
আমরা প্রত্যয় নিয়ে চোখে ড্রপস প্রয়োগ করি। কিছু
সময়ের জন্য আইওপি নিয়ন্ত্রিত থাকে। কিন্তু দৃষ্টির স্বাভাবিকত্ব ফিরে আসে না।
চিকিৎসার সাথে ভেঙে পড়ে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা।
আমরা প্রকৃতির পরিবর্তে আলোকময় ডিভাইসে চোখ রেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করি,
আর সে বিরতিকে বিশ্রাম বলে চিহ্নিত করি।
একটি অদৃশ্য শহর গড়ে ওঠে। পথ বাঁক নিয়ে পেছনে
তাকায়, ভূগর্ভের গুহা নিশ্চিহ্ন হয়ে পড়ে। অন্ধকারের শিরস্ত্রাণ থেকে আলোর সৌগন্ধ্য
ভেসে আসে।
গন্ধময় আলোর অনুসারীরা সর্বত্র উপস্থিত। মানুষ
তাদের অভিজ্ঞতার কথা শোনে, স্বপ্নের নতুন সূত্রের দিকে চেয়ে থাকে।
কোথাও একটি নিস্তব্ধ যন্ত্র অপেক্ষা করে যা অন্ধকার
পরিমাপে ব্যবহার করা যায়। কোনো প্রশিক্ষিত হাত এগিয়ে আসে না।
আমাদের চোখে ধার করা দৃষ্টি। আমরা নির্ভর করি প্রতিবেদন
ও অন্যের পরামর্শের ওপর।
কেউ কেউ ফিরে আসার কথা বলে; বাতাস অনুসরণ করতে
পারে না তাদের স্বর। স্বার্থচিন্তা তাদের সাহসী হতে দেয় না।
ফিরে আসার জন্য দৃষ্টির বিস্তার প্রয়োজন। দৃষ্টি
স্থবিরতার আখ্যানকে চূর্ণ করতে জানে।
আমাদের অন্ধত্ব গভীর হতে থাকে। দূরত্বের শৃঙ্খলা
ধ্বংস হয়েছে বলে আমাদের কোনো আত্মবিশ্বাস নেই।
ফেরার দিনটি প্রায়ই অনির্ধারিত রয়ে যায়। যে চোখে লেগে আছে প্রভাতের রং সে চোখে হয়তো জেগে
আছে দিন নির্ধারণের উত্তেজনা।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন