কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

দীপক সেনগুপ্ত

 

সমকালীন ছোটগল্প


কু রূপকথা

সেটা একটা হতচ্ছাড়া গ্রাম। সেই গ্রামের কেউ কখনো ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার এমেলে এম্পি কিচ্ছু হয়নি। গ্রামের সবাই হতদরিদ্র মানুষ। গ্রামের অনুর্বর জমিতে ফসল টসল তেমন কিছু ফলে না। গ্রামবাসীরা দূর দেশে গিয়ে গতর খাটিয়ে কিম্বা গতর বেচে জীবন কাটায়। বহির্জগত সে গ্রামের খবরই রাখে না।

সেই গ্রামে হঠাৎ করে ভি আই পি র আগমন। সে তার নিজের নাম বলছেন নকুল। কোনো কুলে তার কেউ এক পূর্বপুরুষ নাকি এই গাঁয়ে বসবাস করতো। নকুল সেই পূর্বপুরুষের নাম ধাম ঠিকঠাক জানে না। যে বয়েসে সে গ্রাম ছেড়ে ছিল সেটা কচি বয়েস। ও বয়সে বাবাকে বাবা, মাকে মা, কাকা জ্যাঠাকে কাকা জ্যাঠাই বলা হতো। শুধু ঠাকুর্দাকে ডাকা হতো দাদু বলে। নাম ধরে ডাকার প্রশ্নই নেই। তাই নাম জানারও প্রশ্ন নেই। নকুলও জানে না।

তবে এতোদিন পরে নকুল কি বুঝে এই গ্রামে এলো? কিসে বুঝলো যে এটা তাদের পূর্ব পুরুষদের গ্রাম?

ব্যাপারটা ঘোড়ালো। এবং ঘোড়ার সাথেই তার যোগাযোগ।

কিন্তু তার আগে জানতে হবে নকুল ভি আই পি কেন? সেটার কারণ হলো, নকুল হচ্ছে একজন দক্ষ হর্স ট্রেনার। প্রথমে ছিল রেসকোর্সের হর্স ট্রেনার। পরে ওর যোগ্যতার বলে ও হয়েছিল সিনেমার হর্স ট্রেনার। যাদের কাজ অভিনেতা অভিনেত্রীদের ঘোড়া ছোটানোর ট্রেনিং দেওয়া। কিন্তু তার আগে ঘোড়াটাকে তো ট্রেনিং দিতে হবে। যাতে সে অভিনেতা অভিনেত্রীদের ঠিকমতো সহযোগিতা করে। ধৈর্য ধরে বারবার একই শট দেয়। এই কাজে নকুল ক্রমে ক্রমে খুব দক্ষ হয়ে উঠেছিল। নাম ডাকের সাথে সাথে পয়সাকড়িও হয়েছিল। আর পয়সাকড়ির সাথে সাথে কয়েকটা চরিত্র দোষও এসে গেছিল। সেটা মাগীবাজী। সিনেমার এক্সট্রা গার্লদের পিছু পিছু সে পৌঁছে যেতে শিখেছিল মন্দ পাড়ায়। আর সেখান থেকেই ... না সে কথা এখন নয় পরে বলবো।

সত্য ঘটনা বর্ণনা করা ভীষন কঠিন। প্রায় অসম্ভব। কারণ কথকের কল্পনা তাতে ভেজাল মেশাবেই। আমাকে যখন ভি আই পি নকুল তাঁর জীবনের কাহিনী শোনাচ্ছিল, তখন নির্ঘাত তাতে কল্পনার ভেজাল মিশিয়ে ছিল। কিন্তু ভেজাল মেশানো হলেও গল্পটা একদম সত্য কাহিনীর মতোই ছিল। আমি নিজে তখন শৈশব ছাড়িয়ে তড়তড়িয়ে বাড়ছি। গ্রামের ছেলে তাই অনেক কিছুই জানি, যা ঐ বয়সে জানার কথা নয়। জানা উচিতও নয়।

নকুল ভি আই পি আমাকে বলেছিল-

- ওটা দিয়ে কি খালি মুতিস? নাকি...

আমি ফিক করে হেসে দিতেই বলেছিল-

- সমজ গয়া। মৈ ভি তেরে জৈসা হি থা। তব তো মেরি কাহানী তু সমঝে গা।

তারপর ভি আই পি নকুল এই গল্পটা বলেছিল। আমি সেটা সাজিয়ে দিলাম।

অনেক বছর আগে এক শিকারী তার দলবল নিয়ে এই গ্রামে এসেছিল শিকার করতে। তাদের উদ্দেশ্য গ্রামের পাশের জঙ্গলে গিয়ে বাঘশিকার করে।

গ্রামের লোকেরা তাদের বলেছিল-

- ছাহেব। উ বনে তো বাঘ টাগ নাই। কিছু খট্টাস থাকতি পারে। আর ত্যামন কিছু নাই যা কিনা শিকার করা যেবে।

কিন্তু শিকারীর দল গ্রামবাসীদের কথাকে পাত্তা না দিয়ে বনে ঢুকেছিল। আর শিকারও করেছিল। তবে জন্তু জানোয়ারের না - মানুষের। বনে কাঠকুটো আনতে ঢুকেছিল কয়েকটা মেয়েছেলে। তাদেরই একজনকে গুলি চালিয়ে জখম করে তারা তল্লাট ছেড়ে পালিয়েছিল। তবে সাথে করে ধরে বেঁধে নিয়ে গেছিল নকুলকে। নকুল তখন সদ্য কৈশোর পেরোনো যুবক।

নকুলকে ওরা নিয়েছিল রাস্তা দেখানোর জন্য। নকুল তাদের রাস্তা দেখিয়ে দেখিয়ে এলাকার বাইরে নিয়ে গেছিল শর্টকাট পথে। আর শিকারীদের মধ্যে একজন একজন ওকে বলেছিল-

- চল তোকে কোলকাতা নিয়ে যাই!

এর উদ্দেশ্য উপকারের প্রতিদান দেওয়া নয়, নিজেদের নিরাপত্তা। ব্যাটা গ্রামে ফিরে গিয়ে তো ওদের পালানোর খবর বিস্তারিত জানিয়ে দেবে! তার চেয়ে এই ভালো। শহরে গিয়ে কোথাও একটা ভিড়িয়ে দেওয়া  যাবে। সেই কোথাও একটা হলো কলকাতার রেসের মাঠের ঘোড়ার আস্তাবল। কাজটা বাজে কাজ। ঘোড়ার  মল পরিষ্কার করা। কিন্তু নকুলের কপাল তাকে নোংরা কাজে বেশি দিন আটকে রাখেনি। শিগগিরই ওর প্রমোশন হলো ঘোড়া দলাই মালাই-এর কাজে। তারপর ঘোড়ার দেখাশোনা। এবং তারপর ঘোড়াকে ছোটার ট্রেনিং দেওয়া। একের পর এক সবই ঘটে গেল ঝটপট। এবং তারপর তো হর্স ট্রেনার হিসেবে তার নামডাক হয়ে গেল।

খুব নামডাক। আর তাতেই ও ডাক পেয়ে চললো বোম্বাই।

বোম্বাই সিনেমার শুটিংএ তখন ঘোড়ার রমরমা। হিরো হিরোইন ভিলেন। সবাই ঘোড়া ছোটাচ্ছে। ছুটন্ত ঘোড়া নিয়ে হিরো হিরোইনের প্রতিযোগিতা, পরে প্রেম। তাও ঘোড়া ছুটিয়ে ছুটিয়ে। এবং ভিলেনের শয়তানী তাও ঘোড়া ছুটিয়ে। ঘোড়ার পিঠে চেপে সোর্ড ফাইট মানে তরোয়ালের লড়াই। এরকম সব কিছুতেই নকুলের সক্রিয় ভূমিকা দরকার। মুখ্যত তখন তাকে ঘোড়ার সাথে সাথে অভিনেতা অভিনেত্রীদেরও ট্রেনিং দিতে হতো। অধিকাংশ সময়ে সেটা হতো যেখানে আউটডোর শুটিং হচ্ছে সেই লোকেশনে।

খুব আনাড়ি এবং মহঙ্গা হিরো হলে তার ডাবল অর্থাৎ ডুপ্লিকেট হয়েও কাজ করতে হয়েছে নকুলকে। তখন হিরোর মতো একই পোশাক পরে ঘোড়ার পিঠে নকুলকে চাপতে হতো। ঘোড়ার কঠিন কঠিন কেরামতির সবটাই ওকেই করতে হতো। পরিচালকের কাজ হতো মাঝে মাঝে ভিশন মিক্স করে হিরোর ফ্রন্ট ভিউ জুড়ে দেওয়া।

এসব করে করে বেশ টাকা পয়সা হচ্ছিল। রেসকোর্স থেকে অনেক গুণ বেশি। তার অনুষঙ্গ হিসেবে আর যা হলো তার কথা আগেই বলেছি। নকুলের শরীরে তখন যৌনরোগ সিফিলিসের বাসা। তবে সেটা নকুল জানে না। রোগটা তখনও মারাত্মক হয়ে ওঠেনি।

তারপরেই ঘটলো সেই ঘটনা।

সেটা একটা ঐতিহাসিক সিনেমা। হিরো এক রাজার কুমার। হিরোইন সেও ভিন্ন রাজ্যের রাজকন্যা। রাজকন্যা তার সহেলিদের নিয়ে বনে এসেছেন শিকার করতে। শিকার না ছাই। শুধু হৈচৈ গান নাচ করে জঙ্গল মাতানো। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা সরু নদীতে নেমে জলকেলি। এতে রাজকুমারের শিকারে বিঘ্ন ঘটছে। তাতে ক্রুদ্ধ রাজকুমার রাজকুমারির সাথে বেদম তর্ক জুড়লেন। এবং শেষমেশ সুযোগ পেয়ে  রাজকুমারীকে নিজের ঘোড়ার পিঠে তুলে নিয়ে জঙ্গলের গভীরে ঢুকে পড়লেন। ছুটন্ত ঘোড়া থেকে ঝুঁকে এক নারীকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নেওয়া বেশ কঠিন কাজ। লালটুস হিরোর পক্ষে সেটা করা সম্ভব না। সুতরাং ডুপ্লিকেট দিয়ে করাতে হবে। সেই ডুপ্লিকেট অবশ্যই নকুল।

ছুটন্ত ঘোড়া থেকে ঝুঁকে টপ করে হিরোইনের কোমর ধরে এক ঝটকায় তাকে ঘোড়ার পিঠে তুলে নকুল ছুটে চলে গেল লোকেশনের অরণ্যের অন্দরে। ক্যামেরাম্যানরা বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে নকুলের চেহারা এড়িয়ে ছবি তুলে ফেললো। সব ও কে। নো রিটেক রিকোয়ার্ড। এবার নকুলের ঘোড়া নায়িকাকে নিয়ে বনের ভেতর থেকে বের হয়ে এলেই হয়।

কিন্তু তারা এলো অনেক পরে।

- এতো সময় লাগলো কেন? ক্যা হুয়া থা?

হিরোইন কোনো জবাব না দিয়ে ঝটপট চলে গেল পোশাক পাল্টাতে। যেতে যেতে বলে গেল,

- বহুত থক গই হুঁ মৈ। আজ শুটিং প্যাক আপ কর দিজিয়ে।

তাই হলো।

কাহিনীর এতো দূর তো আমি ভিআইপি নকুলের জবানিকে সাজিয়ে গুছিয়ে নিজের মতো করে বললাম।

বাকিটা সেভাবে বলা মুস্কিল। কারণ ভীষন রকম বিচলিত হয়ে এর পরে ভি আই পি নকুলের কথাবার্তা এলোমেলো হয়ে গেছিল। ও বলেছিল,

- যো ভি কুছ হুয়া, সব উস ঔরতকে শরাপ সে।

- কৌন ঔরত?

- জিসে ও হান্টার লোগ গোলি মারা থা ইস জঙ্গল কে অন্দর। হমে বঁহা যাকর উনসে মাফি মাঙ্গনা পড়েগা।  মরনা তো মুঝে হ্যায়। বচনেকা অব ঔর কোই উম্মিদ নহি হ্যায়।

ভি আই পি নকুলকে আর ভি আই পি মনে হচ্ছিল না। বড়োই করুণ লাগছিল ওকে।

- অব তো মেরা বঁহা সে লাগাতার খুন বহতা হ্যায়। হিরোইন তো ফরেন যাকে ইলাজ করাকে ঠিক হো গই। ঔর লৌটকে মেরা কাম কাজ সব চৌপট কর দি। লেকিন উসদিন জঙ্গল মে কশুর মেরা নহি থা উসকা হি থা। বো হি ঝাপটি দি মেরা উপর।

নকুল কাঁদছিল। মেরা বিমারি বড়তে বড়তে কাঁহা সে কাঁহা আ গয়া। সরকারি হসপিটালকে ডক্টর বোলা,  অব ঔর কোই উম্মিদ নহি হ্যায়। অব বস মৌতকা ইন্তেজার করো।

রক্তমাখা হাতটা তুলে কাঁদতে কাঁদতে নকুল বলছিল,

- অব বস একহি কাম রহ গয়া। উনসে মাফি মাঙ্গনা।

কিন্তু অতোদিন আগের কথা গ্রামবাসীদের কারো মনে নেই। এরা অনেক পুরনো কথা মনে রাখতে পারে না। এদের স্মৃতিশক্তি কম। তবে কি এক ভয়ের কারণে যেন ওরা ঐ বনে আর যায় না? ঐ বনে নাকি চুড়েল আছে।

- কভি খুব চিল্লাতি থি। ফির হম লোগ জঙ্গল যানা ছোড় দিয়া তো চুপ হো গই।

এটা শুনে নকুল ভয়ঙ্কর চমকে উঠে বলে উঠেছিলো,

- ইসকা মতলব মরি নহি থি বো। কেবল ঘায়ল হুই থি। চিল্লাই থি। তা কি কোই আকে উসে বচা লে। লেকিন তুম বুড়বক লোগ কোই নহি গয়া। বেচারি তরপ তরপ করে মর গই।

নকুলের হাহাকারের জবাব সেখানে কারো কাছেই ছিল না।

নকুল ছুটে জঙ্গলের ভেতরে চলে গেছিল। আর ফিরে আসেনি। এবার কোনো চিৎকার শোনা না গেলেও গ্রামবাসীদের পুরনো ভয় ভাঙ্গেনি। বরং বেড়েছিল। ওরা আর নতুন করে জঙ্গলে যাওয়া শুরু করেনি।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন