![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
সিফাতের ধুনুচি নৃত্য
’পরিণীতা’ সিনেমায় সাঈফ আলী খানের মন্দিরে ধুনুচি নাচের দৃশ্য দেখার পর থেকে আম্মার কাছে সিফাতের ঘ্যানঘ্যানানি বেড়ে গেলো।
’গত বছর যে আমারে পূজায় ধুনুচি নাচে নাম লিখাইতে মানা করলা আম্মা, তয় ঐ সাঈফ আলী খানও ত’ মুসলমান। হ্যায় দেহি দুর্গা পূজায় ধুনুচি নাচ নাচলো সঞ্জয় দত্তের সাথে! আর বিদ্যা বালান আইসা অগো নাচের ভেতর নারকেইলের ছোবড়ায় আগুন ধরা - ঢুস ঢুস কইরা মাটিতে পড়ে - বিদ্যা বালান না আইসা সেগুলা সরায় নেয় য্যান অগো পায়ে ফোস্কা না পড়ে - তয় সাঈফ আলী খান নাচতে পারলে আমি পারুম না ক্যান? এইবার দুর্গা পূজায় আমি নাচুমই!
’কও দেহি ছ্যামড়ার কথা! আরে বলদ, ঐডা ত’ অভিনয়।
সাঈফ আলী খান ‘পরিণীতা’য় হিন্দু বেডার চরিত্রে এ্যাক্টিং করছে, তাই তারে ঐডা করন লাগছে!
তুই কী অভিনয় করোস?
’হ্যায় একলা নাকি? শাহরুখ খান, সালমান খান, আমির
খান - ব্যাকডি দেহি পিরাই মন্দিরে গিয়া নাইরকেল ফাডায়, নাচানাচি করে - তয় আমি করলে
দূষ?’
’বাবা, ওরা বোম্বাই শহরের নায়ক। তুই কী তাই? এছাড়া
হিন্দুরা তরে দেবেনি তাগো মন্দিরে এই নাচ নাচতে?’
’দেবে না ক্যান? গত বছর মামুন বাই ত’ নাচছিল - হ্যারপর
ত’ মালয়েশিয়ায় চইলা গেলো কাম করতে।’
’তর আব্বায় যুদি রাজী না হয়? আমি হ্যারে কইতে পারুম
না - দেবে নে ঝাড়ি!
’আম্মাগো আমি এইবার নাচুমই নাচুম - পূজায় কত মাইনষে
আয়, কত লাইটিং, অত মাইনষের ভিতর নাচলে নিজেরে কেমুন হিরোর লাহান লাগে!’
’ঐ সেই কখন থিকা মরার কান্দন শুরু করছে। আর তিনমাস পর ফাইন্যাল পরীক্ষা - ডিসেম্বর মাসে। অই ছ্যাড়া - তর না এইবার ক্লাস টেন চলে? না উনি পূজায় নাচবেন!’
ছেলেকে একটি ঝাড়ি দিয়ে মর্জিনা কলতলায় রাখা এঁটো থালা—বাসন ধূতে বসে। পলাশী বাজারের কাছে টিনের বাড়ি তাদের। পাশে টিউবওয়েল। তার স্বামী পলাশী কাঁচা বাজারেই কাজ করে। পাশেই ঢাকেশ্বরী মন্দির বলে ছেলেকে দুর্গা পূজার আগে আগে আর ধরে রাখা যায় না। ঢাকের বাজনা মন্দিরের খুব কাছেই বাসা বলে কানে আসবেই। আর ছেলেও অমনি বই—খাতা ফেলে সেদিকে দৌড় দেবে।
দোষ অবশ্য তার মানে মর্জিনা বেগমেরও কিছু আছে। ঘটনা হলো ক্লাস এইটে পড়ার সময় বরগুণার পাথরঘাটা থেকে বারো বছরের বড় খালাতো ভাইয়ের সাথে বিয়ে হয়ে ঢাকায় এই পলাশী বাজারের পাশের বাসায় আসার আগে পর্যন্ত ‘পরিণীতা’ ছিল মর্জিনা বেগমের সবচেয়ে প্রিয় উপন্যাস। ক্লাস নাইনের এক আপা পড়তে দিয়েছিল। ললিতা—শেখর—গিরীণ... কেমন একটা বই! গা থমথম করা বই। এই ললিতার জন্য বুকে পাথরঘাটার সমুদ্রের মত জোয়ার আসে, কাপুরুষ শেখরের জন্য মেজাজ খারাপ হলে যেন ঘূর্ণিঝড় তুফান নামে, আবার অভাগা গিরীণের জন্য বুকে যেন ভাটার নি:শ্বাস! একে একে ‘দত্তা,’ ‘দেবদাস’ পড়া শুরু করতে করতে এবং সেই সাথে ‘হিমুর হলুদ পাঞ্জাবী’ বা ‘রূপা’ শেষ করতে করতে, হাফ—ইয়্যারলিতে অঙ্কে হলো ফেল। আব্বাও অনেকদিন থেকেই মেয়েকে বিয়ে দিতে চাচ্ছিলেন। এই হয়ে গেলো বিয়ে। এখন স্বামীর ঘরে এত বড় ছেলের মা হয়েও বইয়ের নেশা আছে। কিন্তÍ বই আর কোথায় পড়তে পায়? তাই বিয়ে হয়ে আসার পরও কিছুদিন পর্যন্ত যখন ভিসিআরের চল ছিল পাড়ায়, মর্জিনা বেগম ভিসিআর দেখতো। এখন মানুষ ভিসিআরও দেখে না। টিভিতে ইন্ডিয়ান চ্যানেলে পুরনো ছবি দেখায়। মোবাইলেও ইউ টিউব টিপে যখন খুশি তখন পুরনো ছবি দেখা যায়। তা’ এক ’পরিণীতা’ যে কতবার জীবনে দেখা হলো মর্জিনা বেগমের তার ইয়ত্তা নেই। প্রথম যখন বউটি হয়ে পাথরঘাটার সমুদ্রের পাশের খোলা আকাশ বাতাসের জীবন ছেড়ে এই পলাশীর বাজারের পাশে একটি টিনের বাড়িতে আসলো... ২০০৫ সালের কথা... তখন বিয়ের পর স্বামী আব্দুল মোত্তালেবের সাথে প্রথম দেখার পর থেকে যখন প্রথম দু’বার তার পেটে বাচ্চা আসার পরও দু’বারই চাচাতো ননাসের বাড়ি সেই পুরাণ ঢাকার র্যাঙ্কিন স্ট্রীটে সাধ খেতে গিয়ে একবার রিক্সা আর সিএনজি এবং আর একবার রিক্সা আর ভ্যানগাড়ি মুখোমুখি হয়ে, দু’বারই সে রিক্সা থেকে পড়ে গিয়ে রক্ত ভেঙেছিল আর তৃতীয়বার বা ২০০৮—এ অনেক চোখের পানির পর এই ছেলেটি যখন হয়, আব্দুল মোত্তালেব সকাল সকাল বাজার চলে গেলে মর্জিনার দিন কেটেছে ছেলেকে কোলে নিয়ে, বাপের বাড়ি থেকে আসার সময় সাথে করে নিয়ে আসা শরতচন্দ্র আর হুমায়ূন আহমেদের কয়েকটি প্রেমের নভেল পড়ে। আর এখন ত’ শরতচন্দ্রের নভেলগুলোর নাম খুঁজে খুঁজে ইন্ডিয়ান বাংলা বইগুলো সে মোবাইল ফোনে ইউ টিউবে সার্চ দিয়ে খুঁজে দ্যাখে। সেই চাচাতো ননাস এই শনিবার বেড়াতে আসছিলেন। তার সাথেই সিনেমা দেখতে বসলে— কী দেখবে আর? ‘পরিণীতা’ ছাড়া? সিফাত দুপুরবেলা অনেক সময় ঘুড়ি ওড়াতে বের হলেও, মর্জিনা বেগমই ধমক দিয়ে বলেছিল, ‘এ্যাই- তোর জুলেখা ফুপু আইছে। ওনার পাশে না বইসা এই রইদে কই যাস?’ সিফাতের অবশ্য হুঁশ—জ্ঞান আছে। সিনেমায় একটু অন্যরকম সীন শুরু হইলে ও নিজেই উইঠা যায় গিয়া। কিন্ত পোলা সিনেমা দেইখা যে ধুনুচি নাচে পার্ট নেবার ঘ্যানঘ্যান শুরু করবে, তা’ মর্জিনা বেগম ভাবেও নাই।
সমস্যা হইলো মর্জিনা বেগমের দুইবার রক্ত ভাঙ্গার
পর তৃতীয়বারের পোলা। এরপর আবার একডা মাইয়া হইয়া সে অল্প বয়সেই জ্বরে—ডায়রিয়ায়
একদিন মারা গেছে। তাই মর্জিনা বেগম বা তার স্বামী আব্দুল মোত্তালেব— একেবারেই এই পোলার
হাউশ—ইচ্ছার উপর একটা কথা কইতে পারে না। এমনিতে আব্দুল মোত্তালেব মানুষ ঠান্ডা। সত্যি
বলতে প্রতি বচ্ছর দুর্গা পূজার সময় সে নিজেই বউ—পোলারে সন্ধ্যার দিকে নিয়া যায়।
বিশেষ কইরা অষ্টমীর দিন।
’ঘরে বইসা আর কী করবা? চলো— লাইটিং দেইখা আসি। একটু
চা—ফা খাবনে। তারপর এই বছর অগো ঠাকুর কেমন বানাইছে একটু দেখমু আনে। গত বছরেরটা ভালা
ছিল না এই বছরেরটা। সুবোধে ত’ কইলো এই বছরের ঠাকুর আরো ফ্যান্টাস্টিক হবে।’ সুবোধচন্দ্র
শীল তার স্বামীর ভাল বন্ধু। একটি হেয়ার সেলুনে কাজ করে। সেই সাথে হোমিওপ্যাথির দোকানও
আছে।
শুনে খুশি মনে মর্জিনা বেগম সাজতে বসে। সাজলেও এত
বড় পোলার মা সে। মাথা একটা কালো চাদরে ঢাকতেই হয়। আব্দুল মোত্তালেবও বিয়ের সময়ের
মত ক্লিন শেভ আর নাই। দাড়ি রাখছে। কিন্ত, তারপরও বছরের ঐ সময়টা চারপাশে আলো—বাজনা,
খাওয়া—দাওয়া, সাজগোজ করা বেডি—ব্যাডাদের ভিড়। ভালই লাগে।
’ঐ সিফাত! সিফাত!’
মা’র ডাকে ক্রুদ্ধ সজারুর মত সিফাত গুটি গুটি পায়ে
এতক্ষণের পড়ার ভান ছেড়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।
’মিটশেফের ভিত্রে তোর জন্য এক বাটি দুধ গরম দিয়া
রাখছি। খা এখন। তোর আব্বা সন্ধ্যায় আসলে কবো নে। দেখি, উনি মত দেন কিনা। বিকালে কী
খেলতে বাইর হবি?’
’এক ঘন্টা— আম্মা!’
’ঠিক আছে। সন্ধ্যার আগে ফিরবি কইলাম।’
(২)
আম্মার উপর এতক্ষণ রাগে খুবই মেজাজ খারাপ লাগছিল সিফাতের। এখন মনটা ফুরফুরা লাগছে। এই আশ্বিন মাসের সন্ধ্যার মত। আজ ওরা কয়েকজন বন্ধু মিলা হাঁটতে হাঁটতে ঢাকা ভার্সিটির দিকে যাবে। সবচেয়ে অবাক লাগে দেয়ালের গায়ের লেখাগুলো পড়তে। আগে আর এক ধরণের লেখা ছিল। গোছানো আর বইয়ের কথার মত। এগুলা কেমন আউলা ঝাউলা। তয় অনেক রঙের চড়া চড়া ছবি। আব্বার সাথে সুবোধকাকার মাঝে মাঝেই ঝগড়া হয়। সে ঠিক বোঝে না সব। তবে পড়তে থাকে।
’তুই যাই কও মোত্তালেব’— সুবোধকাকুর দেশের বাড়িও
পাথরঘাটাতেই, হাসিনা গিয়া ভাল অইলো না খারাপ?
’কিছু বুঝবার ত’ পারি না। ভালই ত’ হইছিলো মনে হয়।
এখন দেখি সব একইরকম— নাকি আরো— যাক— দেখি আরো কিছুদিন!’
দু’জনের কিছু কথা কাটাকাটি হবার পর ঐ হোমিওপ্যাথির ওষুধ লাগলে পরে সুবোধকাকুর বাসায় সিফাতের দৌড়াতে হয় বা চুল কাটতে গেলেও সুবোধকাকুর সেলুনে। আবার সুবোধকাকীর জন্য আম্মা মাঝে মাঝেই তাজা সব্জি পাঠায়। আব্বা ত’ কাঁচা সব্জিই বেচা—বিক্রি করে। কাকাগো বাসার সামনে জবা আর গেন্দা ফুলের গাছ বেশ ভাল লাগে সিফাতের। কাকার ছেলে অজয়ের সাথে এক ক্লাসেই ত’ সে পলাশীর স্কুলে পড়ে। আর অজয়গো বাসায় সকাল কি সন্ধ্যায় গেলে অর নিজের বইন আর দুইটা জ্যাঠাতো বইন রাখি—জয়া—প্রীতির হার্মোনিয়ামে পো বাজনার সাথে ’সা—রে—গা—মা—পা—নি’ কানে ভাইসা আসে। সিফাতের নিজের কোন বইন নাই। রাখি—জয়া—প্রীতির বয়সী সিফাতের চাচাতো—খালাতো—ফুপাতো বইনরা কেউ ওগো মত চুল ছাইড়া ত’ ঘোরে না। সবাই হিজাব পরে বা বোরখা পরে। সুবোধ কাকুদের বাসার সামনে গেলে তাই সিফাতের কেমন যেন বুকের ভেতরটা উদাস উদাস লাগে। ঐ আম্মার বালিশের তলা থেকে ছিঁড়া ছিঁড়া যাওয়া, অস্পষ্ট হলুদ রঙের মলাটের উপর লাল অক্ষরে লেখা ‘পরিণীতা— শ্রী শরতচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ লুকায় পইড়া সিফাতের যেমুন লাগছে। না— সে শেখরের মত খারাপ হবে না। সে হবে গিরীণ। গিরীণ— হবে? না— খুব লস গিরীণের। গিরীণের গোটা জীবনটাই লস। অত ভাল সে হইতে পারবে না। তয় অত লসও জীবনে সে মানতে পারবে না। কী হইলো গিরীণের? ব্যাটার পুরা জীবনটাই লস। তাহলে সে হবেটা কী? দূরগা— বেডা মানুষ। রাখি—জয়া—প্রীতির মত মাইয়া মানুষ ত’ না যে সন্ধ্যাবেলায় ঘরের ভেতর হার্মোনিয়াম বাজায় সময় কাটাইতে হবে কী নিজের চাচাতো—ফুপাতো—খালাতো বোনদের মত ঘরের ভেতর নামাজ পইড়া, রান্না—বান্না শিখা সময় কাটাইতে হবে। এখন পাড়ায় তাগো ফ্রেন্ডদের গ্রুপের ব্যাকডি ফ্রেন্ড মিলা ঘুরতে বাইর হইবো। বিকালের ঘোরা।
(৩)
আব্বা যে এত সহজে রাজি হইবো তা’ সিফাত নিজেও আশা করে নাই।
'পোলাপান মানুষ নাচতে চাইছে— নাচবো একটু। সমস্যা কী? কিন্ত পোলারে কইয়ো প্রেত্যেক দিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে না পারলেও শুক্কুরবার যেন নামাজ মিস না করে! গেলো শুক্কুরবারও বন্ধুগো লগে আহসান মঞ্জিলের ঐদিকটা নি গেছিলো ঘুড়ি উড়াইতে!
‘কমুনে।’ আম্মা বাধ্য মেয়ের মত ঘাড় নাড়িয়েছিল।
আব্বার মত পাইতে না পাইতেই সবার আগে সে দৌড় লাগাইছে
অজয়ের কাছে।
’অজয়— তোগো ঢাকেশ্বরী মন্দিরে পূজা কমিটির কাছে
ক প্লিজ যে আমি নাচবো। ধুনুচি নাচ নাচবো।’
’তোর আব্বা রাজি হইছে?’
’হ।’
’তোর ভয় করবে না?’
’ভয়? ক্যান?’
’বাপরে— আমিই পারি না। ধুনুচি থিকা যখন নাইরকেলের
ছোবড়াগুলা পইড়া যায়!’
’কিন্ত আমার কোন ভয় নাই!’
’ঠিক আছে। পূজা কমিটিতে আমার কয়েকজন কাকু আছে। তোর
নাম লিখানোর ব্যবস্থা করুম আনে। কিন্ত তুই ভাল মতো শিখছিস?’
’কয়েকদিন একটু ইউ টিউব দেইখা প্র্যাক্টিস করতে হইব।
আর আমি পলাশীর পোলা না? জন্ম থিকা তোগো পূজা দেইখাই ত’ বড় হইলাম।’
(৩)
’পূজা অজয়গো— অজয় ঠান্ডা মাথায় ঘরে বইসা অঙ্ক
করে, আমার পোলায় কিনা সকাল নাই সন্ধ্যা নাই, শুধু ডান্স প্র্যাক্টিস করে।’
’হ— অজয় তার বাপের মতই ঠান্ডা মাথা হইছে। যাক— অর
যখন হাউশ হইছেই নাচবে— কিন্ত এই পনরো দিন প্র্যাক্টিসের পর, পূজায় নাচার পর তুই পড়তে
বসবি কইলাম।’
’বসুম আব্বা।’
মুখে যত বকা—ঝকা করুক আব্বা—আম্মা, সিফাতের প্রতিযোগিতার
দিন দু’জনই দুপুরের পর পর ভাল মতো গোসল করলো। আব্বা সবচেয়ে ভাল পাঞ্জাবি—পায়জামা
আর আম্মা সবচেয়ে ভাল শাড়িটা পরলো। বাড়ি থেকে বের হবার সময় দু’একজনকে লাজুক আর হাসি
হাসি মুখে কইলো যে ‘সিফাতের আইজ ড্যান্স কম্পিটিশন।
ঐ ঢাকেশ্বরীতে পোলায় একটু নাচবো আর কী! নাচুক গা। বচ্ছরের একটা দিন। আর ত’ ঘুইরা আগামী
বচ্ছর।”
আব্বা—আম্মার সাথে বের হতে হতে দু’জনেই বলাবলি শুরু
করলো, ’ধানের শীষই ত’ আইব মনে হয় ইলেকশনে। তারেক জিয়া দেশে আইব কবে? ইহ্— একেবারে
ভইরা গেছে সব চাইরপাশ— ধানের শীষের লিফলেটে।’
উহ্— বুকের ভেতরটা টেনশনে ধিক ধিক করতাছে। ‘চ্যানেল
আই,’ ‘বৈশাখী,’ ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’, ‘একুশে’, ‘যমুনা’— কোন্ টিভি চ্যানেল আসে নাই? ভিড়ে
ভিড়াক্কার অষ্টমীর মন্ডপ।
’দ্যাখছো— শামীম আরা নীপা আইছে—’ আম্মা আব্বার কানে
ফিসফিস করে।
’হয়— উনি ত’ জাজ আইজকের কম্পিটিশানে!’ আব্বা হাসি
হাসি মুখ করে।
’যাই আব্বা— আসি আম্মা!’
’যা— আল্লাহ ভরসা!’
সিফাত প্রতিযোগীদের অপেক্ষার জায়গার দিকে এগিয়ে
যায়। গত পনেরো দিন খুব খেটেছে সে। আম্মাই ইউ টিউব ঘেঁটে কত মন্দিরের সামনে নাচের দৃশ্য
তাকে দেখতে দিয়েছে। সালমান খানের জীবনের প্রথম সিনেমা ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’—য়
ভাগ্যশ্রীর বাপ যখন অপমান কইরা সালমানরে তাড়ায় দিলো, তখন শিবের মন্দিরের সামনে গিয়া
সালমানের ডান্স— হিন্দি অত ভাল না বুঝলেও চোখে পানি আসে-
’দর্দে জুদাই কীয়া হোতা হ্যায় তুম জানো ম্যায়
জানুম
প্যার বুলায়ে দুনিয়া রোকে কিসাক কাহানাম আনুম
তুমসে মিলে বিনা দিল কো কুছা ভি সুজে না
ইয়ে পাগলা হ্যায়!’
এমন কত কত নাচ যে সিফাত গত পনেরো দিনে প্র্যাক্টিস
করলো! এই ত’ মঞ্চে ডাক আসছে, এখন আপনাদের সামনে ধুনুচি নৃত্য পরিবেশন করতে আসছেন সিফাত
মোহাম্মদ আলী!’
সিফাত হাসি হাসি মুখে মন্ডপের সামনে নাচের জায়গায়
আসে। মাটির ধুনুচিতে জ্বলছে নারকেলের খোসা। ধূপের ঘ্রাণ কী মায়াময়! Õপরিণীতা’ ছবির
সাঈফ আলী খান তার জন্য বয়সে একটু বেশিই বড়। কিন্ত, আম্মারাও যখন কিনা বাচ্চা ছিল,
সেই সময়ের সিনেমা ‘ম্যায়নে পেয়ার কিয়া’-র সালমানের মত নিজেকে মনে হয়। সালমান খান
নাকি এই সিনেমা আঠারো—উনিশ বছর বয়সে করছে। এখন ত’ সিফাতের বয়স ষোল। দুই বছর এদিক
ওদিক।
ঢাকের কাঠি বাজে। তিত্তি ধিনিকি তিত্তি ধিনিক। সিফাতই
যেন আজ সাঈফ আলী খান, সিফাতই সঞ্জয় দত্ত। সে একাই শাহরুখ—সালমান—আমির—অক্ষয়—হৃতিক!
সিফাতকে আজ কে থামাবে?

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন