কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

প্রদোষ ভট্টাচার্য

 

বড় পর্দায় হিন্দী ছবি (১৫শ পর্ব) আবার নতুন ছবি – ইক্কিস (২০২৬)

 


২০২৫-র ধুরন্ধর-এর বার্তা যেমন সঠিক, তেমনই সঠিক ২০২৬-র ইক্কিস-এর। ১৯৭১-এর যুদ্ধে শহীদ হয়ে মরণোত্তর পরমবীর চক্র প্রাপ্ত কনিষ্ঠতম সেনানী অরুণ ক্ষেত্রপালের (রূপায়নে অগস্ত্য নন্দ) জীবনালেখ্য শ্রীরাম রাঘবন পরিচালিত এই ছবি। চিত্রনাট্য একাধিক মুহূর্তে মর্মস্পর্শী, শেষ দৃশ্যে এই প্রতিবেদকের চোখের পাতা ভিজে এসেছিল। চিত্র-কাহিনির ‘ফ্রেমিং ডিভাইস’ পূর্বোক্ত যুদ্ধের তিরিশ বছর পর অরুণের বৃদ্ধ পিতা, ব্রিগেডিয়ার মদনলাল ক্ষেত্রপাল (রূপায়নে জীবনের শেষ ভূমিকায় ধর্মেন্দ্র) পাকিস্তানে আসা এবং তাঁকে অতিথি করা – নিজের স্ত্রী-কন্যা, এমনকি ঊর্ধতন অফিসারের আশঙ্কা এবং মতের বিরুদ্ধে গিয়ে – সেই যুদ্ধের পাকিস্তানী সেনানী ব্রিগেডিয়ার জান মহম্মদ নাসিরের (বাস্তবে ব্রিগেডিয়ার খোয়াজা মহম্মদ নাসির, রূপায়নে জয়দীপ আহলায়ত)। স্ত্রী-কন্যা বারবার জান মহম্মদকে প্রশ্ন করেন, মদনলালের মানসিক শান্তি বিঘ্নিত করে কী লাভ হবে জানের। এ রহস্য উন্মোচিত হবে ছবির শেষের দিকে। নিজের সিদ্ধান্তে অচল থেকে জান মদনলালকে সম্মানের সঙ্গে নিজগৃহে অতিথি করেন। যখন মদনলাল সারগোদা গ্রামে নিজের পৈতৃক ভিটে দেখার জন্য জানকে ট্যাক্সির ব্যবস্থা করতে বলেন, তখন জান নিজের গাড়ি করে নিজের কন্যাসহ মদনলালকে সেখানে নিয়ে যান।

এরই মধ্যে ‘ফ্ল্যাশব্যাকে’ দর্শক দেখবেন অরুণের সেনানী হিসেবে গড়ে ওঠার আখ্যান, সৈন্য পরিবারের মেয়ে কিরণ কোছরের (রূপায়নে সিমর ভাটিয়া) সঙ্গে তাঁর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠে ভেঙে যাওয়ার ইতিহাস, এবং সর্বোপরি বাসান্তরের যুদ্ধে তাঁর শহীদ হওয়ার ঘটনা। এই শেষোক্ত ঘটনা মদনলাল শুনবেন জান মহম্মদের মুখে, ঠিক যে মাঠে, যে বটগাছের তলায় জানের ট্যাঙ্ক থেকে, জানেরই হাতে নিক্ষেপিত গোলায় আহত হয়ে অরুণ শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন – তাও চোদ্দটি পাকিস্তানী প্যাটন ট্যাঙ্ক ধ্বংস করার পর। এই কথাই মদনলালের কাছে বলে ক্ষমা চান জান। মদনলাল বটগাছের তলা থেকে খানিকটা মাটি কুড়িয়ে নিয়ে জানের হাত ধরে গাড়ীতে ওঠেন। তাঁর আগে তিনি বলেন যে যুদ্ধজনিত ক্ষত কখনও শুকোয় না। কেউ না কেউ তা খুঁচিয়ে তোলে, আর তা থেকে আবার শুরু হয় রক্তক্ষয়। এ জিনিস চলতে থাকবে যতদিন না “আমরা তা বন্ধ করব।”

দেশে ফেরার আগে মদনলাল জানকে ভারতে এসে তাঁর বাড়ীতে অতিথি হবার আমন্ত্রণ জানিয়ে যান। দ্বিধাগ্রস্ত জান অরুণের মা’র আপত্তির দিকে ইঙ্গিত করলে মদনলাল বলেন, “মিসেস ক্ষেত্রপাল একজন সেনানীর স্ত্রী, একজন সেনানীর মা।” ইঙ্গিত, যে ভাবে জানের পরিবার মদনলালকে সমাদর করেছে, জানও মদনলালের পরিবারের কাছ থেকে সেইরকমই সমাদর পাবেন।

ছবিটির দৃষ্টিভঙ্গি যুদ্ধবিরোধী। তা নিয়ে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু দুটি কথাঃ ১৯৭১-এর যুদ্ধ শুধু ভারতের পশ্চিম সীমান্তে হয়নি। পূর্ব সীমান্তের ওপারে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যে পৈশাচিক গণহত্যা চালিয়েছিল, তা সর্বজনবিদিত। জান মহম্মদের মতো ‘ভালো’-মানুষের কি সে ব্যাপারে কোন বক্তব্য ছিল? আর ছবিটি শেষ হবার পর, অভিনেতা ও কলাকুশলীদের নাম দেখানো হয়ে গেলে, যখন দর্শক বলতে প্রেক্ষাগৃহে এক আমি ছাড়া আর কেউ ছিল কিনা সন্দেহ, তখন যে দাবিত্যাগ করা হয়েছে, তা, আমার মতে, ছবির একেবারে শুরুতে দেওয়া উচিৎ ছিল। জান মহম্মদের আচরণ একেবারেই একটি ব্যতিক্রম। পাকিস্তান বাস্তবে এক হিংস্র, আতঙ্কবাদী, কট্টরভাবে ভারত-বিরোধী দেশ যা পদে পদে জেনিভা কনভেনশন থেকে উদ্ভূত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে চলেছে। আরও ভাল হত যদি শ্রীরাম রাঘবনের মতো দক্ষ এবং আপসহীন পরিচালক ছবির মধ্যেই অন্তত ১৯৭১-এ পূর্ব পাকিস্তানে উক্ত দেশের সেনার জান্তব নৃশংসতা নিয়ে বক্তব্য রাখতেন। এই দুটি কারণে আমি ইক্কিস-এর চেয়ে ধুরন্ধর-কে অল্প হলেও এগিয়ে রাখব।

ছবিতে প্রত্যেকের অভিনয় প্রশংসার্হ। যুদ্ধের দৃশ্যে ট্যাঙ্কের লড়াই শেষ এত ভাল দেখেছিলাম সেই ১৯৬৭ সালে, হলিউডের Battle of the Bulge ছবিতে। যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে অরুণের ক্যাডেট হিসেবে, এবং প্রেমিকরূপে, কিছু অন্তর্দ্বন্দ্ব চিত্রনাট্যকে বাড়তি মাত্রা দিয়েছে।

সবশেষে পুরোপুরি ব্যক্তিগতভাবে আমার একটি পরমপ্রাপ্তি ঘটেছে। মদনলাল যখন পাকিস্তানে বিভিন্ন গৃহে  অতিথি হন, তখন গৃহবাসীদের টেলিভিশনে শোনা যায় একাধিক পুরনো বলিউডি ছবির গানঃ তার মধ্যে একটি ১৯৫২ সালের জাল ছবির ‘ইয়ে রাত ইয়ে চাঁদনী’। কণ্ঠ হেমন্তকুমারের – আমার পূজ্য হেমন্ত মুখোপাধ্যায়!

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন