কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জয়িতা ভট্টাচার্য

 

কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৪


কাঁচের গাড়ি

চারিদিক ভিড়ে থিকথিক। মাথার ওপর দিয়ে চলে যাচ্ছে ঝমঝম করে ট্রেন। প্রতি সন্ধ্যার এই একই দৃশ্য এখানটা। মনে হয় সারা রাজ্যের লোক এসে জড়ো হয়েছে এখানে। ওভারব্রীজের নিচে দুটো ফুটপাত দুদিকে। কলা নিয়ে শাক নিয়ে ঝুড়ি করে হাঁসের ডিম নিয়ে বসে মাসি। কাঁকড়া, কলা কী নেই! উল্টোদিকের ফুটে আলোকিত কালীমন্দির,পাঁঠার দোকান এবং জনশৌচাগার। এটা একটা চার-মাথার মোড়। গাড়ি বাইক বাচ্চা  এবং বড় লরি টোটো এবং তিন দিকের রাস্তা থেকে ভেসে আসছে বিচিত্র গান। কিছুদূরে কোনো দলের সভা থেকে ভেসে আসছে বক্তৃতা। ভিড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হরিহর ব্যোমকে গেল। কোনদিকে যাবার ছিল আর কোনদিকে যাওয়ার পথ - সবই ঘেঁটে গেছে! হঠাত ভিড়ের মাঝে রাজার শকট যেন এসে সব যানবাহন  ফিকে করে দিল। মরার গাড়ি। বিরাট বড় ঝা চকচকে রুপোলি পাতে মোড়া। নানা রকম ডিজাইন ওর গায়ে। দুটি দিকে কাঁচের দেওয়াল। মুগ্ধ হয়ে দেখছে হরিহর। এমন নয় যে এই প্রথম। কিন্তু এই প্রথম যেন ভাল করে তাকাল। রূপোলী পাতের ওপর জমজমাট কারুকার্য করা ফ্রেমে কাঁচের ছোট্ট দরজা। কিন্তু এটা কী হরিহর! ভুঁরু কুঁচকে দেখল দুটো পাল্লার মাঝ বরাবর কালো চিকে চিহ্ন করা। বেশ মোটা করে। কালো। শববাহী গাড়িতে কি এমন কালো মোটা প্লাস সাইন থাকে সব সময়ই? সে এতদিন কেন লক্ষ্য করেনি? হরিহরের চোখের সামনে ভেসে উঠল অঙ্ক বইয়ের পাতা। প্লাস মানে তো যোগ। একটু এগিয়ে গেল হরিহর ভিড় সাঁতরে। সমুদ্রের মাঝে টাইটানিক দাঁড়িয়ে আছে। কাঁচের গাড়িটা নড়ছে। জ্যামে জায়গা পাচ্ছে না। একটু এগিয়ে হরিহর ভেতরটা দেখল। কাঁচের ভেতরে ঘরটা উজ্জ্বল আলোয় ভরা। চিত হয়ে শুয়ে আছে সাদা চাদর ঢাকা, ছেঁড়া ছেঁড়া ফুল ছড়ানো, একটা ছেলে। অথবা একটা লোক কিম্বা প্রৌঢ় হতে পারে। থুতনিটা উঁচু। খোঁচা খোঁচা দাড়ি সারা মুখ জুড়ে। কতদিনের না কাটা চুল। বাবরি চুল এলোমেলো সারা মুখে ঝাঁপিয়ে এসে পড়েছে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে মড়মড়ি হয়ে গেছে। একটু ফাঁক। হরিহর তাকিয়ে আছে আধবোজা চোখে। ঘাসের ওপর রাখা আছে খাটিয়া। কাঁচের গাড়ির ভেতর সন্তু। কতদিন পর। হাকিমপুর থেকে কয়েকমাইল যেতে হয়েছিল সন্তুকে দেখতে। কলকাতা থেকে পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল হাকিমপুর তাকে। সন্তু শুয়েছিল শান্ত। নিথর। ধূপের গন্ধ আসছে। একগোছা ধুপ। সস্তার। তীব্র গন্ধ। নড়ে উঠল কাঁচের গাড়িটা। গ্রীন পুলিশের বাঁশি। আলোময় বদ্ধ ঘরটার ভেতর আটকে একটা মথ। কীভাবে যেন ঢুকে পড়েছে! নাকি মরার ঘরেই ডিম পেড়েছিল?

ফরফর করে উড়ছে কাঁচের দেওয়ালে এদিক থেকে ওদিক। মরা মানুষটার বুকের ওপর বসছে। মুখের ওপর বসছে। পাগলের মতো ওড়াউড়ি করছে। বেরোতে পারছে না।

কুয়াশাময় একটা ভোর। আলো ফোটেনি। হরিহরকে নামিয়ে দিয়ে গেছে গাড়ি। সারি সারি দোকান।বহুতল বাড়িগুলো সব দাঁড়িয়ে আছে। একটাও মানুষ নেই। দু’একটা কালো প্রজাপতি উড়ছে মানুষহীন শহরে। 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন