কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

অম্লান বোস

 

সমকালীন ছোটগল্প


জীবন মরণের সীমানা ছাড়ায়ে

চোখের জলই আমাকে গলিয়ে দিল। একজন সাত অন‍্যজন চার, স্কুলের পরীক্ষা শেষ, ওরা রেজাল্টের অপেক্ষায়। উদাস সকাল, অলস দুপুর আর বিষণ্ণ নিষ্ফল সন্ধ‍্যা পার হয়ে যাচ্ছ। নাচ গানের ক্লাস, সাঁতারের সেশন, কখনও মামা, মাসি পিসিদের বাড়ি, সবই চলছে কিন্তু নিরুত্তাপ একঘেয়েমিতে। বুঝতে পারছি ওদের সময় কাটানো ক্রমশই দুঃসাধ্য হয়ে উঠছে। অফিস থেকে ফেরার পথে সেদিন “মিকি, কাম হোম” ছবির ডি-ভি-ডিটা এনে চালিয়ে দিয়েছিলাম। কুকুরটির সঙ্গে বাচ্চা মেয়ের অপার্থিব মেলবন্ধন, নীরব সংলাপ আর আদর কেড়ে নেওয়ার ভঙ্গিমাতে আমার মেয়েরা উচ্ছল - মোম আর টিপ্, আমাদের দুচোখে দুই মণি।

পরের দিন সকাল থেকেই শুরু হয়ে গেল বায়না - “আমাদের মিকির মত একটা কুকুরছানা চাই বাপি, ওর নামও মিকিই হবে - কি সুইই ই ট্।” খুব ভালই জানি ওদের এই সাময়িক উন্মাদনা, অনুরাগ, ভাল লাগা সব একেবারেই ক্ষণস্থায়ী, দু তিন মাসের মধ‍্যেই ওদের এখনকার একাগ্র প্রতিশ্রুতি ভেসে যাবে। কুকুরের সব ভার আমার তখন ওপরই পড়বে বিশেষ করে রিশিতার ওপর। বেশ একটু রূঢ়ই হয়ে গিয়েছিল “না” বলাটা কিন্তু একটু পরে ওদের ঘরে ঢুকতে গিয়ে বাইরে থেকে দুজনের হতাশ, কান্নাভেজা ফোঁপানি শুনে আর সামলাতে পারলাম না। পর্দা তুলে সোজা ঘরে ঢুকে ওদের কথাই দিয়ে ফেললাম, রিশিতার সঙ্গে আলোচনা না করেই।

পরের শনিবারে সপরিবারে ডগ শেল্টারে যেতেই হল। মাঝে দুটো দিন মেয়েদের স্বপ্নের পারদের অদৃশ‍্য উর্ধমুখী চাপে, নীরব আবেদনের মায়ায় আর এক দুর্বল মূহূর্তে আমার দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার তাগিদে।

সারি সারি খাঁচায় বিভিন্ন আকারের, রকমারি চেহারার, নানান আকৃতি আর ভিন্ন ভিন্ন অভিব‍্যক্তি নিয়ে অগুন্তি কুকুরছানা খেলাধুলো দৌড়ঝাঁপ করছে, মাঝে মাঝে রেলিংএর ফাঁক দিয়ে নাকের ডগা আর ছোট্ট ছোট্ট থাবাগুলো গলিয়ে কাতর মুখে দাঁড়িয়ে। মেয়েরা আমার নড়তেই চায় না, পারলে সবকটিকেই বাড়ি নিয়ে যাবার আগ্রহ। অবশেষে খেলার মাঠে খোলা জায়গায় একটি ছানা ছিটকে এসে পড়ল, এসেই দু তিন মুহূর্ত করুণ চোখে, মোমের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ওর ডান পা নিজের ছোট্ট নরম পাদুটো দিয়ে জড়িয়ে ধরল।

তুরুপের তাস। সেই যে মোম ওকে বুকে তুলে নিল, মাটিতে নামালো বাড়ি ফিরে। সেই থেকে সংসারের সদস‍্য সে। সুখে দুঃখে, পালে পার্বণে, আহারে বিহারে, শয়নে স্বপনে তাদের সঙ্গী হয়ে গেল আমাদের মিকি - গ্রেট ডেন। আয়তনে বাড়তে বাড়তে সে এখন আটে পড়েছে - ৫৬ মনুষ‍্য বর্ষ - পরিপূর্ণ যৌবনে অপরিসীম তেজ, নিখুঁত ট্রেণিং আর আত্মনিয়ন্ত্রনের মধ‍্যে দিয়ে মানুষকে সাহায‍্য করার অদম‍্য স্পৃহা গড়ে উঠছে। চেনা অচেনার ভেদাভেদ নেই - কোন টানে যেন অনিবার্য বিপদের আশঙ্কা আগে থেকেই আন্দাজ করে ঝাঁপিয়ে পড়াটা তার স্বাভাবিক কর্মকান্ডের মধ‍্যেই পড়ে।

মেয়েরা একে একে কলেজের পথে, মিকিকে আদরে আদরে ভরিয়ে, চোখে হৃদয় মোচড়ানো যন্ত্রণার কান্না বইয়ে দিয়ে ওরা চলে গেল!

ততদিনে বাড়ি এবং চৌহদ্দিতে মিকির নিশ্ছিদ্র নজরদারি। খবরের কাগজ, চিঠিপত্তর আনা, আমাদের খাওয়া হয়ে গেলে কখনও প্লেট অদ্ভুত ব‍্যালান্সে রান্নাঘরে রেখে আসা, অফিস যাবার আগে আমার ল‍্যাপটপের ব্রিফকেস আনা, যতক্ষণ না আমার গাড়ি গেট ছাড়িয়ে যায় ততক্ষণ দরজায় দাঁড়িয়ে বাৎসল‍্য স্নেহে তাকিয়ে থাকা, যখন তখন বিনা কারণে দৌড়ে এসে কর্কশ জিভ যথাসাধ‍্য মোলায়েম পরশে গালে বুলিয়ে দেওয়া -  এইসব আমাদের মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে দিল। আর মাঝে মাঝে বেশী আদর খাবার জন‍্যে সামনের পা দুটো বুকের কাছে গুটিয়ে এনে চিৎ হয়ে, পেট চারিয়ে আহ্লাদীর মতো শুয়ে থাকতো আবার কখনও কোন বাহাদুরির কাজ করে ফিরে আসলে আমি যখন ওর ঘাড়ে, কানের পেছনে, গলায় আস্কারার হাত বোলাতাম, তখন মিকি এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে জিভ বের করে মানুষের মতই আড়চোখে অন‍্যদিকে তাকিয়ে থাকতো, মনে প্রাণে উপভোগ করত, মুখে মানুষের মতই যেন একটা সলজ্জ হাসি। এটা মিকির একেবারেই নিজস্ব ভঙ্গী, ট্রেডমার্ক পশচার - অন‍্য কোন কুকুরকেই এইরকম নীরবে বাঙ্ময় হতে দেখিনি।

বিপর্যয় নেমে এলো এর মধ‍্যেই। অযাচিত এবং অবাঞ্ছিত। রিশিতা রাস্তার এপারে দাঁড়িয়ে সুশিক্ষিত ডিসিপ্লিন্ড মিকিকে দিয়ে একজন বৃদ্ধকে পার করার জন‍্যেই পাঠিয়েছিল রাস্তার অন‍্য পারে। গাড়ি বাইক বাঁচিয়ে খুশীর ঝলকে লাফাতে লাফাতে রাস্তা পার হয়ে সে বৃদ্ধের লাঠি হাল্কা করে ধরে মাপা পদক্ষেপে ফিরে আসছে, অবাক পুলিশও - ট্র‍্যাফিক চলাচল বন্ধ করেছে সে। কিন্তু তার তো বাইকের দুর্ধর্ষ আর বিপজ্জনক গতি থামাবার ক্ষমতা বা সাহস নেই। এক মুহূর্তে মিকিকে লক্ষ‍্যভ্রষ্ট করে তাকে পিষে ফেলে তার ওপর দিয়েই অবাধ‍্য অসংবৃত যৌবনের ঝড় তুলে মিলিয়ে গেল তিনটি হেলমেটহীন মদ‍্যপ তরুণ, পেছন ফিরে তাকাবার সময়ও নেই তাদেরশ। বৃদ্ধ বেসামাল হয়ে মুখ থুবড়ে রক্তাক্ত মিকির ওপরেই হাত পা ছড়িয়ে পড়লেন যেন সর্বাঙ্গ দিয়ে তাকে আড়াল করে আগলে রাখার জন‍্যেই। অসহায় রিশিতা ততক্ষণে দুহাতে চোখ মুখ ঢেকে কান্না, বিষাদ, রাগ, হতাশার পাঁকে তলিয়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। পাড়ার মানুষজন রিশিতাকে বাড়ি এনে ডাক্তারের ব‍্যবস্থা করার পর আমাকে ফোন করে মিকির নির্জীব দেহটা একটা বস্তায় ভরে আমার বারান্দায় তুলে দিল। এসে দেখি কান পর্যন্ত মাথাটা বস্তার বাইরে নেতিয়ে পড়ে আছে, চোখে জলের ধারা শুকিয়ে গেছে, আধখোলা চোখে একরাশ নালিশ আর ব‍্যর্থতার দুঃখ। বসে পড়লাম, মাথায় গলায় হাত বোলাতে বোলাতে অবুঝ মন বলছে এই বুঝি গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে লাফাতে থাকবে আর হাতের ল‍্যাপটপটা ওকে দেবার জন‍্যে বায়না করবে! কিন্তু মহাকাল সে সুযোগ দিলেন না।

ওর ছোটবেলাকার নিস্পাপ দুষ্টুমিগুলো চোখের সামনে দিয়ে সারি বেঁধে ছুটছে। তখন ছ’মাস বয়স ওর। অফিস থেকে ফিরে জুতো মোজা খোলা চলছে। এক পায়ের মোজাটা খুলতে না খুলতেই মুখে নিয়ে দৌড়, সোজা গিয়ে মেজেতে লুটিয়ে পড়া ভারি পর্দার পেছনে প্রায় অদৃশ‍্য। ইচ্ছাকৃত সচেতনতার সঙ্গে মোজা আর ওর গোলাপী নাকের ডগাটা কিন্তু পর্দার বাইরে উঁকি দিচ্ছে, আমরা যাতে খুঁজতে গিয়ে সময় নষ্ট না করি। টিপই আগে দৌড়ায়, হাত দিয়ে মোজা ছিনিয়ে নেবার চেষ্টা করতেই ‘ফ‍্যাঁস’! দুপাশের ছোট্ট গজদাঁত বেরিয়ে এসেছে - আপাতদৃষ্টিতে ভয়ঙ্কর, ছোট্ট থাবা উদ‍্যত, আর একবার হাত বাড়ালেই ছোবল অবশ‍্যম্ভাবী। আমরা জানি ও কিছুই করবে না, এটা ওর খেলা। কয়েকবার করার পরে মিকি দাঁতের চাপটা ইচ্ছে করেই আলগা করবে, মোজাটা মুখছাড়া হতেই দৌড়ে এসে আমার কোলে লাফ দেবে এবং মুখে নাকে গালে অবারিত চাটন যতক্ষণ না ওকে জড়িয়ে ধরে কোলে তুলি।

মজা দেখার জন‍্যে একদিন অফিস থেকে এসে জুতো না খুলেই সোফার ওপর গা এলিয়ে শুয়ে পড়েছি। এক হাত কপালে, অন‍্য হাত আর পা দুটো অসহায় ভাবে এলিয়ে আছে, জুতো দুটো অবশ‍্যই সোফার বাইরে। খাবার ছেড়েই এলেন উনি নাচতে নাচতে, মুখ দিয়ে টেনে আর ক্ষুদে ক্ষুদে পায়ের থাবা দিয়ে আঁচড়ে মোজাটা খোলার প্রাণপণ অপচেষ্টা। হল না। পরাজিত সৈনিকের মত এক হাত দূরেই বসে আছে, আমি চোখের কোণা কুঁচকে দেখছি মিকির হতাশ চেহারা আর এদিক ওদিক বিষণ্ণ চাউনি - সাহায‍্যের আশায়। হঠাৎ দেখি মাথার দিকে চলে এলো, বারণ থাকা সত্বেও এক লাফে সোফাতে উঠে পড়ে আমার কপালে নাকে মুখে আলতো করে জিভ বোলাচ্ছে, পরম আদরে। ছোট্ট থাবা দিয়ে নরম করে ডাকছে আমাকে। আর থাকা যায়? ঝটকা মেরে উঠে বসে ওকে জড়িয়ে ধরতে গেছি, আমার হাত পিছলে মেজেতে পড়েই ঘরময় শুরু হল ওর অস্থির ছোটাছুটি। মেঘের কোলে রোদ হেসেছে, বাদল গেছে টুটি।

বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। মিকিকে স্বপ্নে দেখার সৌভাগ্যও ধীরে ধীরে অপসৃয়মান। মিকি ছাড়াই প্রাত‍্যহিক জীবনে সাঁতরাচ্ছি আমরা।

সেবার আমার পূর্বপুরুষের পরকালের ক্রিয়ার জন‍্যে আমাকে যেতে হয়েছিল মঙ্গলাগ্রামে, উত্তরপ্রদেশে এক দূরপ্রান্তে। গ্রাম গঞ্জে ফাঁকা জায়গায় শুদ্ধ হাওয়া আমার বরাবরের আকর্ষণ, তাই বিকেল নামতেই আত্মীয় পরিজনদের বারণ না শুনেই বেরিয়ে পড়েছিলাম আমি। গ্রামে নাকি নেকড়েদের উৎপাত শুরু হয়েছে মাসখানেক। স্কুলফেরত বাচ্চারাই ওদের প্রধান লক্ষ‍্য।

বাড়ির পথে আমি, হাল্কা অন্ধকার নিশ্চিত গতিতে নেমে আসছে, কাছে দূরে একটা দুটো করে সন্ধ‍্যেপ্রদীপের আভাস। ওখানে শাঁখ বাজে না, একটানা সুরে রামচন্দ্র বা বজরংবলির স্তুতিগান হাওয়ায় ভেসে আসছে। পুকুরপাড়ের সরু পথ, আশে পাশের ছোট বড় গাছের ডাল পাতাগুলি আকাশে আল্পনা কাটছে, শুকতারার জ্বলজ্বলে হাসিটা তারই ফাঁক দিয়ে কখনো প্রকট কখনও বা অদৃশ‍্য। পূর্ণিমা চাঁদের ভাঙ্গাচোরা প্রতিবিম্ব পাশের পুকুরে ঢেউএর মাথায় মাথায় ঝাড়লণ্ঠনের দ‍্যূতি নিয়ে আত্মহারা।

পায়ে পায়ে সরু বনপথ সামনেই একটা বাঁক নিচ্ছে। সেখানে পৌঁছবার আগেই পেছন দিকে হঠাৎ বাঁশগাছের ফাঁক দিয়ে শুকনোপাতার ওপর একটা অশরীরি খসখসানি শুনলাম। থমকে গেলাম, কানদুটো গরম হয়ে উঠছে - মনে হল শব্দটা আস্তে আস্তে চারদিক থেকে আমাকে ঘিরে ধরছে। অজান্তেই আমার পায়ের গতি বেড়ে গেল, অস্বাভাবিক আতঙ্কে বুকের ভেতর তোলপাড়। পেছনে তাকাতেই হল বিপদ ঝাঁপিয়ে পড়ার আগে তার দূরত্ব আন্দাজ করতে। আশ্চর্য, অগুন্তি জোনাকির সবুজ আলো সারি বেঁধে জ্বলছে - নিস্পন্দ। কোথা থেকে এলো? দপদপানি নেই, স্থির অচঞ্চল। কি ওগুলো - আবহাওয়াটা কি ক্রমশই ভৌতিক হয়ে উঠছে? পায়ের তলায় মাটিতে চুম্বকের টান, এগোতে পারছি না, জুতোটাও যেন অনাবশ‍্যক ওজনে ভারাক্রান্ত। তার ওপর অন্ধকারটাও সুযোগ বুঝে বুকে চেপে বসেছে।

এবার কিন্তু নিশ্চল জোনাকিরা গতি পেয়েছে - ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে আমার দিকে মাপা পদক্ষেপে।

বুনো নেকড়ে, ঝাঁক বেঁধে শিকার খুঁজতে বেরিয়েছে।

তেত্রিশকোটি দেবদেবীকে স্মরণ করে এবার প্রাণপণে ছুটতে শুরু করলাম, বাঁচতে আমাকে হবেই, পেছনে খপ খপ হিংস্র শব্দের দূরত্ব কমে আসছ, ধীর পায়ে নিশ্চিত মৃত‍্যু এগিয়ে আসছে। বাড়ি আর কতদূর - ঠিক পথে ছুটছি কিনা তাও বুঝতে পারছি না মরণত্রাসে।

হঠাৎ পাশ দিয়ে একটা সাদা কালো চতুষ্পদ মূর্তি বিদ‍্যুত ঝলকে ধুলোর ঝড় তুলে পেছনের দিকের অন্ধকারে ছুটে গেল। মুহূর্তের মধ‍্যে ঐ সম্মিলিত আক্রমণাত্মক পায়ের শব্দ নীরব নিস্পন্দ। কৌতুহল এবার আমার ভয়টাকে ছাপিয়ে নাড়িতে ভর করেছ, দৃষ্টি এখন আমাকে পেছনে টানছে। দোটানার মধ‍্যে আবার সেদিকে তাকাতেই হল, সাদা চোখে দেখছি এক অকল্পনীয় দৃশ‍্য। জ্বলজ্বলে নীল সবুজ ক্রুর গতিহীন বিন্দুগুলোর সামনে একটা বিশালদেহী জীব পাহাড়ের মত দাঁড়িয়ে, গলা দিয়ে ভয়াবহ, ভীতিপ্রদ একটা চ‍্যালেঞ্জ গরগরিয়ে বেরিয়ে আসছে। উদ্ধত রক্তপিপাসু নেকড়েগুলো হতভম্ব, সন্ত্রস্ত্র। এগোচ্ছে পেছোচ্ছে, এদিক ওদিক দেখছে আবার ঐ বিশাল অবয়বের দিকেও মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে। ভয় দেখানোর জন‍্যেই বোধহয় দু তিনটে নেকড়ে হঠাৎ দেখলাম, আক্রমণাত্মক তেজে দৌড়ে এলো ঐ অতিকায় জীবটির দিকে।

এবারেই অবিশ্বাস‍্য, অভাবনীয় ঘটনাটা ঘটল তখনই - আমার বিস্মিত, বিমূঢ় দৃষ্টির সামনেই, উপচে পড়া জ‍্যোৎস্নার জোয়ারে। ঐ জন্তুটি বড়, আরও বড় হয়ে ফুলে উঠছে, গায়ের লোমগুলো এখন কাঁটা, মাথাটা একটু নামিয়ে যুদ্ধংদেহি ভঙ্গিতে প্রতিঘাতের জন‍্যে তৈরী, অব‍্যক্ত ক্রোধে শানিত নখ মাটি আঁচড়াচ্ছে, গলায় ত্রাসসৃষ্টিকারী চাপা গর্জন। কাঁধ নামানো, শরীরের পেশিতে পেশিতে প্রখর টান, চোখের দৃষ্টি নেকড়ের পালের দিকে ছুঁচের মত একাগ্র, সারা শরীর জুড়ে উদ‍্যত আক্রমণের প্রকাশ। দুর্বৃত্ত নেকড়ের দল এবারে বিপদ দেখে দৌড় দিল, কয়েক সেকেন্ডেই জায়গাটা পরিষ্কার। আমার উদ্ধারকারী আকাশের দিকে মুখ তুলে এখন ভীত পরাজিতদের উদ্দেশ্যে একটা অপ্রাকৃত হুঙ্কারে শান্ত পরিবেশ অনুরণিত করে আস্তে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে আগের নিজস্ব আকারে ফিরে এল।

ওকে আমার দিকে আসতে দেখে স্বভাবতই আমি আতঙ্কে দিশাহারা, কিংকর্তব্যবিমূঢ়, পালানোই একমাত্র পন্থা - কিন্ত পা চলে কোথায়? হাঁটু দুটো তো গলানো মোম! আস্তে করে কাঁকর ভর্তি মাটিতেই শুয়ে পড়েছি, এখন শুধু তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার দাঁতে ছিন্নভিন্ন হবার অপেক্ষা। চোখদুটো চেপে বন্ধ, ঠোঁটও অস্বাভাবিক চাপে পিষ্ট।

মনে হল ভেজা কর্কশ নরম একটা টিস‍্যুপেপার কেউ বুলিয়ে চলেছে আমার কপাল, চোখ, নাক আর মুখের ওপর দিয়ে - পরম আশ্লেষে, আদরে ভরিয়ে। একটা ধারালো কামড়ের আশঙ্কায় শরীর আমার আড়ষ্ট। আরে - হঠাৎই থেমে গেল চাটাচাটি, একটা পা দিয়ে আমাকে পাশ ফেরাবার চেষ্টা করছে সে। কিন্তু কেন? উদ্বেগে আতঙ্কে আমার হৃৎপিন্ড ফেটে পড়ছে হাতুড়ির ঘায়ে। হাতে পায়ে ঘামের স্রোত। সাধের পৃথিবীটাকে শেষবারের মত চোখের দেখা দেখার জন‍্যে মরিয়া হয়ে, সরু করে একটা চোখ খুলেই ফেললাম।

এ কী - এটা কী দেখছি আমি? জন্তুটা অত‍্যন্ত পরিচিত ভঙ্গিমায় মাটিতে বসে পড়েছে। এখন মুখ নামিয়ে, ঘাড় বেঁকিয়ে জিভ ডান দিক দিয়ে বের করে একেবারে একান্ত সলজ্জ ভঙ্গিতে অন‍্যদিকে দিকে তাকিয়ে যেন হাসছে। ট্রেডমার্ক পশ্চার - চিনতে একবিন্দুও ভুল হল না - মিকি, মিকি, আমাদের ছেড়ে যাওয়া মিকি। আমার রক্ষাকর্তা, অপঘাতে দেহ ছেড়ে গেলেও যে আমাদের ভুলতে পারেনি আজও। ভয় নেই, আর আমার ভয় নেই।

সীমাহীন আনন্দে হাঁটু গেড়ে বসে ওকে জড়িয়ে ধরবার জন‍্যে হাত দুটো বাড়িয়েছি - শূন্য‍ হাওয়ায় রিক্ত বাহু ঘুরে এসে নিজের কাঁধ দুটোতেই আশ্রয় পেল। মিকি বাতাসে মিলিয়ে গেছে।

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন