কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

ইন্দ্রপুরী রহস্য

 


(৫)   

ত্রিপুণ্ড্র

বিনতার কথোপকথন অনেকগুলো সম্ভাবনা আর প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছিল আমাদের সামনে। আশুদা বলে সাদা ডায়রিতে ডিসেকশন নোটসের মতোই তদন্তর খোলা সুতোগুলোর কথা লিখে রাখতে। অনেকগুলো অজানা মানুষ, তাদের অজানা মুখ, অজানা মতিগতি। সব যেন শুভায়ুর রহস্যমৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। দোলনচাঁপা, রোহিত সিনহা, তন্দ্রা বর্মন, নবনীতা, ব্রজলাল, সুনন্দ আর এদের সকলকে ছাপিয়ে সেই রহস্যময় উল্কিচিহ্ন। যার শেষ  তিনটি বিন্দুতে পারদের বিষ ভরে আছে। এর ভিতর একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটে গেল। বিনতার দেওয়া ফোননম্বরে ফোন করতেই আসিফ উত্তর দিল। ওকে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই জানতে চাইলাম কোথায় ওর পার্লার। প্রথমেই একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করল ও। বলল, "আপনি এই নম্বরটা 'পিকে'র থেকে পেয়েছেন?" কে এই 'পিকে' আমি জানি না। বিনতা তার মূল পরিচয় গোপন রাখতে বলেছিল বলে ওর কথা বললাম না। রিফ্লেক্সে 'হ্যাঁ' বলে দিতেই আসিফ আমাকে তার লিন্ডসে স্ট্রিটের ট্যাটুপার্লারের ঠিকানা বলে দিল। আশুদাকে বললাম সমস্তটা। কে এই 'পিকে'? আশুদা নিমগ্ন হয়ে শুধুই বলল "ভাবছি"। ঠিক করলাম দুপুরে কলেজের কাজ সেরে আশুদার সঙ্গে একবার আসিফের ওই পার্লারে একবার যাব। আশুদা বলল, "আমার মন বলছে, এই রহস্যর মূল সূত্র লুকিয়ে আছে ওই পার্লারে।" তাই সেইমতো দিনের কাজগুলো সাজিয়ে ফেললাম। তারপর দ্বিপ্রহরে আশুদাকে তুলে নিয়ে চললাম আসিফের পার্লারে। পার্লারের নামটিও রোমহর্ষক। 'ইন্দ্রজাল ট্যাটু'।

লিণ্ডসে স্ট্রিট একসময় এই শহরের মূল ধমনীর মতো ছিল। আজ শহরে অজস্র লিণ্ডসে স্ট্রিট তৈরি হয়ে হগ মার্কেট আর এই দোকানগুলি ধুঁকছে। আসিফের দেওয়া লোকেশন ট্র্যাক করে দেখলাম ওর পার্লারটা আগে যেখানে গ্লোব সিনেমা ছিল, তার পাশের গলিতে। ভাবতে অবাক লাগে, এই সিনেমাহলে একসময় শহরের সবচেয়ে বড় সিনেমাপর্দা লাগানো থাকত। এখন সে হল বৃদ্ধা সন্তানহারা অভাগী মায়ের মতো মুখ গুঁজে পড়ে আছে। খানিকটা এগোতেই একটা গ্লোসাইনে শুভায়ু আর বিনতার হাতে দেখা সেই উল্কিচিহ্নটি চোখে পড়ল। উনালোম! নীচে নীলচে অক্ষরে লেখা 'ইন্দ্রজাল ট্যাটুজ' আর একটি তিরচিহ্ন। সেই মতো একটি ছোট্ট ঘরে ঢুকে দেখলাম একটি বছর পঁচিশের ছেলে মনোযোগ দিয়ে একটি অল্পবয়সী মেয়ের হাতে ট্যাটু করছে। আমাদের আগমন তার মনোসংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারল না। আমরাও তাকে বিরক্ত না করে নিশ্চুপে  ওয়েটিং এরিয়ার মোড়াতে বসতেই আশুদা আমাকে চোখের ইশারায় একটা আশ্চর্য ক্যাবিনেট দেখালো। ক্যাবিনেটে থরেথরে ছোট ছোট টব সাজানো। সেখানে ছোট্ট ছোট্ট রঙবেরঙের চারাগাছ। টবের উপর ইংরাজিতে রঙের নাম লেখা। আর তার নীচে একটা সংখ্যা। কোনও কালার কোড টোড হবে বোধহয়। ইতিমধ্যে ছেলেটি তার কাজ শেষ করে আমাদের কাছে এসে বলল, "হাই। আই অ্যাম অ্যাসিফ। বলিয়েঁ?" আমি আমার পরিচয় দিতেই ভিতরে বসতে বলল। 'পিকে' বাবুর প্রসঙ্গ আর না ওঠায় খানিকটা স্বস্তি বোধ করলাম ভিতর ভিতর। আশুদা মনোযোগ দিয়ে আসিফের ব্যবহার করা সূঁচ কালী আর ডিজাইনের বই দেখছিল। ডিজাইনের বইয়ে অজস্র নকশা কাটা। মহাদেব থেকে ত্রিশক্তি, সামোয়া থেকে ডোকরা, বাব-আস-সালা থেকে বাব-আস-সাদাখা, কী নেই সেখানে! আশুদা ছবি দেখতে দেখতে বলল, "আপনি ট্যাটুতে যে কালি ব্যবহার করেন, তা কি আপনার নিজের তৈরি?"

আসিফ মাথা নেড়ে বলল, "নেহি। কোম্পানি সে লোগ আতে হ্যায়।"

-আপনি যে গাছগুলো সাজিয়ে রেখেছেন বসার ঘরে, ওগুলোর ব্যাপারে কিছু বলবেন?

আসিফ যা বলল, তাতে বুঝলাম সাধারণত অন্যরা উল্কি করার সময় যে রঙ ব্যবহার করে, তা হল অ্যাজো ডাই। সেখানে গ্লিসারিন, অ্যালকোহল ছাড়াও থাকে টাইটানিয়াম ডাইঅক্সাইডের মতো রাসায়নিক যৌগ। এদের অতিরিক্ত প্রয়োগে শরীরে ক্ষতি হতে পারে। তাই আসিফ এইসব রঙ তার কাজে ব্যবহার করে না। তার ব্যবহৃত সমস্ত রঙ একজন ব্যক্তিগতভাবে বানিয়ে তাকে দিয়ে যায়। প্রতিটি রঙ ভেষজ। বাইরের গাছগুলোর পাতা বেটে জৈবিক পদ্ধতিতে তৈরি করা হয় তাদের। যিনি দিয়ে যান এই রঙ, তাঁর নাম সুরেন্দ্র যাদব। তবে তাঁর এই কালি তৈরি কোম্পানির কোনও নাম নেই। আসিফ তার কাছে ব্যক্তিগতভাবে কালি কেনে। অনেক সেলিব্রিটি তাকে দিয়ে ট্যাটু করায়। সেইজন্য তাকে মাঝেমাঝে ঘরে গিয়েও উল্কি করে আসতে হয়। শুভায়ুর ট্যাটু সেই করেছিল কিনা জিজ্ঞেস করতে সে একটা লাল রেজিস্টার নিয়ে এল। তারপর পাতা উল্টে বলল, "হাঁ। ছয় মাহিনা পহলে উসনে এক ট্যাটু করাথে।"

-ছয় মাহিনা?

-হাঁ।

-আপনি দেখাতে পারবেন কী ডিজাইন করেছিলেন?

আসিফ 'এক মিনিট' বলে এবার কম্পিউটার খুলে নাড়াচাড়া করে দেখালো চিহ্নটা। 'উনালোম'ই। কিন্তু সেখানে উপরের তিনটি বিন্দু নেই। আর পাখির ছবিও নেই।

-আপনার কোনও অ্যাসিস্টেন্ট আছে? যে করে আসতে পারে এই উল্কি?

আশুদার প্রশ্নে আসিফ সগর্ব হেসে জানালো, এই পার্লার, এই ব্যবসা, এই পরিশ্রম, সাফল্য, সব তার একার নিজের হাতে করা। তার কোনও সাহায্যকারী নেই। সুরেন্দ্র যাদবের ফোননম্বর চাইতে গিয়ে এইবার আসিফকে আমাদের আসবার মূল কারণ বলতেই হল। আমাদের কথা শোনামাত্র তার কথোপকথনের সহজভাব কেটে গেল। সতর্ক হয়ে সে বলল, সুরেন্দ্র যাদবের কোনও কনট্যাক্ট নম্বর নেই। প্রতি মাসের একটা অজানা নম্বর থেকে সে নিজেই ফোন করে আসিফকে। আসিফ তখন তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র চেয়ে নেয়। বেশ সুলভে কালি পেয়ে যায় আসিফ। কখনও কোনও সমস্যা হয়নি। তাই সেও কখনও সুরেন্দ্রর নম্বর চায়নি। কেমন দেখতে এই সুরেন্দ্র? জিজ্ঞাসা করতেই আসিফ আবার একটু শঙ্কিত মুখে বলল, সুরেন্দ্র একটা বাইকের হেলমেট পরে প্রতিবার রাতের দিকে আসে তার কাছে। সামান্য কিছুক্ষণ থাকে। রেজিস্টার দেখে, টাকা পয়সা বুঝে মাল নিয়ে ঝটিকায় চলে যায়। আসিফ এবার গলা নামিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে, "হামনে কুছ নেহি কিয়া সাব। আল্লা কসম। হামকো কুছ মত কিজিয়েগা।"

-জানি। তবে এই সুরেন্দ্রজি যব আগলেবার আয়েঙ্গে, আমাদের একটু জানাবেন। আর কারোকে বলবেন না আমরা এসেছিলাম। কিসিকো নেই। স্রিফ হামকো বল না।"

আমরা বেরিয়ে এলাম ইন্দ্রজাল ট্যাটু পার্লার থেকে। রহস্য যেন ক্রমশই আরও ঘনীভূত হচ্ছে। আশুদা 'ইন্টারেস্টিং' বলে গাড়িতে উঠে পড়ল। আমি বললাম-

-এই আসিফ কিন্তু 'পিকে'র কথাটা একদম চেপে গেল। এই পিকের আর সুরেন্দ্র যাদবের খোঁজ তথাগতকে করতে বললে হয় না?"

আশুদা মোবাইলে উনালোমের ছবি দেখতে দেখতে বলল, "তুই যা ভাবছিস তা নয়। এই 'পিকে' কোনও মানুষ নয়।"

-মানুষ নয়! তাহলে?

আশুদা 'উনালোম' উল্টেপাল্টে দেখতে দেখতে বলল, "তামিলনাড়ুর মীনাক্ষী মন্দিরের কাছে নাড়িকুড়াভার জাতির অধিবাসী উল্কিশিল্পীরা কয়লা, দুধ আর ভেষজ গাছের পাতা দিয়ে একধরনের উল্কির রঙ তৈরি করে। এই উল্কিপদ্ধতির নাম 'পাচাই কুথু'। 'পাচাই' শব্দর অর্থ সবুজ। আমি আসিফের কাজের ঢঙ মনোযোগ দিয়ে দেখছিলাম। ও কালির সঙ্গে একটা সাদা তরল মেশাচ্ছিল বারবার। সম্ভবত সেটা দুধ। আসিফের কাজের ধরনের সঙ্গে নাড়িকুরাভারদের 'পাচাই কুথু'র উল্কিপদ্ধতি মিলে যাচ্ছে। তাই আমার ধারণা ওই সুরেন্দ্র যাদব লোকটা যেই হোক না কেন, আসিফ ওর কাজের ক্ষেত্রে ওর কোম্পানির নাম দিয়েছে 'পিকে'। এই পিকে হল পাচাই কুথুর ছোট সংস্করণ।

-এখনও তামিলনাড়ুতে হয় এই পাচাই কুথু?

-সম্ভবত না। আসলে এই নাড়িকুরাভার শিল্পীরা উল্কির জন্য একটিই সূঁচ একাধিক মানুষের ওপর ব্যবহার করত। এতে সংক্রমণ বাড়বে বলে সরকার পাচাই কুথু নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। প্রকাশ্যে এই নাম না ব্যবহার করার এটাও একটা কারণ হতে পারে, যদিও আসিফ কিন্তু দেখলাম ট্যাটু করার পর সূঁচটা ফেলে দিল।  অর্থাৎ সে এক সূঁচ ব্যবহার করে না।

-ওই বসার ঘরে সাজিয়ে রাখা গাছগুলোও বেশ অদ্ভুত! তাই না আশুদা?

-ঠিকই। একটা গাছ তো দেখলাম কুনুকু থোকি। ওগাছ বাংলার মাটিতে হয় না। আগে আয়ুর্বেদে ল্যাক্সেটিভ হিসেবে ব্যবহার হতো। তারপর জানা গেল ওর পাতায় অতিরিক্ত পারদ থাকায় ওই গাছ শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক। তাই ওই গাছের আরেক নাম 'পারদ গাছ'!

আমি চমকে উঠি। "তার মানে শুভায়ুর শরীরে যে উল্কিতে পারদ আছে, সেই পারদ ওই গাছের কালি থেকে এসেছে! অর্থাৎ আসিফই ট্যাটুটা করেছে?"

আশুদা সপ্রশংস চাহনিতে বলল, "সম্ভবত না। আসিফের উনালোমে শেষ তিনটি বিন্দু নেই। শুভায়ু দের শরীরে পারদ পাওয়া গেছে ওই তিনটি বিন্দুতেই। তা ছাড়া, ওই তিনটি বিন্দু আর পাখির ছবিটি কখনওই ছয়মাস পুরনো নয়। আমার ধারণা, ওগুলো আসিফ করেনি।"

-তাহলে কে করল?

-সেটাই তো আমাদের বের করতে হবে। সর্বানন্দ বাঙ্গালোর থেকে কয়েকটা আজব তথ্য দিয়েছে জানিস অর্ক! শুভায়ু দে বাঙ্গালোরের 'আরতি ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স'এ শেষ গিয়েছিল তিনবছর আগে। তারপর আর ওই নামে ওদের রেজিস্টারে কোনও এন্ট্রি নেই। এদিকে বাঙ্গালোর এয়ারপোর্টে শুভায়ু কিন্তু চেক আউট করেছে।

-তাহলে কদিন আগে বাঙ্গালোরের কোথায় গিয়েছিল শুভায়ু? কেনই বা গিয়েছিল?

-সেটাই তো আমাদের বের করতে হবে রে অর্ক!

কথা বলতে বলতে আশুদা দূরে রাস্তার ধারে একটা বড় সিনেমার ব্যানারের দিকে তাকিয়ে ছিল। ব্যানারে পৃথ্বীরাজ সংযুক্তাকে নিয়ে একটা এপিকের ছবি। পৃথ্বীরাজের চরিত্রে রোহিত সিনহা। আর সংযুক্তা তন্দ্রা বর্মন। শীঘ্রই হলে মুক্তি পাবে এই সিনেমা। তবে কি শুভায়ু দের মৃত্যুর পরেই আবার টালিগঞ্জের ড্রিম কাপল রোহিত তন্দ্রার মিটমাট হয়ে গেল! কী বিচিত্র মানুষের মন, ভাবতে ভাবতেই আশুদার ফোনটা বেজে উঠল। ফোনটা তথাগতর। আমি শুনতে পেলাম ফোনের ওপার থেকে তথাগতর উদ্বিগ্ন স্বর। "আশুদা। শিগ্গির আসুন।" ইন্দ্রপুরী অ্যাপার্টমেন্টে আবার রহস্যমৃত্যু। এবারের হতভাগ্য ব্যক্তিটি আর কেউ নয়, সুনন্দ!

(ক্রমশ)


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন