প্রয়াণ-শতবর্ষে পাশ্চাত্য কবি রাইনার মারিয়া রিলকে
কাব্য-কবিতা
সংরূপ সাহিত্যের অন্যতম প্রধান তথা মূল সংরূপ। সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে কাব্য-কবিতার অন্দরমহল
সুসজ্জিত হয়েছে নানান নক্ষত্রের কলমে। তাঁদের মধ্যে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ
পাশ্চাত্য কবি হিসাবে স্বীকৃত জার্মান কবি রাইনার মারিয়া রিলকে তথা রেনে কার্ল উইলহেলম
জোহান জোসেফ মারিয়া রিলকে। তিনি অস্ট্রো-জার্মান কবি হিসাবে প্রখ্যাত হলেও, তাঁর সাহিত্য
কীর্তির উৎকৃষ্টতা জার্মান সাহিত্যেই সর্বাধিকভাবেই পরিলক্ষিত হয়। কাব্য-কবিতার সমান্তরালে
উপন্যাস এবং গদ্যের ক্ষেত্রে তার বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। রিলকের সাহিত্য কীর্তি অন্যতম
প্রধান বৈশিষ্ট্য গীতিময়তা।
১৯২৬
খ্রিস্টাব্দের ২৯ ডিসেম্বর এই কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০২৬ সালতার প্রয়াণ শতবর্ষের
কাল। মৃত্যুর শতবর্ষ পরেও দেশ কাল ভাষা সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে জার্মানির কবি আজও বাংলা
সাহিত্যনুরাগী মানুষ তথা বিশ্ব বিভিন্ন প্রান্তরে আলোচ্যমান। তার কাব্য কবিতার সঙ্গে
বাঙালির প্রথম পরিচয় ঘটে এলিজির মাধ্যমে অর্থাৎ ‘দুইনো এলিজি’র কবি হিসেবে তিনি বঙ্গীয়
মহলে সর্বাধিক সমাদৃত। আসলে ১৯১২ থেকে ১৯২২ সালের ব্যবধানে ডুইনো ক্যাসলে বাসরত অবস্থায়
তার বিখ্যাত এলিজি কবিতাগুলির মাধ্যমে সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যে নিজের স্বাক্ষর বজায় রাখেন
কবি।
আসলে
এলিজি বলতে বোঝায় শোক গাথা বা শোক মূলক কবিতাকে। সম্পূর্ণ একাকীত্বে কাটানো এই বিস্তৃত
সময় জুড়ে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন তিনি হয়েছিলেন তার এক অতলান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই
দশটি কবিতা সংকলনে। আসলে জন্ম এবং মৃত্যু মানব জীবনের শ্বাশত সত্য। মধুকবি কথা অনুসারে,
মানবজন্মের সঙ্গে মৃত্যুর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে। এই অভেদ্য নিয়মাবলীর সঙ্গে ঐশী
সম্পর্কে সরলরৈখিক সূত্র পরিলক্ষিত হয় রিলকের কবিতায়। যদিও জন্ম থেকেই কবির সঙ্গে
মৃত্যুর একটি সমান্তরাল সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তাঁর জন্মের পূর্বেই পূর্বজ দিদির মৃত্যু
ঘটে। ফলে তাঁর নামে উল্লেখিত ‘রেনে’ শব্দটির
পাশাপাশি সমগ্র জীবন জুড়ে মৃত্যুর এক অমোঘ চিহ্ন পরিবহন করেছেন রাইনার মারিয়া রিলকে।
স্বভাবতই ডুইনো দুর্গে বসবাসরত অবস্থায় আবাল্যকালীন পরলোক তথা মৃত্যু সম্পর্কিত জগতের
বিষয়ে অধিকতর আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় কবির মধ্যে। কবি যেন মানবলোক থেকে প্রেত লোকের
একটি সূক্ষ্ম সেতু বন্ধন করেছেন। যার মাধ্যমে তার আত্ম অনুসন্ধানের পাশাপাশি দৈবিক
শক্তির উন্মোচনের ভাবটিও পরিব্যপ্ত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত প্রতিভাবান কবি
বুদ্ধদেব বসুর তরজমা অনুসারে বলা যায়,
“আরাধ্য সে আমাদের, যেহেতু সে শান্ত উপেক্ষায়
তার সাধ্য সংহার আনে না
প্রতি ভিন্ন দেব দূত ভয়ংকর।
তাই
আমি চেপে রাখিনি নিজেকে, ব্যাকুল কন্ঠে গিলে ফেলি,
অন্ধকারে উদগত ক্রন্দন ধ্বনি”
পাশ্চাত্য
কবির এই মৃত্যুচেতনা তথা শোকগাথা মূলক কবিতার সুর পরিলক্ষিত হয়, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ
ঠাকুরের ভানুসিংহের পদাবলীর অন্তর্গত ‘মরণ’ শীর্ষক কবিতায়;
‘মরণ রে,
তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।
মেঘবরন তুঝ, মেঘজটাজুট,
রক্ত কমলকর, রক্ত অধরপুট,
তাপবিমােচন করুণ কোর তব
মৃত্যু-অমৃত করে দান।
তুঁহু মম শ্যামসমান৷’
আলোচ্য
ক্ষেত্রে কবি মানব জীবনের অন্তিমতম পর্যায়কে আরাধ্য ‘শ্যামের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
এই ‘শ্যাম’ সম মৃত্যু যেন কবির কাছে পরমাত্মার সঙ্গে মানবাত্মার কথোপকথনের প্রতিরূপ।
সেই সঙ্গে জার্মান কবির মতই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় ঐশী ভাবনার পরিচয়ও লক্ষ্য
করা যায়।
আসলে
সমগ্র মানবজীবনের বৃত্তটি জন্ম থেকে মৃত্যুর সংলগ্নতায় পরিপূর্ণ হয়। জীবন ও মৃত্যুর
সুক্ষ রেখা দুটি পরমাত্মার সুচারু হাতের দোলায় দোদুল্যমান। মৃত্যুর অমোঘ নির্দয় আঘাত
চিত্তের ভয়কে দূরীভূত করে। যেন এক প্রবল ঝড় ঝঞ্ঝার সম্মুখীন হয় জীবাত্মা। প্রসঙ্গক্রমে
বিখ্যাত কবি শেলির ‘ode to the west wind’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থটি উল্লেখযোগ্য। এই সংকলনে
কবির ভাবনায় অনুরনিত হয়েছে সত্যের সারস্বত রূপ,
“Be
thou sprit fierce,
My
Sprit! Be thou me, impetuous one!”
মৃত্যুচেতনার
পাশাপাশি তার কবিতায় অবসাদগ্রস্ততা, বিচ্ছিন্নতা, বিষন্নতার অনুসঙ্গও লক্ষ্য করা যায়।
প্রাগ শহরে জন্মগ্রহণের পরবর্তী সময়ে মারিয়া রিলকের জীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে তাঁর
তার অভিভাবকদের দাম্পত্যকালীন বিচ্ছেদ। যদিও ব্যক্তিগত জীবনের সম্পর্কের বন্ধুর পরিস্থিতিও
কবিকে চূড়ান্তভাবে প্রভাবিত করেছে।
পরবর্তীকালে
মহাযুদ্ধকালীন সময়ের দূর্বিপাক জনিত বিষাদগ্রস্থতা কবিকে প্রভাবিত করে। আদতে মহাযুদ্ধ
বঙ্গীয় সমাজজীবনের পাশাপাশি বিশ্বের সমগ্র
মানবতা তথা মনুষ্যত্ববোধকে সন্দেহ, সংশয়, সন্ধিহানের সম্মুখীন করে তোলে। মানুষের মনে
জন্ম নেয় একে অপরের ক্রুরতা। অবশ্যই সামাজিক মনোভাবের সম্মুখীন হয় মনুষ্যত্ব। কবিদের
অনুভূতির স্তর সর্বজনীন ভাবে সূক্ষ্মতর। গ্রিক মনীষী অ্যারিস্টটলের কথা অনুযায়ী কবিরা
সর্বসাধারনের তুলনায় অধিকতরভাবে শ্বাশত সত্যকে অনুভব করেন। ফলে তাদের চিন্তা চেতনা
এবং মননের আলোকে সেই দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় লক্ষ্য করা যায়। রাইনার মারিয়া রিলকের
কবিতায় সেই বিষণ্ণকালীন মনোভাব ‘বিবাহ’ শীর্ষক কবিতায়,
“সে এখন বিষণ্ণ
সে নীরব, শব্দহীন, নিঃসঙ্গ।
দেখো – সে যন্ত্রণায় বিদ্ধ।
তোমার রাত্রিগুলি
তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল
অনেকটা স্থানচ্যুত পাথরের মতো
আর তার রাত্রিগুলি ছিল মৃদু উত্তেজনাময়।
তোমার ভোঁতা কামনা দিয়ে তুমি শতবার
তাকে বিনষ্ট ও বিষাক্ত করেছিলে।
অবশ্য তুমি শুধু একবার
যেন মধ্যযুগের দাতা হয়েছিলে
এবং নীরব নিঃশব্দ আঁধারে
তার পাশে নতজানু ছিলে,
এখানেই তোমার পৌরুষ
তোমার নিজস্ব বৃত্ত থেকে নিষ্ক্রমণ।”
রিলকের
এই নিঃসঙ্গ জীবন স্মরণ করায় প্রকৃতি-পিয়াসী কবি জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিগত জীবন তথা
কাব্য কবিতার পরিসরকে। কবি জীবনানন্দ দাশের ব্যক্তিগত জীবন রক্ত স্নাত হয়েছে সম্পর্কে
ব্যস্তানুপাতিকতায়। ‘হাজার বছর ধরে’ কবি যেন পরিভ্রমণ করে চলেছেন তার সেই প্রার্থিত
ভালোবাসার সন্ধানে। বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিবেশ পরিস্থিতিতে একদিকে আর্থসামাজিক রাজনৈতিক
উত্তাল পরিস্থিতি অন্যদিকে অন্তর মুখী দ্বন্দদানিকতার বিচরণ নেই কবির মধ্যে যেন এক
‘বোধ’- এর উন্মেষ ঘটে; যে বোধের অনুরণনের কারণে কবির কাছে এক অবিদ্য সূক্ষ্ম গণ্ডি
রচিত হয়। বলা যেতে পারে কোভিদ সমান্তরালেই যেন চলাচলই যেন তার বিশিষ্টতা;
“পথে চ’লে পারে—পারাপারে
উপেক্ষা করিতে চাই তারে;
মড়ার খুলির মতো ধ’রে
আছাড় মারিতে চাই, জীবন্ত মাথার মতো ঘোরে
তবু সে মাথার চারিপাশে,
তবু সে চোখের চারিপাশে,
তবু সে বুকের চারিপাশে;
আমি চলি, সাথে-সাথে সেও চ’লে আসে।
আমি থামি—
সেও থেমে যায়;”
আসলে
সর্বজনীন ভাবে কবিদের সূক্ষ্ম অনুভূতির স্তর গুলি সমানভাবেই সাদৃশ্যপূর্ণ। তাই অনুভূতির
নানান রকম বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায় প্রাচ্য থেকে প্রাশ্চাত্য সাহিত্যে। কবি মারিয়া
রিলকের জীবনে নারী অনুসঙ্গ বারংবার লক্ষ্য করা গিয়েছে। বস্তুবাদী এই কবির লেখনীতে
প্রতিভাত হয়। ‘গোলাপ’ তার সৌন্দর্যের সুগন্ধের পাশাপাশি সমগ্রহ বিশ্বজনীন ভাবে ভালোবাসার
অন্যতম প্রতিভু হিসেবে পরিচিত। মারিয়া রিলক এর কবিতার অন্যতম প্রধান প্রতীক হিসেবে
লক্ষ্য করা যায় গোলাপের উপস্থিতি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় তাঁর বিখ্যাত ‘গোলাপ গুচ্ছ’ শীর্ষক রচনাংশের কথা।
‘তুলো
না স্মরণস্তম্ভ। গোলাপেরা হবে প্রস্ফুটিত
তারই
জন্য প্রতি গ্রীষ্মে ফিরে ফিরে অফুরান।
কেননা
সে অর্ফিয়ুস। সে-ই হয় রূপান্তরিত
এতে
কিংবা ওতে। অন্য কোনো নামের সন্ধান
আমাদের
অকর্তব্য। একবার, চিরকাল ধরে
গান
যদি জাগে তা-ই অর্ফিয়ুস। সে আসে, এবং চলে যায়।’
অস্ট্রো-জামার্ন
কবি তাঁর এই গোলাপ কেন্দ্রিক প্রভূত উন্মাদনার কারণে সাহিত্যে ‘গোলাপের কবি’ হিসেবেও
সমাদৃত হয়েছেন। কবিতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও গোলাপের প্রতি একটি চিরন্তন ভালবাসার
প্রভাব লক্ষ্য করা যায় কবির স্বভাব- বৈচিত্রে। উল্লেখিত অংশে লক্ষ্য করা যায় তাঁর
সেই আশাবাদটি। আর সেই ভালোবাসা আশাবাদের ওর সঙ্গে কবির কলমে তার জীবনের অমক পরিণতির
চিত্রকল্পটিও প্রতিভাত হয়। লিউকোমিয়ায় আক্রান্ত কবি তাঁর প্রেয়সীকে নিবেদন করেছিলেন
একগুচ্ছ গোলাপ। কিন্তু সেই গোলাপ ফুল সংগ্রহ করতে গিয়েই গোলাপের কাঁটার ক্ষতে সংক্রমিত
হন মারিয়া রিলকে। গোলাপগুচ্ছ কবিতায় ভাগ্যবিড়ম্বিত জীবনের এ প্রতিফলন বিধৃত হয়েছে
তাঁর ‘ গোলাপগুচ্ছ’ শীর্ষক কবিতাবলীতে,
‘হে
গোলাপ, কার/ বিরুদ্ধে তোমার ওই উদ্যত কাঁটাগুলি/ রয়েছে বলে মনে হয়?/ তোমায় কি সশস্ত্র
হতে। বাধ্য করেছে তোমার/ কোমল সংবেদন?/…’
আলোচ্যক্ষেত্রে
কবি যেন ভালোবাসার প্রতিভু গোলাপের সঙ্গে সংযুক্ত সে কাঁটাগুলির প্রতি এক অমক প্রশ্ন
নিক্ষেপ করেছেন। যন্ত্রণাদিগ্ধ মানব জীবনের সুখ স্পর্শ ভালোবাসার মাধ্যমেই পরিব্যক্ত
হয়। অথচ সেই ভালোবাসার সঙ্গে বিরহ কাতরতা একই মুদ্রার দুই তলের মত সম্পর্কযুক্ত। এক্ষেত্রে
গোলাপ এবং তার কাঁটাগুলি সেই অনুভূতির সুখস্পর্শ এবং যন্ত্রণাদিগ্ধ সম্পর্কের কথায়
স্মরণ করায়।
বর্তমান
সময় তথা ২০২৬-এ ২৬ জানুয়ারি প্রাশ্চাত্য কবি রিলকের প্রয়াণ শতবর্ষ উদযাপিত হয় ডুয়ার্স
সমাচারের উদ্যোগে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন