নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য আত্মগত পর্যটন হয়েও বৃহত্তর মানবমহিমায়
পরিব্যাপ্ত
সমকালীন বাংলা সাহিত্যে নীলাঞ্জন
চট্টোপাধ্যায় একটি অত্যন্ত বিশিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ নাম। নব্বইয়ের দশকের কবিদের
মধ্যে তাঁর কাব্যভাষা, উপস্থাপনার ভঙ্গি এবং জীবনবোধ তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত
করেছে। তাঁর সাহিত্য মূলত অন্তর্মুখী, মিতবাক এবং গভীর জীবনদর্শনের ফসল।
নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায় ১২ই নভেম্বর ১৯৫৪তে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আর প্রস্থান করলেন ২০ জানুয়ারি, ২০২৬ তারিখে। কর্মজীবনে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত আই এ এস অফিসার এবং সাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত। মূলত তিনি রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস, ছোটগল্প এবং কবিতাই লিখেছেন বেশি। গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনির মধ্যে ‘চিতিসাপের বিষ’, ‘হত্যাকাণ্ডের আড়ালে’-এর জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দেখলে, অনেক লেখক রহস্য বা ডিটেকটিভ সাহিত্য রচনা করেন বাস্তব জীবনের জটিলতা বা একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে। একে একধরনের 'Intellectual Escapism' বা বুদ্ধিবৃত্তিক পলায়ন বলা যেতে পারে। যেখানে লেখক এবং পাঠক উভয়েই একটি ধাঁধার সমাধান করতে গিয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা থেকে সাময়িক বিরতি নেন। তাঁর লেখায়ও এই জগৎ তৈরির প্রবণতা প্রবল ছিল। তবে তাঁর কাব্যশৈলীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো মিতভাষিতা। তিনি দীর্ঘ বর্ণনার চেয়ে অল্প শব্দে গভীর ব্যঞ্জনা তৈরি করতে পছন্দ করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে—
‘নির্জন এক তারা’
‘পাখির মতো চেয়ে থাকা’
‘জল ও জালের নকশা’
‘শব্দের ঘরবাড়ি’
‘নীলকুঠির গান’
তাঁর কবিতায় চিত্রকল্পের এক অদ্ভুত জাদুকরী প্রভাব লক্ষ করা যায়। তুচ্ছাতিতুচ্ছ অতি সাধারণ দৃশ্যকেও তিনি এক গভীর দার্শনিক রূপ দিতে পারেন। অত্যন্ত পরিমিত শব্দ ব্যবহার করে বৃহৎ ভাবনাকে ফুটিয়ে তোলেন। কবিতায় শব্দের চেয়েও অনেক সময় স্তব্ধতা বা 'Silence' বেশি কথা বলে। আধুনিক নাগরিক জীবনের ক্লান্তি এবং গ্রামীণ প্রকৃতির সুন্দরের যে সহাবস্থান তা তাঁর কলমে বারবার ফিরে আসে। তাঁর জীবন-ভাবনা মূলত মানুষ, প্রকৃতি এবং অন্তহীন একাকিত্বের এক জটিল রসায়ন। কবিতায় জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং নির্মোহ। সেই কারণেই কবিতায় প্রায়ই জীবনের নশ্বরতা এবং আধুনিক মানুষের যান্ত্রিক জীবনের হাহাকার উঠে এসেছে। সমালোচকরা বলেন, তাঁর কলমে একধরনের "Elegy of boredom" বা একঘেয়েমির হাহাকার ফুটে উঠত। তিনি হয়তো অবসাদগ্রস্ত হয়ে থাকতেন বলেই তাঁর এই লেখাগুলো অবচেতন মনের সেই যন্ত্রণারই বহিঃপ্রকাশ। তাঁর সাহিত্যদর্শন ও কবিতার ভাবনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু উদ্ধৃতি ও পংক্তি নিচে দেওয়া হলো, যা তাঁর মনের গভীর হতাশা ও 'পলায়ন'-এর ইঙ্গিত বহন করে।
অস্তিত্বের সংকট ও হতাশা:
তাঁর লেখায় প্রায়শই উঠে এসেছে নিজেকে খুঁজে না পাওয়ার হাহাকার। একটি বহুল পঠিত ভাবনায় তিনি লিখেছেন—
"আমার হওয়া হয়নি, তাঁর কাছ
থেকে পাওয়া হয়নি কিছুই। এক এ উদাসীনতা ছাড়া। সারাজীবনটাই মনে হয়, খুব একা ছিলেন তিনি।
আমিও অজ্ঞাতে এ একা থাকার দীক্ষা নিয়ে থাকতে পারি... তাঁকে ভালোবাসি না, ভালোবাসার
সময়ই পাইনি।"
এটি সরাসরি তাঁর আত্মদর্শনমূলক
উক্তি, যেখানে নিজের জীবনকে এক 'অসম্পূর্ণ' ভ্রমণ হিসেবে দেখার প্রবণতা স্পষ্ট। এখানে
'তিনি' হতে পারেন তাঁর স্রষ্টা কিংবা তাঁর নিজেরই কোনো হারিয়ে যাওয়া সত্তা।
আধুনিক জীবনের শূন্যতা:
তাঁর 'লাঠি' কাব্যগ্রন্থটি আধুনিক জীবনের রুক্ষতা এবং মানুষের একাকিত্ব নিয়ে লেখা। সেখানে তিনি রূপক অর্থে লাঠির ব্যবহার করেছেন, যা বার্ধক্য, অসহায়ত্ব এবং আত্মরক্ষার প্রতীক। এই বইয়ের ভাবনাসূত্রে পাওয়া যায় এমনই এক হাহাকার—
"একটি মানুষ শুধু লাঠি হাতে একা একা হাঁটে
মহানির্বাণের পথে তার হাতে থেকে
গেছে নিরক্ষর চাবি..."
এই পংক্তিটি তাঁর কবিতার ভাবনার সারসংক্ষিপ্ত রূপ, যেখানে মানুষ শেষ যাত্রায় একা, এবং তার অর্জিত সব কিছুই তখন অর্থহীন বা 'নিরক্ষর' চাবির মতো।
সুখ ও দুঃখের দ্বৈততা:
তাঁর অণুকবিতা বা ছোট কবিতার সংকলন 'প্রজাপতি বসেছে প্রিয় ফুলে'-তে তিনি দেখিয়েছেন আনন্দ আর বিষাদ কীভাবে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। সমালোচকদের মতে, এই বইয়ের কবিতাগুলো "হর্ষ এবং বিষাদ-সিক্ত অন্তবিহীন মুহূর্তের টুকরো ছবি"। একটি ভাবনায় তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন—
"আলোর নিচেই থাকে গাঢ় অন্ধকার,
উচ্ছ্বাসের আড়ালে জমে থাকে দীর্ঘশ্বাস।"
আবার 'নীল প্রেমিক' বা 'হে প্রেম' কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলিতেও তিনি গতানুগতিক প্রেমের কবিতা লেখেননি। তাঁর কবিতায় প্রেম কেবল আবেগ নয়, বরং এক ধরনের আত্মানুসন্ধান। তিনি বিশ্বাস করেন, ভালোবাসা এক ধরনের 'নিভৃত একাকিত্ব'। তাঁর কবিতার একটি অন্তর্নিহিত সুর হলো— "যা অব্যক্ত রয়ে গেল, তার মধ্যেই প্রকৃত সুন্দরের বাস।"
তাঁর এই পংক্তিগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়: "আমার হওয়া হয়নি"- এই বোধটি তাঁর মধ্যে প্রবল ছিল। আই এ এস অফিসার হিসেবে সফল কর্মজীবন থাকার পরেও সাহিত্যের পাতায় তিনি নিজেকে বারবার 'ব্যর্থ' বা 'অসম্পূর্ণ' হিসেবে আবিষ্কার করেছেন। তাঁর কবিতায় 'একা মানুষ', 'বন্ধ দরজা', বা 'অন্ধকার'-এর উপমা বারবার ফিরে এসেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, তিনি ভিড়ের মধ্যেও নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে করতেন। অর্থাৎ তাঁর কাব্যশৈলীতে আধুনিক মানুষের অস্তিত্ব সংকট এবং অন্তর্নিহিত একাকিত্বই তাঁর রচনার অন্যতম প্রধান সুর। তবে এই একাকিত্ব বিষণ্ণতার চেয়েও বেশি আত্মানুসন্ধানের। তাই তিনি ভিড়ের মাঝেও এক নিভৃতচারী সত্তাকে খুঁজে চলেন। প্রকৃতি তাঁর কাছে কেবল দৃশ্যাবলী নয়, বরং জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। গাছ, পাখি, মেঘ বা নদীর রূপক ব্যবহার করে তিনি মানুষের মনের গহীন কথাগুলো বলেন। তাঁর জীবন ভাবনায় প্রকৃতি অনেক সময় শিক্ষক বা সহচরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তাঁর কবিতায় 'শূন্যতা' বা 'অভাব' একটি বিশেষ জায়গা দখল করে আছে। যা নেই বা যা হারিয়ে গেছে, তাকেই যেন তিনি শব্দের স্থাপত্য দিয়ে নতুন করে গড়ে তুলতে চান। জীবনের নশ্বরতাকে মেনে নিয়েও তার ভেতরে সুন্দরের যে ছোঁয়া আছে, তাই তাঁর লেখনীর মূল উপজীব্য। নীলাঞ্জন বিশ্বাস করেন যে, সব কথা শব্দ দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তাই তাঁর জীবন ভাবনায় মৌনতা বা নীরবতা এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। জীবনের অনেক জটিল প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পেতে চান শান্ত সমাহিত অনুভবের মধ্য দিয়ে।
নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের গল্পগুলিতেও তাঁর জীবন ভাবনার প্রভাব প্রকট হয়ে উঠেছে। নাগরিক জীবনের ক্লান্তি এবং মানুষের একাকিত্বের কথা বারবার ফিরে এসেছে। নিঃসঙ্গতা ও বাস্তবতা নিয়ে তাঁর একটি উক্তি: "একা লাগলেও থাকা অভ্যাস করতে হবে। অনেককেই ওরকম থাকতে হয়।" (উৎস: গল্প 'আশ্রয়') এই উক্তিটির মাধ্যমে তিনি আধুনিক মানুষের জীবনের এক চরম বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন, যেখানে ভিড়ের মাঝেও মানুষ একা এবং সেই একাকিত্বকেই তাকে সঙ্গী করতে হয়।
নাগরিক বিষণ্ণতা নিয়েও তিনি বলেছেন
: "বিকেল বেলাতেও শহরের কোথাও কোনো ঔজ্জ্বল্য
নেই। পথচারীদের মুখেও যেন বিষণ্ণতা লেগে আছে।" (উৎস: 'আশ্রয়') শহুরে জীবনের যান্ত্রিকতা
কীভাবে মানুষের মুখের স্বাভাবিক হাসি কেড়ে নেয়, এই বর্ণনায় তা স্পষ্ট।
সামাজিক দ্বিচারিতা নিয়েও তাঁর
গভীর অভিজ্ঞতা: "আমি তো একটা ভাল কাজ করছি। ও সব গল্প-উপন্যাসে
চলে... বাস্তবে সম্ভব নয়।" (উৎস: গল্প 'বড় মানুষ') এখানে তিনি সমাজের সেই রূপটিকে
দেখিয়েছেন যেখানে ভালো কাজ করার আদর্শ কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে সমাজ
তাকে চরিত্রহীন আখ্যা দিতেও দ্বিধা করে না।
তাঁর কিছু গল্পে (যেমন—পিকাসোর ছবি বা পরাবাস্তব কিছু গল্পে) তিনি দেখিয়েছেন যে 'Art is the ultimate escape'। অর্থাৎ, রূঢ় বাস্তবতা থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো শিল্পের জগৎ। একে যদি 'পলায়নপ্রবণতা' ধরা যায়, তবে তা নেতিবাচক অর্থে নয়, বরং একজন শিল্পীর আত্মরক্ষা (Defense Mechanism) হিসেবে দেখা যেতে পারে। তিনি হয়তো মনে করতেন, বাস্তব জগৎ যেখানে মানুষকে কষ্ট দেয়, কল্পনার জগৎ সেখানে তাকে আশ্রয় দেয়।
বর্তমান অস্থির সময়ে দাঁড়িয়ে নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়ের সাহিত্য পাঠককে এক গভীর প্রশান্তি দেয়। তিনি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বা উচ্চকিত প্রতিবাদের পথে না হেঁটে, মানুষের ভেতরের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে ছুঁয়ে যেতে পছন্দ করেন। তাঁর সাহিত্য পাঠ করা মানে নিজের মুখোমুখি দাঁড়ানো। তিনি কখনো সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটেননি। বরং তাঁর সাহিত্য কীর্তি বাংলা কবিতার শুদ্ধতাকে রক্ষা করেছে। তাঁর জীবন ভাবনা আমাদের শেখায় কীভাবে যান্ত্রিক সভ্যতার মধ্যেও নিজের কোমলতাটুকু বাঁচিয়ে রাখা যায়।
মাঝে মাঝে তিনি আমাদের প্রকৃতির
কাছেও নিয়ে গেছেন : "এই সুদীর্ঘকাল মানুষ প্রকৃতির কথা, পরিবেশের
কথা ভাববার অবকাশ পায়নি।" (উৎস: 'আমলাকথা') মানুষের উন্নয়ন ও অগ্রগতির নেশায়
কীভাবে আমরা প্রকৃতিকে ভুলে গেছি, সেই অভাববোধ তাঁর রচনায় বারবার ফুটে ওঠে। সব মিলিয়েই
তাঁর সাহিত্য এক আত্মগত পর্যটন হয়েও বৃহত্তর মানব মহিমায় পরিব্যাপ্ত। প্রকৃতিও সেখানে
নিবিড় সংযোগে সংযুক্ত।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন