কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

শান্তিরঞ্জন চক্রবর্তী

 

ধারাবাহিক উপন্যাস

স্বর্গ এসেছে নেমে

 


(১১)   

গ্রামে এবার হৈরৈ কান্ড। এবার কেবলমাত্র সান্যালমশাই নন, সঙ্গে এসেছে তাঁর কন্যাও। এ যেন গ্রামবাসীদের কাছে এক পরম পাওয়া! যার যতটুকু সাধ্য এনে হাজির করছে তাদের রাজকন্যা হেন দিদিমনিকে উপহার দেবে বলে। গ্রামে আসবে বলে মনস্বিনী তার পোশাকেও পরিবর্তন এনেছে কিছু। অতি সাধারণ বেশে এসেছে সে। সালোয়ার কামিজের বদলে বেছে নিয়েছে একটি শাড়ি। সে শাড়িটিও তেমন উজ্জ্বল নয়। তবে অনুজ্জ্বল শাড়িটিও পারেনি তার ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বলতাকে ম্লান করে দিতে। ঘুরে ঘুরে গ্রামটিকে জরিপ করে নিল মনস্বিনী। তার পিতৃভূমি এই গ্রামটি মমতায় বেঁধে ফেলেছে তাকে। সময় এলে কিছু করার ইচ্ছা পুষে রাখল সে মনের ভীতর।

কতদিন পর ছেলেকে কাছে পেল বৈশ্বানরের মা। দেখে যেন মন ভরে না। সেই কবে থেকে মায়ের কোল ছাড়া। মায়ের ইচ্ছে পরীক্ষায় পাশ হলে একটা চাকরী জুটিয়ে গ্রাম থেকেই যাতায়াত করে চাকরীটা করুক বৈশ্বানর। হ্যাঁ, এই গ্রাম তো তারও জন্মভূমি। শহরে থাকে বটে কিন্তু অবসরে মনটা ছুটে চলে আসে এই গ্রাম আর প্রতীক্ষারত মায়ের কোলের টানে। কিন্তু গ্রামের মায়ায় বন্দী হয়ে গেলে কি হবে তার বিশাল কর্ম যজ্ঞের! বৈশ্বানর কেমন করে যেন জেনে ফেলল গ্রাম নিয়ে মনস্বিনীর ভাবনার কথা। তারও যে ইচ্ছা এই গ্রামেই সে এমন কিছু করবে যা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে সারা বিশ্বকে সদিচ্ছার প্রাবল্যের কাছে যে কোন বাধা ভেসে যায় খড়কুটোর মত।

সান্যালদাদা মহাজন তার। তাঁরই কৃপায় সে আজ খেয়েপরে আছে। আস্তানা রাজমহলের মত একখানা বাড়ি। তার ছেলে বিশু নিজের ছেলের মতই তাঁর তত্ত্বাবধানে পরমাদরে থেকে পড়াশোনা করছে। তারই মেয়ে এই প্রথমবারের জন্য এসেছে গ্রামে। বৈশ্বানরের মা সাধ্যমত পরিপাটি করে রান্না করে খাওয়ালো তিনজনকে। মনস্বিনীর গ্রাম দেখা এই প্রথম আর প্রথম দেখাতেই প্রেম-এর মত মনস্বিনী ভালবেসে ফেলল তার গ্রামটিকে। আধুনিকতা দিনে দিনে গ্রাস করছে গ্রামের সারল্য অজগরের মত। রাজনীতির ঘোলাজলে দিকভ্রান্ত হচ্ছে অকপট মনগুলো তবু যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা-ই বা কম কি? মনস্বিনী অকপটে কথা বলল গ্রামের কিছু মানুষের সঙ্গে। এখনও কত সরল এরা, মনস্বিনী ভাবল মনে মনে। এদেরই একজন বৈশ্বানর। বৈশ্বানরের কথা সবার মুখে মুখে। মনস্বিনী উৎসাহিত করল গ্রামের ছেলে মেয়েদের বৈশ্বানরের মত হয়ে উঠতে। কেউ কেউ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানালো আবার কেউ কেউ বলল মা বাবা বলেছে, ‘বিশুদাদা তো ভগবানের কাছ থেকে এসেছে, সক্কলে অমন হয় না’। কে চায় এমন সরল বিশ্বাসকে যুক্তি তর্কের বেড়াজালে ফেলে নিঃসার করে দিতে! শিক্ষার আলো যতদিন না গ্রামের প্রতিটি মানুষকে ভীতর থেকে আলোকিত করে তুলবে ততদিন এমন বিশ্বাস নিয়েই বাঁচবে ওরা।

মনস্বিনী ঘরে ফিরল একবুক মুগ্ধতা নিয়ে। বলে রাখলো বাবাকে, প্রতি মাসে সেও গ্রামে যাবে তার সাথে। বাবা হেসে বললেন, ‘খুব খুশি হলাম মা, কিন্তু তোমার জননী কী এতটা উদার হবেন যে প্রতি মাসে তোমাকে গ্রামে যাবার অনুমতি দেবেন!’ ‘সে আমি দেখে নেবো’, বলে একটু চতুর হাসি হেসে বলল আবার, ‘দেখো না এর পরের বার মাকে নিয়েই যাবো আমি’। ‘পারবি মা’? অনঙ্গ সান্যালের চোখে অপার বিস্ময়। ‘কেন মেয়ের ওপর বিশ্বাস নেই তোমার’? ছোট্ট এই জিজ্ঞাসাটি নিয়ে বাবার দিকে তাকালো মনস্বিনী। অনঙ্গ সান্যাল ব্যবসায়ে পটু কিন্তু হৃদয় নিয়ে খেলা কোনদিনই সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। জানতে চাইলেন, ‘কি মন্ত্রে বশ করবি মাকে’? ‘কেন, শ্বশুরের ভিটের সেন্টিমেন্ট কাজে লাগাবো’! হো হো করে হেসে উঠলেন অনঙ্গ সান্যাল। এমন প্রাণখোলা হাসি কতদিন যে হাসতে পারেননি তিনি!

বিয়ের পর মাঝে মধ্যেই কুন্তলাকে বাবার সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে গেছেন অনঙ্গবাবু। স্ত্রীর মৃত্যুর পর এই কুন্তলাই ছিল তার ঘরটি জুড়ে। সহজে কি একা থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়? বাবার একাকিত্বের কথা ভেবে কুন্তলার মনও আনচান করে উঠতো। কুন্তলার তাগিদেই বেশ ঘন ঘন যেতে হয়েছে তাকে শ্বশুরগৃহে। স্বামী সহযোগে কুন্তলার আগমন ভরে তুলত মহাদেববাবুর শূন্য ঘরখানি। সন্তান জন্মের পর কুন্তলা নিজেই আর আগ্রহ দেখায়নি ততটা। স্বামী সন্তান সংসার এ তিন নিয়েই তার ভুবন। কুন্তলার বাবাও সন্তানকে সুখী দেখেই শান্তি পান । মাঝে মধ্যে তিনি নিজেই চলে আসেন মেয়ের খোঁজখবর নিতে। গ্রাম কুন্তলার কাছে নতুন কিছু নয়। গ্রামেই জন্ম তার, গ্রামের সংস্কার কুসংস্কার নিয়েই বেড়ে উঠেছে সে তাই গ্রাম দেখবার কৌতূহল বা আগ্রহ কোনটাই তার মধ্যে না থাকাটাই স্বাভাবিক। এ ভাবনা যে মনস্বিনীর মাথায় আসেনি তা নয় কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্রীও নয় সে। সময় আসুক, তখন ‘শ্বশুরের ভিটে’ অস্ত্রটি প্রয়োগ করা যাবে এমনটাই ভেবে রাখল মনে মনে।

(১২)

গ্র্যাজুয়েশনের ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতির সাথে সাথেই চলেছিল ইউ পি এস সি’র প্রস্তুতি। বৈশ্বানরের মত প্রতিভাবান যারা তারা পরীক্ষার পর নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। কোন উত্তেজনার চিহ্নমাত্র দেখা গেল না বৈশ্বানরের কথায় বা আচরণে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সর্বভারতীয় পরীক্ষা। কেবলমাত্র জেলা বা রাজ্য নয় তাকে এবার র‍্যাঙ্ক করতে হবে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মেধাবী ছাত্রদের পেছনে ফেলে। নিঃসন্দেহে কঠিন ব্যাপার। বৈশ্বানরের মত লড়াকু ছেলেরা কখনও কি হবে বলে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকে না। চেষ্টা ও অধ্যবসায় এই দু’টি অস্ত্রের দ্বারা তারা যে কোন অসাধ্য সাধনের ভিত তৈরী করতে পারে।

দেখতে দেখতে লিখিত পরীক্ষার দিন চলে এল। প্রস্তুতিতে খামতি ছিল না একবিন্দু, তাই পরীক্ষায় আশানুরূপ ফলও পেল বৈশ্বানর। ইন্টারভ্যু লেটারও এসে গেল সময় মত। এর মধ্যে স্নাতক পরীক্ষার ফলও ঘোষিত হল। সেখানেও ইউনিভার্সিটির ফল তালিকায় দু’নম্বরে তার নাম।  কোন বাধা আর রইল না আই পি এস হওয়ার পথে। ইন্টারভ্যুতেও প্রথম দশজনের মধ্যে। এবার তাকে চলে যেতে হবে মুসৌরিতে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ন্যাশনাল একাডেমিতে। সেখানে ট্রেনিং সমাপ্ত হলে যেতে হবে হায়দ্রাবাদে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল পুলিস একাডেমি অফ পুলিশ অ্যাডমিনিস্টেশন-এ দু’বছরের ট্রেনিং-এর জন্য। ট্রেনিং শেষে গুরু দায়িত্ব এসে যাবে তার উপর। স্বেচ্ছায় বৈশ্বানর বেছে নিয়েছে এই পথ। মনে মনে সে তৈরী করে নিয়েছিল নিজেকে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবে বলে। আত্মপরায়ণ মানুষগুলোকে বুঝিয়ে দিতে  হবে, ব্যক্তি নয়, ভাবতে হবে দেশের কথা আর সেই জন্য ব্যক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে স্বার্থপরতা, আত্ম-অহমিকা ত্যাগ করে উদার মনের অধিকারী হয়ে।

বৈশ্বানরের পর পর দু’টি সাফল্যে অনঙ্গ সান্যাল আনন্দের আতিশয্যে কি করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। ট্রেনিং-এ যোগ দেবার আগে একট সম্বর্ধনা সভার আয়োজন করলে কেমন হয়! তিনি শরণাপন্ন হলেন তাঁর বিদুষী কন্যা মনস্বিনীর। একটুও না ভেবে মনস্বিনী বলে দিল তার মনের কথা। যেন সে স্থির করেই রেখেছিল তার আদর্শ পুরুষের যুগল সাফল্য কিভাবে উদযাপন করা হবে। আরে! মেয়ে কি বাবার মনের খবরটি আগে ভাগেই পেয়ে গেছে? অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি মেয়ের দিকে যখন সে জানালো, যে গ্রামের ছেলে বৈশ্বানর সে গ্রামের মানুষকে এতবড় আনন্দের ভাগ থেকে বঞ্চিত করা কেবল অন্যায় নয় অপরাধ বলে গণ্য হবে। অনঙ্গবাবু কন্যার কথায় সায় তো দিলেনই, তাকে নিয়ে বসেও গেলেন উৎসবের চরিত্র কেমন হবে, কিভাবে তাকে সার্থক করে তোলা যাবে এ সব খুঁটিনাটি আলোচনার জন্য।

ঠিক হল চলতি মাসেরই দ্বিতীয় সপ্তাহের রবিবার দিনটি। গ্রামের সকলকে খবর করে দিলেন। কয়েকজন দায়িত্বশীল যুবক এগিয়ে এল। অনঙ্গবাবু তাদের কাছে খুলে বললেন তাঁর পরিকল্পনার কথা। আগাম বেশ কিছু টাকাও দিয়ে রাখলেন তাদের হাতে আর বলে দিলেন, অনুষ্ঠানে যেন কোনরকম ত্রুটি না ঘটে। খবর পেয়ে তো গ্রামের মানুষগুলো আনন্দে ফুটছে তখন। শুধু কি খাওয়া? নাচ গান গল্প কোন কিছুই বাদ যাবে না সেদিন। ছেলেকে নিয়ে এত কিছু আয়োজন অথচ বৈশ্বানরের মায়ের চোখে ঘুম নেই। গ্রামের সান্ধ্যকালীন আড্ডায় চর্চায় বিষয় এখন তাদের বিশু। বাবু বলেছেন, সে নাকি বিরাট এক অফিসার হবে, দেশের যত অন্যায় অবিচার সব সে দূর করে দেবে। তাদের কল্পনায়, কথায় বাড়াবাড়ি আছে সত্য কিন্তু এ যে বৈশ্বানরের প্রতি তাদের অকৃত্রিম ভালবাসার প্রকাশ তাতে কোন সন্দেহ নেই। এখন বিশুর মায়ের সময় খুব কম। প্রতিবেশীদের আনাগোনা লেগেই আছে। তারা যখন বৈশ্বানরকে নিয়ে উৎসাহব্যঞ্জক কথা শোনায় সে নিরুৎসাহ বোধ করে। এতকিছু তো চায়নি সে। ছেলে যদি তার কোল থেকে দূরেই থেকে গেল তবে আর এ শিক্ষার অর্থ কি! সে তো শুনেছে, গরীব ঘরের ছেলেরা বড় কিছু হয়ে গেলে মা বাবাকে ভুলে যায়, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে। এ আশঙ্কার কথা চাপা থাকেনি। অনঙ্গ সান্যাল বুঝিয়েছেন তাকেচ, বৈশ্বানর অমন ছেলেই নয়, মা অন্ত প্রাণ তার। সে যত বড়ই হোক, যেখানেই থাকুক না কেন তার মনে মায়ের স্থান যেমন ছিল তেমনই থাকবে। কর্তাদাদার কথায় অগাধ বিশ্বাস তার। আশ্বস্ত হয়েছে এই ভেবে যে তিনি মিথ্যে বলবেন না। তার নিজের থেকে তার ছেলেকে অনেক বেশী জানেন কর্তাদাদা।

নির্ধারিত দিনে অনঙ্গ সান্যাল, মনস্বিনী আর বৈশ্বানর প্রস্তুত গ্রামে যাবার জন্য। সমস্যা সৃষ্টি হল কুন্তলাকে নিয়ে। আগে থেকেই বলা ছিল, ওই দিনে কুন্তলাও যাবে গ্রামের বাড়িতে। আগে থেকে কিছুই বলা হয়নি তাকে। কথা কিন্তু চাপা থাকেনি। কোন না কোন ভাবে পৌঁছে গেছে তার কানে। যাবার মুহূর্তে বাদ সাধল সে। বলল, যাদের মনে আনন্দ ধরে না তারা যাক, সে যাবে না কিছুতেই। এবার সেই চালটি চাললো মনস্বিনী। বললো, ‘মা শ্বশুরের ভিটে মেয়েদের কাছে খুব প্রিয়  জায়গা একটা, তীর্থের মত। শুনেছি বাবা নিয়ে যেতে  চাইলেও তুমি যেতে চাওনি কখনো, আজ তুমি না গেলে বাবা বা আমি কেউ যাব না। বাবার বদনাম হোক সেটা কি চাও তুমি?’ এখানে ঘায়েল হল কুন্তলা। মুখে যতই বিরোধিতা করুক না কেন মনে মনে সে পূজা করে তার স্বামীকে দেবতা জ্ঞানে। হ্যাঁ, কুন্তলার একটা অহংকারের জায়গা নিশ্চয়ই আছে। তার বাবার সহযোগিতা না পেলে আজকের এত যে নাম ডাক অনঙ্গ সান্যালের, তা সম্ভব হত নাকি কোনদিন? ঠিক তার পরে পরেই আর একটি যুক্তি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ভেতরে কিছু না থাকলে শত সহযোগিতাতেও লাভ হয় না কোন।

(ক্রমশ)

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন