কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

স্মৃতিকণা সামন্ত

 

গম্ভীরা, এক আয়নাকথন

'গৌড়ীয় গম্ভীরা' দলের প্রধান
মন্মথ মজুমদার 

 

মহানন্দার জলে থির হয়ে আছে ঘাইমারা মাছের চোখ। আকাশে চক্কর কাটছে চিল। শিকারী আর শিকারের বুড়ি ছুঁই ছুঁই খেলায় কার হাত কখন ফসকে যায় কে জানে। মেছো ডানায় খানিকটা আলো, খানিকটা কুয়াশা জড়িয়ে চিল উড়ে যায় স্কাই লাইনের দিকে, জলের উঠোনে ছায়া ফেলে পালকের ধূসর বুক। শহর ছাড়ানো মাঠজমি থেকে দলে দলে উঠে আসে কুয়াশার ঝাঁক। আদিনা মসজিদ ছুঁয়ে রাস্তা দৌড়োয় শহর ছড়িয়ে সুজাপুরের ঢালে।

গ্রাম ছাড়িয়ে গ্রাম, গ্রামের গায়ে হাট, হাটের গায়ে গজিয়ে ওঠা হাঁড়ি কড়াই কিম্বা টিভি সারাইয়ে দোকান। সর্ষে ফুলের ফতোয়া উড়ছে হাওয়ায়। আমের বাগানে এখন ঘরফেরতা পাখিদের ডাক। শীত ফুটছে গায়ে, সজারুর কাঁটার মতন। সুজাপুরে দিকে ছুটতে ছুটতে হাইওয়ে ছাড়িয়ে ফুড়ুৎ পালিয়েছে একটা কাঁচারাস্তা। মোড়ের মাথায় সাইকেল সারাইয়ের দোকানটা সবে ঝাঁপ খুলছে। চায়ের দোকানে সসপ্যান চাপিয়ে গান চালিয়েছে মাঝবয়সী দোকানি – লিখখে জো খত তুঝে ও তেরি ইয়াদ মে...। চেনা খদ্দেররা ভিড় জমাচ্ছে টুকটাক। আশপাশের খুচরো দোকানগুলো তখনো দুপুরের ভাতঘুমে। ওই যে গহীন গাঙ তারই কাছে নাড়া বেঁধেছে জীবন। কখনো উজানে, কখনো ভাটির টানে নিশ্চিত বয়ে যাওয়া।

এদেশের মাটি খুঁড়লে আজও উঠে আসে হুসেনশাহী দিন আর পাতলা ইঁটের স্তূপ। মানুষের হৃদয় খুঁড়েও কি উঠে আসে অতীত নাকি বহতা স্রোতে ভেসে যায় দিন আর হৃদয়ের গালগল্প লেখে লোককথার আখর?  শেষ বিকেলের মরা রোদ লুটোচ্ছে মণিহারি দোকানটার দাওয়ায়। শিল্পী মন্মথ বলেছেন গম্ভীরা গানের রীতিনীতির কথা। শুনছি আমরা, শুনছে তাঁর সাগেরেদরাও।

মালদার রতুয়া, কালিয়াচক, গাজল জুড়ে ভাসে গম্ভীরার সুর। দিনমজুর, ক্ষেতমজুর, বেকার ছেলেদের হৃদয়ে হৃদয়ে মিলিয়ে গান ধরে তিতাসের মত সফল মানুষেরা। এ এক অদ্ভুত প্যাশন। শিব ঠাকুরের আপন দেশে এ এক সর্বনেশে নেশা। একটা এলোমেলো স্টেজ, একঝাঁক আলো আর বুকের গভীর থেকে উথলে ওঠা খেদের কথা বলার নেশা।

গম্ভীরা গানের পর্ব ভেঙে বোঝাতে বোঝাতে আবেশে চোখ বুজে আসে মন্মথ'র শিব বন্দনা, চার ইয়ারি, রিপোর্টিং...

গম্ভীরার অতীত খুঁড়লে উঠে আসে ধুলো। ধুলো মেখে হেঁটে যাওয়া গভীর থেকে গভীরতর দিনে – সেই যেদিন তথাগত ফিরে গেলেন পরম নির্ব্বাণে, যেদিন শিব আর বিষ্ণু ফিরে পাচ্ছিলেন গেরস্তের গৃহকোণ আর ক্রমশঃ মিশে যাচ্ছিল আর্য আর অনার্যের বিশ্বাসের ধারা। সেদিন গম্ভীরা ছিল ছোটঘর। বুদ্ধ পাদুকা রাখার ঘর।  সময়ের ফেরে বুদ্ধ যখন হয়ে উঠলেন ধর্ম নিরঞ্জন তখন বুদ্ধ পাদুকা সরিয়ে গম্ভীরায় রাখা হল ধর্ম পাদুকা। আরো পরে ধর্ম'র শরীর থেকে জন্ম নেওয়া আদ্যাদেবী যখন হিন্দু চণ্ডীর সাথে এক হয়ে গেলেন তখন গম্ভীরা হয়ে উঠল আদ্যের, দেবী চণ্ডীর থান।

চণ্ডী আদতে অনার্য কোন দেবীর মেটামরফসিস কিনা সে নিয়ে তাত্ত্বিকদের  মতভেদ আছেই। অনেকে মনে করেন চণ্ডী শব্দটি উৎপত্তিগতভাবে দ্রাবিড়। চাণ্ডী থেকে চণ্ডিকা, চণ্ডী ইত্যাদি শব্দ আসা সম্ভব। ওঁরাও কিম্বা বিরহোর সমাজে চাণ্ডী নামের এক দেবীর খোঁজ পাওয়া যায় যিনি আদতে শিকারের দেবী। পুরনো আর্যশাস্ত্র যেমন ঋগবেদ কিম্বা রামায়ণ বা মহাভারতের যুগেও চণ্ডীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এর অনেক পরে, দেবী ভাগবত, মার্কণ্ডেয় পুরাণ কিম্বা বৃহদ্ধর্ম পুরাণের মতো বইয়ের পাওয়া যাচ্ছে দেবীকে। এবং চণ্ডীর রূপকল্প মিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে উমা বা পার্বতীর মতো বৈদিক দেবীর সাথে।

আবার অনেকে মনে করেন বৌদ্ধ শক্তি দেবী বজ্রতারার সাথে মিলে গেছে চণ্ডীর কল্পনা। বৌদ্ধ তারা, আর্য্যতারা, নীলসরস্বতী এমনকি কুরুকুল্লা নামের এক দেবীও এসে মিশেছেন চণ্ডীতে। আবার আশুতোষ ভট্টাচার্য বললেন, বৌদ্ধ দেবতা বজ্রসত্ত্বের শক্তি বজ্রধাত্বেশ্বরীর সাথেই চণ্ডীর মিল বেশি।

আদিবুদ্ধ, ধ্যানীবুদ্ধ, বোধিসত্ত্ব যে পথে মিশে গেলেন শিবে, অমিতাভ, অক্ষোভ্য কিম্বা রত্নসম্ভবের শক্তিরা মিশে গেলেন বৈদিক দুর্গার শরীরে; অবলোকিতেশ্বের, মঞ্জুশ্রী, বজ্রপানিরা হয়ে উঠলেন ব্রাহ্মণ্যবাদের দেবদেবী সে পথ বড় জটিল, খানাখন্দে ভরা। সেই জটিল পথের চড়াই উৎরাই এক আশ্চর্য জাদুবলে আত্মসাৎ করে বাংলার নরম মাটি, লোক জীবনের বহতা ধারায় পেলব এক রূপকথা হয়ে ওঠে নৃতাত্বিক ঘাত অভিঘাত।

পশ্চিমবঙ্গ তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে রেজিষ্টার করা গৌড়ীয় গম্ভীরা দলের প্রধান মন্মথ মজুমদার। আত্মমগ্ন  গলায় শিল্পী মন্মথ বলছিলেন শিবের কথা। শিব যেন সংসারের মাথা। যা কিছু অভাব অভিযোগ সবই তাঁর দরবারে। এই শিবকে তাঁরা ডাকেন "নানা"। শিব আসলে শিব না। তিনি দেশের প্রধান, তিনি রূপক।

"ওহে নানা তুই একটা ভাব না, দিশা হামরা আর খুঁজে পাইনা।

দেশের সরকার কর‍্যাছে বেকার তেলিয়া কলুর বলদের মত ঘুরাছে বারবার।

শিক্ষা গেল স্বাস্থ্য গেল গেল রসাতলে রে

দেশের সরকার মোদের কাজ দেয় নাই, নানা বইলা দে উপায়

মোদের কুল কিনারা নাই, নানা বইল্যা দে উপায়"

তাকলামাকানের শুকনো মরু, সুং লিঙের চড়াই উতরাই পেরিয়ে চিন দেশ থেকে এলেন পর্যটক। পায়ে পায়ে হেঁটে দেখলেন বুদ্ধের দেশ ভারতবর্ষ, খুঁজে বেড়ালেন শাশ্বত বাণীর পুঁথি। বিনয় পিটকের সঠিক নির্দেশ খুঁজতে এলেন ভিক্ষু ফা হিয়েন। তারও দুশো বছর পরে এলেন মহান হান সাম্রাজ্যের রাণীর নির্দেশে ভিক্ষু জুয়ান জাং। অপূর্ব এক রথযাত্রার সাক্ষী তাঁরা। দামি কাপড়ে মোড়ানো রথের গায়ে ফুলের সাজ, মাথায় সাজানো ছাতা। ছাতাটি রত্নখচিত। স্যামুয়েল বিল তাঁর অনুবাদে এমনই বলেছেন। রাস্তার দুপাশ উপচে পড়ছে জনতার ভিড়। বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা চলেছেন রথের সাথে। রথের ভেতর বৌদ্ধ ত্রিমূর্তি। রথের সাথে মানুষ চলেছে নাচতে নাচতে, গান গাইতে গাইতে। সন্ধ্যা নামলে মুখোশ নাচে ভরে উঠেছে তথাগত বুদ্ধের আঙিনা। সাতদিন ধরে চলেছে সেই উৎসব।

সময়টা বুদ্ধ জন্মের প্রায় হাজার বছর পার। বুদ্ধ ততদিনে টুকরো টুকরো হয়ে ভাগ বাটোয়ারা হয়ে গেছেন হীনযান আর মহাযানে।  তিনি তখন আর মানুষ বুদ্ধে থেমে নেই। তিনি এক অলৌকিক সর্বশক্তিময় অস্তিত্ব। অনেক বুদ্ধের মধ্যে তিনি একজন। তাঁরই সাথে কাশ্যপ, কাক্কুছন্দ ইত্যাদি  পূর্ব বুদ্ধের হদিস পাওয়া যাচ্ছে , লোকবিশ্বাসে সেইসব স্মৃতিস্তূপে জড়ো হয়েছে মানুষ। হর্ষবর্ধন তখন মহাযান শাখার মন্ত্রযান দলের শরিক। নাগার্জুন ততদিনে মধ্যমিক মত ছড়িয়ে দিয়েছেন সমাজের লতায় পাতায়। হিন্দু দেবদেবী ঢুকে পড়ছে বৌদ্ধ  সংঘারাম আর পুঁথির ভেতর।  উলটো পথে বৌদ্ধ দেবদেবী এসে বসছে হিন্দুর দেব দেউলে। খোদ রাজা হর্ষবর্ধন সেদিন মন্ত্রযান শাখার শরিক। বৌদ্ধ উৎসবে রাজা হর্ষবর্ধন সেজেছেন ইন্দ্র, আর অসমরাজ ভাস্করবর্মা সেজেছেন ব্রহ্মা। ধর্মীয় এই ফিউশন উৎসবের সাক্ষী থেকেছেন ভিক্ষু পথিক হিউয়েন সাং।

ফিউশন এক কন্টিনিউয়াস প্রসেস। বিন্দু নয়, ফিউশন এক রৈখিক চলন। নালন্দা থেকে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন হিউয়েন সাং। এগোলেন প্রাগজ্যোতিষ্পুরের পথে। ডেকেছেন রাজা ভাস্করবর্ম্মা। পথে পড়ল পৌন্ড্র দেশ। সুজলা, সুফলা, নরম মাটির এক দেশ। অগাধ নদীপথ, ফুলে ফুলে ঢাকা গাছে রাস্তা চলে গেছে বন্দর থেকে বন্দরের অফিসে। কী দেখলেন ভিক্ষু? কুড়িটি সংঘারাম, একশটি মন্দির। হেরেটিক, বিধর্মীদের মন্দির, যে মন্দিরে সব ধর্মের মানুষ আসে যায়। আর দেখলেন অসংখ্য নির্গ্রন্থ জৈনদের। পাশাপাশি হেঁটে গেল শৈব রাজা শশাঙ্কের দেশ – সেই শশাঙ্ক যাঁর আদেশে কেটে ফেলা হল বোধি গাছখানি আর বৌদ্ধ মন্দিরে বুদ্ধদেবের মূর্তি ঢেকে দিয়ে বসানো হল শিবের মূর্তি।

ওল্ডেনবার্গ তাঁর বইতে লিখেছেন বুদ্ধের জার্নিটি যেমন এক নিরবিচ্ছিন্ন অনুগমনের বিজয়পথ তেমনই পাশাপাশি থেকেছে বুদ্ধবিরোধী দল। দেবদত্ত যেমন ছিলেন বুদ্ধ বিরোধী তেমনই বুদ্ধ বিরোধী ছিল ব্রাহ্মণ সমাজের বড় এক অংশ। বুদ্ধের হাজার বছর পরেও দেবদত্তের অনুগামী সন্ন্যাসীদের সংঘ হিউয়েন সাং দেখেছেন এই পৌন্ড্রদেশেই। বুদ্ধতে যতটা সম্পৃক্ত থেকেছে সময় ঠিক ততটাই চ্যালেঞ্জ করেছে সমাজ। বৌদ্ধজীবন খুঁজে নিয়েছে সহাবস্থানের পথ। সহাবস্থান কখনো বিরোধী মতের সাথে কখনো  আর্য কিম্বা অনার্য প্রবল দেবদেবীর সাথে।

প্রাচীন পৌন্ড্র দেশের সীমা উইলসন সাহেবের মতে রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, নদীয়া, বর্ধমান হয়ে চুনারের কিছুটা অংশ অবধি। ওয়েস্টম্যাকট সাহেব বলেছেন ফিরোজাবাদের পর থেকে মালদার ছমাইল উত্তর আর গৌড় থেকে উত্তর উত্তর পূর্বে আঠারো মাইল অবধি। আবার ফার্গুসন বলছেন এই অঞ্চল রংপুরের কাছাকাছি।

এরপর পায়ে পায়ে হিউয়েন সাং গেলেন সমতট, বঙ্গ। দেখলেন তাম্রালিপ্ত বন্দর-নগর। ছবিটা মোটামুটি একই। বৌদ্ধ সংঘারম, জৈন মন্দির, হিন্দু মন্দির সব পাশাপাশি, পাশাপাশি হাঁটছে মানুষ আর মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস।

এরপর পাল যুগে অতীশ দীপঙ্কর যখন বজ্রতারার সাধনায় সিদ্ধ হয়ে উঠছেন, তিব্বত দেশে যখন নিয়ে যাচ্ছেন বৌদ্ধ সূত্র আর শাস্ত্র বৌদ্ধ ধর্ম তখন বেড়ে উঠছে তন্ত্রের আশ্রয়ে। বৌদ্ধ রথ উৎসবে ত্রিমূর্তির রথের সাথে চলেছে মৃতদেহ নিয়ে নাচিয়ের দল। পাল রাজারা হিন্দু মন্ত্রীদের প্রভাবে ক্রমশঃ হয়ে উঠছেন শৈব। নিজেদের তুলনা করছেন মহাদেবের নানান রূপের সাথে।দেখতে দেখতে বুদ্ধ হয়ে উঠছেন ধর্মনিরঞ্জন। এমন এক দেবতা যাঁর মধ্যে ছায়া পড়ছে বিষ্ণু, মহাদেব, কিম্বা সূর্যের। মিশে যাচ্ছে লৌকিক দেবতারাও ।

রামাই পন্ডিত তাঁর শূন্য পুরাণে লিখছেন আদ্যার জন্মকথায় লিখছেন

"ভরমিতে ভরমিতে পরভুর পড়ে গেল ঘাম।

তাহাতে জনমিল আদ্যা দুর্গা যায় নাম।।"

আদ্যা থেকে জন্ম হল শিব, বিষ্ণু, ব্রহ্মার। আর ধর্মের আদেশে শিবের সাথে আদ্যার বিয়ে হয়ে আদ্যা আর পার্বতী হয়ে ওঠে অভিন্ন। তেরশ শতাব্দীতে মালদার মাণিক দত্ত তাঁর চণ্ডীমঙ্গলে লিখলেন আদিদেব যখন চিন্তা করছেন সৃষ্টি পালন করব কিভাবে তখনই তাঁর

"হাস্যেতে জন্মিয়া আদ্যা পড়ে ভূমিতলে।

উঠিয়া দাঁড়ালে আদ্যা দেখিল সকলে।।"

পাল, সেন যুগ পার হতে হতে বৌদ্ধধর্ম পুরোপুরি ডুবে গেল হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের ক্যামোফ্লেজে। শূন্য আর প্রজ্ঞাপারমিতাকে গ্রাস করল শিব আর শক্তি। গম্ভীরায় এসে বসলেন হরপার্বতী। চণ্ডী মিশে গেলেন পার্বতীর শরীরে। বৈদিক রুদ্র ততদিনে হয়ে উঠেছেন আদিদেব মহাদেব। বোধিগাছের তলায় বসা ধ্যানী লোকেশ্বরদেবও  শিবের সাথে চেহারার মিলের সূত্রে তলেতলে হয়ে উঠলেন হিন্দু মন্দিরের মহাদেব। বৌদ্ধদের রথযাত্রা হয়ে উঠল গাজনের অনুষ্ঠান আর সেদিনের ছদ্মবেশী নর্তকদের রিপ্লেস করল মুখোশ। কখনো তা কালীর, কখনো শিব, কখনো মশান কালী, কখনো বা নারসিংগীর।

পাঁচ থেকে সাত দিনের গাজন শুরু ঘটভরা অনুষ্ঠানে। তারপর নিয়মমাফিক আসে ছোট তামাসা, বড় তামাসা'র দিন। সমস্ত পালনের শেষে আসে চড়ক। দ্রাবিড়দেশের দেবী কাল্ট খুঁজতে  গিয়ে পাদ্রী হোয়াইটহেড  দেখেছিলেন গ্রামদেবীদের। দেখেছিলেন অনার্য দ্রাবিড় ধারায় পূজা।  দ্রাবিড় দেবীদের খোঁজে হোয়াইটহেডের পথ ধরে উইলবার পেলেন পোলেরাম্মা, অনাকাম্মা, রেনুকা ইত্যাদি সপ্ত মাতৃকাকে। উসুর-আম্মা নামে এক দেবীর বাৎসরিক যে উৎসবের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে সেও পাঁচদিনের। উৎসবের চতুর্থ দিনে প্রধান পূজারী সূচে সুতো পরিয়ে চামড়ার এফোঁড় ওফোঁড় শুরু করলে তার দেখাদেখি অন্য ভক্তরাও একই কাজ করে। গম্ভীরার বান ফোঁড়ার খুব কাছাকাছি এ এক আচরণ। আর তারই পরে গরু কিম্বা মোষ টানা গাড়িগুলি এনে সাজিয়ে রাখা হয় মন্দিরের চারপাশে। উঁচু এক পোলের ওপর দোলনা মতন এক কাঠ বেঁধে তাতে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ছাগলটিকে, ছাগটির গায়ে দড়ি বেঁধে ঝোলে মানুষ। উসুরম্মার বচ্ছরকার উৎসবের সাথে মিলে যায় গম্ভীরার উৎসব। আর্য আর অনার্য ধারার ক্রমাগত এক ফিউশন কাহিনী লুকিয়ে পড়ে মুখা'র আড়ালে, গম্ভীরার অনুষ্ঠানের ভাঁজে।

সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে নামলে জাঁকিয়ে বসে শীত। গরম চায়ের কাপ ফুরিয়ে যায় হুসহাস। গোল হয়ে গল্প শোনায় শিল্পীর দল। গম্ভীরা পালার গল্প। শিল্পী তিতাস বলেন, "গম্ভীরা বাস্তব, বড়ই বাস্তব। গম্ভীরায় কোন কল্পনার জায়গা নাই...।"

"গম্ভীরা কাউকে ভয় পায় না, ছেড়ে কথা কয় না…" তিতাসের কথার পিঠে জুড়ে দেন মন্মথ।

– এই ধরুন ইউক্রেনের যুদ্ধ, আমরা সেটা লিয়েও যেমন বলবো তেমনি বলবো এস আই আর লিয়েও। আর জি করে একটা ঘটনা হয়ে গেল, সেটাও আমরা অনুষ্ঠান করেছি।

লোকশিল্প লোকজীবনের বহতা ধারা। লোকজীবনের গবেষক বলেন চলমানতাই লোকশিল্পের প্রাণ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যা পাল্টে যাবে, বইয়ের পাতায় অক্ষরের বাঁধনে যা স্থবির নয় সেই তো লোকসংস্কৃতি। গম্ভীরার ভাষাও বুঝি তাই। অনাবৃষ্টির দিনে যে গায়ক গান ধরেন-

বলবো কি ওহে শিব বাগানে নাই আম

গাছে গাছে বেড়িয়া দেখছি নতুন পাতা সব সমান।

মনে মনে ভাবছি বসে কাজের কোন পায়না দিশা

তেল ধান চালের দর খুব কশা, ভুষার বেশি দাম

...

কিম্বা

পরনে ন্যাতা নাই ও শিব বরজে নাই পান

কি দিয়া রাখিব শিব মাইয়া লোকের মান

ও বোকা শিব, দয়া করো।

সেই গায়কই একশ বছর পরে ইউক্রেনের যুদ্ধ কিম্বা এস আই আরের আলোচনা তুলে আনেন গানে। গম্ভীরার পালাকে ভাঙা হয় পাঁচটি পর্বে– শিব বন্দনা, চারইয়ারি, রিপোর্টিং, ডুয়েট, টন্টিং। চোত বোশেখের খর দিনে গম্ভীরা যেন খেরোর খাতা। বচ্ছরভর কাজের হিসেবনিকেশ করতে করতে গম্ভীরা কখনো হয়ে ওঠে সমাজের আয়না কখনো বা বিবেক। শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ সমাজেরও এমনই এক উৎসবের কথা জানা যায়, তেমনই জানা যায় আসামের উপজাতিদের এক বাৎসরিক অ্যাসেম্বলির কথা, বছরভর কাজের খতিয়ান দেওয়া নেওয়ার চল।

হরিদাস পালিত বলেছেন জৈন প্রভাবের কথাও। জৈন তীর্থঙ্কর ঋষভ দেবের জন্মতিথির উৎসব মিলে যায় প্রায় একই সময়ে।

গম্ভীরা গানের বুকের ভেতর বাজে আরেক গম্ভীরার সুর। সে সুর বিশ্বাসের, সে সুর যূথবদ্ধ সমাজের। ধর্মীয় বিশ্বাস ছাপিয়ে সেই সুর জেগে থাকে লোকমঞ্চের প্রেক্ষিতে, সাধারণী রোজনামচায়। মাঝবয়সী তিতাস রায়ের সাথে প্রৌঢ় মন্মথ'র সম্পর্ক গুরু শিষ্যের। গুরু ছাড়া গানের হদিস মেলে কই? একটা আমবাগান আর  বিঘা কয়েক জমির মালিক মন্মথ আসেন শেষ বিকেলের আলোয়। "গৌড়ীয় গম্ভীরা" দলের সাথে মানুষগুলোর যেন আত্মার টান। গল্পে কথায় একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ওঠেন আর গুরু মন্মথ বলে চলেন দলের কথা, অনুষ্ঠানের কথা। চৌদ্দ থেকে পনেরো জনের এক একটা দলে গান লেখার লোক, সুর দেওয়ার লোক একজন, বড়জোর দুজন। কখনো মন্মথ, কখনো গান লেখেন তিতাস। তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের রেজিস্টার্ড দল সদস্যপিছু ভাতা পায় মাসে হাজারটাকা, অনুষ্ঠান পেলে অনুষ্ঠানপিছু আরও হাজারটাকা। দোকানঘরের ভেতরে ছোট্ট ঘরটায় ডেকে নিয়ে যান মন্মথ। মাটিতে হারমোনিয়াম, তবলা, নাল। খড়ের সাথে মাখামাখি হয়ে থাকা। বিদেশি ক্যাশিওখানা দেখালেন একটু লজ্জা লজ্জা মুখে, আদর করে আঙুল ছোঁয়ালেন একবার যন্ত্রটার গায়ে– গরিবের দাওয়ায় এ যেন বড় দামী অতিথি, খানিক বেমানানও। হারমোনিয়ামের নেশায় আজও বুঁদ শিল্পীর দল। "বড় মিঠে সে আওয়াজ " বিড়বিড় করে ওঠেন প্রৌঢশিল্পী।

–পরের প্রজন্ম আসে এই দলে?

সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে মুখের রেখায় ভাঁজ মালুম পড়ে না, আক্ষেপ এসে থমকে যায় গলায় "নাহ্, তেমন আর আসে কই? তবে আমরা চেষ্টায় থাকি যাতে পড়াশোনা জানা ছেলেরা দলে আসে।"

বড় তামাসার দিন ভক্তরা আসে ভিড় করে। শিবের মন্দিরে দলে দলে নাচ শেষে শুরু হয় গান। শিব বন্দনা, চারিয়ারি, ঠুংরি... সারা বছরের ঘটে যাওয়া ঘটনা, ন্যায় অন্যায়, আলোচনা সমালোচনা উঠে আসে গানে। শিবকে সাক্ষী সমাজ আর জীবন বোঝাপড়া করে পরস্পর। জীবন মন্থন করে উঠে আসা বোধে ধর্ম সাজায় মানুষ, কখনো বুদ্ধের নামে কখনো শিবের নামে। জীবনের বোধিবৃক্ষ ছুঁয়ে যে পথে দেবতা হয়ে ওঠেন বুদ্ধ, বিষ্ণু কিম্বা শিব সে পথ মানুষের, সে পথ আবহমান লোকজীবনের। তাই বুঝি একফাঁকে ধর্মের নিষ্ঠা-আচরণটুকু পড়ে মন্দিরে মন্দিরে, ক্রমবর্ধমান ঈশ্বরের পায়ে, আর একফাঁকে জীবন বেরিয়ে পড়ে ঝোলা কাঁধে ভুবনডাঙ্গার পথে– গাজন ফেলে গম্ভীরা হয়ে ওঠে মানুষের গান, গাঁয়ের মোড়ে মোড়ে তার আসর বসে মানুষের নামে, মানুষের কথায়। গম্ভীরা হয়ে ওঠে লোকশিল্প। অবসরে কুহকডাকা শীতে ডুবে যায় চরাচর। পাশের দোকান থেকে ছেলেটি আসে, মুখে তার রাগ– বলি, এই যে এতক্ষণ ইন্টারভিউ হল, তা আপনারা কী করবেন এই দিয়ে? তিতাস কিম্বা মন্মথ শিল্পীর জাত, পাওনা গণ্ডার কথা মুখ ফুটে বলা তাঁদের হয় না। কিন্তু আসে, পাশের মানুষেরা এসে তাদের কথা বলে। বলে যন্ত্রের অভাবের কথা, কিছু সাহায্যের কথা, সম্ভব হলে কিছু অনুষ্ঠান পাইয়ে দেওয়ার কথা।

পায়ের তলায় শক্ত মাটি এসে ঠেকে। রোজনামচার কানাঘুষোয় অর্থ বড় জরুরি, নইলে এ শিল্প বাঁচে না। আলকাপ, ছ্যাচড় গানের পথে ভেসে যায় গম্ভীরাও, স্মৃতি হয়ে ডকুমেন্টারি হয়ে।

শীতফুরোনো চৈত্রের আগুন ঝরা আকাশে ভাসবে আমের মৌলের গন্ধ, চাষের অবসরে মালদার গাঁ-গঞ্জে আসর সাজাবে শিল্পীর দল, ঝড় উঠবে হারমোনিয়ামে। গোল হয়ে বসবে মানুষ। কখনো সমাজ কখনো রাষ্ট্র এসে দাঁড়াবে তার এজলাসে। অর্থ আর অনর্থের সীমা আঁকড়ে পড়ে থাকা শিল্পী ছুঁয়ে যাবেন শাশ্বতের ঠিকানা আর তারই পাশে গান গেয়ে উঠবে জীবন চৌধুরীর মত কোন এক ভাবের ঘরের লোক-

হরিনামে কী আনন্দ ডুবলে জানা যায়

নামে ডুবেছিলেন গৌর ও নিতাই

যেমন ভাবে ডুবেছিলেন জগাই আর মাধাই...

ডুব দেওয়াই জীবন। সে এক অনন্ত নেশা। তারই টানে শিল্পী বাঁচে, শিল্পী মরে। লোকজীবন বয়ে যায় লোকশিল্পের সুরধনী হয়ে।

_____________________________

_____________________________

লেখার জন্য যাঁদের কাছে ঋণ:

"গৌড়ীয় গম্ভীরা" দলের প্রধান মন্মথ মজুমদার।

গম্ভীরা শিল্পী তিতাস রায়।

শিল্পী জীবন চৌধুরী।

আমাদের পথপ্রদর্শক যাঁর গাড়িতে এই সফর –উত্তম চৌধুরী।

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন