কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

জয়িতা ভট্টাচার্য

 

বর্ণমালার সাতকাহন

 


(পর্ব ৩৩)

আমাদের ছোটোবেলায় লক্ষ্মী পাগলী ছিল। লক্ষ্মী পাগলিকে সবাই ভালোবাসতো। এক বগলে হাঁস আর এক বগলে বেড়ালছানা। হনহন করে হেঁটে যেত আর পেছনে পেছন ছুটত রাজ্যের কুকুরছানা বেড়ালছানা হাঁস মুরগী। ছোটো বাচ্চাদের খুব ভালোবাসতো লক্ষ্মী। তাই তারাও ভয় পেত না। দুপুরবেলা আমাদের বাড়ির সামনের পুকুরটা, যেটায় কচুরিপানা থিকথিক করত আর হিলহিলে সাপগুলো সাঁতরে যেতো সেইখানে এসে পাড়ে সব তার ধন সম্পদ রেখে নাইত। তার পোষ্যদেরও চান করাতো ধরে ধরে। তারপরে সবাই মিলে খেতে বসত পুকুর পাড়ে গাছের তলায়। যত না নিজে খেত তার চেয়ে বেশি খাওয়াতো ওর পোষ্যদের। চড়ুই এসে বসত ওর ঘাড়ে, কাঠবেড়ালি গা বেয়ে উঠত। মাঝে মাঝেই ওর ছেলে নতুন সুতির শাড়ি পরিয়ে দিত। তাই সারা বছর তার গায়ে থাকত নতুন শাড়ি। হনহন করে বাজারের দিকে হেঁটে যেত আর স্কুলের বাচ্চাকাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে হাসত। আমি মুগ্ধ হতাম। ভাবতাম দেশশুদ্ধ লোক যদি লক্ষ্মী পাগলি হতো! এমন অকারণ ভালোবাসা বোধহয় পাগলের পক্ষেই বাসা সম্ভব। আমাদের লক্ষ্মী পাগলি কখনও বসত না। খালি হাঁটত। পাড়া ছেড়ে বাজার আর বাজার পেরিয়ে মাঠ। কতদূর যেত কে জানে! সকলেই তাকে ভালোবাসত বিশেষত সমস্ত পাখি, কুকুর বেড়াল আর শিশুরা।

কিছুদিন আগে শুনেছিলাম সে মারা গেছে।

এসবও আমারই কথা। আমার মন জুড়ে আছে মানুষের ভিড়। সাদা মানুষ কালো মানুষ।

প্রথমবার শরীরে অন্য প্রাণ টের হবার পরে ওই চারমহলা শূন্য ধ্বংস স্তুপে একাকী আমায় খানিক দেখাশোনা এবং সঙ্গ দেবার জন্য মা গ্রাম থেকে একটা মেয়েকে জোগাড় করে পাঠালেন।

তাতে বিপদ বাড়ল আমার। মেয়েটি আমাকে সামলাবে কী, আমারই কাজ হলো তাকে নজরে নজরে রাখা। কখনও দেখা যায় সে কার্নিশে উঠে বসে আছে তো কখনও নিমগাছের ডালে। বাড়ির পেছনে সাড়ে তিন কাঠা জমির আগাছার জঙ্গল ফুঁড়ে সে খুঁজে আনে মানকচু বুনোফুল। এনে দেয় নিমপাতা। কখনও দেখি ছাদের পাঁচিল ধরে হাঁটে। কাজল ছিল শ্যামলা রঙের ডাগর ডোগর বিরাট আঁখি বিশিষ্ট একটা মেয়ে। বাসন্তী ছাড়িয়ে খুব দূরের গ্রাম থেকে এসেছিল। বছর পনের বয়স কিন্তু চেহারাটা একটু বেশিই বাড়বাড়ন্ত। কথায় কথায় হেসে গড়িয়ে পড়ত কাজল। তখন মোবাইল নয় আকাশনীল সাদা কম্বিনেশন ফোন। কিছুদিন পরে তার অন্য গুণ প্রকাশ পেলো। তার গ্রামতুতো প্রেমিকরা মাঝে মাঝেই ফোন করতে লাগল।

তারপর দেখলাম বমি করছে। খাচ্ছে না। তারপর চেপে ধরতে বলল বাড়ি থেকে সে আসলে চলে এসেছে লুকিয়ে থাকার জন্য। আমি ব্যাপার সুবিধার বুঝলাম না। যে মহিলা দিয়েছিল সে ওর মাসি। নিয়ে যেতে বলি। আমি নিজেই তখন অন্তঃসত্বা। কাজল কিন্তু আমায় খুব ভালোই বাসতো। সে কিছুতেই যেতে চাইছিল না। তবু জোর করে তাকে শহরে তার মাসির বাড়িতে ফেরত পাঠালাম। যাবার আগে সে খুব কেঁদেছিল। আমার মেয়ে হতে সে এসে দেখে গেলো। শুনলাম তার মাসি গর্ভপাত করিয়ে এনেছিল।

শহর থেকে বহু দূরের গ্রামে এখনও বাচ্চা মেয়েরা শত শত সার্ভাইবার হয়ে, পাচার হয়ে কিম্বা কাজলের মতো দেহ খসিয়ে বড় হবার দাম দেয়।

দিন মাস বছর চলে যায়। রোদ্দুর মাথায় উঠলে ঝকঝক করে পার্থক্যের দুনিয়া।

একটা সময় ছিল যখন আমি ফ্রক পরা বালিকা। সেই সময়, বাঙালির কাছে পরম ছিল মেধা কালচার মনন। বড়লোক শব্দটাই নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার হতো। এই শহরে অবাঙালি সম্প্রদায়ের বাস ছিল পাঞ্জাবী ও দক্ষিণীদের ভবানীপুর লেক রোড অঞ্চলে, হাওড়ার দিকে। সামান্য মাড়োয়ারিদের বাস ছিল শুধুই বড়বাজার অঞ্চলে। ঠাকুমা দিদিমারা  হিন্দি ভাষীদের বলত হিন্দুস্থানী। ক্রমে গোবলয় এবং বিহার থেকে লোক আসতে শুরু করল। মানসিকতা ক্রমে কিভাবে যেন বাঙালিত্ব হারালো। পরমহংসের বাঙালি, সুভাষচন্দ্রের বাঙালি, ঋত্বিক ঘটকের বাঙালি, চারু মজুমদারের বাঙালি কিম্বা মানিক বা শক্তির বাঙালি হয়ে গেল অর্থের দাস।

আমাদের ছোটোবেলায় টাকা পয়সা থাকার কথা লোকে গোপন করত। অত্যন্ত সংকোচে বিলাসদ্রব্য কেনার কথা বলত। অপরাধীর মতো বিনয়ে দেখাতো সম্পদ। বাঙালি ব্যবসা করতে জানত না তা নয়, তারা ভীতু ছিল তা নয়, কিন্তু তারা ছিল রিফাইণ্ড। কেউ করলে বলা হতো অবনেদী আপস্টার্ট। এখন দেখা যায় নিজেদের বিত্তবান প্রকাশের নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা। এখন বিনয় নেই, উগ্রতা দেখি।

বাঙালির সেই আদর্শ নেই। বাঙালি মানেই বামপন্থী আদর্শে বিশ্বাসী একটা কেটেছে অধিকাংশ জীবন। যারা তারাদের দেশে চলে গেছেন সেইসব মানুষ যারা একেকজন তাদের মত করে আমার মনের নরম মাটির তালকে আকার দিয়ে গড়েছে তাদের কথা ভাবি।

টাকা সর্বস্বতা এখন দেখি শিল্পী থেকে সাধারণ জনের মনের বল্মীক। ভাবি কত অল্পে সন্তুষ্ট ছিলেন তাঁরা।

এমন নয় যে যা কিছু ভাল সবই আগে ছিল। কিন্তু বাঙালি কোণঠাসা ছিলো না, এমন কালচারাল পল্যুশন ছিলো না। ভদ্রতাবোধ ছিল। মুখে মুখে এত খিস্তি খেউর ছিলো না। সামান্য যেটুকু তা বন্ধু সার্কেলে বয়োজ্যেষ্ঠদের সামনে নয় পাবলিক প্লেসে নয়। এই খৈনি কালচার আমাদের ছিলো না।

আমার জীবন কোনও একার ব্যক্তিজীবন নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নদীর বাঁকবদল, খরা এবং প্লাবন, সাদা এবং কালো। আছে বিবাহ কথা।

(ক্রমশ)

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন