কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তপনকর ভট্টাচার্য

 

সমকালীন ছোটগল্প


গাধা

এখন একটু দূর থেকে, একটু আগে কাছেই ছিলাম, যদিও সেখানেই আছি, সুদর্শন সরে গেছে — আমার থেকে দূরে — ঠিক ততটা, যেখান থেকে ওকে দেখতে সুবিধে হয় — আমি বলিনি, ও নিজেই — অবশ্যই আমি দেখব সে কারণে নয়, আমি যে ওকে দেখতে চাইছি সে কথা ছাই বলেছি নাকি — ও সরেছে নিজের খেয়ালে বা অভ্যাসে — সে যাই হোক, আমি কিন্তু দেখছি। চোখ ভরে, মন ভরে, আমি সুদর্শনকে দেখছি।

সুদর্শন গায়ক-নায়ক। বর্তমান নয় — প্রাক্তন। এখন সে চল্লিশের ঘরে, যদিও নায়ক হবার সবকিছু তার মধ্যে — এই বয়সে উত্তমকুমার তো কত সিনেমায় হিরো, সৌমিত্র পর্যন্ত, সেসব অতীত — আর প্রসেনজিৎ?   সে-ও তো! তার উপর শাহরুখ, সলমন — সুদর্শন কেন সুযোগ পাচ্ছে না? যদিও  আমার এর জন্য দুঃখ নেই, ও চান্স না পাওয়ায় ওকে বেশি বেশি করে দেখার সুযোগ পাচ্ছি — সে কারণে আমার কাছে এটা বেশ ভালো একটা ব্যাপার।

কলতলায় সুদর্শন গামছা পরে গেঞ্জি কাচছে। ওর প্রথম টিভি সিরিয়ালে এই দৃশ্যটা ছিল। ও তখনও  নায়ক হয়নি। নায়কের বন্ধু — গরীব, বেকার। সেই  নায়কের নায়িকা ছিল, কিন্তু গান ছিল না — সুদর্শনের গান ছিল, ছিল ভরাট সুরেলা কন্ঠ, সিরিয়ালের মাঝে, ফাঁকে ফাঁকে তার গান — তারও আগে, শুরুর দিকে  সুদর্শন পাড়ায় পাড়ায় ফাংশনে গান গেয়ে জনপ্রিয় — তখন পর্যন্ত সে গায়ক — পরে অবশ্য টিভির সিরিয়ালে নায়কের গরীব বন্ধু। কতটা গরীব বোঝানোর জন্য তাকে সেই সিরিয়ালে কলতলায়  গেঞ্জি কাচতে হয়েছিল। আজও সুদর্শন গেঞ্জি কেচে চলেছে।

আমি দু চোখ ভরে সুদর্শনকে দেখি। ওটা কি কলতলা? ওদের বাড়ির পিছনের উঠান? কুয়োতলা? জামগাছ? চুন সুরকি খসা দেওয়াল? সুদর্শনের ঝকঝকে, আদুল ফরসা গা থেকে ঘাম গড়াত সিরিয়ালে, এখন ঘাম আছে কি না দূর থেকে বোঝার উপায় নেই।

কিন্তু ওটা কি গেঞ্জি? গেঞ্জি কোথায়? ওটা তো জামা! জামা তো কাচছে না, ইস্তিরি করছে। হ্যাঁ, সুদর্শন মাথা গুঁজে জামা ইস্তিরি করছে। জামা হয়ে গেলে প্যান্ট। কলতলার কোন  হদিস নেই। ওটা তো ওর সেই পুরনো দশ ফুট বাই আট ফুটের ঘর! এই ঘরে আমি কত গিয়েছি, ওই চৌকি — তার উপর শতরঞ্চি, তার উপর জলের ছিটে দেওয়া জামা বা প্যান্ট, ইস্তিরি আর ভাঁজ — শেষ হলে আর একটা জামা, অথচ সিরিয়ালে  জামা প্যান্ট ইস্তিরি করার পার্ট ছিল না সুদর্শনের। সেখানে শুধু গেঞ্জি কাচা।

সুদর্শন রোগা হয়ে গেছে। খুব রোগা আর সরু। বিশেষ করে গলা। কন্ঠার হাড় দেখা যায়। মাথার চুল পাতলা  হয়ে আসছে। কুচকুচে কালো একমাথা কোঁকড়া চুল ছিল, সেই সময় প্রসেনজিতের থেকেও হ্যান্ডসাম ছিল সুদর্শন। আসে পাশে ফাংশনে ওর গান থাকলেই ছুটতাম, ও ছিল মান্নাকন্ঠী। চাঁদ দেখতে গিয়ে আমাকে দেখে ফেলার গান, হ্যাঁ — ওই তুমি আমি ছিলাম সেকথা ও কোনদিন না বললেও জানতাম। সেই কবে থেকে সে আমাকে, আমি তাকে! আর কী সব গান, ও ললিতা, ওকে আজ চলে যেতে বল না…, কে প্রথম কাছে এসেছি…, শঙ্খবেলা সিনেমার গান, নৌকোয় আমি আর সুদর্শন…

অগোছালো ঘর। তক্তপোশের উপর রং ঝলসে যাওয়া শতরঞ্চি, তার উপর ঝুঁকে ইস্তিরি, জামার পরে প্যান্ট, প্যান্ট হয়ে গেলে আরেকটা জামা, আরেকটা প্যান্ট, তক্তপোশে ডাঁই করে রাখা জামা-প্যান্ট, ইস্তিরির পর ইস্তিরি, ধাপে ধাপে সাজানো। সুদর্শনের বাবা, ওর মা — সবাই ইস্তিরি করত, এখন সুদর্শন করে। অনেক ছোটবেলায় গাধার পিঠে কাপড়ের গাঁট চাপিয়ে ওর বাবা যেত পদ্মপুকুরে, সুদর্শনের সঙ্গে আমি, আমরা হাঁটতাম, আমরা খেলতাম, ছাইয়ের গাদা থেকে ঝরে পড়া ফলসা কুড়াতাম।

সে গান শেখেনি, সুযোগও ছিল না। তার চেহারা নরম সুন্দর হয়ে গেল। যে দেখত, বলত কৃষ্ণঠাকুর। কেউ বা কার্তিকঠাকুর বলত। আমি চোখে চোখে রেখেছিলাম অনেকদিন, কিন্ত – ও ললিতা, ওকে আজ চলে যেতে বল না গাইতেই — স্টেজে মাইক হাতে সে মান্নাকন্ঠী গায়ক-সুদর্শন হয়ে গেল। তখনও ওদের গাধাটা ছিল। গাধার গলায় ঘন্টা, টুংটাং শব্দ, তখন ওর বাবা বুড়ো হবার প্রথম ধাপে, কোথায় ব্যবসার হাল ধরবে সুদর্শন — সে তখন জমিয়ে পাড়ার ফাংশনে, দূরের ডাকে, শহর ছেড়ে মফস্বলে, গ্রামে — সুদর্শন আরো ফর্সা, আরো লম্বা, কালো কোঁকড়া চুলে শাহরুখের সঙ্গে পাল্লা দেবে এমনই তার গ্ল্যামার।

ইনকাম হচ্ছিল। প্রথম প্রথম রিকশা, তারপর অটো ছেড়ে ট্যাক্সি, তারই মধ্যে টিভি সিরিয়ালে নায়কের বন্ধু।

গেঞ্জি কাচার সিনটা হিট করেছিল।

সুদর্শন এখন মুড়ি খাবে। লংকা, পেঁয়াজ কুচো, ছোলা,বাদাম,চানাচুর — একঠোঙ্গা মুড়ি। তারপর চা। তারপর আবার ইস্তিরি।

গাধা মরে গেছে কবে। পদ্মপুকুর বুজিয়ে বহুতল। জলাশয়ের অভাবে কাপড় জামা কাচার পাট চুকিয়েছিল ওর বাবা। এখন সুদর্শন শুধুমাত্র  ইস্তিরিতে।

সুদর্শন আর গান করে না। গান শোনে না। সে যে গায়ক ছিল, সেখান থেকে নায়কের বন্ধু হয়ে নায়ক পর্যন্ত — যতই সংক্ষিপ্ত হোক, তার একটা যাত্রাপথ ছিল — সেকথা আমি ছাড়া, সবাই বোধহয় ভুলে গেছে। সন্দেহ হয় সুদর্শন নিজেও ভুলে গেছে।

একটা সময়  সুদর্শনের পক্ষে ভুলে যাওয়াটা জরুরি ছিল। একদিন দেখতে দেখতে তারও আপেল সদৃশ মুখ, নায়কোচিত বুক আর কোমল নরম প্রেমিক সুলভ হাসি। কে যেন বলেছিল, উত্তম কুমারের মতো — একদিন এইসব গুণ, উপকরণ, রসদ নিয়ে সেই পরিচালকের চোখে — যার টিভি সিরিয়ালে সে এতদিন ছিল নায়কের বন্ধু আর গেঞ্জি কেচেছে সিরিয়াল জুড়ে — তো, সেই পরিচালক  তার পরের  সিরিয়ালে সুদর্শনকে নায়কের রোলে পছন্দ করল।

নায়ক হয়ে তার নাম হল দর্শন। আটচল্লিশটা এপিসোডে সে ছিল নায়ক। দশ নম্বর এপিসোড থেকে টি আর পি চড়েছিল চড়চড়িয়ে। তারপরের সিরিয়াল, বুক ভরা ভালোবাসা। বাহাত্তরটা এপিসোড। তারপর চু কিৎ কিৎ, ফাঁদে পড়া ঘুঘু — সাত আটবছর ধরে দর্শন লিড রোলে, তার কেরিয়ার গ্রাফ ধরাছোঁয়ার বাইরে আর দেখতে দেখতে তার জীবনে ফ্ল্যাট, গাড়ি আর প্রেম এল পিঠোপিঠি। তার প্রেমের গল্প খবরের কাগজের বিনোদনের পাতায় ‘কানাঘুষো’ থেকে জেনে খুব কেঁদেছিলাম। দু'দিন খাওয়া দাওয়া বন্ধ ছিল, তিনদিন স্নান করিনি, চারদিন ঘুমোইনি, সাতদিন বাড়ি থেকে বের হইনি।

তারপর সে একলাফে সিনেমায়। সেখানেও নায়ক। ততদিনে দুটো প্রেম। একটা বিয়ে। ‘কানাঘুষো’র সোজাসাপটা পর্বে দর্শন জানিয়েছিল, সে অত্যন্ত প্রাইভেট পার্সন। তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সে কিছু জানাতে চায় না। মানুষ বিয়ে করে সম্পর্ককে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য। স্ত্রী থাকতে বিয়ের বাইরের  প্রেমের জন্য হ্যাংলামি ভালো না।

দর্শন বলেছিল, আমার হৃদয় কখনও ভাঙেনি।

ছবিটা চলল না। ছটা গান ছিল, তার মধ্যে তিনটে নায়কের গলায়। আমি পাঁচবার লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছি। পাঁচদিনের দিন ফাঁকা হলে আমি একা। সিনেমা পুরো ফ্লপ। কিন্তু সুদর্শন ফাটাফাটি। গানে যেভাবে লিপ মিলিয়েছিল, উত্তমকুমার বেঁচে থাকলে ওর পিঠ চাপরে দিত। উত্তমকুমার অভিনয়ের ফাঁকে গান শিখেছিল ওস্তাদের কাছে, সুদর্শনের সে সুযোগ ছিল না, কিন্তু সত্যিই দুর্দান্ত লিপ দিয়েছিল। নায়িকার জন্য ছবিটা চলল না। সে যেমন ন্যাকা তেমনই তার শরীর দেখানোর বাতিক। পাবলিক নিল না।

উত্তমকুমারকে ডাকা হত ফ্লপ মাস্টার। শুরুতেই একটার পর একটা, দশ বারোটা হবে — সব ফ্লপ, একটাও চলেনি। তবে তাঁর ধৈর্য ছিল। প্রসেনজিতের প্রথমদিকের ছবি তো সব ফ্লপ ছিল। প্রথম প্রথম সে তো সবারই। আর আমার সুদর্শন — সে যে  তার আগেই ষড়যন্ত্রের স্বীকার। একটা ছবি ভাইরাল হল, ফেসবুকের ওয়াল থেকে ওয়ালে — সেই ছবিতে গাধার পিঠে বালক সুদর্শন। নিচে ক্যাপশন — সুদর্শন রজক, ধোপার ছেলে। বাবার সঙ্গে সেও কাপড় কাচত, ইস্তিরি করত। একজন একটা নতুন সিরিয়ালের দাবি জানাল, নাম দিল, ধোপার ছেলে নায়ক।

তার কিছুদিন আগে ‘কানাঘুষো’য় এক সাক্ষাৎকারে দর্শন জানিয়েছিল, আমার মা আর বাবার মধ্যে সম্পর্ক নেই অনেকদিন। আমার ১১বছর বয়সে মামা এসে আমাকে নিয়ে যান মুম্বইয়ে । সেখানেই আমার পড়াশোনা। আমার পরিবারের মধ্যে কিছু জটিলতা রয়েছে।

সে বলেছিল, আমার গান, অভিনয়ের শুরু মুম্বইতে। সেখানে প্রচুর স্ট্রাগল করে আমাকে জায়গা তৈরি করতে হয়েছে।

ওই পজিশনে থাকলে মিথ্যে কথা বলতেই হয়। তার জন্য আমার কিছু মনে হয়নি। এর থেকেও বেশি মিথ্যে, গুল গল্প আর ইন্টু মিন্টুর চাটনি অন্য নায়কেরা তো অনবরত। সফল হতে গেলে…

কিন্তু বড় পর্দায় তার সাফল্য এল না। সেই ব্যর্থতার ছাপ পড়ল ছোট পর্দায়। এক সাক্ষাৎকারে সে জানিয়েছিল, আপাতত তার কাছে কোন অফার নেই। কেন নেই, সেটা সে জানে না। একজন সাংবাদিক নির্লজ্জের মতো প্রশ্ন করেছিল, আপনি কি ধোপার ছেলে? সুদর্শন রজক?

সাহস পেয়ে আর একজন — গাধার পিঠে চেপে আপনি কাপড় কাচতে যেতেন?

সেদিন প্রথম আমার রাগ হয়েছিল। ওকে এইভাবে অপমান! সেদিন  আমার দু'চোখ ভরে জল, অথচ ভাবছিলাম ওর চোখে  আগুন দেখতে পাব। ও নিশ্চয়ই এর জবাব দেবে।

সুদর্শনের মুড়ি খাওয়া শেষ। গামছা দিয়ে গা থেকে ঘাম মুছে আবার ইস্তিরি করছে সুদর্শন। ঘুমোতে যাবার আগে পর্যন্ত একটুও বিশ্রাম নেবে না।

গাধার পিঠে সুদর্শন আর গাধার পিঠে আমি, দুটো ছবি।

কে তুলেছিল?

মনে নেই।

তোর কাছে ছিল?

থাকে না কি? কবে হারিয়ে গেছে।

তুই আমার সর্বনাশ করলি?

তোর বউ?

ডিভোর্স হয়ে গেছে।

ফ্ল্যাট? গাড়ি?

সব তো বউয়ের নামে।

গভীর রাতে সেদিন সুদর্শন আমার ঘরে। আনন্দে, সুখে আমি হাত বাড়িয়ে ওর হাত ছুঁতে চাইছিলাম। এরকম এক টুকরো সুখের স্বপ্ন দেখে এসেছি এতদিন। চাইছিলাম,  ও শুধু আমার হাত স্পর্শ করুক।

… জীবনে অনেক দুর্ভাগ্য আসে, তার মধ্যেই সুখের সন্ধান করতে হয়…

বলেছিলাম কি? সুদর্শনকে? এই কথাটা?

একটা পাজামা, স্যান্ডো গেঞ্জি — আমার কাছের মানুষ। হতবিহ্বল হয়ে রাতের আঁধারে আমাকে দেখছিল, হাঁ করে তাকিয়েছিল আমার দিকে, আহাম্মকের মতন। অথচ কেন তাকিয়েছিল, সে নিজেই জানত না।

… পৃথিবীটা এভাবেই চলছে। গোটা মিথ্যাকে সত্য ভেবে। আমি তোর প্রেমে পাগল। প্রেমে খ্যাপা…

এই কথাগুলো কি বলেছিলাম? না বললেও বলতে চেয়েছিলাম তো! গাধার পিঠে আমি ও সুদর্শন, এরকম একটা ফটোও ছিল। আছে কোথাও। ছড়িয়ে ছিটিয়ে কোথায়, কতকিছু!

সুদর্শন কথা দিয়েছিল আবার আসবে। এরকম গভীর রাতে। আর আসেনি।

সারাদিন ধরে ইস্তিরি করতে করতে এত ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ঘুম এসে যায়। ওই তো ঘুমিয়ে পড়ল। কয়েক মিনিট, একটু পরেই জেগে উঠে আবার শুরু করবে। ওর ঘামে ভেজা ক্লান্ত শরীর যে ভাবে নেতিয়ে, মনে হয় না আজ রাতে আর উঠতে পারবে। কুণ্ডলী পাকিয়ে শতরঞ্চির উপর সুদর্শনকে দেখি আর ভাবি, একদিন গভীর রাতে আমিই চলে যাব ওর কাছে। তবে তার আগে ইস্তিরি করাটা শিখে নিতে হবে।

 

 

 

 

 

 

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন