![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
আঘাত
স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই মেজাজটা খিচড়ে গেল নীলাদ্রির। কতবার পই পই করে সুদেষ্ণাকে বলে দিয়েছে যে, স্কুল থেকে ফেরামাত্র এটা সেটা নিয়ে কানের কাছে ঘ্যান ঘ্যান না করতে। সারাদিনে হাজারটা ঝামেলা সামলাতে হয়। সবসময়ে মেজাজ ঠিক থাকে না। কিন্তু কে শোনে কার কথা? আজ স্কুল থেকে ফিরতে না ফিরতেই সুদেষ্ণা বলে বসলো— আজ কিন্তু লিকার চা। দু দিন ধরে দুধ আনার কথা বলছি। তোমার তো আমার কথা কানে ঢোকে না। কোন জগতে থাকো কে জানে!
নীলাদ্রি বেশ
কিছুদিন যাবৎ বিস্তর ঝামেলায় রয়েছে। কোর্টে বিষয়টা নিয়ে যেভাবে কাটাছেঁড়া
চলছে তাতে এমনিতেই মেজাজ বিগড়ে ছিল। তার উপর সুদেষ্ণার কথায় যেন আগুনে ঘি পড়লো।
দপ করে জ্বলে উঠলো নীলাদ্রি। ঝাঁঝিয়ে উঠলো সুদেষ্ণার কথায়-
—লিকার চা কী
আজ নতুন খাচ্ছি? দুধ থাকতেও তো এর আগে লিকার চা গিলেছি, তোমার সময়ের অভাবে। অত
ঘটা করে বলার কী আছে? মন আমার মনের জায়গাতেই থাকে। তোমারই দেখার ভঙ্গীমা বদলেছে।
চা করতে হয় করো, না পারো তো কোরো না। অত কথা শুনতে পারবো না।
—বাবা! দুটো
কথা বলতেই তো হাজারটা কথা শুনিয়ে দিলে! বলবেই তো! এ সংসারে আমার তো কোন মূল্যই
নেই। মুখ বুজে সব সইতে পারলেই ভালো। না পারলেই যতো ঝামেলা।
গজগজ করতে
করতে সুদেষ্ণা চায়ের জল চাপিয়ে দিল। নীলাদ্রি বাথরুমে ঢুকে সাওয়ারটা খুলে দিয়ে
চোখ বুজে দাঁড়িয়ে রইল। সারাদিনের ক্লান্তি সারা গা বেয়ে ঝরে পড়তে লাগলো। মনে
মনে অনুতপ্ত হলো হঠাৎ হাইপার হয়ে সুদেষ্ণার সঙ্গে এমন ব্যবহার করার জন্য। কিন্তু
ঐ বা মাঝে মাঝে এমন অবুঝের মতো করে কেন?
বাথরুম থেকে
বেরিয়ে ঘরোয়া পোশাক পরে বসার ঘরে এসে নীলাদ্রি বেশ অবাক হয়ে গেল। সুদেষ্ণা
শান্ত মূর্তিতে বসে রয়েছে সোফায়। সামনে টি টেবিলে ধূমায়িত চা, সঙ্গে নীলাদ্রির
প্রিয় চিকেন পপকর্ণ। ওর মুখটা দেখে নীলাদ্রির কেমন মায়া হলো। কে বলবে একটু আগে
অমন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল। কী সুন্দর শান্ত বিহ্বল উদাস ওর চোখ দুটো। নীলাদ্রির
মনের কোণায় জমে থাকা রাগের উচ্ছিষ্ট কেমন করুণায় পরিণত হলো। পাশে বসে ওর কোলের ওপর অগোছালো ভাবে রাখা
হাতটা চেপে ধরে আন্তরিক গলায় বললো,
—আই অ্যাম
সরি। আমার ঠিক অতটা রুড হওয়া উচিত হয়নি। তুমি প্লিজ কিছু মনে কোরো না।
—না। মনে করেই
বা কী করবো? তবে জানো তো, তখন যদি তুমি তোমার মায়ের কথায় না নেচে আমার চাকরিটা
ছাড়ানোর ব্যাপারে জেদ না ধরতে তাহলে আজ হয়তো তুমি এতটা চাপে থাকতে না। অন্তত
ভাবতে যে, এক কূল ভাঙলেও আরেক কূল অটুট থাকবে। সংসারটা ভেসে যাবে না। কিন্তু তখন
তুমিও সেকেলে মানসিকতা নিয়ে মায়ের সঙ্গে জেদ ধরে আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করলে।
বললে স্বামী স্ত্রী দুজনে বাইরে কাটালে সন্তান মানুষ হবে না। তারপর চাকরিও ছাড়লাম
আবার মিসকারেজ হয়ে মা হবার পথটাও তখনকার মতো বন্ধ হয়ে গেল। এখন সারা বাড়িতে একা
একা আমার কীভাবে কাটে একবারও ভেবে দেখেছ? আমি টেমপারামেন্ট হারালে খুব দোষ হয়ে
যায় তাই না?
—বললাম তো ভুল
হয়ে গেছে। প্লিজ রাগ কোরো না।
—নাও চা আর
স্ন্যাক্সগুলো খেয়ে নাও। ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
নীলাদ্রি
চায়ে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে দুটো পপকর্ণ মুখে পুরে বললো,
—হাইকোর্টের
রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সরকার যখন সুপ্রিমকোর্টে গেল তখনো মনে মনে ভেবেছিলাম
অন্তত আমরা যারা প্রকৃত যোগ্যতার নিরিখে চাকরিটা পেয়েছি তাদের হয়তো ঠিক একটা
ব্যবস্থা হবে। ও এম আর এর মিরর কপি হয়তো উদ্ধার হবে।
কিন্তু যত দিন
যাচ্ছে ততই পরিস্থিতি কেমন জটিল থেকে জটিলতর হয়ে যাচ্ছে। তথ্য প্রমাণ এমনভাবে
লোপাট হয়ে গেছে যা পুনরুদ্ধারের কোন সম্ভাবনাই নাকি নেই। এমতবস্থায় সুপ্রিম
কোর্টের রায় যে কী হবে সেসব ভেবেই রাতের ঘুম উড়ে যাচ্ছে।
—
অত চিন্তা
কোরো না। দেখো, সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে।
— দেখা যাক কী হয়। অপেক্ষা করা ছাড়া তো আর কোন উপায় নেই। শোন, আমি উপরের ঘরে গিয়ে খাতা দেখতে বসছি। পরশুর মধ্যে সব খাতা হেড এক্সামিনারের ঘরে পৌঁছাতে হবে। এখনো পঞ্চাশটা খাতা দেখতে বাকি রয়েছে।
নীনীলাদ্রি ওপরের ঘরে চলে গেলে সুদেষ্ণা টিভিটা খুলে রিমোট হাতে নিয়ে এ চ্যানেল ও চ্যানেল ঘোরাতে লাগলো। কোনো চ্যানেলেই মন বসাতে পারছে না। সব চ্যানেলে যেন একই রকমের সিরিয়াল চলছে। এক নায়ককে নিয়ে তিন নায়িকার টাগ অব ওয়ার, আর তার সাথে অদ্ভুত অদ্ভুত খলনায়িকাদের অদ্ভুত অদ্ভুত কু চক্রান্ত, যা দেখলে পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত বিতৃষ্ণায় জ্বলে ওঠে। এদের বিষাক্ত মনের প্রকাশ পৌরাণিক কাহিনীর রাক্ষসীদেরও হার মানায়।
কোনো সিরিয়ালেই মন না বসায়, সুদেষ্ণা খবরের চ্যানেলগুলোয় চোখ রাখলো। আর হঠাৎ করেই একটা বাংলা খবরের চ্যানেলের সংবাদ পাঠিকার ঘোষণা শুনে ওর বুকের ভিতরটা কেমন দুরদুর করে উঠলো — আগামীকাল এস এস সির নিযুক্ত ২৬০০০ শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীদের নিয়োগের বৈধতা নিয়ে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবে সুপ্রিমকোর্ট।
খবরটা শুনে সুদেষ্ণার হাত পা কেমন শীতল হয়ে গেলো। একবার ভাবলো নীলাদ্রিকে গিয়ে খবরটা জানাবে। পরমুহূর্তেই ভাবলো, না। দরকার নেই। রাতে খাওয়া দাওয়ার পরেই বিষয়টা জানাবে। এমনিতেই অনেক মানসিক চাপ নিয়ে খাতা দেখার মতো একটা ভয়ঙ্কর বোরিং কাজ করছে। তার উপর এরকম একটা খবর পেলে খাতা দেখা মাথায় উঠবে।
টিভি বন্ধ করে
সুদেষ্ণা ভাবতে বসলো।
একসময়ে সুদেষ্ণা ছাত্র রাজনীতি করতো। দাপুটে নেত্রী হিসেবে রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বিশেষ পরিচিতিও লাভ করেছিল। অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করা তার স্বভাবে ছিল না। এ নিয়ে দলের বাইরে ভিতরে তাকে কম ঝক্কি পোহাতে হয়নি। সবচেয়ে খারাপ লাগতো যখন উপর মহল থেকে কোন বিষয় নিয়ে সমঝোতার নির্দেশ আসতো। অন্যায় জেনেও অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো জঘন্য কাজ করতে বাধ্য করা হতো। অবশ্য চুপচাপ মুখ বুজে কোনদিন কোন বিষয় সে মেনে নেয়নি। তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক করেছে ডাকসাইটে নেতাদের সঙ্গে। তারপর একরাশ গ্লানি নিয়ে হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে ভেবেছে দল ছেড়ে দেবে। তারপর আবারও কেন যে দলের কাজে যোগ দিয়েছে, তা ঠিক ওরও জানা নেই। আসলে রাজনীতি করাটা একটা নেশা। তাই ছাড়বো বললেই চট করে ছাড়া যায় না। কিন্তু ২০০৯ সালের শেষের দিকে দলের মধ্যে বেশ কিছু নেতার এমন কদর্য রূপ ওর কাছে প্রকাশ পেল যে ন্যায় নীতি বিবেক বোধ বিসর্জন দিয়ে কেবল পার্টিকে ভালবেসে পার্টি করা ওর পক্ষে সম্ভব হয়নি। নিঃশব্দে সরে এসেছে। তারপর এতগুলো বছর কেটে গেছে। প্রথম প্রথম খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগতো। মনে হতো যেন সময় কাটছেই না। তারপর নীলাদ্রির সঙ্গে আলাপ হলো। আলাপ থেকে প্রেম। প্রেম থেকে বিয়ে। বিয়ের পরের বছরেই কর্পোরেট অফিসে ওর চাকরিটাও হয়ে যায়। কিছুদিন সব ঠিকঠাকই চলে। তারপরেই সমস্যা শুরু হয়। নীলাদ্রির মা মানে সুদেষ্ণার শাশুড়ি হঠাৎ একদিন ঘোষণা করলেন যে তিনি আর এভাবে দুবেলা হেঁসেল ঠেলতে পারবেন না। সুদেষ্ণা যদিও অফিস থেকে ফিরে কোনরকমে পোশাক বদলেই রান্না ঘরে গিয়ে শাশুড়ির কাজে হাত লাগাতো, কিন্তু ছোটখাটো বিষয় নিয়ে খুঁটিনাটি দুজনের মধ্যে প্রায়ই লেগে থাকতো। রান্নার লোক রাখার প্রস্তাবেও ভদ্রমহিলা রাজি হননি। বাইরের লোকের হেঁসেলে ঢোকা তাঁর পছন্দ নয়। তার পর পরই সুদেষ্ণা যখন কনসিভ করলো এবং বেশ কিছু কম্প্লিকেশন দেখা দিল তখন নীলাদ্রিও মায়ের সঙ্গে তাল মেলালো। সুদেষ্ণা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কিন্তু নিত্য অশান্তি তারও আর ভালো লাগছিল না। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ঘরে বাইরে প্রতিবাদ করতে করতে সেও যেন কেমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তারপর হঠাৎ করেই ভদ্রমহিলা একদিন চিরনিদ্রার দেশে পাড়ি দিলেন। সুদেষ্ণাও নিজেকে কেমন গুটিয়ে নিল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদে জ্বলে ওঠা মনটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। ধীরে ধীরে জীবনটা কেমন বদলে গেল। কিন্তু এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, তুঁষের আগুনের মতো মনের আগুনও তার প্রজ্বলন ক্রিয়া অব্যাহত রাখে, আর কখনো কোন সময়ে তাতে বাতাস লাগলেই দপ করে জ্বলে ওঠে। ঠিক আজ যেমন সে জ্বলে উঠেছিল।
মনের মধ্যে
সম্ভব অসম্ভব নানা রকম চিন্তা করতে করতে সুদেষ্ণা যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল।
নীলাদ্রির কথায় ওর চমক ভাঙে –
আজ রাতে আর আমি কিছু খাব না। বড্ড ক্লান্ত লাগছে। আমি শুয়ে পড়লাম। তুমি খেয়ে নাও।
কথাগুলো বলেই নীলাদ্রি বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল। সুদেষ্ণা বিহ্বল চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো, কিছু বললো না। তার মানে কালকের খবরটা ইতিমধ্যেই ওর জানা হয়ে গেছে। শুধু তো ও একা নয়, হাজার হাজার ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলছে এই নোংরাখেলা। তাই আতঙ্কের ও উদ্বেগের খবরগুলো কারোর কাছেই চাপা থাকে না। সবাই সবার সঙ্গে খবরগুলো ভাগ করে নিয়ে উদ্বেগের ভার কিছুটা হালকা করতে চায়, মনকে সান্ত্বনা দিতে চায় এই বলে যে, এই রাজ্যে তুমিই একমাত্র অভাগা নও, তোমার মতো অনেকে আছে, হাজারে হাজারে আছে।
খাওয়া দাওয়ার কাজ কোনরকমে সেরে সুদেষ্ণা যখন শুতে গেল, তখন নীলাদ্রি চোখ বন্ধ করে বুকের উপর হাতদুটো জড়ো করে চুপ করে শুয়ে আছে। নাইট ল্যাম্পের মৃদু নীল আলোয় ওর মুখটা কেমন মায়াবী দেখাচ্ছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে সুদেষ্ণার কেমন মায়া হলো। নীলাদ্রি যে ঘুমোচ্ছে না, ঘুমনোর ভান করে রয়েছে তা বুঝতে ওর বাকি নেই। সুদেষ্ণাও কিছু না বলে চুপ করে পাশে শুয়ে পড়লো। সারারাত দুজনেরই ঘুম এলো না। এপাশ ওপাশ করে কেটে গেল। ভোরের আলো ফুটতেই সুদেষ্ণা আর বিছানায় গা ঠেকিয়ে রাখতে পারলো না। উঠে চোখে মুখে জল দিয়ে ব্যালকনিতে পাতা চেয়ারটায় গা এলিয়ে বসলো।
দুটো নাম না জানা পাখি এসে বসেছে সামনের মাধবীলতার ঝোপটায়। ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে কিচিরমিচির শব্দ করে খুব খানিকটা ঝগড়া করে নিল। তারপর একটা পাখি উড়ে কিছু দূরে প্রমিলা গাছটার উপর বসলো। দ্বিতীয় পাখিটা উড়ে প্রথম পাখিটার কাছে যেতেই সেটা আবার উড়ে এসে মাধবীলতার ঝোপটায় বসলো। এরকম বেশ কয়েকবার ওড়াওড়ি করার পর আবার ঠোঁটে ঠোঁট লাগিয়ে একচোট কিচিরমিচির করার পর দুটো পাখি একসঙ্গে উড়ে দিগন্তে মিলিয়ে গেল। ওদের কান্ড দেখে সুদেষ্ণাও আপন মনে হেসে উঠলো। মান অভিমানের পালা তাহলে পক্ষী সমাজেও আছে।
হঠাৎ
সিগারেটের গন্ধ পেয়ে পিছনে তাকিয়ে সুদেষ্ণা দেখে নীলাদ্রি কখন এসে দাঁড়িয়েছে
তার পিছনে। তার হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, চোখের দৃষ্টি দূর দিগন্তে।
নিস্তব্ধতা
ভেঙে সুদেষ্ণা-ই প্রশ্ন করলো –
উঠে পড়লে যে?
—
আর কতক্ষণ
বিছানা আঁকড়ে পড়ে থাকবো? এখন শুধু খবরের অপেক্ষা।কী যে হবে কিছু বুঝতে পারছি না।
তবে সবাই বলছিল ইতিবাচক কিছু না হলে আমরা এবার বৃহত্তর আন্দোলনে রাস্তায় নামবো।
—
পুলিশের মার
সহ্য হবে তো?
—
এভাবে মুখ
বুজে মার খাওয়ার চেয়ে না হয় মার খেতে খেতেই চিৎকার করে এই ঘৃণ্য সমাজের কথা
বলবো।
—
তাতাতে লাভ? কে
শুনবে তোমাদের কথা? তোমাদের গলার জোর ফুরিয়ে আসার আগেই দেখবে রাজ্যে আরেক
বিপর্যয় ঘটে গেছে। হয়তো কেউ নৃশংস ভাবে খুন হবে কিংবা রাজ্য জুড়ে অকস্মাৎ কোন
মহামারীর প্রাদুর্ভাব ঘটবে। ব্যাস, মানুষ সব ভুলে নতুন বিষয় নিয়ে মেতে উঠবে।
সংবাদ মাধ্যম গুলোও গলার শির ফুলিয়ে চিৎকার করে গরম গরম খবর পরিবেশন করা শুরু করে
দেবে।
—
তুমিও তো
একসময়ে কতো আন্দোলন করেছো, দিনের পর দিন রাস্তায় কাটিয়েছো।
— ঐ জন্যই তো এই ভোজবাজির খেলা গুলো সহজে বুঝতে পারি। তা নইলে যারা টাকা খেয়ে দুর্নীতি করলো তাদের ধরা নিয়ে কারোর কোন মাথাব্যথা নেই কেন?
ত তোমাকে একটা কথা বলি। লড়াইটা তোমরা ছেড়ো না। অন্যায়ের বিহিত হোক বা না হোক প্রতিবাদটা দরকার। মেরুদন্ডের অস্তিত্বটা জানান দেওয়া খুব জরুরি।
সুদেষ্ণার কথার প্রত্যুত্তরে নীলাদ্রি কী একটা বলতে যাচ্ছে আর তখনই কলিং বেলটা বেজে উঠল। সুদেষ্ণা তাড়াতাড়ি নীচে নেমে গেল কাজের মাসিকে দরজা খুলে দিতে। তারপর যে যার মতো কাজে লেগে পড়লো। সুদেষ্ণা স্নান সেরে এসে ভাতটা চাপিয়ে আনাজগুলো বের করতে লাগলো কাজের মাসিকে কাটতে দেবে বলে। নীলাদ্রি খবরের কাগজটা ভাঁজ করে রেখে বাথরুমে ঢুকলো স্নান পর্ব সারবে বলে।
নীলাদ্রি স্কুলে বেরিয়ে গেলে সুদেষ্ণা খবরের কাগজটা নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। কাল সারারাত বিভিন্ন চিন্তায় দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি। খবরের কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে কখন যে দু চোখের পাতা জুড়ে ঘুমের ঢল নেমে এসেছে তা বুঝতেও পারিনি। ঘুম যখন ভাঙলো তখন দুপুর একটা। হুড়মুড় করে উঠে টিভিটা অন করলো। আজই তো সুপ্রিম কোর্টের রায়টা ঘোষণা হবে। মা দুর্গাকে স্মরণ করতে করতে টিভির খবরের চ্যানেলে চোখ রেখে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো রায়টা জানার জন্য। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না।বিজ্ঞাপন শেষ হতেই খবরের শিরোনামে ফুটে উঠলো-
— এস এস সির ২৬০০০ শিক্ষক অশিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলো সুপ্রিম কোর্ট...
রঙিন আলোকচিত্রের ওঠানামা সংবাদ পাঠিকার উত্তেজিত কন্ঠস্বর কোন কিছুই সুদেষ্ণার চোখে বা কানে ধরা পড়েছে না। ওর অন্তর্দৃষ্টিতে ফুটে উঠছে কেবল নীলাদ্রির যন্ত্রণাকাতর মুখটা। সারাটা দুপুর সুদেষ্ণা অস্থির হয়ে কাটালো। টেবিলে খাবার যেমন সাজানো ছিল তেমনই রয়ে গেল। খিদে তৃষ্ণার কোন অনুভূতিই যেন তার নেই। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। ব্যালকনিতে পাতা চেয়ারটায় বসে নীলাদ্রির জন্য অপেক্ষা করতে করতে সন্ধ্যে ঘনিয়ে এলো। হঠাৎ সুদেষ্ণার কেমন ভয় ভয় করতে লাগলো। নীলাদ্রির স্কুল থেকে ফিরতে তো এতো দেরি কখনো হয় না! খুব দেরি হলেও সাড়ে পাঁচটা বাজে। সাড়ে ছটা বাজে, এখনো এলো না কেন? ব্যস্ত পায়ে ঘরে ঢুকে মোবাইলটা নিয়ে ফোন করে প্রচন্ড উদ্বেগে অপেক্ষা করতে লাগলো নীলাদ্রির গলা শোনার জন্য। কিন্তু বারবার ফোনের রিং বেজে গেলেও ও প্রান্ত থেকে কোন উত্তর এলো না। সুদেষ্ণার বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ চাপ অনুভূতি হচ্ছে। গা’টা কেমন গোলাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে যেন কষ্ট হচ্ছে। বেসিনে গিয়ে চোখে মুখে জলের ছিটে দিয়ে সোফার উপর ধপ করে বসে পড়লো। তারপর আবার মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে রিং করলো। ও প্রান্ত থেকে উওর এলে কাঁপা কাঁপা গলায় বললো-
— হ্যালো বাবলুদা! নীলাদ্রি স্কুল থেকে কখন বেরিয়েছে?
বাবলু নীলাদ্রির কলিগ। বাবলু জানালো যে নীলাদ্রি সাড়ে বারোটা নাগাদ এইচ এম-কে বলে ছুটি নিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়টা জানার পরেই ও কেমন যেন অস্থির অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছিল। সবার মাঝে কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করছিল। তারপর হঠাৎই এইচ এম-কে বলে ছুটি নিয়ে বেরিয়ে যায়।
খবরটা শুনে সুদেষ্ণার মাথার রগগুলো কেমন দপ দপ করে ওঠে। দুহাতে মাথাটা চেপে ধরে বসে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর সোফা থেকে উঠে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে টিভির সুইচটা অন করে। খবরের চ্যানেলে সংবাদ পাঠিকার উত্তেজিত কন্ঠস্বরে ঘর গমগম করে উঠলো —
আপনারা দেখছেন সুপ্রিম কোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে আজ বিকাশ ভবনের গেটের সামনে রণক্ষেত্রের চেহারা। হাজার হাজার চাকরিহারা শিক্ষক আন্দোলনে ফেটে পড়েছেন। আমাদের নিজস্ব প্রতিনিধি মুকুল ঠাকুর ওখানে রয়েছেন। আমরা সরাসরি কথা বলবো মুকুল ঠাকুরের সঙ্গে। মুকুল! চাকরিহারা শিক্ষকদের বিক্ষোভ আন্দোলনের ছবিটা যদি তুমি সরাসরি দেখাও আমাদের দর্শক বন্ধুদের...
মুহূর্তের মধ্যে টেলিভিশনের পর্দায় ফুটে ওঠে এক ধুন্ধুমার কান্ডের চিত্র। হাজার হাজার চাকরিহারা শিক্ষক তীব্র প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে করতে বিশাল লোহার ফটক ধরে ঝাঁকা দিচ্ছে। বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হাজির হয়েছে বিশাল পুলিশবাহিনী। তারপরেই ক্যামেরা ঘুরে যায় একটু অন্যদিকে। আর টিভির পর্দায় যে চিত্র ফুটে ওঠে তা দেখে সুদেষ্ণার শরীরের রক্ত হিম হয়ে যায়। — নীলাদ্রি দাঁড়িয়ে! হাতে বড় একটা কেরোসিনের জার! চিৎকার করে হাত উপরে তুলে কী যেন বলছে। মাইক্রোফোনটা একটু এগিয়ে ধরতেই ওর কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে-
— আমাদের যোগ্যতার নিরিখে পাওয়া এই চাকরি আমাদের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে নিয়ে সংবিধানকে মান্যতা না দিয়ে দ্বিতীয়বার আমাদের যোগ্যতার পরীক্ষা দিতে বলে আমাদের চূড়ান্ত অপমান করে যোগ্য-অযোগ্যকে এক পংক্তিতে ফেলে সরকার আমাদের উপর যে অন্যায়, অত্যাচার চালালো, আমি তার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। যোগ্য হয়েও অযোগ্যের অপবাদ নেওয়ার থেকে মৃত্যুই শ্রেয়। তাই আজ জনসমক্ষে আমি নিজেকে আহুতি দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে, দেশের আইনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জানাবো আমার তীব্র ধিক্কার, ও প্রতিবাদ।
—কথাগুলো বলেই নীলাদ্রি জারের ছিপি খুলে সারা গায়ে তেল ঢালতে শুরু করলো। চারিদিকে তুমুল হৈ হৈ শুরু হয়ে গেল। দুজন উর্দিধারী পুলিশ ছুটে গিয়ে তাকে নিষ্ক্রিয় করার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু নীলাদ্রির উপর তখন দানবীয় শক্তি ভর করেছে। ওর এক ধাক্কায় পুলিশ দুজন হুমড়ি খেয়ে পড়লো মাটিতে। টিভির সামনে দাঁড়িয়ে সুদেষ্ণা আর্তনাদ করে উঠলো-
— না নীলাদ্রি না! তুমি এটা কিছুতেই করতে পারো না।
কান্নায় ভেঙে পড়ে চিৎকার করতে করতে উন্মাদের মতো মাথার চুল ছিঁড়তে লাগলো সুদেষ্ণা। জীবনে এমন অসহায় সে কখনো বোধ করেনি। আর্তস্বরে শুধু বলে যেতে থাকে – না না না...
হৈ হট্টগোলের
মধ্যেই কার যেন গলা শোনা যায় —
আরে নীল জল! নীল জল! এরকম নাটক অনেক দেখেছি।
তারপরেই টিভির পর্দায় ফুটে ওঠে এক বীভৎস দৃশ্য। জ্বলন্ত একটি মানব দেহ শূন্যের দিকে দুহাত তুলে দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য হয়ে এদিক ওদিক ছুটোছুটি করছে। ভয়ে আতঙ্কে সমবেত জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে বিশৃঙ্খলভাবে ছুটোছুটি করছে। তীক্ষ্ণ ভয়ার্ত চিৎকার ছাড়া কারোর কোন কথা বোঝা যাচ্ছে না। সুদেষ্ণা আর টিভির পর্দায় চোখ রাখতে পারলো না।
ওর জ্ঞানহীন দেহটা সোফা থেকে গড়িয়ে পড়লো মেঝেতে।
বিকেলে কাজের মাসি এসে কলিং বেল টিপে, দরজা পিটিয়েও কোন সাড়া না পেয়ে স্থানীয় ক্লাবে গিয়ে ছেলেদের খবর দিল। ক্লাবের ছেলেরা এসেই দরজা ভেঙে সুদেষ্ণাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলো।
হাসপাতালে জ্ঞান ফিরতেই টিভি ও সংবাদপত্রের কয়েকজন লোক তাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন করতে শুরু করলো। প্রশ্নগুলো তার কানে পৌঁছালেও তার কোন অর্থ সে বুঝে উঠতে পারছিল না। ঘন কুয়াশায় ঢাকা একটা চাদরের আস্তরণ থেকে নিজেকে খুব কষ্ট করে বের করে অস্পষ্ট উচ্চারণে সে শুধু বললো,
— নীলাদ্রি! কেন তুমি... দধীচি... হতে গেলে? এ রাজ্যের... দুর্নীতির... দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর যে বজ্রের... আঘাতেও ভাঙে না...
খুব কষ্ট করে কথাগুলো বলেই সুদেষ্ণা আবার চোখ বুজলো। আর ওর দুচোখের কোল বেয়ে শ্রাবণের ধারার মতো নেমে এলো অশ্রুধারা।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন