কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

চঞ্চল বোস

 

দোমোহনীর গোয়ালা গৌড়



অন্ধজনে দেহো আলো-

ছোটবেলায় আমাকে বাবা  সম্প্রদান কারক পড়াতে গিয়ে এই লাইনটা ঠেলে দিয়েছিল-

-এর মানে  কী বল তো! 

ব্যাপক প্রত্যয়ে আমার উত্তর ছিল-

-অন্ধদের গায়ের থেকে আলো বেরোয়।

বাড়িতে বাংলা ও ইংরিজির ডাবল এম এ অধ্যাপক বাবা থাকলে তার বিড়ম্বনা অনেক। দেহোকে দেহ বুঝে দেহে উত্তমমধ্যম হজম করতে হয়েছিল। তবুও লাইনটার অর্থ অন্ধাকারাচ্ছন্নই থাকতো যদি না দোমোহনীর লাগোয়া ডোবো গাঁয়ের গোয়ালা গৌড় কাণ্ডটা ঘটতো ডোবো ব্রীজের অন্ধকার রাস্তায়।

দোমোহনীতে ক্যামেরা বন্দী করেছি হাজারো ছবি। আজ খুঁজছি  দুধের ক্যান ঝোলানো সাইকেলে গোয়ালা   গৌড়কে। ও আজ গল্পের নায়ক। 

দোমোহনীর ঘাটে  বিশবছর ধরে ক্যামেরাবন্দি করা  খেটে খাওয়া মানুষের প্রাত্যহিক কুচকাওয়াজের ছবির ভিড়ে আজকের গৌড়কে খুঁজে বার করা প্রায় অসম্ভব। 


কোনোদিন একথা ভেবে ছবি তুলিনি
, কাল এই ছবি থেকে মানুষ চিনে বার করবো। ফটোগ্রাফার তার স্বভাবসিদ্ধ অভ্যাসে ছবিকে ধরে কম্পোজিশনে। খোঁজে প্যাটার্ন-এর পুনরাবৃত্তি। আলোছায়ার খেলায় ভেসে ওঠা মুহর্তের নিরর্থক হাবিজাবি দৃশ্যে ফটোগ্রাফার খোঁজে শৈল্পিক অর্থ।  


আমার শ্রীমতি ভোরের অন্ধকারে হাঁটতে ভালোবাসেন। আলো ফোটার আগেই ঘরে ঢুকে পড়ার কঠিন নিয়ম ওর নিত্য অভ্যাস। এই নিত্য অন্ধকারে হন্টনকালে একদিন লক্ষ্য করলাম, একটা লোক সাইকেলে দুধের ক্যান ঝুলিয়ে হেঁটে আসে।  সাইকেল থাকতে হাঁটে কেন? সাইকেল চালিয়ে আসতেই পারে!


কৌতূহল বেশি দিন পুষে রাখা গেলো না। আজ ঠিক করলাম ব্যাপারটা জানতেই হবে। আলো আঁধারিতে ব্রিজের রেলিং ঘেরা ফুটপাতে হেঁটে চললাম সাইকেলধারীর পিছুপিছু।



সর্বনাশ ও যে রাস্তার মধ্য দিয়ে হাঁটে! এটা তো হাইওয়ে। দ্রুতগতিতে ধাবমান ট্রাক যে কোনো সময় ওকে পিষে দেবে। এই! একটুর জন্য বেঁচে গেলো। আরে এবারে তো একটা বাস ট্রাককে ওভারটেক করছে। গেল গেল!  বাসটা যেন জানতো। জোর ব্রেক মেরে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে গেল। বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিন এভাবে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়াই কেন ভাই?

রাস্তার একটা নিরাপদ কোণে মুখোমুখী হয়ে দাঁড় করালাম সাইকেলধারীকে।

-ভাই তুমি সাইকেলটা চালিয়ে আস না কেন?

-হামি চোখে দেখি নাই বাবু।

এবার আমার অবাক হবার পালা। কবলবো বুঝতে পারছি না।

-নাম কতোমার? 

-গৌড় আইজ্ঞা। একটা চোখ জন্মের লে অইন্ধ্যা। আরেকটা গেলো  মতিয়াবিন্দ হইয়ে। ডাক্তার করলি। দমে খরচা। হামি মাঠে গরুতরু হাঁকি আর একটা গাইয়ের দুধ বেচি। ওতো পইসা কুথালে আইসবে?



চক্রবালে অনির্দিষ্ট দৃষ্টি সাক্ষ্য দিচ্ছে দৃষ্টিহীনতার। দিগন্তের দিকে তাকিয়ে ওর মুখে মুচকি হাসি ফুটলো।

-হামি আগে যে পাঞ্জাবিকে দুধ দিতি উ হামাকে অনেক মদদ কৈরে ছিলো। উ তো টাটা কোম্পানি ছাইড়ে দিল্লি চইলে গেলো। পাঞ্জাবি ইখানে থাইকলে কিছু উপায় কৈরতো। তুমি উহাকে দেইখলে জানাবে।

গৌড় আমায় পিছনে ফেলে আবার চলল। আমি বিহ্বল হয়ে গৌড়ের ধীর অনিশ্চিত চলার পথের দিকে পাথর হয়ে তাকিয়ে থাকলাম।

গল্পটা হয়তো এখানেই শেষ হয়ে যেত যদি না এই প্রশ্নটা করতাম-

-সে পাঞ্জাবির নাম ক?

-হরভজন সিং।

গৌড় আবর্জনার পাহাড়ে সাইকেল ঠেলে নির্মলবস্তির গলিতে ঢুকে গেল।

এক হরভজনকে তিরিশ বছর আগে XLRI-এ ম্যানেজমেন্ট পড়ার সময় আমি চিনতাম। ট্রেড ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা পরোপকারী মানুষ। যদি সেই হয়, তাকে এখন পাই কোথায়? গুগল করতেই ওর লিঙ্কড্ইন প্রোফাইল থেকে বেরিয়ে এলো-  
Harbhajan Singh
Chief - Strategy & HR - XLRI Delhi | Director Railway Children | CII | Director - Fricks India। 

ওরে বাবা! এ যে  এখন এক পাহাড় প্রমাণ মানুষ হয়ে গেছে! ওকে নাগাল পাই ককরে? XLRI 1997 এর এক অ্যালুমনি হোয়াটস্যাপ গ্রুপ আছে। সেই গ্রুপে গৌড় বৃত্তান্ত  ছবিসহ  চারপাঁচ লাইনে পেশ করলাম। আমায় অবাক করে পাঁচমিনিটে হোয়াটস্যাপে হরভজনের প্রতিক্রিয়া-

-জীবনে অনেকের উপকার করেছি, তবে গৌড় নামে কাউকে মনে পড়ে না।

খুবই হতাশ হলাম। আরও আধাঘন্টা পরে হরভজনের দ্বিতীয় রেসপন্স-

-One Goud used to come from nadi paar to deliver us milk. His one eye  effected. Then we  used to live in sonari. Pata nhi wahi hai yaa koi aur.

আমার রেসপন্স-

-Wahi hai😌. He comes from Dobo - nadi par.

এবার হরভজন সরাসরি আমার হোয়াটস্যাপে জানালো- 

-Oh my God. I am in Seoul today. am flying back tommorrow. on 22nd I will fly to Jsr. I am coming to Jamshedpur on 22nd evening and will be back to delhi on 26th Jan. Chanchalda, take his mobile no. If possible. I would like to meet him. I willl be staying in XLRI .

আমি আনন্দে আত্মহারা হলাম। ২৩শে জানুয়ারী সকালবেলায় হরভজনের ফোনে জানাল-

-আমি এসে গেছি। XLRI ফ্যাকাল্টি হস্টেলে  স্ত্রীর সাথে আছি। যদি সম্ভব হয় চলে এসো।

পৌঁছে গেলাম। সত্যিকারের বড় মাপের মানুষ কখনও নিজের মাপটা বুঝতে না দিয়ে এক সচ্ছন্দ বাৰ্তালাপের পরিবেশ তৈরি করে। হরভজন আমাকে XLRIএ পায়চারি করে নতুন কমপ্লেক্সের আদি অন্ত দেখিয়ে পরিচয় করালো নতুন কর্ণধারদের সাথে। পুরনো চায়ের ঠেকটা এখন অন্যত্র সরে গেছে। কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে বললো-

-জিন্দেগিমে পইসা কমানা কোই বাড়ি বাত নাহি হয়। সামনেওয়ালা তেরে বারে ক্যায়া সোচতা ওহী  আসল কামাই হ্যায়।

কিছুক্ষণ ওর সাথে থেকে এই শিক্ষা আমি হাড়েহাড়ে টের পেয়েছি।
পরদিন ভোর ছটায় যখন গৌড় ব্রিজ পেরিয়ে আসে তখন আমি হরভজনকে গাড়িতে নিয়ে হাজির হবো স্থির করা হলো।

পরেরদিন ভোর পৌনে ছটায় গাড়ি নিয়ে XLRI এর কাছে পৌঁছে দেখলাম হরভজন মিলিটারি কমান্ডারের মতো রাস্তার ধারে পায়চারি করছে। বিচক্ষণ হরভজন হাইওয়েতে উল্টো দিকে গাড়ি ঘোরানোর বিপদ থেকে আমায় বাঁচিয়ে দিলো। গাড়ি নিয়ে সাক্ষাতের পূর্বনির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেখলাম গৌড় সাইকেল ঠেলে ব্রিজ পার হয়ে আসছে। গৌড় নামে হাঁক দিয়ে দাঁড় করালাম। তারপর যা ঘটল সেই রোমাঞ্চকর দৃশ্য আমার সারাজীবন মানে থাকবে।

হরভজন গৌড়কে জড়িয়ে ধরলো। গৌড় চোখের জলে ভেসে গেল। দুজনে নিভৃতে কথা বলার পর আমি কাছে গেলাম। যাবার আগে হরভজন বিহ্বল গৌড়ের হাতে একগুচ্ছ পাঁচশো টাকার নোট গুঁজে দিল।

সারসংক্ষেপ: গৌড়ের দুটি সমস্যা - চোখের ছানি অপারেশন আর মেয়ের বিয়ে দেওয়া। আমার দায়িত্ব কোনো ডাক্তার দেখিয়ে চোখের কঅবস্থা আর কত খরচ হবে সেটা জেনে নেওয়া। বাকি আর্থিক আর প্রয়োজনীয় লোকবল বা অন্য রিসোর্স হরভজন ব্যবস্থা করবে। চোখ ঠিক হলে মেয়ের বিয়ের ব্যাপারটা হরভজন  দেখে নেবে।

গাড়িতে হরভজনকে XLRIএ বিদায় জানিয়ে ফিরে আসার পথে মনে হলো রবিঠাকুরের ওই লাইনটা আজ একটু বোধগম্য হলো।

অন্ধজনে দেহো আলো, মৃতজনে দেহো প্রা
তুমি করুণামৃতসিন্ধু করো করুণাকণা দান।

শুষ্ক হৃদয় মম কঠিন পাষাণসম,
প্রেমসলিলধারে সিঞ্চহ শুষ্ক নয়ান।

তৃষিত যে জন ফিরে তোব শুদ্ধসাগরতীরে
জুড়াও তাহারে স্নেহনীরে, সুধা করো হে পান।

 


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন