![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
বাঘ শিকার
বহুদিন আগে সেই কোন ছোটবেলায় বাঘ শিকারের একটা গল্প পড়েছিলাম। তারপর কত বছর কেটে গেছে, কত কী পড়েছি, দেখেছি, শুনেছি। তার কিছু হয়তো বুঝেছি আবার কত কিছুই তো বুঝিনি। সব মিলিয়ে চলতি কথায় যাকে অভিজ্ঞতা বলে তা জমা হয়ছে বিস্তর। অনেক দিন আগে পড়া হলেও বাঘ শিকারের সেই গল্পটা ভালো করেই মনে ছিল, কিন্তু গল্পেরও কি বয়স বাড়ে? অভিজ্ঞতা ব্যাপারটা ধূলো-ময়লা আর এলোমেলো রঙের ছিটে লাগা একটা বাঁকাট্যারা আয়নার মতো। তার প্রতিচ্ছায়ায় গল্পের অবয়ব পালটে যায়। তা না হলে আজ সে একই কাহিনী অন্য চেহারা নিয়ে দেখা দিচ্ছে কেন!
অনেক কাল কেটে গেছে তাই হয়তো স্বাভাবিক ভাবেই গল্পের সে শিকারি বুড়ো হয়েছে। তবু রাত-বিরেতে বনে-বাদাড়ে ঘোরাঘুরির করার অভ্যাসটা তার যায়নি। যেমন আজ এই গভীর রাতে তাকে জঙ্গলের ভেতরে দেখা যাচ্ছে। হাতে তার প্রিয় দোনলা বন্দুকটা। নিশুত রাত্তিরে বুনো গাছপালা লতাপাতা সকলে জড়াজড়ি করে ঝিম মেরে রয়েছে। কাস্তের মতো সরু বাঁকা চাঁদের আর কতটুকু আলো – সে আলোতে অরণ্য-রাত্রির যেন ঘোর লেগেছে। মায়াময় অন্ধকার নীরব প্রতীক্ষায় অহল্যার মত স্থির। শিকারির অভিজ্ঞতা অনেক – শিকারি জানে কোথায় তাকে পাওয়া যেতে পারে। ঝোপঝাড় সরিয়ে সরিয়ে সাবধানে এগোচ্ছে – সামনে একটা মরা নদী, তার ওপারে এক-আধটু ফাঁকা এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে মেঠো জমি আর তার পরেই ঘন এবং ঘনতর বন। গহন অরণ্য যাকে বলে। যার জন্য আসা সে এই অঞ্চলেই ঘোরাফেরা করে সাধারণত। শিকারিদের একটা ছ-নম্বর ইন্দ্রিয় থাকে। শিকারি টের পাচ্ছে এখন সে আছে। ওখানেই আছে।
লতাপাতার বুনোটে দুটো জ্বলজ্বলে চোখ দেখা গেল। ঠাণ্ডা চাউনি। একঠারে চেয়ে আছে শিকারির দিকে। সেও যেন জানতো শিকারি আসবে। আজ এই ফালি-চাঁদের তামাটে আলোর রাত্তিরে শিকারির সঙ্গে তার একটা বোঝাপড়া করার আছে। শিকারি একটা পাথরের ওপর পা রেখে দেখে নিল তার প্রিয় বন্দুকটা ঠিকঠাক রয়েছে কি না। তারপর ওই জ্বলজ্বলে চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে বলল, “কান খুলে শোনো, আজ তোমার শেষ দিন। এই বনে যত বাঘ ছিল মানে তোমার আত্মীয়স্বজন বন্ধু-বান্ধব সবাইকে আমি এক এক করে মেরেছি। আজ তোমার পালা। তোমার ভবলীলাটুকু সাঙ্গ করতে পারলেই আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়।
বাঘের কি কোন ভাষা আছে? আছে ঠিকই। বহুদিনের অভিজ্ঞতায় শিকারি সে আপাত অর্থহীন ধ্বনির অর্থ কতকটা ঠাহর করে নিতে পারে। বাঘ মুখ নিচু করে হাল্কা শব্দ করল, যার মানে – জানি, আমি জানি। কিন্তু কেন?
শিকারি একটু হাসলো, “তুমি যে এত মুর্খ তা তো জানতাম না। বাঘ শিকারি হিসেবে গ্রামগঞ্জে শহরে-নগরে আমার কত নাম হয়েছে তার খবর রাখো? সক্কলে আমাকে বাহবা দেয়, বলে দুঃসাহসী শিকারি। আমার বৈঠকখানার দেয়ালে আর জায়গা নেই। চামড়া, কাচের চোখ-লাগানো মাথা, দাঁতের পাটি সব টাঙিয়ে রেখেছি। লোকে দেখে বলে, “ওরেঃ বাবা! কত বাঘ মেরেছে এই শিকারি! হ্যাঁ, দেয়ালের কোণের দিকে একটু ফাঁকা জায়গা আছে, সেখানে তোমার মাথাটা টাঙিয়ে রাখা যাবে, মানাবেও বেশ …”
বাঘ চাপা শব্দ করল। সে কথা বলছে। “এককালে তুমি যে নিপুণ শিকারি ছিলে তা ঠিক। কিন্তু এখন সে টিপ, দ্রুত বন্দুক হাতে তুলে নিয়ে পলকের মধ্যে তাক করে গুলি ছোঁড়ার ক্ষমতা তোমার আর নেই। সে তুমিও জানো, আমিও জানি”
“বাহ, খুব কথা শিখেছ তো তুমি! আমারও জানতে বাকি নেই যে তুমি বুড়ো হয়েছো। তোমারও আর সে রকম তড়িৎ-গতিতে নড়াচড়ার সামর্থ নেই। লক্ষ্যভেদের জন্য তোমার মাথা আর বসে থাকা ডানা ভাঙা হাঁস আমার কাছে সমান। বয়সের জন্য একবার যদি ফসকেও যাই, দু-নম্বর গুলি থেকে তুমি রেহাই পাবে না তা জেনে রেখো। তোমাকে শেষ করতে পারলেই বনে আর কোনো বাঘ থাকবে না।”
“না, তুমি ভুল করছ। আমাকে মারলেও তা হবে না। এক জোয়ান ছেলে আছে আমার। কম বয়সে আমি যা ছিলাম তার থেকে সে আরও বহুগুণ ক্ষিপ্রগতি। অতি-নিঃশব্দ তার পদক্ষেপ।”
“ওহ, তোমার ছেলে আছে? তা তো জানতাম না, সে বেঁচে গেল কী করে? লুকিয়ে রেখেছিলে বুঝি! যাকগে, মোটকথা আমার কাজ বাড়ল। এখনও তাহলে দুটো বাঘ মারা বাকি! তবে কি জানো, আমারও ছেলে আছে। সেও শিকারি। ভালো শিকারি। তবে তাকে আর লাগবে না। তোমাকে এবং তোমার বংশধরটির জন্য আমি একাই যথেষ্ঠ। এই অরণ্য বাঘশূন্য করার কৃতিত্ব কারোর সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই না।”
বাঘ এবার গাছের আড়ালে গিয়ে একটি মৃদু গর্জন করল। ঠিক যেন কোনো ওস্তাদ বীণকার মন্দ্র-সপ্তকে পঞ্চম-ধৈবতের আন্দোলন এনে ষড়জে ফিরে এলেন। শিকারি এই পদটির অর্থ ঠিক ধরতে পারলো না। সে অবশ্য কোন ব্যাপার নয়। শিকারি ভাবল সব বার্তালাপ বুঝতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বাঘ হয়তো বুঝেছে তার শেষ সময় এসে গেছে, সে তাদের ভগবানের কাছে প্রার্থনা জানাচ্ছে। শিকারি টুপিটা ঠিক করল, তার ঠোঁটে চাপা সূক্ষ্মহাসি খেলে গেল। এ হাসি অনুবাদ করলে হবে – এইবার, ওহে ব্যাঘ্রবর, ‘নাম লহ দেবতার / দেরি তব নাই আর…’
খেলা শেষ করার আগে শিকারি তারিয়ে তারিয়ে তার অনেক দিনের চেনা বাঘের সঙ্গে আলাপ করতে থাকল। এই যে খেলিয়ে খেলিয়ে শেষ দৃশ্য অবধি টেনে নিয়ে চলা, এর মধ্যে একটা অদ্ভুত মজা আছে। যেন মঞ্চে কোনো রোমাঞ্চকর নাটক চলছে। শিকারির বেশ লাগছিল। যবনিকার দড়ি বা বন্দুকের ঘোড়া টানা তো তার অঙ্গুলিহেলনের অপেক্ষায়!
মরা নদী পেরিয়ে ঝাঁপ দেওয়া তো দূরের কথা, বৃদ্ধ বাঘটির এতটা দৌড়ে আসার ক্ষমতাও নেই। দোনালাটা পাশে রেখে শিকারি মশায় মোজ করে উপভোগ করতে লাগল নিশীথ রোমাঞ্চ। চাঁদের স্তিমিত কিরণ আর বসন্তের মৃদু বাতাসে এ বনভূমি কখনো কখনো বড় রহস্যময় লাগে। সামনে অসহায় শিকার, কাঁপতে কাঁপতে গুণে চলেছে তার জীবনের বাকি কটা মুহূর্ত। দোনালা বন্দুকটি শিকারির হাতের পাশে। এই বিশ্বস্ত যন্ত্রটি থাকাতে শিকারির মনে বেশ ফুরফুরে ভাব। সে জানে এ অরণ্যের অধিকার তাকে দিয়েছে টোটা ভরা এই দুটো নল। গলায় আরও ডজন খানেক মরণ-কাঠি মালার মতো ঝুলছে। সে অবশ্য দেখানোর জন্য – ওসবের দরকার তার কোনোদিনই হয়নি। তার নিশানা অভ্রান্ত ও অব্যর্থ।
চাঁদ ধীরে নামছে পশ্চিম দিগন্তের দিকে। ঊষার বাতাসে সামান্য শীতের আভাস। শিকারি নিজের মনে বলল, “ ওহে বৃদ্ধ বাঘ, নতুন দিনটা তোমার আর দেখা হবে না।”
বন্দুক হাতে নিল শিকারি। দুটো জ্বলজ্বলে চোখ ঠিক একই জায়গায় স্থির হয়ে আছে।
শিকারি বন্দুক তুলল। সে জানে টিপ করতে হবে দুটো চোখের মাঝখানে, ইঞ্চি খানেক ওপরের দিকে। বাঘও জানে সে নড়াচড়া করলে শিকারি ধৈর্য হারাবে। বন্দুকের গর্জন তখুনি শোনা যাবে। একটা গরম ধাতব-পিণ্ড তার ললাট বিদ্ধ করে পলকে তার ইহলীলা সমাপ্ত করে দেবে। আর একটু সময়, শুধু আর একটু সময় পেলে ভালো হতো। তাই সে অনড় হয়ে বসে। অন্তিম মুহূর্তে এসে বৃদ্ধ পশুটি সময় কেন চাইছে? ঈশ্বরের উদ্দেশে তার শেষ প্রার্থনা কি একটু বাকি রয়ে গেছে?
**
শিকারিপুত্র বাবাকে বলেছিল একা যেও না, কিন্তু বাবা শুনলে তো! বাবা অসমসাহসী শিকারি, কোনো রকম অরণ্যসঙ্গী বা সহায়তা বাবা কোনদিনই পছন্দ করেনি। তবু ছেলে ভাবল বাবা বাঘটিকে মেরে নিজে টেনে আনতে পারবে না। তার যাওয়া দরকার। শিকারিপুত্র জানতো তার পিতা মরা নদীর দিকেই গেছে। রাতের শেষ প্রহরে এদিক ওদিক সাবধানী চোখে জরিপ করতে করতে সে এসে দাঁড়ালো মরা নদীর তীরে। সে জানতো তার বাবা এরকম জায়গাতেই কোথাও আছে। এমন সময় আচমকা রাত্তিরের নিস্তব্ধতা ভেঙে আঁ আঁ ধরনের একটি আর্ত শব্দ কানে আসাতে সে চমকে উঠল। কী হলো? শিকারিপুত্র দৌড়ে গেল শব্দের উৎস লক্ষ করে।
তখন পূবাকাশে সবে ফুটে ওঠা লাল আভা নতুন দিনের আগমন-বার্তা নিয়ে আসছে। সে আলোতে শিকারি পুত্র পলকে দেখল মরা নদীর ওপারে দুটো বাঘ পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে গহন কান্তারে প্রকৃতি মায়ের কালচে সবুজ আঁচলের আড়ালে চলে গেল।
আর এপারে শিকারির প্রাণহীন শরীর ভুলুণ্ঠিত। বন্দুক মাটিতে পড়ে আছে, শেষ লড়াইয়ে তা কাজেই লাগেনি। এ তো বুড়ো বাঘের কাজ নয়, এ কোনো ক্ষিপ্র চতুর শ্বাপদের মারণ আঘাত। যে বনপথে বাঘ আর ব্যাঘ্রপুত্র এইমাত্র অদৃশ্য হয়ে গেছে সে দিকে চেয়ে শিকারির ছেলে অস্ফুটে বলল, “ওরে ব্যঘ্র সন্তান, তুই আমার পিতাকে হত্যা করলি!!”
শিকারির দেহে আঘাত নেই। নিঃশব্দ তড়িৎ-গতিতে জোয়ান বাঘটি নিমেষে পিছন থেকে এসে টুঁটি ছিঁড়ে নিয়েছে। তারপর প্রস্থান করেছে অচঞ্চল পদক্ষেপে। ঘৃণায় শিকারির দেহ দ্বিতীয়বার স্পর্শমাত্র করেনি।
ভোরের আলো ফুটেছে ততক্ষণে। ঊষার মঙ্গলকিরণ ছড়িয়ে পড়ছে বনভূমিতে। রোজই পড়ে। সেই আদিম প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এমনই অকৃপণ মঙ্গলালোক প্রত্যহ ছড়িয়ে পড়ে অরণ্য পর্বত সাগর সমতলের সর্বত্র। সে শুভকিরণ কিন্তু মানুষের কাছে বড় অসহায়। সে কিরণ কিছুই করে উঠতে পারে না, পারেওনি কোনোদিন। অরণ্যই হোক বা জনপদ, লোভ-লালসা-অহং-হিংসা-প্রতিহিংসা পিতামহ থেকে পিতা, পিতা থেকে পুত্র, পুত্র থেকে তস্য পুত্রের মনে প্রতিসারিত হয়ে চলেছে। এ পরম্পরা কবে যে শুরু হয়েছিল তা জানা নেই, শেষ যে কবে হবে তাও কেউ জানে না।
শিকারির নিষ্প্রাণ শরীরটি পাঁজাকোলা করে শিকারিপুত্র লোকালয়ের দিকে রওনা দিল। চলতে চলতে সে দাঁতে দাঁত চিপে বারবার প্রতিজ্ঞা করছে, “ওরে ব্যাঘ্রপুঙ্গব, তোকে আমি ছাড়ব না। তোকে আমি শেষ করবই করব।”
তার কেশে বেশে লুটিয়ে পড়েছে সকালের সেই মঙ্গলালোক। হয়তো সে আলো বলতে চায় ওরে বাছা শোন, একটু শোন, অমন কথা বলিস না! ওতে শত্রুতা বেড়েই চলবে, একটুও কমবে না রে …

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন