বিয়ের গান
দুই মনের মিলনের উৎসবে, মানুষের মেলায জড়িয়ে থাকে সুর, কথা, কথোপকথন, প্রেম, আনন্দ। বিবাহ হল সেই প্রাচীন রীতি, যেখানে দুই চোখের মিলন, দুই মনের যুগলবন্দী, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয় গান, গানের মধ্যে জড়িয়ে থাকে বিষয়ভিত্তিক কথা। অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রাসঙ্গিক কথার মধ্যে দিয়ে বিবাহের বিভিন্ন পর্যায়ের চালচিত্র একসময় তুলে ধরা হত এই বিয়ের গানে। যেখানে বিয়ের প্রাক_প্রস্তুতি পর্ব থেকে একেবারে শেষ আচার পর্যন্ত খুঁটিনাটি বিবরণ গাঁথা থাকত এই গানে। মহিলারাই এই গানের একমাত্র ধারক বা স্রষ্টা ছিলেন। দল বেঁধে ছন্দবদ্ধ ভাবে তাঁরা গান গাইতেন। এখনও সেই রীতি বেশ কিছু জায়গায় প্রচলিত থাকলেও, বিয়ের গানের সেই ঐতিহ্য আজ বিলুপ্তির পথে। বৈশাখ উদযাপন পয়লা বৈশাখ দিয়ে শুরু হলেও, শেষ হয় বিয়ের মরসুম দিয়ে। বিয়ের মরসুম শুরু হয়ে গেছে। হেমন্ত ক্ষণস্থায়ী ঋতু হলেও, বিয়ে নামক চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত শুরু হয়ে যায় এই ঋতু থেকে। তারপর শীতের অলিন্দে আলগা রোদ আর বর কনের আলগা প্রেমের ঘনত্ব বাড়তে থাকে শীতের আমেজ দিয়ে। তার প্রস্তুতি পর্ব শুরু।
যদিও বিয়ের মরশুম অবশ্য চৈত্র
সেলের কেনাকাটায় নতুন বছরের উৎসবের ছোঁয়া দিয়েও শুরু হয়। চৈত্র সেলে নববর্ষের উপহার
আর বিয়ের কেনাকাটার জন্য ভিড়, আমোদ প্রমোদের তরী ভাসিয়ে দেওয়া হয় গ্রীষ্মের খরতাপে।
তাই সেইটার গ্রীষ্ম এই দুই ঋতু জুড়ে বিয়ের মরশুম জুড়ে থাকে। তবে একটা সময় ছিল যখন
এই বিয়ের প্রস্তুতি পর্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকত "বিয়ের গানে"র ঐতিহ্য।
বিয়ের গান ছাড়া বিয়ের মরশুম ভাবাই যেত না। সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে সেই গানের চরিত্র। বদলেছে সামাজিক রীতি নীতির চেহারাও। কানাডার ছেলের সাথে যখন অস্ট্রেলিয়ার মেয়ের বিবাহ সম্পন্ন হয় কলকাতারই কোনও পাঁচ তারা মহলে, তখন তার আনন্দের চেহারা কি লৌকিক বা আঞ্চলিক থাকে? বিয়েতে এখন প্রবেশ করেছে প্রাচ্য পাশ্চাত্যের মেলবন্ধনে তৈরি হওয়া ফ্যাশনের কারিশমা। বাঙালি সংস্কৃতি থেকে সরে গিয়ে এখন বরকনে পড়ছেন ভিন্ন ঘরানার ভিন্ন সংস্কৃতির পোশাক-আশাক।
বিয়ের গানের জায়গায় প্রবেশ করেছে
ফিউশন মিউজিক। ডিজের গান।
ভোজনরসিক বাঙালীর কলাপাতায় চেটেপুটে
খাওয়ার সেই জিভে জল আনা চেহারাটাই এখন উধাও, ঠিক যেরকম ভাবে লোকসংস্কৃতির অন্যতম আকর্ষণ,
অঙ্গ ও বিশেষ ধারার বিয়ের গানও হারিয়েছে তার জাকজমক, জৌলুস। এখন বিয়ের আনন্দ উৎসবের
সাথে জড়িয়ে গেছে বাজার চলতি জনপ্রিয় কিছু হিন্দি গান, ব্যান্ডের গান, পাঞ্জাবি ভাঙ্গরা
স্টাইল, অথবা কোনও বাংলা গান, কিংবা ভাইরাল হওয়া কোনোও মিউজিক ভিডিও। সে সব গানের সাথে
কোমর দুলিয়ে নাচের হিড়িকও তো কম নয়। সামাজিক
রীতি অনুযায়ী, প্রচলিত ধারাকে বা সংস্কৃতিকে বহন করে যাওয়াটাই রীতি বা রেওয়াজ হওয়া
উচিত ছিল। কিন্তু সেই প্রথাকে ভেঙে প্রযুক্তির যুগে আধুনিকতার মোড়কে এখন বিয়ের গানের
মধ্যে ঢুকে পড়েছে বিদেশি সুর, বাংলা ব্যান্ডের সুর অথবা অন্য কোন বাজার চলতি সুর।
বৈশাখ মানেই তো শুধু আম পোড়া শরবত, নানা স্বাদের আম, হালখাতা, মিষ্টিমুখ চৈত্রসেল কিংবা রবি ঠাকুরের হরেক রকমের বৈশাখী গান বা কবিতাই তো নয়, এর পাশাপাশি আরেকটি বিশেষ উৎসব তা হল বধূবরণ। একটা সময় ছিল যখন অনেক আগে থেকেই বিবাহের প্রস্তুতি শুরু হয়ে যেত। যাকে বলে বিবাহ প্রাক প্রস্তুতি পর্ব। এই পর্বের মুখ্য চরিত্র ছিল বিয়ের গান। বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান অনুযায়ী বিয়ের গান বাধা হতো। আর এই গানকে ছন্দবদ্ধ করে বিভিন্ন ফরম্যাটে বেঁধে ফেলতেন একদল মহিলা। আশীর্বাদ থেকে শুরু করে দ্বীরাগমন পর্যন্ত প্রতিটি আচার অনুষ্ঠান নিয়ে তৈরি হত 'বিয়ের গান'।.গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে নাপিতের মুখ থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী
এক পক্ষ অন্য পক্ষকে নিয়ে মজাদার
গান বাঁধতেন। গান বাঁধতেন অন্তঃপুরের মহিলারা। ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের বিয়েতে ভিন্ন রকম
গানের প্রচলন আচার অনুষ্ঠানের তফাৎ থাকলেও মেজাজটাই তো আসল রাজা গানের মুড সেই আনন্দের
ধারাকেই বয়ে দিয়ে যায়। একটা সময় যখন হিন্দুদের বিয়েতে মেয়েলি আচার অনুষ্ঠানের
প্রধান অঙ্গই ছিল মঙ্গল গান মঙ্গল অর্থাৎ যা কল্যাণময় দুই মনের মানুষের কল্যাণ সাধনে
ব্রতী ছিলেন সবাই আর গানের মধ্যে দিয়েই সে মঙ্গল সাধন ঘটানো হতো। এই অনুষঙ্গ অন্যান্য
ধর্মাবলম্বীদের বিয়েতেও যুক্ত হয়েছিল পরবর্তীকালে।
এবার আসি গ্রামের কথায়। গায়ে
হলুদের সময় গাওয়ার জন্য 'গীত গাওনি' মহিলাদের ডাক পড়তো দূরদুরান্ত থেকে। এখন এই
গানের ধারা প্রায় অবলুপ্তই বলা চলে। তবুও প্রত্যন্ত গ্রামের এখনও বেশ কিছু জায়গায়
গীতগাওনি গাওয়া হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম মুখে মুখে এই গান গেয়ে আসছেন মহিলারা যা
আঞ্চলিক ভাষায় রচিত থাকে বড় হয়ে তারাও গাইতে থাকে এবং সেই গান পৌঁছে যায় মানুষের
মুখে মুখে মূল গানের সঙ্গে সময়ের বিবর্তনের ছায়া কিছুটা হলেও এখন জড়িয়ে গেছে। কিছু
সংযোজন বিয়োজন ঘটলেও মূল গানের আস্বাদন কিন্তু একই থেকে যায়। বিয়ের গানের রচয়িতা
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিলেন নারীরা তারাই গান পরিবেশন করতেন। নারী মনের আবেগ উৎকণ্ঠে
আনন্দ বেদনা হাসি কান্না সুখ-দুঃখের তীব্র অনুভূতি প্রকাশভুক্ত এই গীত গাওনি গানে পাশাপাশি
নতুন বরকোণের জীবনের পরম সুখানুভূতির প্রকাশটুকু মিশে থাকত এই প্রচলিত সুরে ও কথায়। বর কনের উদ্দেশ্যে যেসব গীত বা গান গাওয়া হত, তার
মধ্যে প্রচলিত একটি গীত বা গানের কথা এখানে লিপিবদ্ধ করলাম-
কালা বাইগুনের ধালা ফুল
রুমালে গাথিয়া তুল
কইনা লো তোর দয়াল বাবাজির মায়া
তুল বরির গাছে কুমড়ার ফুল
রুমালে গা্থিয়া তুল
বিয়ের গান মানে কি শুধু আনন্দের
গান বা উৎসবের ছোঁয়া? সেখানেও আছে বিষাদেরও সুর। আছে বিরহের সুর। যেমন আগমনী ও বিজয়ের
গানেও আমরা পাই বিষাদের মূর্ছনা। বাপের বাড়ি ছেড়ে
শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় কনের
মনের যে কষ্ট বা বেদনা তার নিদারুণ বর্ণনা পাওয়া যায় এই বিয়ের গানে। বিয়ের গানের
একটি বিশেষ স্তর হল 'কনে বিদায়ের গান'... যে গান শুনলে চোখের জল বাঁধ মানে না।
মন কিন্দাইলাম বনে বনে
আরো কান্দন কান্দে ঘুমায় ও বনে
বনে আরো কান্দনে কান্দে গো মায় ও বনে বনে
আরো কান্দন কান্দে গো মায় ও নিরলে
বসিয়া'...
পাশাপাশি রয়েছে 'বরকনের গান'…
যেখানে বর তার কনেকে অনুরোধ করছে সঙ্গে যাওয়ায় জন্য। কিন্তু কনে বলছে বরের দেশে ভাতের কষ্ট, কাপড়ের কষ্ট আছে কিনা? বর তাকে আশ্বস্ত করছে। কনের যাতে কোনোও ধরনের কষ্ট না হয়,
তার জন্য সে সব ব্যবস্থাই নেবে
প্রেম-ভালোবাসা, বিরহ, আনন্দ, বেদনা বিষাদ, বিদায় এই সবকিছু জুড়ে রয়েছে মানুষের
জীবন। সেই জীবনের গল্প গাঁথাই তুলে ধরা হয় "বিয়ের গানে"।
যেমনভাবে বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য
অধ্যায়" শাক্ত-পদাবলী"র আর এক উল্লেখযোগ্য গানের ধারা আগমনী ও বিজয়ের গানেও
পাওয়া যায় সেই বিষাদ বেদনা ও আনন্দের সুর। শাক্তপদাবলীর দুটি ধারা। একটি হল
"উমাসঙ্গীত" আরেকটি "শ্যামাসংগীত", যেখানে রয়েছেন উপাস্য এবং
উপাসক। উমাসংগীতে যেমন উমার জীবনের পাঁচালী এবং মা মেনকার ব্যাকুলতা তীব্রভাবে তুলে
ধরা হয়েছে, যা বাঙালি জীবনের চিরকালীন এক বিরহের ছবি। তেমন পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে
মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘরোয়া কাহিনী। সমসাময়িক যুগ ও জীবনের করুণরসের অভিব্যক্তি
ঘটে আগমনি ও বিজয়া গানে। এটা ঠিকই বিয়ের গানে জড়িয়ে নেই কোন পৌরাণিক কাহিনী বা
দেব দেবীর কথা। তবে এখানেও গ্রাম বাংলার অতি বাস্তব চিত্র। জীবনের চলচিত্র তুলে ধরা
হয়েছে।রয়েছে নারীর অন্তরের খুঁটিনাটি।
বিয়ের গানের বিভিন্ন ধারার মধ্যে
সিলেট অঞ্চলের ধামাইলের উল্লেখ করা যেতে পারে যে কোন মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে গীত নৃত্যের
মধ্যে দিয়ে এই ধামাইল অঙ্গের গান পরিবেশিত হয়। বর্তমানে এখনও সনাতন বিয়ের অনুষ্ঠানের
অধিক প্রচলন, যা সর্বাধিক প্রচলিত এবং প্রসারিত সিলেট অঞ্চলে। সিলেট অঞ্চলে এর জনপ্রিয়তা
থাকলেও, পার্শ্ববর্তী জেলা সমূহ বিশেষ করে নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণ বাড়িয়ার
কয়েকটি উপজেলায় এই গানের প্রচলন দেখা যায়। একটি বিখ্যাত ও বহুল প্রচলিত ধামাইলঙ্গের
গানের কথা মনে পড়ছে-
লীলাবালি লীলাবালি
বড় যুবতী সই গো
বড় যুবতী সই গো
কি দিয়া সাজাইমু তোরে"...
প্রায় চারশ, সাড়ে চারশ বছর আগেকার
রচিত এই গান যা মুখে মুখে প্রচলিত হয়ে আসছে। যা আজও অত্যন্ত জনপ্রিয় ও প্রাসঙ্গিক।
বিভিন্ন চলচ্চিত্রে মঞ্চে এই গান ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি আসলে একটি মুসলিম বিয়ের গীত।
ধামাইল অঙ্গের গান। নৃত্য সহযোগে পরিবেশিত হয়। বিশিষ্ট লোক সঙ্গীতশিল্পী ও গবেষক লোকসংগীত
গবেষক ডঃ অভিজিৎ বসু জানালেন এই কথা। আরো জানালেন হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েতেও যা
আনন্দের সঙ্গে নৃত্য গীত সহযোগে পরিবেশিত হয় এবং মুসলিম সমাজের বিয়েতেও তাই। অর্থাৎ
এই গানটি সর্ব ধর্মের সমন্বয়ের কথা বলে। অনেকে বলেন এই গানের রচয়িতা ও গীতিকার রাধা রমন দত্ত। কিন্তু এত বছর পরেও এই
গানটির রচয়িতা সুরকার সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। রাধারমন দত্ত অসংখ্য ধামাইল
গানের জনক।তিনি একাধারে বাংলা সাহিত্যিক, সাধক কবি, বৈষ্ণব বাউল, ধামালি নৃত্য গীতের
প্রবর্তকও বটে। তার রচিত ধামাইল গান সিলেট ও ভারতের বাঙ্গালীদের কাছে অধিক সামাদৃত
যা সমবেত নারী কন্ঠে গাওয়া হয় এবং বিয়ের গানের একটি বিশেষ অঙ্গ হিসেবেই ধরা হয়ে
থাকে। আরেকটি অত্যন্ত জনপ্রিয় বিয়ের গান'
কুঞ্জ সাজাও গো' যা বাসর শয্যার সময় গীত হয়ে থাকে। হিন্দু সমাজে বিয়ের গান হিসেবে
প্রচলিত অত্যন্ত জনপ্রিয় এই গানটিও সর্ব ধর্মের উজ্জ্বল নিদর্শন।
শাহ আব্দুল করিম রচিত এই গানটি
এতটাই জনপ্রিয় বর্তমানের বিয়ের আসরেও অধিক সমাদৃত। এই গানের সমাদর সমাজের প্রায়
সর্পস্তরে। এটি ধামাইল অঙ্গের গান একসময় ধামাইল নৃত্যের সঙ্গেও এই গানটি গাওয়া হতো।
যুগ যুগ ধরে মুখে মুখে এই গানটি গেয়ে আসা হচ্ছে। লোক সাহিত্যের এমন অনেক লোকসংগীত
আছে যা শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য নয়, মুসলিম সমাজেও গৃহীত হয়েছে এবং অন্যান্য ধর্মেও
যা বহুল প্রচলিত। আসলে লোকসংগীত কোন নির্দিষ্ট ধর্মের কথা সবসময় বলে না, সম্প্রীতির
কথাও বলে। লালন সাঁই থেকে হাসন রাজা রাধারমন দত্ত থেকে শাহ আব্দুল করিম সকলেই সম্প্রীতির
কথাই বলেছেন। বলেছেন মানব ধর্মের কথা।
মধ্যযুগের কবিদের একাধিক কবিতা সাহিত্যে 'ধামালি' শব্দের ব্যবহার পাওয়া যায়। যা বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে ব্যবহৃত হয়েছে। মহাকবি সঞ্জয় রচিত মহাভারতেও ধামালীর ব্যবহার পাওয়া যায়। মরমী কবি রাধারমন দত্ত এই ধামাইলের বিকাশে বড় ভূমিকা নিয়েছিলেন। পল্লী নারীর হৃদয়ের গভীর আকুতিকে রাধা কৃষ্ণের চরিত্রের মধ্যে দিয়ে অত্যন্ত সুচারুভাবে প্রকাশ করেছেন তিনি। যা বিয়ের গানের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে বহুবছর ধরে। হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বিয়ের বিভিন্ন পর্বে বিশেষ করে মঙ্গলাচরণ, গায়ে হলুদ, জলভরা, দ্বিরাগমন প্রভৃতি উপলক্ষে ধামাইলের আয়োজন করা হয়, যার পরিবেশন রীতি সম্পূর্ণ আলাদা। ছন্দব্ধ করতালির মাধ্যমে তাল এবং লয়কে নিয়ন্ত্রণ করা হয়. হাওড়া অঞ্চলে করতালি কে বলা হয় থাপা। বাকিরা কণ্ঠ মেলান এবং নৃত্য সহযোগে ঘুরতে থাকেন. এই গানের বিভিন্ন রকম পর্ব হচ্ছে
বন্দনা
আসর
বাঁশি
জলভরা
গৌর রূপ
শ্যামরূপ
বিচ্ছেদ
কোকিল সংবাদ
মানভঞ্জন
মিলন
সাক্ষাৎ খেদ
বিদায়
আউট গান
মূল বিষয়বস্তুর মধ্যে রাধাকৃষ্ণের
প্রেম কাহিনী থাকলেও, বিয়ের গানের মধ্যে বরকনেকে সেই রাধা কৃষ্ণের রূপেই দেখা হয়।
খালিয়াজুরির নয়াগাঁও গ্রামে মহুয়া ধামাইল দল তারা দীর্ঘদিন ধরে এই গান পরিবেশন করে
আসছেন। প্রচার ও প্রসার করে আসছেন এই ধামাইল গানের। বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়াও করিস এই
জন্য আমার কাজ। বিয়ের অনুষ্ঠান ছাড়াও নবজাতকের ষষ্ঠী মাসিক ব্রত অন্নপ্রাশন সীমন্ত
সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এই ধামাইলের আয়োজন করা হয়ে থাকে।
গ্রামীণ বাংলার গান মানে জাদুর
স্পর্শ। বিষয় ভেদে, অঞ্চল ভেদে, ভাষায় বদল, সুরও বদলে যায়। বৈচিত্রের সমাহার ভাদু,
চটকা, ভাটিয়ালি, আকরাই, ঝুমুর, গম্ভীরা, কীর্তন, পাশাপাশি রয়েছে বিয়ের গান যা বিষয়বৈচিত্র্যে
এক অসাধারণ মাধুর্য রেখে যায়। এই গানের অঙ্গ হিসেবেই রয়েছে কনে সাজানোর গান, কনে
বিদায়ের গান, আলপনার আলাদা গান, যে সমস্ত গান মহিলারাই বাঁধেন পরিবেশন করেন এবং শ্রোতাও
সেখানে মহিলা। রয়েছে জল আনার গান যা অত্যন্ত মজার এবং খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কাহিন্দু
রীতির বিয়েতে স্ত্রী আচার যেরকম থাকে সেরকমই আরেকটি আচার হল জলভরা"। বিয়ের দিন
বর কনেকে স্নান করানোর জন্য বাড়ি থেকে এও স্ত্রীরা কাছাকাছি কোন নদী বা পুকুর থেকে
জল নিয়ে আসেন। নিয়ম অনুযায়ী বিজোড় সংখ্যায় মেয়েরা থাকবেন। সাত অথবা নয় জন কিংবা
এগারোজনের মত মহিলারা যেতে পারবেন ঘাটে। কাছে থাকবে কলসি আর সেই সঙ্গে বিয়ের আরোও
বেশ কিছু উপকরণ থাকবে। এরপরে শুরু হবে জল ভরার গান এই গান গাওয়া হয় ঘাটে গিয়ে উলুধ্বনি
দেওয়া হয়। শঙ্খ বেজে ওঠে চটুলতা, রসিকতার মিশ্রণে সাজানো এই গানে কখনোও রাধা কৃষ্ণের
উপমাও উঠে আসে। যেরকম-
"ওগো সাঝের বেলা কে তোরে
জল আনতে বলেছে
কে জল আনতে বইলাছে
ঘরের জল বাইরে ফেলে যমুনার জল আনতে
গেলে
না জানি কোন কালার সনে প্রেম মইজাছে'...
রাধাকৃষ্ণের লীলার সঙ্গে গ্রামীণ মেয়েদের সুখ দুঃখের কথা মিলিয়ে অসাধারণ অভিব্যক্তি প্রকাশ পায় এই গানে। দৈনন্দিন জীবন যাপনের নানান খুঁটিনাটি ছবি উঠে আসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে। বাংলার সংস্কৃতিতে বিয়েতে বরাবর বিয়ের গান বা বিয়ের গীতের প্রভাব। একসময় বিয়েতে আমন্ত্রিত বউদের বলা হত বিয়ের গান গাইবার জন্য। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই রকম। আগেই সিলেট অঞ্চলের কথা বলেছি রংপুরের চিত্রটাও একইরকম। আবার টাঙ্গাইলেও তাই। আগে গীতগাওনি মহিলাদের ডাক পড়ত।
শুধুমাত্র হিন্দু রীতিতে কেন মুসলিম
সমাজেও এই বিয়ের গান অধিক প্রচলিত ছিল যা এখনো ব্যাবহৃত হয় বেশ কিছু জায়গায়। শুধু
চিত্ত বিনোদনের জন্যই এই গান নয়, মুসলিম মহিলাদের নানান সুখ দুখ বেদনা যন্ত্রণা আনন্দের
কথা ও প্রকাশিত হয় এই গানের মধ্যে দিয়ে। নানান প্রথা ও পরম্পরার কথা প্রকাশিত হয়
বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন ধরনের আঞ্চলিক রীতি আছে। সেই অনুযায়ী বিয়ের গীত
পরিবেশিত হয়। বর আসার অনেক আগে থেকে শুরু হয় এই গান। নানা স্তরের নানা পর্যায়ের
গান। বর আসার আগে প্রতিবেশীরা বলেন এই গানের কথায়-
"দুলহান সাজাও আম্মা খুবসুরত করিয়া
দামান আসেছে দেখি পাগড়ি নাড়িয়া"...
মা তখন প্রতিবেশীদের উত্তর দিয়ে বলছেন আসুক নারী পুতার দামান চিন্তার ন্যায় কিছু কামরাঙ্গা রঙ পার্টি পিঁধে বেটি যাবে পিছু পিছু। মেয়ে মহলে বরের রূপ বর্ণনা করার একটা রেয়াজ আছে সব সম্প্রদায়ের মুসলিম গিতের মধ্যেও সেই একই রেওয়াজ-
"কোথায় গিলা পুতের মা
দামান দেখো আইয়া
রূপের বান ডাইকা দিল কত মিষ্টি
লইয়া"
কিছু গান প্রচারিত আবার কিছু মুখে মুখে ও রচিত হয়ে জনপ্রিয় হয়েছে এ বিয়ের গীতার সঙ্গে তালবদ্ধ হিসেবে থাকে বাংলা ঢোল বা মাদল মহিলারা এই বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে থাকেন। এক সময় বর্ধমান জেলার পিন্দিরা গ্রামে আমিনা বিবির লেখা একটি বিয়ের গীত খুবই জনপ্রিয় হয়। প্রথম পংক্তি ছিল-
"কেন ভাঙলি রে তুই চারা গাছের
আম ওরে বেহুদা গোলাম"
সম্প্রতি গবেষক লেখিকা মনোয়ারা
খাতুনের গবেষণাধর্মী একটি বই প্রকাশ পেয়েছে যেখানে বাঙালি মুসলিম সমাজের উৎপত্তি বিস্তার
এবং প্রসারের পটভূমিতে খুব সুন্দর এবং সাবলীল ভাবে মুসলিম বিয়ের গানের বিষয়টি তুলে
ধরেছেন তিনি। বইয়ের মুখবন্ধ এবং লেখিকার নিজের কথা থেকে জানা যায়, বিয়ের গীতের সংস্কৃতি
তার পরিবারগত এবং একইসঙ্গে ঐতিহ্যগত। মুসলিম সমাজের অন্তর্ভুক্ত একজন যিনি ওই সংস্কৃতির
ধারক বাহক তিনি নিজেই যখন তাঁর সংস্কৃতি সম্পর্কে লেখেন, তার একটা আলাদা গুরুত্ব অবশ্যই
থাকে। কারণ তিনি সমাজের ভেতর থেকে সেই সংস্কৃতিকে দেখতে পারেন।
মনোয়ারা খাতুনের রচনার ভিতরে আছে
"আমাদের গাওয়া, চারপাশের এবং দূর দূরান্ত থেকে সংগ্রহ করা বিয়ের গীতগুলোর আমি
একজন উপস্থাপক মাত্র। এই গ্রন্থের আমি কথক, গীত আসরের গুণমুগ্ধ দর্শক, গায়ক আবার নায়ক।
'কত কথা হলো বলা কত কথা'...”। বাকি পর্যায়ে কথা বলেছেন গবেষক লেখিকা মনোয়ারা খাতুন।
তার সংযোজন- "এই সমস্ত মেয়েলী গীতগুলো নারীদের রচনা। এই গীত, সংস্কৃতির স্রষ্টা,
ধারক এবং বাহক মুসলিম নারী সমাজ। মৌলিক অলিখিত এক ঐতিহ্যকে বয়ে চলেছে তারা যুগের প্রভাবে
ভাষার পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু মূল কাঠামোটি অটুট আছে"।
গ্রন্থটি কেবল সংগ্রহ ও সংকলনমূলক
নয়, বিশ্লেষণমূলকও বটে। যা পাঠকদের অবশ্যই সমৃদ্ধ করবে মুসলিম সমাজের লোকসংস্কৃতি ও বিয়ের গান সম্পর্কে জানতে।
বাঙালি মুসলিম সমাজে লোকসংস্কৃতির বেশিরভাগটাই ধরে রেখেছেন মুসলিম মহিলা সমাজ অধ্যাপক
ডক্টর মকবুল ইসলাম বলেছেন ইসলামী মূল্যবোধের সঙ্গে বাঙালি সংস্কৃতির লৌকিক রূপটিকে
আঁকড়ে রাখার যাবতীয় কৃতিত্ব মুসলিম মহিলা সমাজেরই প্রাপ্য।
বিবাহ কেন্দ্রিক আচার অনুষ্ঠান
সংস্কৃত ধারার একমাত্র সম্রাজ্ঞী তারাই। তার কথায় মুসলমান মাত্রাটিকে সরিয়ে রাখলে
বলতে হয় পরিবারে এবং সমাজে নারীর এক রকমের প্রান্তীয়তা আছে আর তার দিকটা হল অন্তর
প্রান্তীয়তা বা ইন্টারনাল মার্জিনালিটি। পাশাপাশি জনপ্রিয় বা প্রচলিত বাংলা আধুনিক
গানের সুরেও এই বিয়ের গান রচিত হয়। স্বর্ণযুগের আধুনিক বাংলা গান ও তার সুর ভীষণভাবে
প্রভাবিত করেছিল একসময় মুসলিম বিয়ের গানকে। যেমন শ্যামল মিত্রের গাওয়া-
"কি নামে ডেকে বলবো তোমাকে"
এই গানের সুরে সেরিনা বিবি একসময়
বেঁধে ফেলেছিলেন বিয়ের গীত-
"কি নামে ডেকে বলবো বিয়াইকে
তোমার ছোট মেয়ে দিবে আমাদের ঘরে
ঘড়ি নিব, সাইকেলে নিব, নিব মাকুরি
বউ হবে ছোট পাড়া খুব সুন্দরী"
একটা সময় মুসলিম সমাজে এই বিয়ের
গীত ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। লোকসংস্কৃতির এক বিশেষ অঙ্গ
"বিয়ের গীত" বা “বিয়ের গানে"র যে অপার সৌন্দর্য বা অলঙ্কার, আজকের প্রজন্ম তা যেন অনুধাবন
করে। বাংলার এই লোক সংস্কৃতিকে যেন বাঁচিয়ে রাখেন। ভিন্ন সংস্কৃতিকে গ্রহণ মানে নিজের
সংস্কৃতিকে হারিয়ে ফেলা নয়। তাকে ধারণ করে লালন করা আজীবন।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন