![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
অজ্ঞাতসারে
রোজ নিয়ম মেনেই জীবনযাপন করে যে লোকটা, একদিন সে-ও এমন একটা কান্ড করে ফেলতে পারে যে, অবিশ্বাস্য লাগে। এই যেমন অনিমেষের কথাই ধরুন। অফিস পিকনিকে গিয়ে কয়েকজন কোলিগের পাল্লায় পড়ে অনিমেষ সেদিন বেশ কয়েক পেগ খেয়ে ফেলল। যেহেতু অনভ্যস্ত, যথারীতি নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রইল না। কিন্তু তাই বলে উল্টোপাল্টাও কিছু করে ফেলল না। শুধু হঠাৎ ও ঘোষণা করে বসল, ও একটা গান গাইবে। মাতালকে নিয়ে খুব খিল্লি হবে ভেবে অনেকেই উৎসাহ দিল সোচ্চারে। প্রিয়বন্ধু গোপাল লজ্জায় মুখ লুকোলো। অনিমেষকে মদ খাওয়ানোয় সবচেয়ে যার বেশী ভূমিকা ছিল, সেই সুভাষ জড়ানো গলায় বলে উঠল – “বিনে পয়সায় মাল খাওয়ালাম, এটুকু ফেরত দিবি না, তা কি হয় রে!”
অনিমেষ ফেরত দিল। সাঙ্ঘাতিকভাবেই
ফিরিয়ে দিল ধুনকির সবটূকু। উদাত্ত গলায় ও যখন গেয়ে উঠল “ও যে মানে না মানা” - একটুও
গলা কেঁপে যাচ্ছে না, সুর লাগছে ঠিকঠাক, উচ্চারণেও কোন জড়তা নেই, এমনকি শুদ্ধ গায়কীতে
যেন এক মগ্ন তাপস আনমনে স্তোত্রপাঠ করছে। কেয়া বেশ ভালো গায়। ও স্বগতোক্তি করে উঠল
– “যেন বিক্রম সিং খাঙ্গুরা!” রবীনবাবুর মত নাক-উঁচু মানুষও স্বীকার করে নিলেন – “সত্যিই
অপূর্ব! চুপচাপ ছেলেটার মধ্যে এই গুণের কথা কে জানত!” সুভাষ, যাকে সবাই ‘বিচ্ছু সুভাষ’
বলে ডাকে, সে পর্যন্ত চুপ করে গেছে। ঋতজা বলে উঠল, “থ্যাংকস সুভাষদা। তোমার জবাব নেই।
অনিমেষদার এই গুণটার কথা আমরা জানতেই পারতাম না, তুমি যদি না ওকে আজ…”
পিকনিকে চর্চিত বিষয় হয়ে উঠল অনিমেষ। মোট তিনটে গান গেয়েছিল। প্রথমটি ছাড়াও “হৃদয়ের একুল ওকুল দুকুল ভেসে যায়” এবং “আজি ঝরের রাতে তোমার অভিসার”। পরিবেশ পরিস্থিতির সঙ্গে হয়ত সেভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল না, কিন্তু গান গেয়ে ও সকলের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠল অচিরেই। সারাদিন অফিসে চুপচাপ থাকা মানুষটা যে ভেতরে এত দরদ দিয়ে আগলে রেখেছে রবীন্দ্রনাথের গানকে, কে জানত! গান শেষ করে যখন ওর দুচোখ দিয়ে নিঃশব্দ অশ্রু গড়িয়ে নামছিল, সকলে ধরে নিল ওর ভেতরে নির্ঘাত কোন ব্যথা আছে, যে ব্যথারা গোপন থাকতে থাকতে আজ দুর্বল ফাটলের চিলতে দিয়েই বেরিয়ে এসেছে। কিংবা অনিমেষ নিশ্চয়ই ধাক্কা খাওয়া একজন, যে নিজের দুঃখের শরিক করতে চায় না কাউকেই। বা হয়ত কোন শপথ ছিল – কোনদিন গান গাইবে না। আজ বেসামাল হয়ে ভেঙে গেল সেই দার্ঢ্য। অনিমেষের থেকে যেহেতু কিছুই জানা গেল না, আলোচনা ঘনিয়ে উঠেও আস্তে আস্তে থিতিয়ে গেল, যেভাবে সবকিছুই একদিন আপাত সুপ্তিতে চলে যায়।
শনিবারের পিকনিকের পর রোববার এমনিতেই ছুটি, আর সোমবার কোম্পানীর প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুবার্ষিকী ছিল বলে অফিস ছুটি ছিল। সেভাবেই পিকনিক অ্যারেঞ্জ করা হয়েছিল। ফলে আবার মঙ্গলবার সবাই অফিসমুখো হল। খুব স্বাভাবিকভাবেই গোটা অফিস অনিমেষকে নিয়ে পড়ল। প্রশংসায় ভরে যেতে লাগল ও। সেই সঙ্গে গভীরে ডুব দিয়ে দুএকটা মণিমাণিক্য পাওয়ার খোঁজেও একেকজন উৎসুক হয়ে পড়ল। অনিমেষ লজ্জায় মরে যেতে লাগল। সবার খোরাক হয়ে ওর এত অস্বস্তি হচ্ছিল! কী যে বিশ্রী একটা কান্ড ঘটে গেল!
বস ঢুকলেন পৌনে একটা নাগাদ। ঢুকেই
অনিমেষকে ডাকলেন চেম্বারে।
“আপনি হয়ত আন্দাজ করতে পারছেন,
আমি কি বলব?”
বসের কথায় মুখচোরা মানুষটা কী আর
বলবে। মুখটা নীচু করে চুপ করেই রইল।
“শুধু একটা কথা বলি অনিমেষবাবু,
গানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়াবেন না। কী, কেন, কীভাবে এসব কিছু জানতে না চেয়েও বলছি, আপনি
পেরেছেন”।
অনিমেষ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালো
বসের দিকে।
“আমি সবই জানতে পারলাম। মৌলী আমায়
সবই বলেছে। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে ও আমার কাছে কার্যত ভেঙে পড়েছিল। ঘটনাটা শুনে ওকে
সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া কিছু করারও ছিল না। আপনার জন্য কষ্টও হচ্ছিল। কিন্তু যা ঘটবেই,
তাকে আমি আপনি বদলে দিতে পারার কে?”
এরপর অনেকক্ষণ দুজনের মধ্যে কোন
কথা রইল না। অনিমেষের মনে হচ্ছিল, কোম্পানির মালিক ও তাঁর কর্মচারীর মধ্যে এরকম একটা
সংযোজক অভিপ্রেত নয়।
চেম্বারের বাইরে তখন জোর আলোচনা
চলছে, অনিমেষ কি বসের কাছে ঝাড় খাচ্ছে? নাকি ওর সুপ্ত প্রতিভার কথা জানতে পেরে বস খুশী
হয়েছে ইত্যাদি প্রভৃতি।
অনিমেষ বেরিয়ে এল। দরজাটা নিজে
থেকেই বন্ধ হয়ে গেল। ওর নিস্পৃহ মুখ দেখে কেউ কিছু ঠাহর করতে পারল না ভেতরে ঠিক কী
ঘটেছে। ততক্ষণে লাঞ্চ আওয়ার এসে গেল। অনিমেষ ওর কমপিউটারে বসে একটা চিঠি টাইপ করছিল। গোপাল এসে ডাকল – “কিরে, যাবি
না?”
“না রে, আজ একটু বেরোব। বসের কাছে
ছুটি চেয়ে নিলাম। সেই প্রেয়ারটাই লিখছি। জমা দিয়েই বেরিয়ে যাব। তুই লাঞ্চ করে নে”।
“কিছু হয়েছে?”
গোপাল অনিমেষের কাছে এভাবে জানতে
চাইতেই পারে। অনিমেষও পারত ওকে জিজ্ঞাসা করতে।
সুভাষ চলে গেল।
অনিমেষ চিঠিটা রিসিভিংয়ে জমা দিল। এরপর ধীরপায়ে বেরিয়ে এল অফিস থেকে। কোন তাড়াহুড়ো নেই… পিছুটানও রইল না…
_

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন