কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

রামতনু দত্ত

 

কবি ও শব্দসাধনা

 


শব্দই ভাষার মূল। কবির রয়েছে নিজস্ব ভাষিক জনসমাজ। এছাড়াও আছে প্রকৃতি ও পশুপাখি কীটপতঙ্গের জগৎ। তাও  ছাড়িয়ে আকাশ। শব্দগুণসম্পন্ন  নীলাকাশ বা দিনে সূর্য, রাতে গ্রহতারাদের মহাবিশ্ব মহাকাশ। সবকিছু ছাড়িয়ে নিঃসীম মহাশূন্য। এর বাইরেও থাকে ধারণার জগৎ, জ্ঞানের ও অভিজ্ঞতার অনুভবের উপলব্ধির জগৎ, কল্পনার জগৎ, খেয়ালী মহল, ঈশ্বরতন্ত্র ও রাষ্ট্রতন্ত্রের অদৃশ্যলোক। নিয়মের জগৎ ক্রিয়ার জগৎ অদৃশ্যই হয়। যিনি কবি তিনি সচেতন হবেন। সর্ববিষয়ে অন্তরীক্ষণ জরুরী।

আমরা যা দেখি তা দৃশ্যলোক আর কবি দ্রষ্টা অর্থাৎ তিনি সমস্তই লোকন করেন, চেখে দেখেন, চক্ষণ

করেন, দূরে দৃষ্টি ফেলেন, আনয়ন করেন লোচন চোখ, চক্ষু, অক্ষি, নয়নের দ্বারা। আবার কাছে নিয়ে এসে দেখান ও ত্রাণ করেন নিজেকে এবং সমাজকে। নেত্র বা নেতা বা নেত্রী। বোঝাই যাচ্ছে কবি আর পাঁচজন মানুষের মতো নন। তার মানে সাধারণ মানুষ কবিদৃষ্টির ও কল্পনাশক্তির অধিকারী নন, এমন কিন্তু নয়। কবিমন একটা থাকে মানুষের মধ্যে। তবু সকলেই কবি নয়। কবি মিছিলে হাঁটলে মিছিলের একজন, আবার তফাত থেকে মিছিলকে লক্ষ করলে অন্য একজন। এই স্বতন্ত্র ভিন্ন মানুষটিই কবি। বিভিন্ন ও বিবিধের মাঝে তাঁকে  আলাদা করে চেনা যায়। শব্দের প্রতি তাঁর দুর্বার আকর্ষণ। সব ধরনের শব্দ বা আওয়াজ বা রব তাঁকে টানে। যুগপৎ নীরব ও সরব। একজন কবি নিশ্চিত জানেন  তিনি সমষ্টির অংশ এবং ক্ষমতার নজরে। রক্তাক্ত ক্লেদাক্ত ঘর্মাক্ত পৃথিবীকে কি কবি উপেক্ষা করতে পারেন? বিচার যুক্তিবোধ থাকলেও এক অপার অনুভূতিময়  প্রদেশের তিনি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর যেমন কেন্দ্র থাকে আবার তিনি উপেন্দ্রনাথ। কবি ও আলংকারিক ভর্ত্তৃহরি  বলেছেন, সুকবিতা যদি অস্তি রাজ্যেন কিম্। সুন্দর কবিতাই তাঁর প্রিয়, রাজ্য নয়। তবু প্রশ্ন থেকে যায় কবি কে? আমাদের সময়ে অনেক পত্রপত্রিকা, ফলে অনেক কবি। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই বেশ কয়েক হাজার। এখানে মানদণ্ড হল লিখে ছাপলেই কবি। মানতেই হবে এঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ ভালো কবিতা রচনা করেন। অপ্রাতিষ্ঠানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরে চর্চা হয় না বলে অ-শনাক্ত থেকে যাচ্ছেন। প্রায় চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে কবিতার প্রতি মনোযোগী বলে এমন বলতে পারছি। এখন আর বেশি পত্র পত্রিকা কেনার সুযোগ পাই না। বয়সের কারণেও বটে, অবসরগ্রহণের পর আর্থিক কারণেও বটে। তাছাড়া একজন মানুষ কত পত্রিকা কিনে পড়তে পারবে? এর একটি সীমা আছে, সীমান্ত আছে। তবু ‘সীমান্ত সাহিত্য’ ও ‘কবিতা সীমান্ত’ দীর্ঘদিন পড়েছি। শত শত পত্রিকা বের হয়। বহু দূরের হলে পাওয়াও যায় না।

কবি ক (মস্তিষ্কে) বহু কিছু বহন (ব) করেন, অর্থাৎ কব্ কব্ করেন। কব থেকে কব্যয়, তা থেকে কাব্য। মানুষ বক্ বক্ করেন, যা থেকে বাক্যের জন্ম হয়। বাক্যসৃষ্টিতে জনসাধারণ অনেক এগিয়ে। কারণ অল্প শব্দে অসংখ্য বাক্যরচনা সম্ভব হয়। শিশুদের দিকে তাকান, সবচেয়ে বেশি কথা বলে। অথচ তাদের শব্দভাণ্ডার কত সামান্য। কবিদের শব্দ শিখতে হয়। একে বলে শব্দসাধা। শব্দ থাকে অভিধানে বাক্যে থাকে পদ। শব্দ কীভাবে পদ হচ্ছে তা জানতে ব্যাকরণ বুঝতে হয়। ব্যাকরণ হল শব্দশাস্ত্র। কবির বিরাট দায়িত্ব। তাঁকে ঠিক বানানে লিখতে হয়, কাব্যভাষা নির্মাণ বিনির্মাণ করতে হয়। শব্দ সাধতে সাধতে বা শিখতে শিখতেই সিদ্ধ ও সাধিত শব্দের সম্মুখীন হন কবি। কবির লেখালেখির উপকরণ বহু। ভাষার কৃৎকৌশল যেমন জানতে হয় তেমনই স্বীয় রচনাকৌশলও আয়ত্ত করতে হয়। বেশ ঝামেলার কাজ। পরিশ্রমের কাজ, ধৈর্যের কাজ, লেগে থাকার ব্যাপার। যাঁরা মনে করেন কবিতা লেখা সহজ, এ ধারণা তৈরি হচ্ছে ক্রমশ, তাঁদের মনোযোগ বোধহয় অন্যত্র সরে গেছে। কবি সাধারণ অসাধারণের ভাষায় কান পাতেন, প্রকৃতির প্রতিটি ধ্বনিকণা তাঁকে মুগ্ধ করে। কিন্তু লেখেন নতুন ভাষায়। এই কাব্যভাষা আয়ত্ত করতে হয় দীর্ঘ দীর্ঘ চর্চার ভিতরে। যাইহোক কবি যেমন কব কব করেন, তেমনই কু ডাক ডাকেন, শিবের মতন পাঁচমুখে কুকথা

ক'ন। কুকথা হল তত্ত্বকথা। কবি হবেন তত্ত্বজিজ্ঞাসু ও কাব্যজিজ্ঞাসু। শব্দজিজ্ঞাসাকেই কাব্যজিজ্ঞাসা বলে। আর কু ডাক ডাকবেন। কু হল অতি ভালো ও অতি মন্দ, যা প্রচলিতকে আঘাত করে। কু-কে যে মারে সেই তো কুমার বা কুমারী। মহাকবি কালিদাসের কুমারসম্ভবম্ বা প্রয়াত কবি নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘ক্ষেত্রসম্ভব’ 

উভয়ই প্রচলিতকে ছাড়িয়ে ছাপিয়ে। কবির মাথায় কী গভীর দায়িত্ববোধ। এখনও এই কমিটমেন্টের পরিচয় পাচ্ছি-                                    

"আমি শুধু জানি মৃত্যুর চেয়েও বেশী গভীরতা আছে জীবনের কাছে"। ( অনন্ত দাশ - 'শ্রেষ্ঠ কবিতা')

সেই ঋগ্বেদ থেকে আজ পর্যন্ত আমাদের ভাষায় কবিতা লেখা হচ্ছে। পাঠের সময় মনে হয় না চার হাজার বছরের ব্যবধান। এই যে আবহমান কবিতা তার যে ভাষা, শুনেও শোনে না কেউ তাকে। "উতঃ ত্বঃ শৃণ্বন্ ন শৃণোতি এনাম্"। (ঋগ্বেদ)। সেদিনও যেমন আজও তাই। তবুও কবিদের শব্দের প্রতি কী সুগভীর অনুরাগ। কবিতার পাঠক হলে পাঠিকা হলে হাড়ে হাড়ে তা টের পাবেন। সবার কবিতাই পড়ুন, বিচারে নির্বিচারে চারুপাঠ নিন, আনন্দপাঠ নিন, কিন্তু সুকবিকে চিহ্নিত করুন। কবিতা হল "শ্রেষ্ঠম্ উ প্রিয়ানাম্" - প্রিয়ের মধ্যে প্রিয়তম। আবহমান ভাষার ভাঙাগড়ার মধ্যে আজও টিকে আছি আমরা।


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন