![]() |
| কালিমাটির ঝুরোগল্প ১৪৪ |
যেভাবে জীবন
গাড়িটা বাঁক নিতেই তিথি দেখল, মন্দিরা ফুটপাথের উপর ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। যেভাবে মৃদুতায় ধরণীর বুকের ওপর হেমন্তের সাঁঝ নেমে আসে।
রাস্তায় সামান্য জ্যাম থাকায়
গাড়ির গতি কিছুটা মন্থর। তিথি গাড়ির ভেতর বসে মন্দিরার হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটুকু
দেখছিল। কয়েক মুহূর্ত আগেই এই মানুষটির সঙ্গেই ক্যাফেতে দীর্ঘসময় কাটিয়েছে। সামান্য
কথা বলেছে। শুনেছে বিস্তর। তিথির মতই একই নারীজন্মে দীর্ঘ সত্তরটা বছর পার করে এসেছেন
মন্দিরা। তিথির মনে হয়েছে মন্দিরা যেন অমৃতের টলটলে কুম্ভ। জীবনের শতেক ওঠাপড়ার মাঝেও
জীবনবোধের অমৃতটুকু বাঁচিয়ে রেখেছেন। কতই না ঝড়ঝাপটা গেছে। অল্প বয়সে স্বামীকে হারিয়ে
দুটি শিশুকন্যাকে নিয়ে একলা পথ চলেছেন। তাদের শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন জীবনে।
প্রাণে কোনো ব্যর্থতার আবর্জনা জমতেই দেননি। হাল ছাড়তে শেখেননি মন্দিরা। তিথি এই নারী-জীবনের
পূর্ণ কুম্ভের সামনে বসতে চেয়েছিল।
কোথা দিয়ে যেন তিনটে ঘন্টা পেরিয়ে গেল। উত্তর কলকাতার সেই ডানপিটে কিশোরী আজ এই প্রান্তবয়সে তিথির সামনে বসে স্মৃতি ঘেঁটে উপাদান তুলে এনে নির্মাণ করলেন সত্তর-আশির উত্তাল সময়। সাহিত্য পড়তে চেয়ে বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে শেষে পুনরায় সাহিত্যে ফিরে আসা। তারপর শিক্ষক শিক্ষণের ট্রেনিং। মন্দিরা ভারি সুন্দরভাবে বলেছিলেন, 'আমি যখন দ্বিতীয়বার কনসিভ করলাম, ভাবলাম, এই সময়টায় বরং বি-এডের কোর্সটা করে নিই! দুটোই তো প্রজেক্ট! কী বলো?' মন্দিরা হাসলেন। তিথিও হেসে ফেলল, 'একদমই তাই!'
মন্দিরার সঙ্গে তিথির পরিচয় একটি সাহিত্যসভার অনুষ্ঠানে। মন্দিরা তাঁর প্রকাশিত বই নিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন। অনুষ্ঠানের শেষে তিথি এগিয়ে গিয়ে ফোন নাম্বার নিয়েছিল। পরের দিন ফোন করে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্টও ফিক্স হল। কালীঘাটের একটি কফিশপে বিকেল পাঁচটায়। তিথি প্রায় কুড়ি মিনিট আগেই পৌঁছে গেছে। কোণের দিকে একটা ছোটো টেবিলে বসেছে। কাঁচের দরজা ঠেলে ঢুকলেন মন্দিরা। দীর্ঘ ঋজু চেহারা। চশমার ভিতর শান্ত দুটি চোখ। ধুসর চুল মাথার পিছনে একটি ছোটো খোঁপা করে বাঁধা। ধুসর রঙের শাড়ি-ব্লাউজের ওপর একটি তুঁতে রঙের উলেন স্টোল জড়ানো। তিথি হাসিমুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। মন্দিরাও সামান্য হাসলেন। মন্দিরার সৌম্য উপস্থিতি তিথির বড় ভালো লাগল। দুজনের জন্যে কফি এসে পড়ল। মন্দিরা চেয়ারে বসেই সরাসরি বললেন ,'বলো কী জানতে চাও?' তিথি হঠাৎ তেমন কোনো কথা খুঁজে পেলো না। মুহূর্ত খানেক চুপ করে থেকে বললো, 'দিদি, আপনার জীবনের গল্প আপনার কাছটিতে বসে শুনতে ইচ্ছে করে...'
মন্দিরা সস্নেহে তাকালেন। শুরু করলেন তাঁর জীবনের কথা। সুশিক্ষণের শিক্ষিকা হয়ে ওঠা। সাইকোল্যাবে কাজের অভিজ্ঞতা। কখন এবং কীভাবে জেলের কয়েদিদেরকে পড়ানো শুরু করলেন সেইসব কথা। জীবনের এইসব বাঁকবদলের কথা তিনি মলাটবন্দি করেছেন যত্নে। মন্দিরার লেখা বই তিথির চাই। অথচ বইটা আর কোথাও পাওয়া যায় না। ‘আপনার কাছেও আর এক-কপিও নেই?' মন্দিরা তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মৃদু হেসে বলেন, 'না গো! আজকাল মনে হয়, এমন অনেক মানুষকে বইটা আমি উপহার দিয়েছিলাম যাদেরকে না দিলেও হতো!'

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন