কালিমাটি অনলাইন

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

দশম বর্ষ / একাদশ সংখ্যা / ১১০

ত্রয়োদশ বর্ষ / দ্বাদশ সংখ্যা / ১৩৯

শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

শৌভিক দে

 

সমকালীন ছোটগল্প


ও যে মানে না মানা

'ভূত দেখেছেন কোনো দিন'? বিশিষ্ট ভূত - তাত্ত্বিক, বিদেহী বিশেষজ্ঞ পিনাকিন পাণি জিজ্ঞেস করলেন নরেশ কেশকে। নরেশবাবু তক্ষুনি সকালের প্রথম চায়ে চুমুক দিতে যাচ্ছিলেন। প্রশ্ন বোমায় বিষম খেলেন।

আজকাল খবর মানেই শুধু যুদ্ধ, দাঙ্গা, আস্ফালন আর হুঙ্কার। দেখে শুনে সাধারণ মানুষের মাথা, পেট গরমই থাকে। হয়ত সে কারণেই বঙ্গোপসাগরের অভ্যন্তরীণ উষ্মা যখন তখন বেড়ে যায়। হাঁচি, কাশি, নিম্ন চাপ। কুপিত বায়ুর ঠ্যালায় আকাশ কালো আর ঝরো ঝরো ধারা ঝরে অবিরল। ঋতুর সীমানা গুলিয়ে গেছে - গরম কালটিকে মনে হয় বর্ষাকাল, শীতকালকে গরম আর বসন্তকে শীত। হেমন্ত কাল তো হেমন্ত বাবুর আগেই অমর্ত্যলোক যাত্রা করেছে।

আজকে যেমন। নিম্নচাপের জেরে মেঘে ঢাকা ডিসেম্বরের সকালে কলকাতা যেন লন্ডন। পরিস্থিতি আমাশা রুগীর মত গান গাইছে 'যাস নে ঘরের বাইরে'। এই গুড় গুড় - এই বুঝি শুরু হল। দাঁতে দাঁতে কর্তাল বাজে, মুখ খুললেই কালোয়াতি সঙ্গীত। আলোয়ান মুড়ি দিয়ে জুবুথুবু নরেশবাবু  ঠাণ্ডার মোকাবিলায় চায়ে চুমুক দিচ্ছিলেন - তখনই এমন বেমক্কা প্রশ্ন করতে হয় বদমায়েশ পাজী? জিভের ডগাটি পুড়ে গেল মানে পরের একহপ্তা - পায়েস খাচ্ছেন কী কালিয়া কোনো স্বাদই পরিষ্কার হবে না।

পড়শি হিসেবে অবশ্য পিনাকিন পাণি একশোয় সাতাশি পাবেন। বাঙ্গালী হয়েও শুধু বচন বীর নন, করমেতে বীর। অবসরের পর নরেশবাবু এই অজানা পাড়ার বহুতলে দুই ঘরের 'সমতল' মানে ফ্ল্যাট নিয়েছেন। সেই কাজ গোছাতে অনেক সাহায্য করেছেন পিনাকিনবাবু। গৃহ প্রবেশের দিন ঘর থেকে কোষাকুষি আর গিন্নী সহ শঙ্খ এনে দিয়েছেন। কাজের মাসীকে দিয়ে আনিয়েছেন কলাপাতা। হাঁকডাক করে নিচে থেকে যজ্ঞ স্থলের ইঁট বালি, মায় চমচম কম পড়াতে স্থানীয় 'খাই খাই' দোকান থেকে মেঠাই আনিয়ে দিয়েছেন। এখানে পাকাপাকি ভাবে থানা গেড়ে বসার পর - সবার জন্যে ছিমছাম কথাকম কাজের মাসী, গিন্নীর তুলসী গাছ, ছেলের সাধন সমরের আন্তর্জাল সংযোগ, বউমার জন্য 'চুল নখ, ঝকমক' দোকানের হদিস, এমন কি তিন বছুরে নাতনির 'ছাড়ো কোল - বল বোল' খেলাঘরের সন্ধান - বলা চলে - সব রকম বাঁচার রসদ - বিনা বলাতেই দেখিয়ে দিয়েছেন। সব থেকে বড় কথা নরেশবাবুর বাড়িতে চুলো ধরে একটু দেরিতে। অথচ ভোর সক্কালে এককাপ চায়ের জন্যে নরেশবাবুর  চিত্ত চাই চাই করে। সেটা বুঝে মাঝে মধ্যেই পিনাকিনবাবু সকাল সাড়ে ছটায় একটি বেঁটে ফ্লাস্কে দুজনের মত লাল দার্জিলিং চা নিয়ে দরজায় টুকটুক টোকা দেন। মিনিট দশেক চায় পে চর্চা হয়।

এত বন্ধুকৃত্যের চাপে কৃতজ্ঞ নরেশবাবু গতকাল গেছলেন পিনাকিনবাবুর ফ্ল্যাটে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে। দরজায় নাম-পট্টতে নামের তলায় লেখা 'ভু-তা-বি-বি'। কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করলেন, আর তাতেই জাগলো পাগলা দাশু। জানা গেল ওই ইস্তিরি করা অক্ষরমালার ভাঁজ ভাঙ্গলে হবে' ভুত-তাত্ত্বিক, বিদেহী বিশেষজ্ঞ'। পিনাকিনবাবু অবসরোত্তর জীবনে ভুত চর্চা করে থাকেন এবং ফলশ্রুতিতে আজ সকালের প্রশ্ন।

নরেশবাবুকে শৈশবে নিস্তারিণী পিসি যাবতীয় শিশুপাঠ্য ভুতের ভয় দেখিয়ে খাবার খাওয়াতেন। তাদের সর্বক্ষণের কাজের লোক জগাদা বারান্দার অন্ধকার থেকে কোনোদিন গঁগা, কখনো শাঁকচুন্নি,কন্ধকাটা, বেম্মোদত্তি হয়ে রকমারি আওয়াজ বের করত। কাজেই ঘরে থাকা মানেই তিনি 'ভয়ে বচ' হয়ে থাকতেন। বড় হয়ে সমস্ত কৌশল বুঝতে পারলেও সেই অবুঝ বেলার ভয় তাকে বাকি জীবন তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। মা বাবার শেষ কাজ ছাড়া কোনোদিন শ্মশান যাননি। রাতে বাথরুম যেতে বরাবর ছড়িদার লেগেছে। এমন কি বর্ষায় ভুতের গল্পও সাধ্যমতে এড়িয়ে গেছেন। তেমন লোকের প্রতিবেশী হল কিনা ভুতাবিবি। যাকে বলে ভুত সন্ধানী মেজ কর্তা। গেরো একেই বলে।

পিনাকিনবাবু অবশ্য গেরো আরো পাকালেন। চায়ে চুমুক  দিয়ে বললেন -

- 'আপনাকে বোধহয় একখানা গুপ্রকথা কেউ বলেনি। এই হাউজিং কমপ্লেক্সটিই গড়ে উঠেছে বহু পুরনো  একটি ব্রিটিশ কবরস্থান দুরমুশ করে। আমার এখানে ফ্ল্যাট কেনার মূল কারণই তাই। মোগলাই কবর হলে ভালো হত কিন্তু কথায় বলে না বিধাতার ফয়সালা, পাল্টাবে কোন শালা'। যা পেলাম তাই খুঁড়ে দেখি'।

= 'আবার খোঁড়াখুঁড়ি কেন? তাছাড়া মোগলাই হলেই বা কোন চতুর্বর্গ ফল লাভ হবে। ভুত হয়েও কী এক জাতি এক প্রাণ হতে পারে না'?

- 'আজ্ঞে না। বর্ণভেদ আছে, ধর্মাধর্ম আছে। ধরুন আমরা হব প্রেত, দৈত্য, পিশাচ, তাল, বেতাল। বিলিতি  হলে স্পূক, পিক্সি, নোম, গবলিন হতে পারে। আবার আরবি হলে জিন, জান, আফ্রিদ, মারীদ ইত্যাদি। আপনি পরশুরামের ভুশুণ্ডির মাঠে পড়েন নি'?

= 'না মানে - হ্যাঁ মানে পড়েছি তো। কিন্তু কবরস্থানের মাটি মানে - এ - এ- এ - রকম করা যায়? মানে  ... আইনে মানে'?

- 'সে যে মানে না মানা। খুব যায়। একশো বছর পেরলে এই সব জমির জমিদারি ফেরত আসে। মানুষ বাড়ছে, জমি তো আর বাড়ে না, তাই। তাছাড়া ভুতের কথাই যদি বলেন - শুধু কি কবরস্থানেই থাকে? তেনাদের তো হাউসিং লোন নিয়ে আস্তানা কিনতে হয় না, উত্তর দক্ষিণ খোলা বাস্তু লাগে না। এমন কি আট্যাচড বাথও নয়। পছন্দ হলে দখল নিলেই হল'।

= 'কী বলছেন মানে - মানে ...'?

-'খোঁজ খবর করেই বলছি। এই ধরুন ... আপনার এই ফ্ল্যাটটি। রাস্তা পেরিয়ে বেলগাছটির মুখোমুখি। উত্তর দিকে শ'খানেক গজ গেলেই একটি শ্যাওড়া গাছ। পিছনে পুকুরটা তো মেছো ভুতদের আস্তানা হতেই পারে। না মশাই ভুত সমাজে এমন ত্রাহস্পর্শ বেশ পছন্দসই'।

= 'দাদা কী বলছেন আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে'।

-  'বটে? আপনি কি বিশেষ কিছু অনুভব করেছেন'?

= 'রাম রাম রাম রাম। আমি তো কিছু বুঝছি না। বুঝতেও  চাই না'।

- 'ঠিক আছে। কিন্তু তেমন কিছু বুঝলে - এই ধরুন টেবিল ল্যাম্প উল্টে পড়ল কিম্বা হাওয়া ছাড়াই দুলে উঠল পর্দা -  আমাকে বলবেন। ভয় পাবেন না'।

= 'কেন? পাবো না কেন? মানে ... ঠিকই তো, ঠিকই তো। ভয়ের কি আছে'।

- 'তাই তো বলি সবাইকে। ভুত মানে অতীত, আমাদের ইতিহাস। ভালো করে যদি ভেবে দেখেন আমরা সবাই ভুত থেকেই এসেছি আবার ভুতেই ফিরে যাব। আজ চলি'।

নরেশবাবু তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে নিস্তারিণী পিসির কাছে শেখা কয়েকটা বাছা বাছা বাঙাল গাল দিলেন। অবশ্যই মনে মনে। 'পুঙ্গির পুত'টা শুধু জিভ পুড়িয়েই ক্ষান্ত দিলো না, যাবার সময় নরেশবাবুর যাবতীয় শান্তিও ফ্লাস্কে ভরে নিয়ে গেল। সকাল আটটা বাজতে যায় এখনো ঠিকঠাক সকালের আলো ফুটল না। সাঁইসাঁই হাওয়া চলছে, তালে তালে ঝুপঝাপ বৃষ্টি। আলোয়ান জড়িয়ে নরেশবাবু জ্বর হওয়া ভালুকের মত কাঁপতে লাগলেন। মুণ্ডু নড়ছে ঘড়ির পেন্ডুলামের সঙ্গে সঙ্গে। ঠুক হলে চমকে উঠছেন, ঠাক হলে আঁতকে উঠছেন। এমন সময় ভেতরের ঘরের পর্দা দুলে উঠল। 'ভুত, ভুত, মাইর‍্যা ফেলাইল পিসি' চিৎকার দিয়ে নরেশবাবু প্রায় মুচ্ছা গেলেন।

রোজকার মত গিন্নী হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঢুকছিলেন ঘরে। আচমকা ডাকাত পড়া চিৎকার শুনে চমকে ফুটন্ত চা চলকে ফেললেন পায়ে। এবার তার চিৎকারটিও কম করে বিরানব্বুই ডেসিবল পেরল। 'কী হল? কী হল'? করে বাড়ির বাকি আড়াইজন সদস্য দৌড়ে এলো ঘরে। গিন্নি ভাঙ্গা কাপের টুকরো কুড়োতে কুড়োতে নতুন বাসায় নরেশবাবুর উদ্বোধনী ঝাড়াই শুরু করে দিলেন। তার 'ভুত ভুত' যে গিন্নিকে বলা হয়নি সেটা কোনো জজে মানলো না। ফলত নিত্যদিনের গা-সওয়া ঝাড়াই প্রায় আখ মাড়াইয়ের উচ্চতায় পৌঁছে গেল। নরেশবাবুও বুদ্ধি করে চুপ থাকলেন। কারণ 'কবরস্থানের ওপর তোলা বাড়ি কেন কেনা হয়েছে' - তার জবাব দেবে 'কোন হালায়'!

সেদিন না হল ঠিক করে খাওয়া, না হল দুপুরের অতিপ্রিয় ঘুম। কেঁপে কেঁপেই দিন ফুরাল। সন্ধেবেলা একা খাটে বসে আছেন। উঠে লাইট জ্বালাবার সাহস জুটছে না। গিন্নী ঘরে ঢুকে বললেন -

-  'কি ভুতের মত অন্ধকারে বসে আছো? অন্তত টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে নাও'।

= 'না। কিছুতেই টেবিল ল্যাম্প নয়'।

নরেশবাবুর হুঙ্কার শুনে গিন্নী চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে রইলেন। শ্বশুরের বংশে কোন এক মামা পাগল ছিলেন। নরানাং মাতুল ক্রম হল না কি? নরেশবাবু কাতর কণ্ঠে বললেন -

- 'মানে বলছিলাম টেবিল ল্যাম্প কেন - টিউব লাইটটাই জ্বালিয়ে দাও না। মানে আলো একটু বেশী হবে'।

গিন্নী মানে মানে বড় লাইট জ্বালিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেলেন। খানিক পরে নাতনী চারিদিক দেখতে দেখতে তার তার কোল ঘেঁসে ফিসফিস করে বলল -

- 'দাদাই -  দেখি তোমার পা দুটো'।

= 'কেন রে পায়ে কী হল'?

- 'তোমার না কি পা গোল হয়েছে? কই এতো আগের মতই বাঁকা ট্যাঁরা। গোল করে দেখাও না, ও দাদাই...'!

নরেশবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন। কী হবে আর গোল করে? গোলমাল তো ফ্ল্যাট কেনার সময়ই হয়েছে। একেবারে সেমসাইড গোল। শীতের রাতে চুপচাপ জল মুড়ি খেয়ে নিলেন। গিন্নী ফতোয়া দিয়েছেন পেট গরমের এ হল মহৌষধ। রাত একটা নাগাদ তার স্বপ্নে এলেন মা। নরেশবাবু ফুঁপিয়ে বললেন -

- 'মা হ্যারা হগ্গলে আমারে ভুতের ভয় দেখাইতে আস্যে'।

= 'ছিঃ বাবা। কান্দে না। ভয় কি। আমারে দ্যাইখ্যা কি তর ডর লাগত্যাসে'?

- 'কি কও মা, তমারে দেইখ্যা ডরামু ক্যান'?

= 'তয়? আমি কি ব্যাইচ্যা আসি? দ্যাহ দেহি তর বাপে ওইহ্যানে খাড়াইয়া হাস্তাসে। নিস্তারিণী হাইস্যা গড়াগড়ি যায়। আমরা তহন আসিলাম, এহন আর নাই। তফাৎ কতটুক? কান্দে না বাপধন আমার, কান্দে না'।

- 'আমারে ছাইড়্যা গ্যালা ক্যান মা? খুঁৎ খুঁৎ ফুৎ ফুৎ...'।

= 'এই দেখো। মাঝ রাত্তিরে আবার কাঁদো কেন? ওগো কী হয়েছে? নিশিতে ধরল না কি'?

টুপ করে বেড লাইট জ্বলে উঠল। নরেশবাবু চোখ খুলে দেখেন সামনে উৎকণ্ঠিতা গিন্নী বসে আছেন। খাটের পাশে সদ্য ঘুম ভাঙ্গা ঢুলুঢুলু চোখে ছেলে, বৌমা, নাতনী। এমন কি টেডি বেয়ারটাও কোলে কোলে মজা দেখতে এসেছে। নরেশবাবু চোখ মুছে নিলেন ঝটপট। অশ্রুজলে ভুতের ব্যাপার এক্কেবারে জলের মত বুঝে গেছেন তিনি। ধরতে গেলে আসলে ভুত হলেন তিনি, বর্তমান ওই ছেলে বৌমা আর ভবিষ্যৎ টেডি কোলে নাতনী। তাহলে কে কাকে ভয় পাবে! ভুতের থেকে ভবিষ্যৎ, এই তো জীবন কালিদা!


0 কমেন্টস্:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন