![]() |
| সমকালীন ছোটগল্প |
রাজপ্রাসাদ
এ তো দেখছি একেবারে রাজপ্রাসাদ! যে দেখল সেই বলল। কাছেপিঠে যারা থাকে, যারা এই গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানের অনেক আগেই দেখে গিয়েছে বাড়িটা, তারাও সে কথা সমর্থন করল একবাক্যে। যারা জানে কোন চোরা পথে এই রাজঐশ্বর্য হরিদাসবাবুর পুরনো সেকেলে বাড়ির ভাঙা এবং জংধরা বাক্সপ্যাটরার মধ্যে এসে ঢুকেছে, তারাও বলতে বাধ্য হল যে এ বাড়ি সাবেক রাজবাড়িকেও হার মানায়। চোরাপথে আসা টাকা আত্মপ্রকাশ করেছে অভিনব সৌন্দর্যের পথে। টাকা অনেকেরই থাকে কিন্তু এমন বহিঃপ্রকাশ বিশেষ একটা দেখতে পাওয়া যায় না। অথচ মানুষটা এখনও আগের মতনই সরল সাদাসিধে। বিনয়ে আর সৌজন্যে সব সময়ই আছে ঘাড়ে ঝুঁকিয়ে।
দেখা গেল প্রায় সকলেই রাজপ্রাসাদের
সাথে সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছে। হরিদাসবাবু শোনে আর বিস্ফারিত বিস্ময়ে প্রতিবার বলে, 'সত্যি?'
আজ বারবার তাকে একই কথা বলতে হয়েছে। কিন্তু দেখলেই বোঝা যায় যে এ অভিব্যক্তি তার বানানো
নয়। প্রতিবারই নতুন এবং স্বতন্ত্র। পুঞ্চা রাজবাড়ির লালসাহেবও (যিনি নিজে রাজা নন,
কিন্তু রাজার বংশধর) যখন একই কথা বলল, তখন হরিদাসবাবু একেবারে কাদা হয়ে গেল। বিশিষ্ট
কয়েকজন অতিথিকে নিয়ে যেমন বাড়তি আদিখ্যেতা করেছে, তেমনি লালসাহেবকে নিয়েও না করে পারল
না, তা সে যতই পড়তি অবস্থা হোক না কেন লালসাহেবের। সাথে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ঘরগুলো
সব দেখাল হরিদাসবাবু। হাজার হোক রাজবংশের রক্ত তার শরীরে, রাজবংশের ঐতিহ্য তার মানসিকতায়,
সেখানকার চাল চলন, রীতি নীতি সব এখনও জীবন্ত আছে তার অভিজ্ঞতায়। সে যা বলবে, সে যা
বিধান দেবে, তার দাম অনেক বেশী।
বাস্তব জীবনে দুঃস্থ লালসাহেব রাজকীয়
অভ্যর্থনায় যখন অভিভূত তখন রাজকীয় মেজাজ ফিরে এল তার। বলল প্রাসাদের চারিদিকে উঁচু
পাঁচিলের ঘোরাটোপ গেঁথে তুলতে হবে। দ্বার থাকবে দুইটি, একটি আসার এবং অন্যটি যাওয়ার।
নিত্য প্রহরা থাকবে দুটিতেই। সাধারণ লোক অনুমতি ছাড়া প্রবেশাধিকার পাবে না। হরিদাসবাবু
আঁতকে উঠল, এ আপনি বলেন কী? আমার পাড়াপড়শী বন্ধু বান্ধবদের অনুমতি লাগবে আমার কাছে
আসতে? লালসাহেব বলল, 'হ্যাঁ, লাগবে। আপনি এখন যেখানে আছেন সেখানে লাগবে না, কিন্তু
এখানে লাগবে। এ যে বিরাট, এর প্রতি সমীহ থাকবে না মানুষের? তাহলে আর তাদের মধ্যে বড়
হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হবে কেমন করে?
পরামর্শ আরো ছিল, সবই ঐতিহ্য অনুসারে।
দোতলার দক্ষিণ দিকের ঘরট হবে রানী মায়েরণ।
ঠিক পাশেরটি হবে তার পূজাআচ্চা উপাসনার ঘর। হরিদাসবাবু আবার আঁতকে উঠল, "রানীমা
আবার কী? এর মধ্যে আবার রানীমা'র কথা আসছে কেন?" লালসাহেব বলল, ঐ হলো, আপনার স্ত্রীর
কথা বলছি। এটা রাজপ্রাসাদ হলে তিনি রানীমা হন বৈকি! অবাক হরিদাসবাবু জিজ্ঞেস করল,
"কে রানীমা? আমার বৌ? সারাদিন বসে সে উপাসনা করবে? তাহলে খেতে দেবে কে, আর রান্না
করবে কে? তার চেয়ে বরং ওটা রান্নাঘর বানিয়ে নিই"।
-- না, রান্না করবে রাঁধুনি। একতলায়।
ঠাকুর-চাকর সব ঐ একতলায় থাকবে যাতে রাজসভা থেকে আপনি হুকুম করলে তারা শুনতে পায়। খাওয়াদাওয়া
সব নীচের তলায়। কেবল আপনার খাওয়া দাওয়া তিনতলায়। সে খাবার রানীমা নিজে নিয়ে আসবেন
হাতে করে। কিন্তু সঙ্গে পরিচারিকা থাকবে। আপনার শয্যাগৃহের পার্শ্বস্থ কক্ষে আপনার
ভোজনের পূর্বে রানীমা এবং পরিচারিকাকে নানা পাত্র থেকে কিছু কিছু পরিমাণ খাদ্য দ্রব্য
আপনি নিজ হাতে তুলে দিয়ে তা খেতে বলবেন।
হরিদাসবাবু পুনর্বার আঁতকে উঠল।
বলল, 'বলেন কী? তাহলে অশান্তি বাধিয়ে ছাড়বে আমার বৌ। আমি খাওয়ার আগে কোনোদিন খেয়েছে
নাকি?'
-- কিন্তু এখন থেকে তাই খেতে হবে।
এটাই নিয়ম। আপনার নিরাপত্তার প্রয়োজনে তা অবশ্যই মানতে হবে। খাওয়ার পর তারা যদি সুস্থ
থাকে, একমাত্র তবেই আপনি সে খাবার গ্রহণ করবেন।
-- কেন?
-- নিরাপত্তার প্রয়োজনে। কারো প্রভাবে
বা কোনো বাসনার বশবর্তী হয়ে রানীমা যদি খাদ্যে বিষ প্রয়োগ অনুমোদন করে থাকেন!
-- কী বলছেন আপনি, আমার বৌ আমার
খাবারে বিষ দেবে? একথা কানে গেলে সে নির্ঘাত হার্টফেল করবে। কী ভীষণ দয়া মায়া তার শরীরে,
তা জানেন?
-- এখন আছে, তখন থাকবে না। এত বড়
প্রাসাদে তা থাকবে না, থাকতে নেই।
হরিদাসবাবুর কথা যেন সব হঠাৎ ফুরিয়ে
গেল। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল লালসাহেবের মুখের দিকে। জিজ্ঞেস করল, "ছেলেরা?"
-- তারা থাকবে চারতলায়, প্রত্যেকে
স্বতন্ত্র কক্ষে।
-- তার মানে? বৌ, ছেলের সাথে সারাদিন
দেখা হবে না? বৌ থাকবে দোতলায়, আমি তিনতলায়, ছেলেরা চারতলায়! সবাই আমরা হাপিয়ে মরব
যে?
-- তাই নিয়ম। রাজপ্রাসাদের মর্যাদা
তো রাখতে হবে! ছেলেরা আসবে অনুমতি নিয়ে। নিরাপত্তার কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের দিয়ে
ছেলেদের গতিবিধি তদন্ত করিয়ে নেওয়ার পর সেই অনুমতি মঞ্জুর করা হবে, তার আগে নয়।
হতাশ হরিদাসবাবু বলল, এ আবার কেমন
ধারা বেঁচে থাকা? নিজের বৌ, নিজের সন্তান, এদেরও সন্দেহ করতে হবে? লালসাহেব বলল, 'হ্যাঁ,
তাই করতে হবে। কেউ আর আপনজন নয়, কেউ আর আপনজন থাকবে না। ছাড়িয়ে যাবেন যাদের, তাদের
সকলকে নিয়ে সন্দেহ, তাদের সকলের কাছ থেকে আশঙ্কা, তারা সবাই পিছনে টানবে। রাজার জন্য
স্তিমিত জীবন কখনো নয়। প্রতি মুহূর্তেই তার উত্তেজনা। উত্তেজনাই তার শ্বাস প্রশ্বাস।
সন্দেহ, সংশয়, আশঙ্কা, নিয়ত এর সরবরাহ আর নিয়ত তার সমাধানের চেষ্টা -- এই নিয়েই চলে
রাজার জীবন। আপনি বড় মানুষ হয়ে উঠেছেন, তার মানে রাজা, সুতরাং আপনাকেও তাই করতে হবে।
বড় মানুষরা বাড়িতে বাঘ, সিংহ পোষে, শুনেছেন? লোড করা বন্দুক আর ধারালো তলোয়ার হাতের
কাছে রেখে তারা বাঘ, সিংহকে আদর করে। এও তেমনি।
হরিদাসবাবু বলল, আমার বড় হয়ে কাজ
নেই, বাড়ি আমি বেচে দেব। লালসাহেব বলল, পারবেন না। এ রাজপ্রাসাদ এত বড় যে এ কেনার
লোক নেই। কেউ কিনবে না, এ আপনার গলায় বিঁধে থাকবে।

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন