ধারাবাহিক উপন্যাসিকা
অস্তাচল
(বারো)
সব চিন্তার ভরকেন্দ্র একটাই জায়গায় স্থির। একটা যদিতে এসে ঠেকেছে তাদের তর্ক। যদি সে তোমার বোন হয় তো, তাদের পাওয়ার রাস্তা রয়েছে। আর যদি না হয়, তো?
স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়ার পরেও জেগে রয়েছে
আহ্নিক। স্ত্রীর কথায় সে আরও দশ কি বারো জায়গায় ছুটোছুটি করেছে। বাবার সমসাময়িক এখনও
যারা যারা বেঁচে আছে তাদের কাছে গিয়েছে একে একে। যারা যারা সে সময়ে বাবার পার্টিতে ছিল। তাদের মধ্যে বেশিরভাগ সে
দল আর করে না। অবশ্য কেউ কেউ এখনও ঝুলে আছে শতাব্দী প্রাচীন অট্টালিকায় ঝুলে থাকা ঝুলের
মত। তেমনই কিছু ঝুলের মাঝে আটকা পড়া পোকা এখন তাদের সামনে। তারা এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা
করে, কে তুমি? ও অমুকের ছেলে? আচ্ছা? কিন্তু কী চাও এখন আমাদের কাছে?
কী চায় আহ্নিক? এও কি আর বলার মত?
সে এসেছে বাবার ফেলে আসা পাপ খনন করার জন্য। আহ্নিক তাই কথা ঘুরিয়ে বলেছে, খুব অর্থ
কষ্টে আছি আজকাল, টাকা পয়সার খুব টানাটানি। শুনেছি বাবা ঝুমুরদের জন্য কিছু টাকা রেখে
গিয়ে ছিল। তাই ঝুমুরদের কোনও খবর যদি আপনাদের কাছে থাকে?
ওনারা প্রথমে বলেছে, ঝুমুর? ঝুমুর
কে?
আহ্নিক বাধ্য হয়ে ঝুমুরের মায়ের
নাম উচ্চারণ করেছে, আর সাথে সাথে দেখতে পেয়েছে বুড়োগুলোর জিভ দিয়ে লাল পড়তে শুরু হয়েছে।
চোখমুখের ভাষা পালটে গিয়েছে। তারা যে গোটা জীবন কী চেয়ে এসেছে তা স্পষ্ট। আর তাকে না
পাওয়ার যন্ত্রণা যখন এতটা তীব্র, আহ্নিক বলেছে, উনি এখন কেমন আছেন আপনারা জানেন না?
বুড়োগুলো সব জানে অথচ বলে না। ঝুমুরদের
তারপর কী হয়ে ছিল? কোথায় গিয়ে ছিল তারা? কার সাথে ঝুমুরের মা ফের চলে গিয়ে ছিল, সে
সব খবর এরা জানে অথচ টাকা পয়সার খবর জানবে, সে একটু বেশিই আশা করা হয়ে যাচ্ছে। তাও
একটা সূত্র তো চাই। হ্যাঁ তারা সেই লোকটার নাম করেছে, যার সাথে থাকাকালীন ঝুমুরের মায়ের
এক্সিডেন্ট হয়েছিল।
তাদের মধ্যে একজন বলেছে, তোমার
বাবা তোমার জন্য টাকা না রেখে ঝুমুরদের জন্য রেখে গিয়েছে, সত্যি জানো?
কোনটা যে সত্যি আর কোনটা মিথ্যা,
সে যদি জানা যেত তবে তো গল্প এতদূর গড়াতই না। অনেক আগেই শেষ হয়ে যেত। ঘুম আসছে না,
অথচ শুয়ে থাকতে হচ্ছে, এ বড় বিরক্তিকর। তার নিজের ব্যবসার সমস্ত কাজ অনেকদিন ধরেই আটকা
পড়ে রয়েছে। স্মিতার কাছে গিয়ে ছিল সে সব থেকে বেরিয়ে আসার একটা রাস্তা পাওয়ার জন্য।
রাস্তা তো দূরের স্মিতা তাকে যেন আরও এক জালে জড়িয়ে দিয়ে গেল। দরজা খুলে বাইরে এলো
আহ্নিক।
তার ঘরের সামনে একটা সিউলি গাছের
ঝোপ রয়েছে। আহ্নিক দেখতে পেল সেখানে কেউ একজন যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঝোপের আড়াল থেকে দেখা
যাচ্ছে কোনও এক মহিলার অর্ধেক শরীর। এক পা এগোল সে, কে ওখানে?
-আমি এসেছি, স্মিতা।
-স্মিতা, এখানে কি করে এলি?
এগিয়ে এলো স্মিতা একেবারে শতচ্ছিন্ন অবস্থায়। কাপড় আধ ময়লা, চুল খোলা, কবেকার পুরনো এক ব্লাউজ পরে রয়েছে। ব্লাউজের হাতা ক্ষয়ে ক্ষয়ে হাতা কাটা ব্লাউজ হয়ে গিয়েছে। এমন ব্লাউজ সে তার মাকে পরতে দেখেছে। মা যখন বছরের পর বছর একটাও কাপড় না নিয়ে চালিয়ে দিত, সে তখন মাকে দেখেছে এভাবেই ব্লাউজের হাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছোট হয়ে এসেছে। তারপর পিঠ জড়িয়ে কাপড় দেওয়া শুরু করেছে মা। কেননা গায়ে কাপড় না দিয়ে বাইরে বেরনোর অবস্থা আর নেই ততদিনে। কষ্ট হয়েছে খুব তাও কিছু করতে পারেনি শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া। কবে তার হাতে ক্ষমতা আসবে। অবশ্য এখন সে মায়ের প্রতিরূপ দেখছে না। দেখছে আরও এক অসহায় মেয়ে। হ্যাঁ সে এখন স্মিতাকে একটা মেয়ে দেখছে। যেমন দেখে এসেছে সেই কলেজ বেলা থেকে।
-আহ্নিকদা আমার সাথে যাবে? নিতে এসেছি তোমাকে, আমার সাথে চলো।
সেই নিষ্পাপ স্মিতা। যখন সে প্রথমবার তার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করে ছিল, কোথায় কলেজের ফর্ম দিচ্ছে? সে উত্তর দিতে গিয়ে একবার থেমে ছিল মাঝখানে। তার মনে হয়ে ছিল, উত্তরটা দিয়ে দিলে তাকে দেখার সময় শেষ হয়ে যাবে। অনেক কিছুই যেন শেষ হয়ে যাবে। বেঁচে থাকার অর্থটাই যেন শেষ হয়ে যাবে কোথাও। আর সেই ছিল প্রথমবার যখন কোনও মেয়েকে দেখে মনে হয়ে ছিল, কিছুক্ষণ দেখি। আর শুধু এখানেই শেষ নয়। এরপর গোটা জীবনে সে অনেকবার সেই অনুভূতির অপেক্ষায় থেকেছে, তাও তেমন কাউকে দেখে মনে হয়নি, সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে।
স্মিতা ডাকছে, কিন্তু কোথায়?
আহ্নিক বলতে চাইছে, কোথায় নিয়ে
যাবি? স্মিতা ঘুরে তাকাচ্ছে, যেন বলতে চাইছে, আহ্নিকদা আমি ঝুমুরকে মারিনি। আমি কি
তেমন কাজ করতে পারি?
আহ্নিক বিশ্বাস করছে, কেননা সে
বিশ্বাস করতে চায়। বরাবর সে বিশ্বাস করতেই চায়। অথচ এই বিশ্বাস তার মায়ের জীবনের মত
টলোমলো। যার কোনও ভীত নেই। তাই সে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে নিজের মধ্যে। কোনোদিন বলতে
পারেনি যাব না। আহ্নিক স্মিতার পিছনে হাঁটতে শুরু করেছে। স্মিতা কিছুক্ষণ পরে বলেছে,
পিছনে কেন পাশে এসো। সে পাশে এসে বলেছে, কোথায় নিয়ে যাবি?
গলি রাস্তাটা এখানেই শেষ। এরপরে সে মিশে যাবে বড় রাস্তার সাথে। বড় রাস্তাটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাশ দিয়ে উঠে যাবে ন্যাশানাল হাইওয়ের দিকে। স্মিতা আগেও এ ঘরে এসেছে তাই সে জানে, গলি রাস্তাটা যেখানে এসে বড় রাস্তায় মিশছে সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভাঙা পাঁচিল রয়েছে। অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা পাঁচিলের একটা ফুটো। যেন এক ক্রসিং পয়েন্ট। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছেলেরা রাত বিরাতে সে ফাটল ইউজ করে। স্মিতা সেই ফাটলের কাছে এসে দাঁড়িয়ে খুব উদাস ভাবে তাকিয়েছে তার দিকে। আহ্নিক দেখেছে, ফাটলের মাঝ থেকে বেরিয়ে আসছে বিকাশ।
(তেরো)
কারণ আমি জানি না আমি কি লিখব? নাকি আমি জানি কি লিখতে গিয়ে মাথা ভারি হয়ে এসেছে আমার। ভারি হয়ে আসা দিনগুলো থেকে রাত্রি চুরি করে দাঁড়িয়েছি গলি মোড়ের আবছা লাইট পোস্টের নীচে। যেখানে এসে গলি রাস্তাটা বড় রাস্তায় মিশেছে। বা বলা যায় বড় রাস্তা থেকে একটা দরিদ্র, সরু, অবৈধ রাস্তা নেমে গেছে আমাদের দিকে। এখানের লাইট পোস্ট বিকল থাকে বছরের তিনশ চৌষট্টি দিন, একদিন তার মনে পড়ে এ বছর জন্মানো মানুষগুলোকে একবার এই গলি পথ দেখান উচিৎ। একটা অস্পষ্ট স্বপ্ন যার শুরু এবং শেষ অনন্তে মিলিয়ে গিয়েছে। গায়ের ময়লা ম্যাক্সি খুলে রেখে, যখন বিষণ্ণ স্তন আঁটো সাটো কাপড়ের মাঝে বেঁধে কোনও মেয়ে বা মেয়েদের দল সেই গলি থেকে বড় রাস্তার প্রবাহের সামনে এসে দাঁড়াবে। বড় রাস্তায় চলমান গাড়ি ছবি তুলে রাখবে তাদের। সে ছবি ভেসে যাবে কল্পনার জগতে। গলি থেকে উঠে আসা ছেলেরা সারা দিনের কাজের শেষে যখন বড় রাস্তা থেকে গলি মুখের দিকে নামবে, ছবিতে ভাসমান মেয়েদের স্তন সেই অস্পষ্ট স্বপ্নের বাস্তব রূপ তাদের দেখাবে। যে রূপের কাছে তারা প্রতিবার প্রতারিত হয়েছে। যে রূপের জন্য প্রতারিত হয় প্রতিটি পুরুষ।
প্রতিটি পুরুষ গাড়ি চালাতে চালাতে
লুকিং গ্লাসে দেখে, পেরিয়ে আসা প্রতিটি গলি মোড়ে এমনই অসংখ্য উড়ন্ত স্তন প্রতীক্ষায়
রয়েছে।
এ কাহিনীর কিরদার তেমনই গাড়ির আয়নায় দেখতে পাচ্ছে। তারই প্রতিরূপ বিকাশ আর স্মিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। ভাবছে, ঝুমুর যদি সত্যি তার বোন না হয় তাহলে এদের বিপক্ষে দাঁড়ানোর কোনও মানে থাকে না। কেননা এ শহরে সবাই ভিক্টিম আর সবাই অ্যাকিউসড। আর যদি সত্যি বোন হয় তাহলে? এটা কি কোনও সুযোগ? সে গোটা জীবন স্মিতাকে বিশ্বাস করতে চেয়েছে, যদিও জানে স্মিতার মত অবিশ্বাসী আর কেউ নেই। আর জানে বিকাশ এখন আর তাদের দলে নেই।
(সমাপ্ত)

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন