কালিমাটি অনলাইন / ১৩৯ / ত্রয়োদশ
বর্ষ : দ্বাদশ সংখ্যা
বিগত সাতচল্লিশ বছর যাবত নিয়মিতভাবে প্রকাশিত মুদ্রিত পত্রিকা ‘কালিমাটি’র ১১২তম সংখ্যা প্রকাশিত হলো ২০২৬ কলকাতা আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায়। এই সংখ্যার আলোচ্য বিষয় হিসেব যে প্রবাদ বাক্যটি বেছে নিয়েছি – ‘নেপোয় মারে দই’ – তাতে আমরা দুটি চরিত্রের সন্ধান পাচ্ছি, একটি ব্যক্তিবাচক ‘নেপো’ এবং আরেকটি বস্তুবাচক ‘দই’। প্রশ্ন উঠতে পারে, নেপো যেহেতু ব্যক্তিবাচক, তাই তার চরিত্র থাকতেই পারে; কিন্তু দই তো একটা জড়পদার্থ ও প্রাণহীন, তাহলে তার কীভাবে চরিত্র থাকতে পারে? সেক্ষেত্রে আমরা মনে করি, জড়পদার্থ ও প্রাণহীন হলেও দইয়েরও চরিত্র আছে। দই টাটকা নাকি পচা, টক নাকি মিষ্টি ইত্যাদি। বিশেষত এখানে দই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে রূপকার্থে। অর্থাৎ দই এখানে আসলে দই নয়, বরং অন্যকিছু। এবং সেই অন্যকিছুটা নির্ভর করে নেপোর চরিত্র ও কার্যকলাপের ওপর। সুতরাং দইয়ের চরিত্র বোঝার আগে জরুরি হচ্ছে নেপোকে বুঝে নেওয়া। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, নেপো শব্দটা এসেছে কোথা থেকে? সাধারণভাবে মনে করা হয়, যার পোশাকিনাম নেপাল, তার ডাকনাম নেপো। বলা বাহুল্য, এটা নিতান্তই সরলীকরণ। তাহলে তো নেপাল দেশটাকেও সংক্ষেপে নেপো নামে উল্লেখ করা যেতে পারে! জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস রচিত 'বাঙ্গালাভাষার অভিধান’ গ্রন্থে নেপো শব্দের ব্যুৎপত্তি উল্লেখ করা হয়েছেঃ নৃপতি > নৃপ > নেপো (কথ্য ভাষায়)। এই ব্যুৎপত্তির আড়ালে একটা যুক্তি অবশ্যই আছে। নৃপতিরা সব দেশে সব কালে শাসন ও শোষণ চালিয়ে এসেছে প্রজাদের ওপর। প্রজাদের শ্রমের ওপর নির্ভর করে থেকেছে চিরদিন। সেইসঙ্গে প্রজাদের বঞ্চিত করেছে তাদের প্রাপ্য থেকে। প্রজাদের শ্রমলব্ধ অর্থ কেড়ে নিয়ে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছে। অন্যদিকে বাংলা একাডেমীর ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’ এবং ‘সংসদ বাংলা অভিধান’এ নেপো শব্দের অর্থ অতিশয় ধূর্তব্যক্তি রূপে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ‘সরল বাঙ্গালা অভিধান’এ সুবলচন্দ্র মিত্র নেপো শব্দের অর্থ জানিয়েছেন ফাজিল, ডেঁপো, ধূর্ত ইত্যাদি। আবার কারও মতে আরবি শব্দ নফর অর্থাৎ চাকর থেকে নেপো শব্দটি এসেছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের 'বাঙ্গালাভাষার অভিধান’এ একটি শব্দ খুঁজে পাওয়া গেছে, নিপান, কারও কারও মতে এই শব্দটি থেকেই উদ্ভব হয়েছে নেপো শব্দটির। নিপান শব্দটির অর্থ দু’রকমের হয়, যেমন - পশুপাখির জলপান বা স্নানের জন্য নির্মিত ক্ষুদ্র জলাশয় বা চৌবাচ্চা। আবার নিপান শব্দের অর্থ দোহনপাত্রও হয়, অর্থাৎ যে পাত্রে দুধ দোহন করা হয়। আর এই দোহনের কাজ যারা করত, তাদের বলা হতো নিপানি। এই নিপানিরা যে শুধুমাত্র দুধ দোহন করত তা নয়, বরং দুগ্ধজাত অন্যান্য দ্রব্য যেমন ননী, ক্ষীর, ছানা, দই প্রভৃতি প্রস্তুতের কাজেও তারা নিয়োজিত থাকত। কিন্তু দুঃখের কথা হচ্ছে, সবাই তো আর সৎ হয় না! আর যারা সততাকে এড়িয়ে চলে, তারাই গন্ডগোলটা পাকায়। বলা বাহুল্য, অসৎ নিপানিরা সুযোগ পেলেই চুরি করে বা মেরে দেয় দুধ, ননী, ক্ষীর, ছানা এবং দই। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এইসব নিপানিরা শুধু গোয়ালঘরেই নয়, বরং বিরাজ করছে সর্বত্র। সমাজের সব স্তরে। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, কলা, ধর্ম, ক্রীড়া, স্বাস্থ্য, প্রশাসন, আইন-কানুন, নিরাপত্তা – সব ক্ষেত্রেই।
প্রকৃতির দুয়ারে এখন ফাল্গুন মাস। অর্থাৎ বসন্তকাল। আগামী চৈত্র মাসেও তার সহবস্থান আমাদের সঙ্গে। আপনাদের সবাইকে জানাই আমাদের বাসন্তী শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের ই-মেল ঠিকানা :
kajalsen1952@gmail.com
/ kalimationline100@gmail.com
দূরভাষ যোগাযোগ :
9835544675

0 কমেন্টস্:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন